কর্ণফুলীর ইতিব্যস্ততা

চট্টগ্রাম বন্দরের বয়স কত? বন্দর প্রধানের মুখ থেকে শুনেছিলাম, প্রায় চার’শ বছর। তখন থেকেই ভাবছিলাম বাংলাদেশের সঙ্গে বহির্বিশ্বের বাণিজ্যের সংযোগ স্থাপনকারী নদী কোনগুলো? মেঘনা না হয়ে কর্ণফুলী কেন বন্দর স্থাপনে প্রথম পছন্দ ছিল। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের তৃতীয় এবং অত্যাধুনিক আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর হতে চলেছে মেঘনা মোহনায় পটুয়াখালী জেলার পায়রায়। সমুদ্র উপকূলীয় জেলাসমূহ বিশেষত মেঘনা তীরবর্তী এবং বঙ্গোপসাগরের মোহনা নিকটবর্তী অঞ্চলসমূহ গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া এখনও চলমান। সেক্ষেত্রে কর্ণফুলীর মোহনা অধিকতর স্থায়ী এবং স্থিতিশীল।

১৯৬০-এর দশকে বর্তমান চট্টগ্রাম বন্দর নির্মাণের সময় শত বছরের পূর্ব ইতিহাস থেকে একেই সবচেয়ে স্থিতিশীল হিসেবে খুঁজে পাওয়া যায়। গত প্রায় ছয় দশকে কর্ণফুলী নদীর চরিত্র অনেক পাল্টেছে। পাল্টেছে বহির্বাণিজ্যের পরিমাণ; কেননা মানুষ বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। কর্ণফুলী নদী এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যস্ত নদী। এই ব্যস্ততা বাণিজ্য কেন্দ্রিক, নানাবিধ ইন্ডাস্ট্রি কেন্দ্রিক। চট্টগ্রামবাসীর এবং চট্টগ্রামের নানাবিধ কর্মযজ্ঞের পেছনে কর্ণফুলী নদীর প্রভাব মায়ের সাথে নাড়ির সংযোগের মতো। গত পাঁচ বছরে কর্ণফুলী নদীর পূর্ব পাড়ের আনোয়ারায় অবস্থিত দেশের সবচেয়ে বড় জাহাজ নির্মাণ কারখানায় যেতে আমাকে এই নদী পার হতে হয়েছে বহুবার। আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি এবং এর ভিতরে যাওয়া-আসার সুবাদে অনুভব করার চেষ্টা করেছি এর ইতিব্যস্ততা।

শীত, গ্রীষ্ম বা শরতে আকাশের চেহারা পাল্টায়, কুয়াশায় সব ঢেকে যায়, বৃষ্টিতে বাতাসে ঢেউ ওঠে তুমুল এই নদীতে। দিনে অন্তত দু’বার জোয়ার-ভাটার খেলা চলে নদীর বুকে। শত শত নৌকা, মাছধরা ছোট-বড় ট্রলার, লাইটার জাহাজ, বড় জাহাজ নোঙর করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে ডাকের অপেক্ষায়। এরই মাঝে ছোট ছোট নৌকায় মাছ ধরে চলেছে জেলে। দু’পারের অসংখ্য মানুষ যাতায়াত করছে নীরবে।’

কর্ণফুলীর নব্যতা কমে চলেছে। সেজন্য প্রতিনিয়ত একে ড্রেজিং করতে হয়। জাহাজগুলোও পাল্লা দিয়ে শুধুই বড় হয়ে যাচ্ছে। সেজন্য বড় জাহাজ আর কর্ণফুলীতে প্রবেশ করতে পারছে না। নদীর পাড় থেকে দেখা যায় বহুদূরে গভীর সাগরে দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় জাহাজগুলো। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত থেকে কিছু দূরেই কর্ণফুলী গিয়ে মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। জার্মানির জন্য নতুন নির্মাণকৃত একটি জাহাজের ‘সী-ট্রায়াল’-এ আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। আমি দেখেছি কর্ণফুলীর ঘোলা পানি কীভাবে ধীরে ধীরে সাগরের নীল পানির সাথে গিয়ে মেশে। যেন নীল ক্যানভাসে ধূসর কালি দিয়ে কে যেন এঁকে চলেছে নিজের মনে।

কর্ণফুলীর কিংবদন্তি

কোনো এক পূর্ণিমা রাতে চট্টগ্রামের এক উপজাতি রাজকুমার তাঁর প্রণয়াসক্ত আরাকানের রাজকুমারীর সঙ্গে নদীতে নৌবিহার করছিলেন। পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায় নদীর নৈসর্গিক রূপে মুগ্ধ রাজকুমারী ঝুঁকে পানি স্পর্শ করতে গেলে তাঁর কানের ওপরের চুলে রাজকুমারের গুঁজে দেয়া ফুলটি নদীর পানিতে পড়ে যায়। কুমারের দেওয়া প্রেমের অর্ঘ্যটি উদ্ধারের লক্ষ্যে রাজকুমারী তৎক্ষণাৎ পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লে খরস্রোতা পানির টানে তিনি ভেসে যান। রাজকুমারও রাজকুমারীকে উদ্ধারের উদ্দেশ্যে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু রাজকুমারীকে উদ্ধার করতে না পেরে মনের দুঃখে নদীর নিকষ কালো জলে আত্মাহুতি দেন। সে বিয়োগান্তক ঘটনার স্মরণে নদীটির নামকরণ হয়েছে ‘কর্ণফুলী’ যার অর্থ কানের ফুল। তবে মারমা উপজাতি গোষ্ঠীর কাছে নদীটি কিনসা খিয়ং (Kinsa Khyong) নামে পরিচিত।

কর্ণফুলীর বিপর্যয়

কর্ণফুলী নদীতে জেগে উঠেছে অসংখ্য চর। বাংলাবাজার, শাহ আমানত সেতু, বাকলিয়াসহ অন্যান্য এলাকায় জেগে উঠা এসব চর জোয়ারের সময় ডুবে থাকলেও ভাটার সময় স্পষ্ট দেখা যায়।

ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি কর্ণফুলী নদী। নদীর দুই পাড়ে গড়ে উঠা দুই শতাধিকেরও বেশি মিলের নির্গত রাসায়নিক বর্জ্য পানিকে বিষাক্ত করে তুলছে প্রতিনিয়ত।

নদী ভরাট করে গড়ে তোলা হচ্ছে নানা ধরনের অবকাঠামো। কর্ণফুলী নদীর বিভিন্ন চ্যানেল থেকে অব্যাহতভাবে বালি উত্তোলন করে নির্মাণ করা হচ্ছে বাড়ি, গুদাম, অফিস, জেটিসহ নানা স্থাপনা। অবৈধ এসব স্থাপনা নদীর স্বাভাবিক গতিকে বাধাগ্রস্ত করায় ক্রমেই পানি জমে কর্ণফুলীতে চর জেগে উঠছে।

 

ছবি: লেখক