আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন

বৃক্ষের বংশবিস্তারে পরাগায়নের যে ভূমিকা, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যের বিস্তারে আড্ডার ভূমিকা। সেই আড্ডাকে ক্যাফে, গলি, শহর ও দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বমানবের দহলিজে পৌছে দেওয়ার প্রয়াসে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন আয়োজক পরিষদের এই অভিনব উদ্যোগ। বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রনালয় ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় এবং ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ ও নিখিল ভারত বঙ্গসাহিত্য সম্মেলন এর সার্বিক সহযোগিতায় গত ৩০ পৌষ থেকে ২ মাঘ ১৪২৪ (১৩-১৫ জানুয়ারি ২০১৮) পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন ১৪২৪। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান প্রথমবারের মতো এই সাহিত্য সম্মেলন উদ্বোধন করেছিলেন ১৯৭৪ সালে। অতঃপর, দীর্ঘ ৪৪ বছর পর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেন এই সম্মেলনের বর্তমান আয়োজন।

দেশি গান, চলচ্চিত্র, নাটক এই সবকিছুই হতে পারে সাহিত্যের এর ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা। সৃষ্টির উল্লাস যখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বসাহিত্যের বৈচিত্র্যপূর্ণ অঙ্গণে তখন এমনিধারা সম্মেলনের প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নাতীত। এজন্যই বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মান থেকে আগত বিভিন্ন ভাষাভাষী তিন শতাধিক প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গ সরগরম করে রেখেছিলেন সমগ্র সম্মেলনটিকে। শিল্প, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের নিরন্তর শ্রমিকদের মাঝে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সত্যম রায় চৌধুরী, সুনীলময় ঘোষ গৌতম ঘোষ, সুনীল চট্রোপাধ্যায়, কাজুহিরো ওয়াতানাবে, হাসান আজিজুল হক, নাসিরুদ্দিন ইউসুফ, রাবেয়া খাতুন, শামসুজ্জামান খান, প্রফেসর মুনতাসীর মামুন, সেলিনা হোসেন, আনিসুল হক, ইমদাদুল হক মিলন, তানভীর  মোকাম্মেল, মইনুল আহসান সাবের, বোরহানুদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আবুল হাসনাত, আব্দুল্লাহ আল মামুন, শাহীন আখতার, জাহিদুর রহিম অঞ্জন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

বাংলা একাডেমির তিনটি মিলনায়তন ও বহিরাঙ্গনের তিনটি মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় এ সম্মেলন। সম্মেলনের পাশাপাশি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বই ও বিভিন্ন সাহিত্য-সাময়িকী, লিটিল ম্যাগ প্রদর্শনী ও বিক্রয়ের সুযোগ ছিলো। এর পাশাপাশি ছিলো বাংলা সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বকারী পোশাক, অলঙ্কার, বাদ্যযন্ত্র ও পিঠা পায়েস এর উন্মুক্ত লাভজনক প্রদর্শনী। একাধিক তাঁবু ও অস্থায়ী মঞ্চে দুটি চলচ্চিত্র ও চারটি নাটক মঞ্চায়িত হয়েছে। সেইসঙ্গে ছিলো গল্প-কবিতা পাঠ, গান পরিবেশন এবং নাচের আসর। এ ছাড়াও অতিথি-দর্শনার্থী ও সাহিত্যিকদের মাঝে উন্মুক্ত আড্ডার ব্যবস্থা ছিলো উৎসব প্রাঙ্গণে।

মোট ছয়টি সেমিনারে নির্ধারিত বিষয়ে প্রবন্ধ পাঠ ও আলোচনা করেন স্ব স্ব ক্ষেত্রে গুণী স্রষ্টাগণ। বাংলা সাহিত্যে দেশভাগের অভিঘাত বিষয়ে প্রবন্ধ পাঠ করেন গোলাম মোস্তুফা এবং সেমিনারটির সভাপতিত্ব করেন হাসান আজিজুল হক। আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সেমিনারটির বিষয়বস্তু ছিল সাহিত্য ও চলচ্চিত্র। এই সেমিনারটিতে সভাপতির আসন উজ্জল করে ছিলেন পরিচালক গৌতম ঘোষ এবং সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক মিথস্ক্রিয়া প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন তানভীর মোকাম্মেল, সুবোধ সরকার, চৈতালি মুখার্জি প্রমুখ।

নজরুল মঞ্চে পালাগান পরিবেশনা।

সম্মেলনের দ্বিতীয় কিস্তিতে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের সভাপতিত্বে ‘বাংলা সংবাদ ও সাময়িকপত্রের দুশো বছর’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় যেখানে আলোচনা করেন কিংশুক বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যামল দত্ত, অনির্বাণ চৌধুরী, মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল প্রমুখ। গত দু’শ বছরে দুই বাংলার সংবাদ চর্চার ইতিহাস, বিকাশ, সুযোগ ও খামতিগুলো নিয়ে চলেছে অতি প্রাসঙ্গিক তর্জমা ও মতবিনিময়। সাময়িকপত্রের বোধিপূর্ণ স্নেহের বাতাবরণ এই দুশো বছরে বাংলা সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতিকে কতটা পরিপুষ্ট করেছে এই আলোচনায় উঠে এসেছে সেই সারকথা।

