অরণ্যে নৈবেদ্য

ঢাকায় টি-শার্টের পরিবেশে শীতের বিদায় বিরহ যখন, তখন বান্দরবানে রীতিমতো মোটা কাপড়ের দাপট। এ সময়টাই সেরা পাহাড়ের হদিস নেয়ার। মেঘ ছুঁয়ে দেখার। পাহাড় মানে যাদের কাছে কেবলই একটু একটু করে ওপরে উঠে যাওয়া, মেঘের অস্তিত্ব ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা; তাদের জন্য শীতে ট্রেকিং বা এক্সপেডিশন কেন যেন আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে না। হয়তো কুয়াশার চাদর মোড়ানো ন্যাড়া পাহাড়ের তুলনায় বুনো সবুজ জঙ্গল কিংবা নিদেনপক্ষে জুম ঘরের মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকার সুখদর্শন সম্ভব হয় না বলে। পার্থক্যটা শুধু উচ্চতার নয়, তার চেয়ে বেশি আবহাওয়ার।

ঢাকা থেকে রাতে রওনা হয়ে ভোরেই পৌঁছে যাওয়া সম্ভব পাহাড়ি এই জনপদে। শহরের আনুষ্ঠানিকতা আর কেনাকাটা চুকিয়ে বড়জোর ঘণ্টা খানেক সময় নষ্ট করা যায়। ইচ্ছে হলে দুদিন দিব্যি কাটিয়ে দেওয়া যায় নীলাচল, স্বর্ণমন্দির আর সাঙ্গু তীরে। অবশ্য ট্রেকাররা সেপথে যান না বললেই চলে। গন্তব্য যাদের পাহাড় ডিঙানো, তাদের প্রথম গন্তব্য থাকে শহর থেকে ৭৯ কিলোমিটার দূরে ওয়াই জংশন, নীলগিরি, পিক সিক্সটিনাইন ফেলে থানচি। বান্দরবানের রুমা ও থানচি- এই দুই উপজেলা দিয়েই মূলত পাহাড়ে ট্রেকিংয়ের রুটগুলো তৈরি হয়েছে। তবে চাইলে ৫ থেকে ৭ দিনের বড় প্ল্যান নিয়ে ক্রস ট্রেকিং করা সম্ভব।

সে ক্ষেত্রে রুমা দিয়ে ঢুকে থানচি কিংবা থানচি দিয়ে প্রবেশ করে রুমা দিয়ে বেরোনো সম্ভব। এ ছাড়া ভেতরের আরও কিছু দুর্গম রুটও এক্সট্রিম ট্রেকারদের জন্য এক্সপেডিশন রুট হিসেবে পরিচিত। সেসব সম্ভাবনা হাতড়ানোর চেয়ে আমাদের আটজনের টিমের পছন্দ থানচি-তিন্দু-রেমাক্রি-নাফাখুম-অমিয়খুম-জিনাপাড়া-পদ্মঝিরি হয়ে থানচি। পুরো পথে দিন-রাতে ট্রেকিং করে ১১ ঘণ্টা করে হাঁটা পথ ধরলে ৩ দিনে পাড়ি দেওয়া সম্ভব। ট্রেকিংয়ের জন্য এ রুটে প্রধান সমস্যা অতিরিক্ত বোঝা বহন। কেননা তিন দিনের খাবার নিজেরা ভাগাভাগি করে বহন করার কারণে খরচ অনেক কমে আসে এবং প্রচণ্ড কায়িক শ্রমের পর পছন্দসই ক্যালরি নেওয়া যায় শরীরে।

বলে রাখা ভালো, ট্রেকিংয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা সারতে হবে থানচি ঘাটে। সেখানে বিজিবির অনুমতি, বাজার-সদাই, গাইড চূড়ান্ত করাসহ আনুষঙ্গিক সবকিছু ঠিক করতে হবে। অনুমতি পেলে প্রথম কাজ সকাল সকাল ক্যানুজাতীয় ইঞ্জিন বোটে রেমাক্রির উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া। সাঙ্গু নদী ধরে এ পথ গেছে উজানে। তাই খরস্রোতা নদী হিসেবে এই অংশে বদনাম আছে সাঙ্গুর। বিপদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে নদীর বুকে মাথা তুলে চোখ রাঙানো একেকটা পাথরের চাঁই। সকালে রওনা দিলে তিন্দু পৌঁছে যাওয়া সম্ভব মিনিট চল্লিশের মধ্যে। তিন্দু ইউনিয়নের বাজার বলতে ছোটখাটো দু-একটা দোকানঘর। তিন্দু মূলত মাতৃতান্ত্রিক মারমা ও মুরংদের আবাসস্থল। চাচাইলে রাত্রিযাপন করা যায় এখানে। থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা আছে।

