আমার গান শেখা শুরু দুই বছর বয়সে

ছেলেবেলা থেকেই প্রখ্যাত গুরুজিদের সান্নিধ্যে লাভ করেছেন বিস্তর প্রশিক্ষণ। সে কারণেই পাতিয়ালা কসুর ছাড়াও আরও অনেক ঘরানার ওপর দখল অজয় চক্রবর্তীর। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই তিনি আই টি সি সংগীত একাডেমির সাথে যুক্ত আছেন। ১৯৭৮ সালে তিনি এর প্রথম পণ্ডিত হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তিতে তিনি কনিষ্ঠতম গুরুর আসনে আসীন হন, যে রেকর্ড আজ অবধি বহাল আছে। এছাড়া সংগঠনটির বিশেষজ্ঞ কমিটিতেও আছেন তিনি। তাঁর পুরস্কারের সংখ্যা অগণিত। স্বীকৃতির ঝুলিতে আছে ‘পদ্মশ্রী পদক’। আই টি সি এর প্রথম স্বর্ণপদকজয়ী সঙ্গীতজ্ঞও তিনি। এছাড়া  ৪৫ বছরের নিচে সেরা সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবেও গন্ধর্ব পদক পেয়েছেন। এছাড়াও সঙ্গীত নাটক একাডেমি পদক, বঙ্গভূষণ এবং আলভার ভিরাসাত পদক তার আরও কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন। বলিউডে কাজ করেও তিনি খ্যাতি কুড়িয়েছেন এবং সেখানকার অনেক নামী সঙ্গীত পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছেন। ২০১২ সালে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবে সংগীত পরিবেশন করতে ঢাকায় আসেন এই গুণী শিল্পী। তখনই ‍মুখোমুখি হন বেঙ্গল বারতার…

আপনার সংগীতজীবনের শুরু কীভাবে?

