আজি অন্ধকার দিবা বৃষ্টি ঝরঝর

কবিগুরুর এই ‘অন্ধকার দিবা’ বিচিত্র রঙে হাজির বাংলার প্রকৃতিতে। প্রকৃতিতে তাই বর্ষার আবেদনও অন্যরকম। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে ভিন্নমাত্রার ভালোলাগা, দুঃখবোধ, আনন্দ, বিনোদন, বিরহ, মনের প্রসারণ, মনের সংকোচন, বিস্তৃতি সবকিছুই। বর্ষার জলধারা কখনো একটু সিক্ত করে, কখনো গোটা শরীর-মন জুড়িয়ে দেয়, কখনোবা ধাক্কা দিয়ে নিয়ে যায় গহীন অঞ্চলে। যা চেনাজানা নয়।

প্রকৃতি এবং বর্ষা এই বিষয়টি ভাবতেই প্রথমেই মনে আসে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা। তিনি এতো বিস্তৃত, এতো বিশদভাবে বর্ষার প্রতিটি রূপ, রহস্য, গন্ধ, ভীতি বর্ণনা করেছেন যা বলে শেষ করা যাবে না। বর্ষা ঘিরে মানবের অসহায়ত্ব কিংবা পুলক সবিই বর্ণণা করেছেন অপার শক্তিশালী শব্দমালায়। প্রকৃতিপর্যায়ের গানে কবি বলছেন,

‘ঝরঝর বরিষে বারিধারা

হায় পথবাসী, হায় গতিহীন, হায় গৃহহারা।।’

এক বরষার গানে তিনি তিনটি পর্যায়ের অবস্থানকে তুলে এনেছেন। তিনটি অবস্থানে বর্ষার রূপপ্রকৃতি আলদা, আলাদা। কবিগুরু আরেক জায়গায় বরষাকে এনেছেন ছন্দের দুলনিতে, তরুলতার আন্দোলনে, আমোঘ মননৃত্য।

‘এসেছে বরষা, এসেছে নবীনা বরষা,

গগন ভরিয়া এসেছে ভুবনভরসা।।

দুলিছে পবনে সনসন বনবীথিকা,

গীতময় তরুলতিকা।’

বর্ষা শুধু শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক বা প্রকৃতিপ্রেমীদের আমোদিত করে তা না, সাধারণ জনমানুষের মধ্যেও বরষার আবেদন অন্যধরনের। কবিগুরু বলেছেন,

‘অন্তরে আজ কী কলরোল,

দ্বারে দ্বারে ভাঙল আগল-

হৃদয়-মাঝে জাগল পাগল আজি ভাদরে।

আজ এমন ক’রে কে মেতেছে বাহিরে ঘরে।।’

 

একদিকে যেমন বর্ষার স্তুতি গেয়েছেন, অন্যদিকে বর্ষার ভয়াবহতাকেও ছাড়েননি কবিগুরু। এই সময়টাতে বর্ষার ভয়াল রূপ, দুর্বার গতি, আচমকা ধেয়ে আসা যে জনমনে ভীতি সঞ্চার করে। জনমন উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠে তা তিনি জানতেন, তাই তিনি লিখেছেন,

‘আজ শ্রাবণের আমন্ত্রণে

দুয়ার কাঁপে ক্ষণে ক্ষণে,

ঘরের বাঁধন যায় বুঝি আজ টুটে।।

ধরিত্রী তাঁর অঙ্গনেতে

নাচের তালে ওঠেন মেতে,

চঞ্চল তাঁর অঞ্চল যায় লুটে।।’

বর্ষার আনন্দ, বেদনা যেমন আছে, তেমনি রয়েছে আকুলতা, অস্থিরতা। বৃষ্টির দিনে প্রিয়জনের অনুপস্থিতি বারবার নাড়া দেয় ঘরের মানুষটিকে, যাতনায় রাখে ক্ষণে ক্ষণে। বর্ষার আবহ মন তো বটেই, শরীরেও একধরনের উন্মাদনা তৈরি করে। সেই আকুলতা, সেই উন্মাদনা প্রিয়জনের সাহচর্য চাই বারে বারে। কারণ এমন মধুর সময় উপভোগ করার জন্য প্রিয়জনের আলিঙ্গনই শ্রেয়, উত্তম। তাই কবিগুরু লিখেছেন,

‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার

পরানসখা বন্ধু হে আমার।।

আকাশ কাঁদে হতাশসম,

নাই যে ঘুম নয়নে মম-

দুয়ার খুলি হে প্রিয়তম,

চাই যে বারে বার।।’

বর্ষা বন্দনার এক জায়গায় অভিসারের আকুতি যেমন স্পষ্ট, অন্যদিকে বর্ষার আগমনে, মনের আনমনে মাতোয়ারা দুলনিতে ছন্দহীন হয়ে ছুটে যাওয়ার কথাও ব্যক্ত করেছেন রবীন্দ্রনাথ। তাই তিনি লিখেছেন,

‘মোর ভাবনারে কী হাওয়ায় মাতালো,

দোলে মন দোলে অকারণ হরষে।

হৃদয়গগনে সজল ঘন নবীন মেঘে

রসের ধারা বরষে।।

………………………………………

সে যে মন মোর দিল আকুলি

জল-ভেজা কেতকীর দূর সুবাসে।।’

প্রেমময়, আবেগঘন বর্ষার স্তুতি যেমন রবীন্দ্রনাথ করেছেন, তেমনি করেছেন বর্ষায় মন পাগল, উন্মাদ, রুক্ষ, বিদ্রোহী করে দেয়ার স্তুতি। এই উন্মাদনা জুড়ে রয়েছে চিত্ত, প্রশান্তি। কবি লিখেছেন,

‘মন মোর হংসবলাকার পাখায় যায় উড়ে

ক্বচিৎ ক্বচিৎ চকিত তড়িত-আলোকে।

ঝঞ্ঝনমঞ্জীর বাজার ঝঞ্ঝা রুদ্র আনন্দে।

…………………………………………

মন মোর ধায় তারি মত্ত প্রবাহে

তাল-তমাল-অরণ্যে

ক্ষুব্ধ শাখার আন্দোলনে।।’

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের বরষার বন্দনা বা স্তুতি বলে শেষ করা যাবেনা। রবীন্দ্রনাথ বর্ষা নিয়ে এতো এতো গান লিখেছেন যে সারাদিন আলোচনা করলেও তা যেন মন ভরে না। একধরনের অতৃপ্তি, আরো জানবার আগ্রহে মন আকুলি বিকুলি করে উঠে। তাই কবিগুরু লিখেছেন,

‘মন হারাবার আজি বেলা,

পথ ভুলিবার খেলা- মন চায়

মন চায় হৃদয় জড়াতে কার চিরঋণে।।’

আবার আরেক জায়গায় মনের মাতোয়ারা গতিকে বন্দী করতে না পেরে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,

‘যা না চাইবার তাই আজি চাই গো,

যা না পাইবার তাই কোথা পাই গো।

পাব না, পাব না,

মরি অসম্ভবের পায়ে মাথা কুটে।।’

 

ছবি: ঈষাণ শাহরিয়ার