জীবনানন্দ-ভূমেন্দ্র গুহ পুরস্কার পেলেন সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ

জীবনানন্দ গবেষণায় পথিকৃত ভূমেন্দ্র গুহ স্মরণে প্রবর্তিত ‘জীবনানন্দ-ভুমেন্দ্র গুহ পুরস্কার ২০১৮’ পেলেন সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ। তার গবেষণা গ্রন্থ নতুন চর্যাপদ– এর জন্য এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন তিনি। গতকাল ৩১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় লালমাটিয়ার বেঙ্গল বই প্রাঙ্গণে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। সাহিত্য ক্ষেত্রে গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ বেঙ্গল পাবলিকেশন্স এ বছর থেকে পুরস্কারটি প্রবর্তন করে।

পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে ড. আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ মার্টিন কেম্পশেন। এ ছাড়াও মঞ্চে বিশেষ অতিথি হিসেব মঞ্চে ছিলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জনাব আবুল খায়ের এবং কালি ও কলম সম্পাদক জনাব আবুল হাসনাত। শুরুতেই পুরস্কার প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী এবং মার্টিন কেম্পশেনকে পরিচয় করিয়ে দেন জনাব আবুল হাসনাত।

অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে একক বক্তৃতা প্রদান করেন জার্মান বংশোদ্ভুত রবীন্দ্র গবেষক মার্টিন কেম্পশেন। তিনি প্রায় ৪০ বছর ধরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যকর্ম নিয়ে গবেষণায় রত আছেন, অনুবাদ করেছেন গুরুত্বপূর্ণ রবীন্দ্র-সাহিত্য। তার রচিত Rabindranath Tagore and Germany বইটি বিশেষভাবে পরিচিত। বক্তৃতায় রবীন্দ্র গবেষণায় জড়িয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেন মার্টিন কেম্পশেন। তিনি বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি পাঠ করে আমি বিমুগ্ধ হয়ে যাই। তখনও বুঝতে পারিনি যে রবীন্দ্র-সাহিত্য আমার জীবনের এত বড় অংশ হয়ে উঠবে। পরে রবীন্দ্রনাথের বাংলা কবিতা ও তার অনুবাদ পড়ে আমি বাংলা পঙক্তি ও ছন্দের শক্তির জায়গাটা অনুধাবন করতে পারি।’ অনুবাদক হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি। ‘রবীন্দ্রকাব্যের একনিষ্ঠ পাঠক হিসেবে অনুবাদ করতে গিয়েও জটিলতার মুখে পড়তে হয়েছে। বাংলা ভাষা ও ছন্দ যুগপদভাবে ইউরোপিয় ভাষায় অনুবাদ করা কঠিন ছিলো। অনুবাদ করতে গিয়ে আমিও নিজের মধ্যে সত্যিকারের কবিত্ব অনুভব করি’, বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিবৃন্দ। পুরস্কার হিসেবে এক লাখ টাকা, স্মারক ও একটি সনদ প্রদান করা হয়। সম্মাননা স্বীকৃতি পেয়ে মোহাম্মদ শাহেদ বলেন, গত আট বছর ধরে গবেষণার ফল এই বই। এধরণের বইয়ের প্রকাশক পাওয়া কঠিন। তাই প্রকাশক কথাপ্রকাশ প্রকাশনা সংস্থার কর্ণধার জসিম উদ্দিনকেও ধন্যবাদ জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন ড. আনিসুজ্জামান

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ড. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘মার্টিন কেম্পশেন নিজে কবি না হলেও তার মধ্যে একজন কবি লুকিয়ে আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদের বই নতুন চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে যারা গবেষণা করেন তাদের বিশেষ কাজে আসবে। কেননা এ ধরণের গবেষণা বাংলা সাহিত্যে বিরল।’

উল্লেখ্য, বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে ২০১৬ সালে প্রকাশিত জীবনানন্দ সমগ্র সম্পাদনা করেছেন জীবনানন্দ-গবেষক ভূমেন্দ্র গুহ। তিনি ১৯৩১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। মৃত্যুবরণ করেন ২৪ ডিসেম্বর ২০১৬ সালে। তাকে সম্পাদনা, কম্পোজ, প্রুফ ও কলকাতা জাতীয় গ্রন্থাগারে রক্ষিত মূলানুগ পাঠের কাজের জন্য সম্মানী গ্রহণের অনুরোধ জানালে তিনি বৃহত্তর গবেষণায় এই অর্থ ব্যয়ের সুপারিশ করেন। এ প্রসঙ্গে কথোপকথন চলাকালে তার আকস্মিক মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর বাংলাদেশের অনাদৃত গবেষণাকর্মকে সঞ্জীবিত করার লক্ষ্যে ও উদ্দেশ্যে বেঙ্গল পাবলিকেশন্‌সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নির্বাহী পরিচালক ও কালি ও কলমের সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ড. আনিসুজ্জামান ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে এক বৈঠক করার পর এক বছরে প্রকাশিত গবেষণা ক্ষেত্রে একটি গ্রন্থকে জীবনানন্দ-ভূমেন্দ্র গুহ পুরস্কার প্রদান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

এই পুরস্কার প্রবর্তনের মাধ্যমে ভূমেন্দ্র গুহকে যথাযথ সম্মান জানানো এবং বাংলাদেশে গবেষণা কর্মকে আরো সঞ্জীবিত করা সম্ভব হবে মনে করছেন আয়োজকরা।