কাজ করতে হয় কাজকে ভালোবেসে

সেলিনা হোসেন একই সাথে কথাসাহিত্যিক, গবেষক এবং প্রাবন্ধিক। তাঁর লেখার জগৎ বাংলাদেশের মানুষ, তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। জীবনের গভীর উপলব্ধির প্রকাশকে তিনি শুধু কথাসাহিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, শাণিত ও শক্তিশালী গদ্যের নির্মাণে প্রবন্ধের আকারেও উপস্থাপন করেছেন। বেঙ্গল বারতায় এবারে রইল তাঁর সাক্ষাৎকার।

 

 

 

কেমন আছেন আপা? সময় কাটছে কিভাবে?

ভালো আছি। সময় তো সময়ের নিয়মে কাটে। আমি সেই সময়টাকে আনন্দময় করে কাটাই। তবে এখন প্রতিটি দিন পার করছি লেখালেখির পেছনে সময় ব্যয় করে।

আমরা আপনার গল্প শুনতে চাই। শৈশবের গল্প, আপনার পরিবারের গল্প।

আমার বাবার বাড়ি বর্তমান লক্ষীপুর জেলার হাজীরপাড়া গ্রামে। বাবা এ কে মোশাররফ হোসেন ছিলেন রাজশাহী রেশম শিল্প কারখানার পরিচালক। মা মরিয়মন্নেসা বকুল ছিলেন গৃহিণী। তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমতী ছিলেন। স্বামীর চাকরির টাকা দিয়ে সংসারের সব খরচ সুন্দরভাবে চালাতেন, খুব ভালো রান্না করতেন। ছেলেমেয়েরা কে কোথায় পড়াশুনা করবে তার সিদ্ধান্তও নিজেই নিতেন। অবসর সময়ে রেডিওতে খেয়াল শুনতেন, বাগান করতেন আর ফুলগাছ ভালোবাসতেন। আমার জন্ম ১৯৪৭ সালের ১৪ জুন রাজশাহী শহরে। সাত ভাইবোনের মধ্যে আমি ছিলাম চতুর্থ। ভাইবোনেরা সবাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। আর শৈশবের কথা বলতে গেলে- বাবার কর্মস্থল বগুড়ায় শৈশব কাটে। শৈশবে অবাধ স্বাধীনতা ও উন্মুক্ত প্রকৃতির মাঝে বেড়ে উঠি। মাঠেঘাটে, প্রান্তরে, নদীতে, ঘুরে বেড়ানো, গাছ বাওয়া, কখনও অনেক উঁচু গাছে চড়ে বাবাকে দেখে বকা খাওয়ার ভয়ে লাফ দিয়ে পালিয়ে যাওয়া, ভাইবোন এবং অন্যান্য ছেলেমেয়ের সঙ্গে হল্লা করতে করতে স্কুলে যাওয়া ছিল নিত্যনৈমিত্তিক কাজের একটি। গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, ছি-বুড়ি ইত্যাদি একেক রকম খেলা খেলতাম একেক দিন। সন্ধ্যা নামলেই ঘরে ফিরে হারিকেনের আলোয় পড়তে বসা। সে এক আনন্দময় শৈশব ছিল আমাদের।

কথা প্রসঙ্গে আমরা জানলাম আপনার মায়ের কথা। বাবার সম্পর্কে একটু জানতে চাইব।

আমার বাবা ছিলেন ভীষণ রাগী মানুষ। ফলে বাবাকে ভাইবোনেরা খুব ভয় পেতাম। আমার চার-পাঁচ বছর বয়সের ছোট বোন লাকির মৃত্যু বাবাকে একদম বদলে দেয়। লাকির নেফ্রাইটিস অসুখ হয়েছিল। সে সময়ে ভালো চিকিৎসা না থাকায় লাকির নানা রকম চিকিৎসা চলতে লাগল। একজন কবিরাজ লাকিকে রাতে ধানের ওপর বসে থাকা শিশির খাওয়ানোর উপদেশ দেন। ছোট বোনকে সুস্থ করার জন্য ভাইবোনদের সঙ্গে আমিও ধানক্ষেতে গিয়ে শিশির ঝরিয়ে বাটি ভরে নিয়ে আসতাম। কিন্তু এর পরও ছোট বোনকে হারাতে হলো। কন্যাকে হারিয়ে বাবা একেবারে শান্ত হয়ে যান। আর কোনো দিন কোনো ছেলেমেয়ের গায়ে হাত তোলেননি।

সেই সময়ে তো মেয়েরা পড়াশোনাও কম করত, করলেও চাকরি করত না। আপনার কর্মজীবন শুরু হলো কেমন করে?