সম্মেলনের সমাপনী দিনে সাজানো সেমিনারগুলোতেও ছিলো বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে অতি প্রাসঙ্গিকতার সঙ্গে আগ্রহোদ্দীপক বৈচিত্র্য। ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতিসত্ত্বা বিষয়ক সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম এবং আলোচকবৃন্দের মধ্যে ছিলেন আবুল মোমেন, উষারঞ্জন ভট্টাচার্য, অমর মিত্র প্রমুখ। ডক্টর মুহাম্মদ জাফর ইকবালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় ‘প্রযুক্তির বিশ্বে বাংলা সাহিত্যের সংকট ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনার যেখানে মূল প্রবন্ধটি পাঠ করেন রাজু আলাউদ্দিন। ষষ্ঠ সেমিনারটির বিষয়বস্তু ছিল ‘সাহিত্যের অনুবাদ এবং অনুবাদ সাহিত্য’ যেখানে সভাপতিত্ব করেন শিল্প সমালোচক ও সাহিত্যিক বোরহানুদ্দিন খান জাহাঙ্গীর।

একটি বিশেষ পর্ব ছিল প্রথম দু’দিন, ১৩ ও ১৪ জানুয়ারি- গল্পপাঠ ও কথাসাহিত্য আলোচনা। কবিতাপাঠ যেকোনো উৎসবের নিয়মিত অংশ বহুদিন ধরেই, কথাসাহিত্য নিয়ে আলোচনাও নতুন কিছু নয়, কিন্তু এই প্রথমবারের মতো কোনো উৎসবে বা আয়োজনে গল্প পাঠের ব্যাপারটি যুক্ত হয়েছে। দু’দিনে তিনজন করে ছ’জন তরুণ গল্পকার তাঁদের গল্প পড়ে শোনান, এরপর বাংলাদেশের কথাসাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেন দুই বাংলার প্রতিথযশা কথাশিল্পীরা। বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান মিলনায়তনে ১৩ ও ১৪ জানুয়ারি বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলে এই পর্ব। তরুণ গল্পকার ও আলোচকদের মাঝে উল্লেখযোগ্য মোজাফফর হোসেন, প্রশান্ত মৃধা, মেহেদি উল্লাহ,খালিদ মারুফ, স্বকৃত নোমান প্রমুখ।

প্রথমদিনেই অর্থাৎ ১৩ জানুয়ারি বাংলা একাডেমির বহিরাঙ্গনে প্রদর্শিত হয় গৌতম ঘোষ পরিচালিত পদ্মা নদীর মাঝি এবং শেখ নেয়ামত আলি পরিচালিত সূর্যদীঘল বাড়ি। এ ছাড়াও ছিলো ম্যাড থ্যাটার প্রযোজিত নাটক নদ্দিউ নতিম এবং ঢাকা থিয়েটার প্রযোজিত নাটক ধাবমান

আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন ১৪২৪ এর ইতি টানতে এসেছিলেন ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। তাঁর সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী জনাব আসাদুজ্জামান নূর, অর্থমন্ত্রী জনাব আবুল মাল আব্দুল মুহিত, বাংলা একাডেমি মহাপরিচালক জনাব শামসুজ্জামান খান, ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের সংসদীয় মন্ত্রী সরযু রাই এবং প্রখ্যাত ভারতীয় শিল্পী যোগেন চৌধুরী।

সমাপনী পর্বের অতিথিবৃন্দ।

সমাপনী অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর পাঠ করেন সৈয়দ শামসুল হক রচিত ‘আমার পরিচয়’ কবিতাটি। এখানে সমাপনী বক্তব্য প্রদান করেন এমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। সম্মেলনটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গান গেয়েছিলেন ওপার বাংলার শিল্পী শ্রাবণী সেন এবং সমাপনী অনুষ্ঠানটি গান দিয়ে শুদ্ধ করেন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা।

‘বিশ্বমানব হবি যদি কায়মনে বাঙালি হ’ এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে আয়োজিত হয় ‘আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন ১৪২৪’। তিন দিনের উৎসবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসারে। কেননা সাহিত্য সংস্কৃতির প্রসার না হলে বিকশিত হবে না চিন্তা, চেতনা। সেই বার্তাই প্রকাশ পেল উৎসবের বিশেষ অতিথি প্রণব মুখার্জির বক্তব্যে, ‘পরিবেশ দূষণের চেয়ে ক্ষতিকর যে দূষণ, তা হচ্ছে চিন্তার দূষণ। আত্মাকে, চিন্তাকে সে দূষণের হাত থেকে রক্ষা করার ক্ষমতা রয়েছে একমাত্র সাহিত্য-সংস্কৃতিরই।’

ছবি: মাহবুব হোসেন নবীন