তিন্দু থেকে একটু সামনে এগোলেই বড় পাথর, স্থানীয়রা একে রাজা পাথরও বলে থাকে। বিশাল আকারের এই পাথরসহ উজান পথে নদীতে আরও বেশ কিছু ছোট-বড় পাথর নদীর মাঝে পড়ে আছে। ধারণা করা হয়, বহু আগে ভূমিকম্পের ফলে পাশের পাহাড় থেকে বিশাল আকারের এই পাথরের টুকরোগুলো নদীতে এসে পড়ে। আদিবাসীরা বিশ্বাস করে, এই রাজা পাথরকে সম্মান দেখাতে হয়, নইলে পথে দুর্ঘটনা ঘটে। এই কারণে এখানে নৌকা থেকে নেমে হেঁটে যেতে হয়। এসব পাথরে বাধা পেয়ে পানির তোড় একেবারেই ওলটপালট। খর প্রবাহের নদীটা সাঙ্গু-মাতামুহুরী থেকে বান্দরবানের পথে আসতে অপার্থিব এক সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের এই একটি জায়গা র‌্যাফটিংয়ের জন্য দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। বর্ষায় এই পথে অবশ্য চলাচল দায়। আর পাহাড়ে হরকাবান নামলে মাটিগোলা পানিতে উপচে পড়ে থানচি থেকে রেমাক্রির দুই তীর। তখন এ পথে চলা বারণ। তাই বর্ষার আগে আর পরের সময়টা ট্রেকিং, র‌্যাফটিংয়ের জন্য উপযুক্ত। তিন্দু ছেড়ে ঘণ্টা দুয়েক এগোলে রেমাক্রি বাজার। সমতলের গ্রামের বাড়িগুলো যেমন হয়, সেই আদলে বসতি উঠেছে এখানে। মাঝখানে বড় উঠানকে কেন্দ্র করে চারপাশে মারমাদের দোকান। এই দোকানগুলোর পেছনের অংশেই পরিবার-পরিজন নিয়ে মারমাদের বাস। নদী তীর থেকে কিছুটা উঁচুতে এই মারমা পাড়ায় থাকা-খাওয়া, ক্যাম্পিংয়ের সব ধরনের সুবিধাই আছে।

নাফাখুম ঝর্ণা

নিরাপত্তাও চোখে লাগার মতো। আছে বিজিবি ক্যাম্প। এই পাড়াকে স্টার্টআপ পয়েন্ট ধরে ট্রেকিং শুরু করে অভিযাত্রীরা। থানচি থেকে গাইড নিয়ে এলেও স্থানীয় অদ্ভুত নিয়মে সে গাইড পুরো ট্রেকিংয়ে সঙ্গে থাকতে পারবে না। এটা গাইড অ্যাসোসিয়েশন আর পাহাড়িদের আইন। তাই রেমাক্রি থেকে গাইড বদলে যায় যাত্রার আগে। গুনতে হয় বাড়তি খরচ। অনেকের মতো সে ঝক্কির ধার ধারলাম না আমরাও। স্থানীয়দের বাগবিতণ্ডা আর নিষেধ উপেক্ষা করে থানচি থেকে সঙ্গে নেওয়া গাইড নিয়েই আটজনের দল বেলা থাকতে থাকতে যাত্রা করল পাড়ার উদ্দেশে। গাইড জানাল, তার আগেই অবশ্য পথে দেখা দেবে জলপ্রপাত নাফাখুম।

আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার মতো হাঁটা দূরত্বে নাফাখুম জলপ্রপাত। রেমাক্রি খাল আর পাথুরে পথ ধরে হেঁটে গেলেই নাফাখুম। খালের অপরূপ সৌন্দর্য আর স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ হিম ধরায়। পাহাড়ের পাদদেশে চলতে আর উপত্যকা পেরোতেই হয় প্রথম দুই ঘণ্টা। কেননা অসংখ্য ঝিরি, খাল পাহাড়ের নিচের অংশেই অবস্থিত। তাই চড়াই-উতরাই নেই নাফাখুমের পথে। আরামের ট্রেকিংই বলা চলে। এ পথে সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং মনে রাখার মতো পরিবেশ- বুনো নীরবতা। পায়ে পায়ে চলতে নিজের মাড়ানো পথের আওয়াজও রীতিমতো বিধ্বংসী শব্দে ধরা দেয় কানে। হাঁটা পথে ঝিরিপথের সৌন্দর্য আর পিচ্ছিল বোল্ডারগুলো পেছনে ফেললাম আমরা দ্রুতই। পিচ্ছিল পাথর আর বাড়ন্ত আগাছা ধীরগতি আনতে বাধ্য এ পথে। নাফাখুম পৌঁছাতে পৌঁছাতে সূর্য হেলে পড়েছে পাহাড়ের গায়ে। প্রচণ্ড শব্দে প্রায় ৩০ ফুট নিচে পানি গড়িয়ে পড়ার কান ফাটানো শব্দ চলে অবিরত। অনেকটা দূর থেকে এ শব্দ কানে যায় পর্যটক আর অভিযাত্রীদের। এত কষ্টের পর নাফার রূপে মুগ্ধ আমরা অপলক। তিনটি ধাপে নেমে আসা এই জলপ্রপাতটি পতিত হয়ে সূর্যের আলোর সঙ্গে তৈরি করে রংধনু। চোখ জুড়ানো সে দৃশ্য পেছনে ফেলে চলে আসা নিয়ে রীতিমতো ট্র্যাজিক কাহিনি লিখে ফেলা সম্ভব। বেলা পড়ছে, যেতেও হবে বহুদূর, তাই দ্রুত পা চালানোর তাগাদা এলো গাইডের তরফে। সময় আর দূরত্বের হিসাব কষে আবারও শুরু হলো হাঁটা। রেমাক্রি খালের এই একটি মাত্র ধারাকে অন্তত পাঁচবারনাফাখুম পৌঁছাতে পৌঁছাতে সূর্য হেলে পড়েছে পাহাড়ের গায়ে। প্রচণ্ড শব্দে প্রায় ৩০ ফুট নিচে পানি গড়িয়ে পড়ার কান ফাটানো শব্দ চলে অবিরত। এত কষ্টের পর নাফার রূপে মুগ্ধ আমরা অপলক। তিনটি ধাপে নেমে আসা এই জলপ্রপাতটি পতিত হয়ে সূর্যের আলোর সঙ্গে তৈরি করে রংধনু। চোখ জুড়ানো সে দৃশ্য।