চন্দ্রনাথে মোক্ষলাভ

সীতাকুণ্ড পাহাড় সারির সম্ভবত সবচেয়ে উচুঁ চূড়া চন্দ্রনাথ মন্দির। ভ্রমণের পরিচিত ভেন্যু হলেও ১২০০ ফুট উঁচু এ চূড়ায় পৌঁছানো সব সময়ই ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলাম সঙ্গীদের মাঝেও। অবশ্য তাদের হাসির দমকেই যেন উড়ে গেল সেই বাধা। ‘এ আর এমন কী, এক তুড়ি মেরেই পৌঁছে যাওয়া যায়।’ বাড়বকুণ্ড বাজার থেকে সিএনজি নিয়ে সরাসরি গেলাম মন্দির কমপ্লেক্স প্রবেশদ্বারের সামনে। তখনও বেলা খুব বেশি হয়নি। হালকা নাশতা করেই পাহাড়যাত্রা শুরু করলাম।

পাহাড়ের গোড়া অবধি পৌঁছতেই বেশ খানিকটা শরীর ঘামিয়ে নিতে হয়। চন্দ্রনাথ ধাম মূলত একটি বিখ্যাত তীর্থক্ষেত্র। এ নামের সঙ্গে জড়িত আছে হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা মিথ, ধর্মীয় ইতিহ্য। এখানে চূড়ায় যাওয়ার দুটি পথ। হাতের ডানে সিঁড়ি উঠে গেছে একেবারে চূড়া অবধি। বামে পথে ডিঙোতে হবে পাহাড়ি উঁচু-নিচু রাস্তা। তবে ওঠার জন্য বামের পথটি তুলনামূলক সহজ, কারণ ডানে খাড়া সিঁড়ি অনেকের জন্যই বেশ কঠিন। আমরা বামের রাস্তা ধরেই অগ্রসর হলাম।

কিছু দূর চড়াই ভাঙলেই চোখে পড়বে সীতাকুণ্ড রেঞ্জের আদিগন্ত সবুজের মেলা। ঢেউ খেলানো ফসলের মাঠ, রেললাইন, এরপর সমুদ্র। উচ্চতা ডিঙানোর ক্লান্তি হাফ ধরাতে পারে, কিন্তু মাথার উপরের নীলাকাশ আর দূর দিগন্তে সমুদ্র থেকে উঠ আসা লোনা বাতাস শরীর জুড়িয়ে দিতে যথেষ্ট। আমরা পা বাড়ালাম। কিন্তু পথ একটু বেশিই খাড়া। তাই খানিকটা যেতেই একটু থামা, আবারও চলা, এমন খেলা চলতে থাকবে একেবারে বিরুপাক্ষ পর্যন্ত। চড়াই-উতরাই ভাঙার অভ্যেস না থাকলে এ পর্যন্ত আসতে ভালো ধকলই পোহাতে হবে। তবে একবার বিরুপাক্ষ পর্যন্ত উঠে গেলে হাতের কাছে এ যেন সাক্ষাৎ স্বর্গ। ঘাসে বসে হাপাতে হাপাতে কানে এল ঘণ্টার ধ্বনি। ফিরে দেখলাম, একটি পরিবার মন্দিরে পূজা দিচ্ছে। অবাক করল তাদের ছয় বছর বয়সী শিশুটি। এই খাড়া রাস্তা সে গটগট করে উঠে এসেছে। এরই মধ্যে বাকিরা উঠে এল। চকলেটে কামড় বসিয়ে ক্লান্ত শরীর চাঙা করে আবারও খাড়া পাহাড়ি রাস্তা ধরে উঠছি।

