একজন হুমায়ূন ফরীদি

নামটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখের সামনে ভেসে ওঠে প্রকম্পিত অট্টহাসির শব্দ। যে শব্দ একজন দর্শককে আলোড়িত করবে, পর্দার সামন আটকে রাখবে, ভাবাবে। ভাবনার অন্তরালে ভাসতে ভাসতে একজন দর্শক কখন যে ফরীদির অভিনয়ক্ষমতার গুণে হারিয়ে যাবে সে নিজেও বলতে পারবে না। প্রয়াত নাট্যজন আতিকুল হক চৌধুরী বলেছিলেন, ‘ফরীদির মতো শিল্পী যেকোনো দেশে জন্মাতে যুগ যুগ সময় লাগে, শতাধিক বছর লাগে। ও একজন ভার্সেটাইল শিল্পী।’

শুধু আতিকুল হক চৌধুরী নয়, তার সমসাময়িক অনেক শিল্পী, কলাকুশলীই ফরীদিকে অন্যভাবে দেখতেন এবং জানতেন। বিজ্ঞাপন নির্মাতা আফজাল হোসেন ছিলেন ফরীদির কাছের বন্ধু। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘ফরীদির মতো সহজ, সরল, স্বাভাবিক মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি। তার মতো বেয়াড়া হওয়ার সাধ্য আমার ছিল না। সে অদ্ভুত বেয়াড়াপনায় সবার মনে জায়গা করে নিয়েছিল। পছন্দ, অপছন্দ সকল মানুষের সাথে ফরীদির আচরণ ছিল সহজ, স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিকতার মধ্যে কেমন অস্বাভাবিকতা লুকিয়ে আছে। এই অস্বাভাবিক আচরণ একজন বড় অভিনেতার পক্ষেই সম্ভব।’

ফরীদির রক্তে ছিল অভিনয়ের নেশা। ১৯৬৪ সালে মাত্র ‪‎বারো বছর বয়সে কিশোরগঞ্জের মহল্লার নাটক এক কন্যার জনক-এ প্রথম তিনি অভিনয় করেন। অভিনয়ের নেশা প্রকট আকার ধারণ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে স্নাতক জীবন শুরু করেন ফরীদি। ফরীদি চাইলেই একজন নামকরা অর্থনীতিবিদ হতে পারতেন। অভিনয়ের নেশায় বুদ হওয়া ফরীদি তখন সেলিম আল দীনের কাছে নাট্যতত্ত্বে দীক্ষা নেন।

১৯৭৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম নাট্য উৎসব আয়োজন করা হলে তার প্রধান সংগঠক ছিলেন হুমায়ূন ফরীদি। এ উৎসবের মধ্য দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্গনে তার ব্যাপক পরিচিতি গড়ে ওঠে। ওই সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু প্রথম দেখেন ফরীদিকে। আন্তঃহল নাট্য প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবে বাচ্চু সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

ফরিদীর নিজের লেখা, নির্দেশনা এবং একই সঙ্গে অভিনয় করা আত্মস্থ ও হিরন্ময়ীদের বৃত্তান্ত নাটকটি দেখে অভিভূত হয়েছিলেন সেই সময়। এই নাটকটি সেরা হিসেবে বিবেচিত হয় তখন। বাচ্চু বলেন, ‘ওই সময়ই আমি বুঝেছিলাম ফরীদি অসম্ভব মেধাবী একজন অভিনেতা। প্রতিটি চরিত্র আলাদা করে বিশ্লেষণ করার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তার। অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত ছিলো ফরীদি।’

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর সহযোগিতায় ফরীদি যুক্ত হন ঢাকা থিয়েটারে। ঢাকা থিয়েটারের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশে একজন মেধাবী ও শক্তিমান অভিনেতা হিসেবে নিজের জাত চিনিয়েছেন। বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সদস্য হিসেবে তিনি চট্টগ্রাম বিভাগের গ্রাম থিয়েটারের প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। ঢাকা থিয়েটারের সদস্য হিসেবে শুধু ঢাকাতেই নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন মঞ্চে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

ঢাকা থিয়েটারের শকুন্তলা, মুনতাসীর ফ্যান্টাসি, কেরামত মঙ্গল, কীর্তনখোলা’র মতো মঞ্চনাটকে অভিনয় করে ফরীদি নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। আদায় করে নিয়েছিলেন দর্শকের ভালোবাসা।

মঞ্চের গণ্ডি পেরিয়ে ফরীদি একসময় টিভি নাটক আর চলচ্চিত্রে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন। আতিকুল ইসলাম চৌধুরীর নিখোঁজ সংবাদ-এ অভিনয়ের মধ্যদিয়ে ফরীদি টিভি পর্দায় আসেন। এরপর ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত নীল নকশার সন্ধ্যায়দূরবীন দিয়ে দেখুন নাটকে অভিনয় করে তিনি সবার প্রশংসা কুড়ান। ১৯৮৩ সালে ফরীদি ভাঙনের শব্দ শুনি প্যাকেজ নাটকে অভিনয় করে আরেকবার পোক্ত অভিনেতার পরিচয়ন দেন। সেলিম আল দীনের রচনা ও নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর পরিচালনায় এই নাটকটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায় ফরীদির কারণে। এই নাটকে তিনি টুপি দাড়িওয়ালা গ্রামের শয়তান ‘সেরাজ তালুকদার’ চরিত্রে অভিনয় করেন। সেই নাটকে তার সেই অমোঘ সংলাপ, ‘আরে আমি তো পানি কিনি। পানি, দুধ দিয়া খাইবা না খালি খাইবা বাজান।’ মানুষের মুখে মুখে রটিয়ে পড়ে এই সংলাপ। তার অভিনীত ধারাবাহিক নাটক সংশপ্তক আজও দর্শকের স্মৃতির পাতায় ভাস্বর। ‘কানকাটা রমজান’ চরিত্রটি আজও অমর হয়ে আছে ফরীদির অভিনয়গুণে।