আমার সংগীতজীবনের শুরু তো আমার ইচ্ছায় হয়নি, হয়েছে আমার বাবা-মায়েদের ইচ্ছায়। বাবা বলতেন, আমাকে দুই বছর বয়স থেকেই গান শেখানো শুরু করেছিলেন (বাবা-মায়েরা প্রত্যেকেই গান করতেন)। মায়েরা বলছি এ কারণে যে আমার দুজন মা। আমার বড় মায়ের কোনো সন্তান হয়নি বলে আমার দাদু তাঁরই তৃতীয় মেয়ের সঙ্গে আমার বাবার আবার বিয়ে দেন। আমার মা আর বড় মা সম্পর্কে দুই বোন। আমার বাবার নাম অজিত চক্রবর্তী, মায়েরা ছিলেন মহামায়া চক্রবর্তী আর জয়ন্তী চক্রবর্তী। বাবা-মায়ের অনেক প্রতিভা আর ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও গানকে জীবনে জীবিকা হিসেবে নিয়ে বড় হওয়া হয়ে ওঠেনি তাঁদের। কারণ, সে সময় বাংলাদেশের সেই অবস্থা ছিল না (তাঁরা দুজনেই ময়মনসিংহের মানুষ। সত্যজিৎ রায়ের বাড়ির পাঁচিলের এপাশে আমার মামার বাড়ি, আর ওপাশে ওঁদের বাড়ি, মুশুলি গ্রামে। এখন তো কিশোরগঞ্জ হয়ে গেছে)। আর বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষের হয়তো মনেই নেই যে বাবা আলাউদ্দিন খাঁ থেকে শুরু করে বেলায়েত খাঁ, এনায়েত খাঁ, আয়াত আলী খাঁ, বাহাদুর খাঁসহ আরও অনেকের জন্ম এই বাংলাদেশে। যন্ত্রসংগীতের মূল কিন্তু বাংলাদেশ, ভারতবর্ষ নয়। কিন্তু তাঁরা সবার সামনে এসেছেন ভারতবর্ষে গিয়ে। স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত এই দেশ অনেক জটিলতার মধ্যে ছিল বলেই হয়তো বাংলাদেশে শাস্ত্রীয় সংগীতের তেমন জোর ছিল না। তবু দেশ স্বাধীনের পরও কেন জানি না সে রকম পৃষ্ঠপোষকতা শাস্ত্রীয় সংগীতের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। তাই এবারে আমি অনুষ্ঠানেও শ্রোতাদের বলেছি, আপনারা যদি একটু মনোযোগ দিয়ে গানের চর্চা করেন, তাহলে বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে সংগীতেও একটা স্থান করে নেবে। এসব কিছুই আমার বাবার কাছে শুনেছি, পরবর্তী সময়ে নিজেও উপলব্ধি করেছি। আমার বাবার স্বপ্নকে পূরণ করার জন্যই আমি এ পর্যন্ত সবকিছু করে এসেছি। আমার গান শেখা শুরু হয়েছে দুই বছর বয়সে। প্রচণ্ড অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে আমি বড় হয়েছি। প্রায় ছয় বছর বয়সের পর থেকে আমার নিজের মনে আছে। তবে শুনেছি, আমি নাকি চার বছর বয়সেই যাত্রায় গান করেছি। পালাসম্রাট ব্রজেন কুমার দে সে সময়ের বিখ্যাত পালাকার। তাঁর কাঁধে চেপে আমি রুপোর মেডেল নিয়েছিলাম, সে প্রায় হাজার দশেক লোকের সামনে। ‘রাজ-সন্ন্যাসী’ যাত্রায় আমি কৃষ্ণের ভ‚মিকায় আর ‘করনারজুন’ পালায় ব্রিশকেতুর ভ‚মিকায় গান করেছিলাম। পরে আমি তাঁর ছবি দেখেছি। বাবা আমাকে বলতেন, ‘কুপুত্রের চেয়ে নির্বংশ ভালো।’ এর মানে হলো, হয় তাঁর ছেলে ভারতবর্ষের এক নম্বর গাইয়ে হবে, নয়তো তিনি জানবেন তাঁর কোনো সন্তান নেই। বাবা আমাকে বিভিন্ন পালায় গান গাওয়াতেন। আমার জীবনে তেমন কিছুই হয়নি, তবে বাবার কারণে আমার গান শেখার একটা বড় সুযোগ হয়েছে বলে আমি মনে করি।

বাবা আমার বন্ধুর মতো ছিলেন। মায়ের চেয়ে বাবার সঙ্গে আমার সখ্যতা বেশি ছিল। শুনেছি, আমার তিন বছর বয়সে বাবা রাইফেল ফ্যাক্টরির কাজটা ছেড়ে দেন। ‘কী করে চলবে’- মা জিজ্ঞেস করায় বাবা বলেছিলেন, ‘আমি যদি চাকরি করি, তাহলে ওর গানটা হবে না। তাই চাকরিটা ছেড়ে এসেছি।’ জমিতে শাকসবজি হতো, গরু ছিলো আর বাবার দুটি তাঁতের মেশিন খোলা অবস্থায় ছিল। তাঁত দুটি বাবা মিস্ত্রি ডেকে ঠিক করিয়ে নিয়ে নিজেই চালাতে শুরু করলেন। তাতে মণিপুরী কাঁথা, শাড়ি বুনতেন বাবা-মা দুজনেই। শাড়ির দাম ছিল সাড়ে পাঁচ টাকা, কাঁথার দাম তিন টাকা। ওগুলো যেদিন বিক্রি হতো, সেদিন বাড়িতে বাজার হতো, বিক্রি না হলে বাজার হতো না। এসবই আমার মনে আছে। এ রকম অবস্থা আমার ১৬-১৭ বছর বয়স পর্যন্ত। সে সময় আমাদের বাড়িতে ইলেকট্রিসিটি কেনার পয়সা ছিল না। আমি হারিকেনের আলোতেই লেখাপড়া করতাম। আমার মনে হয়, এ কথাগুলো সবার জানা উচিত। সবাই তো আর রুপোর চামচ নিয়ে জন্মায় না। কিন্তু জীবনে কষ্ট করে বেড়ে ওঠা সব মানুষের জন্যই প্রয়োজন। তাতে জীবন সম্পর্কে বোধটা আরও বেশি পরিষ্কার হয়।

