চা বাগানের দুঃখগাথা

ধানক্ষেত ছাড়া এত অবিরাম সবুজের দেখা মেলা ভার। তবে ধান গাছেও ছড়িয়েছে সন্ত্রাস। হাইব্রিড ধানের নামে সবুজেও মিলেছে বিষ। যদিও চায়ের দেশের সবুজ যেন অবিশ্রান্ত। চা গাছ থেকে দৃষ্টি যায় মহীরুহ অভিভাবকের মতো দাঁড়ানো ছায়া বৃক্ষ অথবা আশেপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ফসলের ক্ষেতে। তবে এত সবুজ, এত শান্ত, স্নিগ্ধ চায়ের বেড়ে ওঠার গল্পটা কিন্তু অতটা মসৃণ-পেলব নয়।

১৮৪০ সালে চট্টগ্রাম ক্লাব এলাকায় প্রথম চায়ের চাষ শুরু হয়। যদিও বাণিজ্যিকভাবে প্রথম উৎপাদন শুরু করে সিলেটের মালনীছড়া চা বাগান ১৮৫৪ সালে। এরপর থেকে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে চায়ের বাগান ছড়িয়ে পড়েছে সিলেট ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায়। এমনকি পঞ্চগড়েও চাষ শুরু হয়েছে চা’র । ২০১২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী পৃথিবীর দশম চা উৎপাদনকারী দেশ বাংলাদেশ।

অন্যান্য কৃষিনির্ভর শিল্পের মতোই এখানেও পর্দার পিছনে চলমান গল্পের মূল কারিগর, চা বাগানের শ্রমিকরা, উদয়াস্ত পরিশ্রম করে যারা আমাদের প্রতি কাপ চায়ের যোগান দেন। ঔপনিবেশিক ইংরেজ শাসনামল থেকে শুরু হওয়া, এই শিল্পের উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে বর্তমানে জড়িয়ে আছেন প্রায় এক লাখ ২৩ হাজার কৃষিজীবী মানুষ ও তাদের উপর নির্ভরশীল পরিবার। যাদের অধিকাংশই বংশপরম্পরায় বাগানে কাজ করছেন। আর এই চা শ্রমিকদের অর্ধেকেরও বেশি নারী, যারা সরাসরি বাগানে কাজ করার পাশাপাশি ঘর সামলানোর দায়িত্বও পালন করেন। একটি সাধারণ কৃষিনির্ভর পরিবারের সাথে এই মানুষগুলোর মূল পার্থক্যের জায়গা হলো, কৃষিজমির মালিকানা। মূলত অন্যের জমিতে চাষ করে ফসল ফলান চা শ্রমিকেরা, নিজেরা সাধারণত ভূমির মালিক হতে পারেন না। কারণ, বাগানের একজন স্থায়ী শ্রমিক বর্তমান সময়ে কাজ করেন দৈনিক মাত্র ৮৫ টাকা বেতনে। পাশাপাশি থাকার জন্য ২১ ফুট বাই সাড়ে ১০ ফুটের একটি জায়গা বরাদ্দ পান। রেশন হিসেবে সপ্তাহে পান ৩.২৭ কেজি চাল। তবে স্থায়ী ছাড়াও অস্থায়ী ও মৌসুমি শ্রমিক রয়েছেন চা বাগানে। দৈনিক বেতন, রেশন, অবসরকালীন ভাতা কিংবা চিকিৎসা সুবিধা পান না তারা।

চা বাগানে কাজ করবার পাশাপাশি, পারিবারিক ভরণ-পোষণ ও ঐতিহ্যগত কারণেও চা জনগোষ্ঠীর অনেকেই ধানসহ অন্যান্য ফসল ফলান। এজন্য অবশ্য বাগান কর্তৃপক্ষের বরাদ্ধ দেওয়া জমির উপরই নির্ভর করতে হয় তাদের। প্রায় দেড়শো বছরেরও বেশি সময় ধরেই বাগান এলাকার মধ্যে থাকা বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে সেখানে ফসল ফলানোর ঐতিহ্য রয়েছে চা জনগোষ্ঠীর। অবশ্য এজন্য বাগান কর্তৃপক্ষের কাছে জমি বরাদ্দ নিতে হয় স্থায়ী শ্রমিকদের। যেই জমির ভূমিকর তাদের রেশনের সাথে সমন্বয় করে বাগানের মালিক প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের চা বাগানগুলো ঘুরে দেখলে সেই মাটি ও প্রকৃতির সাথে এই জনগোষ্ঠীর নিবিড় সম্পর্ক অনুভব করা যায়। এই আবাদি জমিতে ফসল ফলানোর পাশাপাশি অন্যান্য সামাজিক আনুষ্ঠানিকতাও পালন করতে দেখা যায় শ্রমিকদের।

সম্প্রতি হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের ডানকান ব্রাদার্সের চান্দপুর চা বাগানের ৫১১.৮৩ একর জমির লিজ বন্দোবস্ত ফিরিয়ে নিয়ে, সেখানে ‘অর্থনৈতিক অঞ্চল’ স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। যদিও ঐতিহ্যগতভাবে নির্ধারিত ঐ জমিতে ফসলের আবাদ করে জীবনযাপন করে সেখানকার চা শ্রমিকেরা। পাশাপাশি ঐ এলাকার মধ্যে রয়েছে শ্মশান ও কবরস্থান। তাই এই জমির উপর নিজেদের অধিকার ছাড়তে নারাজ চান্দপুর চা বাগানের শ্রমিকেরা। চা জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার নিশ্চিত করতে সবার প্রতি উদ্বাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন ঐ বাগানের প্রায় ১৬ হাজার শ্রমিক ও তাদের ওপর নির্ভরশীল কৃষি পরিবারগুলো। গেল ডিসেম্বর মাস থেকেই চুনারুঘাটের চান্দপুর চা বাগান তাই উত্তপ্ত। নিজেদের জমির জন্য চা শ্রমিকদের লড়াই নজর কেড়েছে সারা দেশের।

ছবি: লেখক