আনিসুজ্জামান সোহেলের অন্তরঙ্গ ভয়

শিল্পের সঙ্গে সমকালের সম্পর্ক, শিল্পের উৎপত্তিকাল থেকেই। আর চিত্রশিল্পের বেলায় বলা যায়, সমকালীন ভাবনা বা উপলব্ধি প্রকাশের প্রয়াস থেকেই চিত্রশিল্পের উদ্ভব ও বিকাশ। আর এই বিকাশের ধারায় চিত্রশিল্প আজ প্রাগত ধরন-ধারণ থেকে বের হয়ে শিল্পবোধ প্রকাশ করছে বিভিনড়ব গঠন এবং মাধ্যমে, যা সমকালীন শিল্প নামে আখ্যায়িত। সমকালীন শিল্পধারার চর্চা বাংলাদেশে খুব বেশি দিনের নয়। এই ধারায় বাংলাদেশ এখনো তার প্রম ধাপ অতিক্রম করছে।
আমার প্রতিবাদ আমার ছবি
অস্থির সময়ের মাঝে পথ চলছি যেন আমরা। ছুটছি প্রতিনিয়ত। কিন্তু কিসের আশায়, তা হয়তো অনেকেই জানি না। আর এই ছোটাছুটির ভেতর সময় করে গুলশানের বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জের দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লে প্রমেই আবিষ্কার করবেন শিল্পী আনিসুজ্জামান সোহেলের অন্তরঙ্গ এক ভয়ের জগৎ। তাঁর একান্তই এক নিজস্ব শিল্পের জগৎ। ‘আমি আসলে খুব ভিতু ধরনের মানুষ। আমি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কিংবা লেখক নই। কিন্তু তারপরও সমাজের কাছে আমার কিছু দায়বদ্ধতা আছে। সমাজের যেসব অসঙ্গতি আমার কাছে ম্যাটার করে, তাই তুলে ধরার চেষ্টা করি কাজের মাধ্যমে। আমার কথা বলা আমার ছবি। আমার প্রতিবাদ আমার ছবি। ছবির মধ্য দিয়ে সেই প্রতিবাদ করি।’
যুদ্ধ আমাকে বরাবরই বেদনা দেয়
সোহেলের একান্ত ব্যক্তিগত ভয়ের জগতের একটু গভীরে প্রবেশ করলেই খোঁজ পাওয়া যাবে সমাজ, দেশ এবং সীমানার কাঁটাতার পেরিয়ে সমকালীন বিশ্বের। মানুষের জীবন থেকে অদৃশ্য কোনো শক্তি বেলচা দিয়ে চেঁছে নিয়েছে সংগীত, কেটে গেছে আমাদের মানবিক সুর। চারদিকে বাজছে ছাপানো টাকায় কেনা অস্ত্রের ঝনঝনানি। সুন্দরকে প্রতিনিয়ত কাটাছেঁড়া চলছে নৃশংসতায়। বিষয় নির্বাচনে এমনই সব ভয়ংকর বাস্তব হয়ে উঠে এসেছে শিল্পী সোহেলের সতর্ক দৃষ্টিতে। ‘যুদ্ধ আমাকে বরাবরই বেদনা দেয়। আমার কাজের মধ্যে মিলিটারি, রাজনীতি, ভয়ংকর বিষয়গুলো থাকে। ভয়কে খুব কাছ থেকে দেখার চেষ্টা। কিন্তু কুৎসিতভাবে নয়, নান্দনিক দৃষ্টিকোণ থেকে। যেন মানুষ আঁতকে না ওঠে, যেন উপলব্ধি করতে পারে।’
আমি খুব অস্থির প্রকৃতির
চারপাশের অস্থিরতা যেন অবিরত গ্রাস করে চলে শিল্পীকে। মাধ্যম নির্বাচনে কি তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন শিল্পী? ড্রয়িং, অবজেক্ট যেমন আছে তেমনি আছে ভাস্কর্য। তবে বেশির ভাগই ইনস্টলেশনভিত্তিক। যার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে অ্যালুমিনিয়াম, ব্রোঞ্জ, স্টেইনলেস স্টিল, কাঠ খোদাই, ফাইবার গ্লাস, লাইট বক্স তেমনি ব্যবহার করেছেন অ্যাক্রিলিক, চারকোল ও মিশ্র মাধ্যমসহ প্রচলিত উপকরণ। ‘আমি খুব অস্থির প্রকৃতির। সব সময়ই খুঁজতে থাকি নতুন কী করা যায়। সব সময় একটা প্রস্তুতি চলে নিজের মধ্যে। নিজেকে ভেঙেচুরে সাজানোর একটা চেষ্টা।’ ‘আমার কাজ কোনো বাসার ড্রয়িংরুমের দেয়ালে শোভা পাবে, তা ভেবে আমি কাজ করি না।’ আর তাই হয়তো সোহেলের শিল্পকর্মে গতানুগতিক ফুল, পাখি, নদী বা নিসর্গদৃশ্যের পরিবর্তে প্রকৃতি ও সমাজবাস্তবতা রূপাশ্রয়ী হয়ে গভীর ও মর্মস্পর্শী আর্তনাদ তৈরি করে। যা আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা ও বিবেকবোধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। যেখানে শিল্পী নিজেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
ব্যতিক্রর্মী ৫৭টি শিল্পকর্ম নিয়ে আয়োজিত এই প্রদর্শনীর মধ্য দিয়েই শেষ হতে যাচ্ছে গুলশানের বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জের কার্যক্রম। তবে বাংলাদেশের শিল্পকলার পরিচর্যায় বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সহায়তায় অলাভজনকভাবে নিজস্ব কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়। ৭ মে থেকে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী চলে ৪ জুন ২০১৬ পর্যন্ত।

বর্তমানে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কর্মরত শিল্পী আনিসুজ্জামান সোহেলের জন্ম ১ অক্টোবর ১৯৭৩ সালে, টাঙ্গাইলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বিএফএ ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৯৬ সালে। দুটি একক প্রদর্শনীসহ দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক প্রদর্শনী ও কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন এ শিল্পী।