এবার সরাসরি চন্দ্রনাথ মন্দির। তবে পথের আরেক জায়গায় খানিকটা বসতে হলো। দূরে তাকিয়ে চলন্ত ট্রেনকে পিঁপড়ের সারি মনে করে ভিরমি খেলাম। প্রায় সাড়ে এগার শ’ ফুট উচ্চতায় তখন। আরও বাকি ফুট পঞ্চাশেক। জোর কদমে উঠে এলাম বাকি পথটুকু। চন্দ্রনাথ মন্দির! এর চাতালে পৌঁছেই ধপাস করে শুয়ে পড়ল সবাই। এতক্ষণের ক্লান্তি বহু কষ্টে চেপে রাখা গেলেও গন্তব্যে পৌঁছে তা বাঁধ ভাঙল। একটু বিশ্রাম শেষে চোখ মেলতেই বাতাসের এক ঝাপটা শিহরণ জাগিয়ে গেল গোটা শরীরে। আমরা এই মুহূর্তে ১২০০ ফুট উপরে। পর্বতারোহণের হিসেবে এ উচ্চতা মোটেই ঈর্ষণীয় কিছু না। কিন্তু এখানকার চারপাশের অতুলনীয় ঐশ্বর্য মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র এ কোণে বসেও মনে জাগাতে পারে সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার স্পর্ধা। কোন এক দলছুট চিল ভেসে যাচ্ছে আপনার পায়ের নিচের শূন্যতায়, বাতাসে মিশেছে কি যেন এক ঘ্রাণ। দূর সমুদ্রের লোনা গন্ধ আর অনেক নিচের পাহাড়ি লালমাটির পথ একসঙ্গে ঘর পালানোর সুর তুলেছে। সঙ্গে যোগ হলো পূজার ঘণ্টাধ্বনি। সময় থেমে নেই, বহমান স্রোতের সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে দৃষ্টির বাইরের দূর মহাবিশ্বের পানে। আমি তাতেও সওয়ার হতে চাই।

ধর্মীয় গাম্ভীর্য আর প্রকৃতির নির্মলতা একসঙ্গে মিশেছে চন্দ্রনাথে। এ মন্দিরকে ঘিরে প্রচলিত আছে সনাতন ধর্মীয় বেশ কিছু ঘটনা। সনাতন ধর্মীয় মত অনুসারে সত্যযুগে সীতা দেহ ত্যাগ করলে মহাদেব তার মৃতদেহ নিয়ে প্রলয়নৃত্য শুরু করে। এ সময় বিষ্ণু সীতার মৃতদেহ ছেদন করে। তার দেহখণ্ড বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায়। পরবর্তীতে সেই জায়গাগুলো হয়ে ওঠে শাক্তপিঠ, সনাতন ধর্মীয় মানুষের তীর্থস্থান। চন্দ্রনাথ মন্দির তেমনই একটি তীর্থক্ষেত্র। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসের দিকে শিব চতুর্দশীতে এখানকার মেলায় যোগ দেন দেশ-বিদেশের লাখো মানুষ। এছাড়া সারা বছরই লেগে থাকে পুণ্যার্থীদের ভিড়। এমনই কয়েকটি দলের পূজার প্রসাদ পেলাম।

 

বৃত্তান্ত:

ঢাকার কমলাপুর, সায়েদাবাদ, কল্যাণপুরসহ দেশের যে সকল স্থান থেকে চট্টগ্রামের গাড়ি ছাড়ে সেসব গাড়িতে করে সীতাকুণ্ড যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে সকল বাসই সীতাকুণ্ডে থামে। আর যারা ট্রেনে করে যেতে চান তাদেরকে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ঢাকা মেইল ট্রেনে উঠতে হবে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী ট্রেনগুলোর মধ্যে শুধু এই ট্রেনটিই সীতাকুণ্ড স্টেশনে যাত্রী ওঠানামা করিয়ে থাকে। সীতাকুণ্ড বাজার থেকে ১০০ টাকা দিয়ে সিএনজি ভাড়া করে সরাসরি চন্দ্রনাথ ধামের প্রবেশদ্বারে। এরপর চ‚ড়ার মূল মন্দিরে যেতে হলে হাইকিং করতে হবে।

পর্যটকদের থাকার জন্য সীতাকুণ্ডে তেমন কোনো ভালো হোটেল নেই। পর্যটকরা চাইলে এখানে অবস্থিত মন্দিরগুলোতে অনুমতি নিয়ে থাকতে পারেন। সেক্ষেত্রে রাতে সীতাকুণ্ড না থেকে চট্টগ্রামে ফিরে যাওয়াই ভালো।