এভাবেই আমার গান শেখার শুরু। তবে বছর তিনেক বাবার কাছে শেখার পর বাবারই এক বন্ধু পান্নালাল শামন্ত, যিনি আমাকে নিজের সন্তানের মতই স্নেহ করতেন, দুই বছরের মতো তাঁর কাছে তালিম নিয়েছি। তারপর উনিই আমাকে তাঁর গুরু কানাইদাশ বৈরাগীর কাছে নিয়ে গেলেন। তার দুই বছর পর, আমার বয়স তখন ১৬ চলছে, গুরুজি কানাইদাশ বৈরাগী আমাকে জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের কাছে নিয়ে গেলেন। জ্ঞানপ্রকাশ গুরুজি তার দুই বছর পর পেনসিলভানিয়া যাওয়ার সময় আমাকে বললেন, ‘তুমি মনবর আলী খাঁ সাহেবের কাছে নড়া বাঁধো।’ তারপর সংগীত রিসার্চ একাডেমীতে এলাম ১৯৭৭ সালে। তখন আমার বয়স পঁচিশ। তার আগে রবীন্দ্রভারতী থেকে বিএ, এমএ শেষ করেছি এবং আমার রেকর্ড এখনো কেউ ভাঙতে পারেনি। আমি ফার্স্ট হয়েছিলাম দুটোতেই। এসবের মূল কিন্তু আমার বাবার স্বপ্ন। বিএ পাস করার পর ভেবেছিলাম, শুধুই গান করব। কিন্তু বাবা আমায় বলেছিলেন, ‘এমএ পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্টের কাগজ আমার হাতে দিবি, তারপর পড়াশোনা ছাড়বি।’ বাবার কথা রাখতেই হয়েছিল। আর সব সময় বাবা-মায়ের সঙ্গে আমাদের দেশি, মানে ময়মনসিংহের ভাষায় কথা বলতাম। আমার খুব ভালো লাগত।

ঘরানা বলতে আপনি কী বোঝেন?

আমি আমার নিজেকে যেভাবে আঁকতে পারি, সেটাই আমার ঘরানা। আমরা প্রত্যেকেই আমাদের বাবার কাছ থেকে, তাঁরা তাঁদের বাবার কাছ থেকে শিক্ষা পেয়ে বড় হয়েছেন। কিন্তু গানের এই পরম্পরা যদি ওই একই ছাঁচে রয়ে যায়, তবে সেটা হবে ব্যর্থ ঘারানা। আমার কাছে ঘরানা হচ্ছে একটা বেসিক মূল্যবোধ নিয়ে তাকে নতুন করে সাজানো। ঘরানা বলে কোনো জিনিসকে কনফাইন করা উচিত নয়। নজরুল, লালন, রবীন্দ্রনাথ- তাঁরা কোন ঘরানার? কোন ঘরানার কোন ওস্তাদ এসব গেয়েছেন? তাঁরা শুধু খেয়াল গেয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের মধ্যে কিছু অসাধারণ গুণ ছিল বলে তাঁরা একেকটা নির্দিষ্ট স্টাইলকে উপস্থাপন করেছেন। আমি জানি, কী করে জয়পুর ঘরানা, গোয়ালিওর ঘরানা, পাতিয়ালা ঘরানা পরিবেশন করা হয়। আমি নিজে পাতিয়ালা ঘরানা শিখেছি। তাই বলে শুধু একটা ঘরানার অনুসরণ আমি কখনোই করিনি, সেটা আমার কাছে ঠুলি পরা ঘোড়ার মতো। আমি সব সময় নিজেকে নতুন সুরের জন্য উন্মুক্ত রাখি। এতে করে আমি আমার ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকেও শিখি। একবার শান্তিনিকেতন থেকে ফেরার পথে এক বাউলের গান শুনে আমার চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে গেলো। আমার মনে হলো, এত বছরের সাধনা করেও আমি ওই বাউলের মতো গান গাইতে পারব না। আমার মনে হয়, আমি যদি এটা স্বীকার করতে না পারি, আমার জন্য এর চেয়ে বড় দৈন্য আর নেই। তাই বলছি, ঘরানা হচ্ছে একটা নির্দিষ্ট স্টাইলে সংগীতের উপস্থাপনা, যা আমি ব্যক্তিগতভাবে অনুসরণ করতে পছন্দ করি না।

জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ সম্পর্কে কিছু বলবেন?