আমার কর্মজীবন শুরু হয় বাংলা একাডেমির গবেষণা সহকারী হিসেবে, ১৯৭০ সালের জুলাই মাসে। ১৯৬৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে চাকরি পাওয়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন পত্রিকাতে, উপসম্পাদকীয়তে নিয়মিত লিখতাম। কর্মরত অবস্থায় বাংলা একাডেমির ‘অভিধান প্রকল্প’, ‘বিজ্ঞান বিশ্বকোষ প্রকল্প’, ‘বিখ্যাত লেখকদের রচনাবলী প্রকাশ’, ‘লেখক অভিধান’, ‘চরিতাভিধান’ এবং ‘একশত এক সিরিজের’ গ্রন্থগুলো প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করি। এছাড়া ২০ বছরেরও বেশি সময় ধান শালিকের দেশ পত্রিকা সম্পাদনা করি। ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমির প্রথম মহিলা পরিচালক হই। ২০০৪ সালের ১৪ জুন চাকরি থেকে অবসর নিই।

বিয়ে, সংসার জীবন-

১৯৬৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বিয়ে করি। আমাদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় দুই কন্যাসন্তান- লাজিনা মুনা এবং ফারিয়া লারা। ১৯৭১ সালের ২৩ ডিসেম্বরে স্বামী মারা যান। দু’সন্তানকে নিয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করি। ১৯৭৩ সালে আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয়। আবার মেয়েরা বাবার স্নেহ-ভালোবাসায় বেড়ে উঠতে থাকে। পুত্র সাকিব আনোয়ারের জন্ম ১৯৭৭ সালে।

আমরা জানতে চাই আপনার ছোট মেয়ে বাংলাদেশের প্রথম নারী পাইলট ফারিয়া লারা’র কথা।

১৯৯৪ সালে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাশ করার দু’বছর পর লারা পাইলট প্রশিক্ষণে চমৎকার ফলাফল করে। ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬ সালে সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশের কাছ থেকে প্রাইভেট পাইলটের লাইসেন্স অর্জন করে। দু-বছর পরে ১৯৯৮ সালের ১৯ মার্চ লারা বাণিজ্যিক পাইলট লাইসেন্স পায়। এরপর ও পাইলটদের প্রশিক্ষক হওয়ার প্রশিক্ষণ নেয়। লারা-ই বাংলাদেশের প্রথম নারী যিনি এই পেশায় আসেন। পাইলট হতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি উড্ডয়নের প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করে। পঞ্চাশ ঘণ্টার এই প্রশিক্ষণের শেষ দিনটি ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৯৮ সালে বরিশাল থেকে ঢাকায় ফেরার পর পোস্তগোলা এলাকায় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে লারা মৃত্যুবরণ করে।

আপনার দুটি গ্রন্থ পোকামাকড়ের ঘরবসতি এবং হাঙ্গর নদী গ্রেনেড নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। কয়েকটি গল্প নিয়েও নাটক নির্মাণ করা হয়েছে। আপনি বর্তমানে ফারিয়া লারা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক। জেন্ডার ইন মিডিয়া ফোরাম-এর আহ্বায়ক। এছাড়াও প্রতিদিন সভা-সেমিনার, নানা সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ তো আছেই। এতকিছু একসাথে সামাল দেন কিভাবে?

সামাল দিতে হয়। কাজ করি কাজকে ভালোবেসে। কাজ ভালোবাসলে সব কাজ সহজ হয়ে যায়। সময় ব্যবস্থাপনাটাও সুন্দর হয়। তাই অন্তরে লালন-ধারণ করতে হবে কাজকে।