কাগজ কাটার শিল্পী

কাগজ কেটেই দিনযাপন তার। কাগজ কাটার পাশাপাশি সমান দক্ষতায় তিনি বিজ্ঞাপনী বোর্ডে রং আর তুলির পরশ বোলান। কিশোরগঞ্জের শহরে কালীমন্দিরের ঠিক উল্টো দিকেই তার ছোট্ট দোকানটি। নামটাও রঙের সাথে আঁতাত করে- রঙ্গশ্রী।

৬০এর দশকে কৈশোরে কাগজের সঙ্গে সখ্যতা শুরু হয় সুবোধ চন্দ্র সরকারের। পৈত্রিক ভিটা ছিলো নেত্রকোণায়। শখের বশে ঘুড়ি বানানো আর তাতে রং-বেরঙের কাগজ এঁটে সাজিয়ে তুলতেন তিনি। এভাবেই শুরু হয় কাগজের কাজ। তবে সেটা কেবলই নেশা ছিল- পেশা নয়। স্বাধীনতার পর ময়মনসিংহে এসে কাকার কাছে কাজ শিখতে শুরু করেন তিনি। মূলত সাইনবোর্ডে কীভাবে তুলির পরশে বর্ণিল করতে হয় ক্যানভাস-তা শিখলেন। পাশাপাশি কাগজের কাজও শিখতে শুরু করলেন। এরপর কিছুদিন সেখানেই কাজ করে চলে এলেন কিশোরগঞ্জে। ১৯৭৪ সালে যাত্রা শুরু হয় রঙ্গশ্রী নামের দোকানটির। প্রথমে ভাড়া ছিল ৪০ টাকা, এখন সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫০০ টাকায়।

কাগজ কেটে নকশা করার নেশাটা কেন এল- জানতে চাইলে তিনি বললেন, ব্যাপারটা আমার কাছে নেশার মতন ছিলো। শৈশবে ঘুড়িতে রংচঙে কাগজ লাগাতাম। পরে দেখলাম বিভিন্ন পূজায়, কীর্ত্তণে, বিয়ের মণ্ডপে কাগজে কাটা নকশার বেশ ভাল চাহিদা রয়েছে। তাই ব্যানার, সাইনবোর্ড লেখার পাশাপাশি এই কাগজের নকশার কাজটাও ধরে রাখলাম। তবে সময়ে পরিবর্তন এসেছে। এখন হাতে গোণা কিছু সৌখিন মানুষ বিয়ের মণ্ডপ সাজান কাগজের নকশায়। কীর্ত্তণ আর বিভিন্ন পূজার মাঝেই সীমাবদ্ধ কাগজের নকশার সাজ।

এই কাজ তাকে স্বচ্ছল করতে পারেনি আর্থিকভাবে, তবে এনে দিয়েছে সম্মান। এই কাগজ কাটার মাধ্যমেই সুবোধ চন্দ্র সরকার ঘুরে এসেছেন ইরোপের দুই বড় শহর লন্ডন ও ফ্লোরেন্স থেকে। ১৯৮৭ সালে ক্র্যাফটস অব বাংলাদেশ শীর্ষক দশ দিনের প্রদর্শনীতে তাকে সম্মানিত করা হয় লন্ডনে। ১৯৮৫ সালে ঢাকার পাবলিক লাইব্রেরিতে এক প্রদর্শনীতে কাগজ কাটার শিল্পীদের মধ্যে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। সম্প্রতি বেঙ্গল ফাউন্ডেশনও তাকে স্বীকৃতি জানিয়েছে।

একটি বিয়ের মণ্ডপ সাজিয়ে বা কীর্ত্তণের আসর সাজিয়ে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা উপার্জন করেন তিনি। তবে ইদানিং আগেকার সেই জমাট আসর নেই, আগেকার মত ঘন ঘন হয়ও না। ফলে ব্যস্ততার অনেকখানি অংশ চলে গিয়েছে শ্বেত পাথরে নাম খোদাই আর ব্যানার রং করার পেছনে। কাগজ কাটার শিল্পের এই দুর্দিনেও খানিকটা ভালো সময় কাটে মাঘ ও ফাল্গুন- এই দুই মাসে। এ সময়ে মাসে ৪-৫টি বিয়ের কাজ পাওয়া যায়।

সনাতনি পন্থায় তিনি প্রথমে কাগজে নকশা কেটে নেন। তারপর সেটার উপ হাতুড়ি- ছেনি দিয়ে কাটতে থাকেন। এর জন্য প্রয়োজন অসাধারণ দক্ষতা, নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ আর ধৈর্য্য। এই শিল্পের জন্য বিখ্যাত ভারতের উত্তর প্রদেশের মথুরায় অবশ্য এখন আর এভাবে নকশা করা হয় না। ভারতে বিভিন্ন নকশা কাটার মেশিন রয়েছে, রয়েছে কম্পিউটার জেনারেটেড নকশাও। কিন্তু বাংলাদেশে এই শিল্প বেঁচে রয়েছে কেবলমাত্র বিয়ে আর সনাতন ধর্মীয় কিছু আচারের মাধ্যমে। ফলে এই শিল্পের বিকাশ হচ্ছেনা সেভাবে। আর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এই শিল্পের সাথে জড়িতরা আস্তে আস্তে অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়ছেন। শিল্পীদের মধ্যে যোগাযোগ না থাকায় এই শিল্প আটকে রয়েছে একই জায়গায়।

তার তিন ছেলে নিয়ে এখন কিশোরগঞ্জ শহরে একটি ছোট্ট টিনশেড বাসায় ভাড়া থাকেন তিনি। সাদামাটা এই মানুষটি যেটুকু সম্মান পেয়েছেন দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে তার জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। মৃত্যুর সময়ও যেন এই ভালবাসাটুকু ম্লান না হয়, এটাই তার চাওয়া।