এককথায়, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গুরু তিনি। তাঁর মধ্যে যেটা সবচেয়ে বড় ব্যাপার ছিল সেটা হলো, উনি যে যেমন, তাঁকে তেমনি বড় হতে দিতেন; কখনো কিছু জোর করে চাপিয়ে দিতেন না। এ পর্যন্ত শঙ্কর কানাই দত্ত, নিখিল ঘোষ যেমন বাজিয়েছেন বা তাঁদের ছাত্ররা এখনো যা বাজাচ্ছে, সবাই কিন্তু আলাদা, অথচ সবারই গুরু জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ (৯ মে ২০১২ থেকে ৮ মে ২০১৩)। এখানেই ওই ঘরানা প্রথা হার মানে। কারণ, ঘরানা প্রথা বলে, ‘আমি যা বলছি, শুধু তাই বলে যাও।’ আমার বাবা-মায়ের শিক্ষার পর জগৎ থেকেও তো আমি অনেক কিছু শিখেছি, তা থেকে শুধু ভালোটা নিজের কাজে লাগালেই তো হলো। আজকে ভারতবর্ষের সংগীত জগৎ, বিশেষ করে তবলার জগৎ যেখানে পৌঁছেছে, তার পেছনে আমার গুরু জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের একক উদ্যোগের আর অবদানের কথা না বললেই নয়। তাঁর শততম জন্মবার্ষিকীতে বিভিন্ন রকমের উদ্যোগে বেশ কিছু অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। অনুষ্ঠানটি শুরু হয়েছে ৫ মে থেকে। ৯ মে থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত আমার যুক্তরাষ্ট্রের সব কটি অনুষ্ঠানই আমি এবার অর্পণ করছি আমার গুরুজিকে। এ ছাড়া গুরুজির শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আরও ভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান বছরব্যাপী করার ইচ্ছা আছে। তাঁর জন্য আমি কিছু করব, তাতে তাঁর কিছুই এসে-যায় না, তবে আমার জীবন ধন্য হবে।

সংগীত রিসার্চ একাডেমী সম্পর্কে কিছু বলুন।

সংগীত রিসার্চ একাডেমী আমার ‘তীর্থভূমি’। আমার জীবনে অনেক কিছুর আই ওপেনার নিসার হোসেন খাঁ সাহেব ছাড়া বাকি প্রায় সবার কাছেই আমি বসে শিখেছি। এঁদের যদি না দেখতাম, তাহলে কী করে ওস্তাদ ঘরানায় লোকে বড় হয়, ওস্তাদদের ছেলেরা কী করে বড় হয়? তার ভালো কী, মন্দ কী, তা আমি বুঝতে পারতাম না। কাজেই, আমার রাগসংগীতের উন্নতিকল্পে যেভাবে ওস্তাদদের সাহায্য আমি পেয়েছি, তাতে এই একাডেমীর কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। সামগ্রিকভাবে বলতে পারি, সংগীত রিসার্চ একাডেমী না হলে ভারতের শাস্ত্রীয় সংগীতের, বিশেষ করে কণ্ঠসংগীতের চর্চা প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে যেত। এই একাডেমী কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে প্রতিবছর কেবল শাস্ত্রীয় সংগীতের ধারা বজায় রাখতে। আমার নিজের ছেলেমেয়ে বা ছাত্রছাত্রী, যাদেরই আমার ভালো লেগেছে, তাদের সবাইকে আমি উৎসাহ দিয়েছি সংগীত রিসার্চ একাডেমীতে এসে নিজেকে আরও বড় পরিসরে আত্মোপলব্ধির চেষ্টা করার। শুধু আমার কর্মক্ষেত্র নয়, সংগীত রিসার্চ একাডেমী আমার আরেকটা মন্দির।

শ্রুতিনন্দন প্রতিষ্ঠার পেছনে কারণ কী ছিল?