ফরীদি অভিনীত আলোচিত নাটকগুলোর মধ্যে ভাঙনের শব্দ শুনি, বকুলপুর কতদূর, দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা, একটি লাল শাড়ি, মহুয়ার মন, সাত আসমানের সিঁড়ি, একদিন হঠাৎ, অযাত্রা, পাথর সময়, দুই ভাই, শীতের পাখি, কোথাও কেউ নেই, তিনি একজন, চন্দ্রগ্রস্ত, কাছের মানুষ, মোহনা, শৃঙ্খল, প্রিয়জন নিবাস ও বিষ কাঁটা অন্যতম।

টেলিভিশন নাটকে কাজ করতে করতে ফরীদি একসময় চলচ্চিত্রে আসেন। তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত হুলিয়া চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রথম বড় পর্দায় পা রাখেন। যথারীতি এইখানেই তিনি নিজের জাত চিনিয়ে দেন। নব্বইয়ের দশকে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে হুমায়ূন ফরীদি একটি বিশাল ব্র্যান্ড হয়ে যায়। শহীদুল ইসলাম খোকনের সন্ত্রাস, দিনমজুর, বীরপুরুষলড়াকু ছবিতে ফরীদি নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করেন। ফরীদি এতোটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ অভিনয় করেন যে, একসময় চলচ্চিত্রে নায়কের চেয়ে সিনেমাপ্রেমী দর্শকদের কাছে ভিলেন হুমায়ূন ফরিদী বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। সে কারণেই কিনা বিশ্বপ্রেমিক সিনেমার খল চরিত্রে খোকন বেছেন নেন ফরিদীকে। মজার ব্যাপার হলো, অভিনেতা হিসেবে ফরিদী নির্মাতা শহীদুল ইসলাম খোকনের এতই পছন্দের পাত্র ছিলেন যে তার ২৮টি ছবির মধ্যে ২৫টিতেই ফরীদিকে নেন। আর ফরীদিও নিজেকে উজাড় করে দেন। অপহরণ, দুঃসাহস, ভণ্ড  তার অন্যতম উদাহরণ।

একসময় এমন পরিস্থিতি হয় যে, ফরীদির চলচ্চিত্র মানেই প্রেক্ষাগৃহে উপচে পড়া ভীড়। যেই সময়টাতে বাংলা চলচ্চিত্রে নায়কের চরিত্র বা অবস্থান সুদৃঢ় সেই সময় ফরীদি নিজের অভিনয়ক্ষমতা দিয়ে নেতিবাচক চরিত্র বা ভিলেনের অবস্থান সুদৃঢ় করে তোলে। এইটা কতটা শক্তিমান অভিনেতা হলে সম্ভব যে, একজন অভিনেতা নায়কের চেয়ে ভিলেন চরিত্রকে বেশি দর্শকপ্রিয়তা করে তুলেছে। তখন দর্শক তখন নায়কের পরিবর্তে ফরীদিকে দেখার জন্যই প্রেক্ষাগৃহে যেতো।

তার অভিনীত ছবির আলোচিত চলচ্চিত্রের মধ্যে দহন, একাত্তরের যীশু, দূরত্ব, ব্যাচেলর, জয়যাত্রা, শ্যামল ছায়া, মায়ের অধিকার, ত্যাগ, মায়ের মর্যাদা, অধিকার চাই, মাতৃত্বআহা! অন্যতম।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নেতিবাচক চরিত্রে যে এতো বৈচিত্র্য আনা যায় তা ফরীদিই প্রথম দেখিয়েছেন। চোর, বাটপার, খুনী, সন্ত্রাস, রাজাকার, মুন্সী, ভণ্ড, কমেডি, প্রেমিক, মাফিয়া সব চরিত্রে ফরীদি ছিলেন অনবদ্য। এই জায়গায় কেউই এখনো পর্যন্ত ফরীদিকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি।

একজন অভিনেতার যত ধরনের গুণ থাকা দরকার তার সবটাই ফরীদির মধ্যে ছিল। মঞ্চ, নাটক, চলচ্চিত্র এই সকল মাধ্যমেই ফরীদি নিজের অভিনয় নৈপুন্য দেখিয়েছেন। বাজিমাত করেছেন অবলীলায়।

এক সাক্ষাৎকারে ফরীদি বলেছিলেন, ‘আমি অভিনেতা দুটো কারণে। প্রথমত, অভিনয় ছাড়া আর কিছু আমি পারি না আর দ্বিতীয়ত, অভিনয় করাটা আমি এনজয় করি।’

আমরা আজকে গর্ব করে বলতে পারি আমাদের দেশে হুমায়ূন ফরীদি নামের একজন অনেক বড়মাপের অভিনেতা ছিলেন, যিনি কোটি কোটি ভক্তদের হৃদয়ে শুধু নিজের জাদুকরি অভিনয় দিয়ে যুগের যুগের পর টিকে ছিলেন, আছেন, থাকবেন।

শুভ জন্মদিন, জাদুকর।