আমি অনেকবার সংগীত রিসার্চ একাডেমীকে অনুরোধ করেছি, শিশুদের জন্যও একটা শাখা খুলতে বা শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রারম্ভিক পর্যায়ের কিছু তালিমের ব্যবস্থা করতে। কিন্তু একাডেমী কেবল অ্যাডভান্স লেভেলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়েই কাজ করবে বলে বদ্ধপরিকর। আমি সে কারণে, শৈশবে যারা সংগীতে প্রতিভার প্রমাণ রাখে, তাদের নিয়ে কিছু বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে কণ্ঠসাধনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। আর তাতে আমি নিজে প্রমাণ পেয়েছি যে, এই পদ্ধতিতে চলতে পারলে ভারতীয় কণ্ঠসংগীতের উন্নতি অনিবার্য। সেদিক থেকে ‘শ্রুতিনন্দন’ একটা শিশু-সঙ্গী-মন্দির, যেখানে আমি শেখাই বললে ভুল হবে; আমি শিখি যে, কী করে শিশুদের আরও বড় করে তুলতে হয়। সংগীতের শিক্ষার সঙ্গে মনুষ্যত্ব শ্রুতিনন্দনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কী করে একটি ছেলে বা মেয়ে ভালো মানুষ হবে, তা নিয়ে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে আলোচনা করি, নিজের চলাফেরা দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করি। হয়তো দোষত্রুটি থাকে। তবে আমার উদ্দেশ্য হলো, একটা জীবনে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে ওরা যেন বুঝতে পারে ওদের মধ্যে কোনটা ভালো বা কোনটা খারাপ আছে। খারাপকে আস্তে আস্তে বর্জন করে ভালোটাকে গ্রহণ করাই হলো শ্রুতিনন্দন একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কী করে একটি ছেলে বা মেয়ে ভালো মানুষ হবে, তা নিয়ে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে আলোচনা করি, নিজের চলাফেরা দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করি। হয়তো দোষত্রুটি থাকে। তবে আমার উদ্দেশ্য হলো, একটা জীবনে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে ওরা যেন বুঝতে পারে ওদের মধ্যে কোনটা ভালো বা কোনটা খারাপ আছে। খারাপকে আস্তে আস্তে বর্জন করে ভালোটাকে গ্রহণ করাই হলো ‘শ্রুতিনন্দন-চিন্তা’। ‘শ্রুতিনন্দন’ কোনো স্কুল নয়, এটি একটি আইডিয়া বা ধারণা।

আমাদের সংগীত কতটা প্রাতিষ্ঠানিক বা কতটা গুরুমুখী?

সবটাই গুরুমুখী। তবে শুধু সংগীত নয়, প্রতিটি জিনিস গুরুমুখী। আজকে যিনি রাজনীতিবিদ, ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার, এরা সবাই বিভিন্ন গুরুর কাছেই তো যা জানেন, তা শিখেছেন। যেমন, শিক্ষকের চেয়ে তুলনামূলকভাবে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম হয়। সেখানে শিক্ষার্থীদের প্রতি একটু বেশি নজর দেওয়া সম্ভব হয়, আর সেটাই প্রয়োজন। কেবল সংগীতের বেলায় ‘উনি অমুক গুরুর কছে শিখেছেন’, এ রকম বলাটা ঠিক নয়। গুরু বা শিক্ষক আমাদের পথ বাতলে দেন। আর আমরা ভালো শিক্ষার্থী হলে তাঁর বা তাঁদের দেখানো পথে চলে জীবনের কাছ থেকে আরও নতুন কিছু শিখি।

ঢাকা কেমন লাগল?

বেশ ক’বছর পর এলাম। অনেক কিছু বদলেছে। তবে বদলায়নি একটা জিনিস, তা হলো এ দেশের মানুষের অতিথিপরায়ণতা। এ দেশের মানুষের ভালোবাসায় এক রকমের পাগলামি আছে, যার প্রমাণ এবারের অনুষ্ঠানে আবারও পেলাম। এই পাগলামির খুবই প্রয়োজন। এতে একদিকে বিরাট একটা শান্তি, অন্যদিকে একটা বড় দায়িত্ববোধ আমার মধ্যে জন্ম নেয়। আমার মনে হয়, সবাই আমার জন্য যে এত ভাবছেন, তার যথার্থ মূল্যায়ন আমি করতে পারছি কি না। আমার এবারের সফর মূলত সংগীত রিসার্চ একাডেমীর কারণে। আমার বিশ্বাস, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন ও সংগীত রিসার্চ একাডেমী যদি নিজেদের লক্ষ্যে অটল থাকে এবং অন্তত ১০ জন নতুন গাইয়ের সন্ধান আমাদের দেন, তাহলে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে বাংলাদেশেও একটা সংগীত রিসার্চ একাডেমী গড়ে তোলা সম্ভব। আর সেটা তখনই সম্ভব, যখন এখানকার অভিভাবকেরাও বিশ্বাস করবেন, সংগীত একটা সাধনার বিষয়, মনুষ্যত্ব দিয়ে উপলব্ধি করার মতো কঠিন একটি বিষয়।

সাধনা বা রেয়াজের কি একটা রুটিন থাকা জরুরি?

অত্যন্ত রুটিনমাফিক করা উচিত। এককথায় রেওয়াজ মানে হচ্ছে, একটা জিনিস বহুবার করা। একটা জিনিস আমি শিখলাম। তারপর যদি সেটা এক লক্ষবার করি, তাহলে সেটা আবার নতুন করে জানব। তারপর সেই একই জিনিস যদি এক কোটিবার করি, তাহলে আরও নতুন করে জানব। এর একটা সোজা উদাহরণ হলো রবীন্দ্রনাথের কবিতা ‘দেবতার গ্রাস’। সাত বছর বয়সে আমি এই কবিতা আবৃত্তি করতাম। এখন সেই একই কবিতা আজ যখন পড়ি, তখন সেটা আমার কাছে সম্পূর্ণ নতুন অর্থ এবং অনুভূতি নিয়ে আসে। ঘরের মেঝে প্রতিদিন না মুছলে যেমন তার ওপর ধুলো পড়ে, তেমনি প্রতিদিন রেয়াজ না করলে কণ্ঠে ধুলো পড়তে বাধ্য। রেওয়াজ মানে প্রতিদিন নিজেকে জাগ্রত করা।

আমাদের পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলবেন?

আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম সবাইকে। আমরা যেন সবাই আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজেদের আরও পরিশুদ্ধ করতে পারি, এটাই আমার প্রার্থনা। আত্মসমালোচনা আর সমতার খুব প্রয়োজন আজকের সমাজে। আমরা প্রত্যেকে যদি আমাদের ঠিক পাশের বাড়ির মানুষটার কথা ভাবি, মানে একটা মানুষ যদি আরেকটা মানুষের কথা ভাবে, তাহলেই পৃথিবীটা অনেক সুন্দর হতে পারে। আজকে এমন সময় এসেছে, যখন আমাদের এমন করে ভাবাটা জরুরি হয়ে পড়েছে। আর বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, বিশেষ করে আবুল খায়ের সাহেবের কথা না বললেই নয়। তিনি সংগীতের ক্ষেত্রে যে পদক্ষেপ নিয়েছেন, আর তা যদি বহাল থাকে, তাহলে বাংলাদেশের সংগীতের একধরনের বিপ্লব আসতে খুব একটা দেরি নেই বলেই আমার বিশ্বাস। খাবার মানুষের শরীরকে বড় করে। কিন্তু শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্য, বিশেষ করে সংগীত মানুষের মনকে বড় করে। এর চেয়ে বড় বিদ্যা আর নেই।

 

ছবি: কামরুল হাসান মিথুন