দেশজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য

 

ভাস্কর্য বহন করে ইতিহাস। আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যগুলোও ঠিক তেমনই বহন করে চলেছে মুক্তিযুদ্ধের একেকটি গৌরবগাথা। বিজয়ের মাসে ঢাকার বাইরের কিছু উল্লেখযোগ্য মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য নিয়ে লিখেছেন ও ছবি ‍তুলেছেন আসমা বীথি, বাপ্পী মজুমদার, শিকদার খালিদ, হাসনাত কামাল ও আবদুস সাত্তার।

 

চট্টগ্রাম। হালিশহর মধ্যম নাথপাড়া শহীদ স্মৃতি ভাস্কর্য

১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম শহরে প্রথম গণহত্যার ঘটনাটি ঘটে হালিশহর এলাকার মধ্যম নাথপাড়ায়। ইতিহাসের বর্বরোচিত এই গণহত্যা ঘটে একাত্তরের ৩১ মার্চ। পাকবাহিনীর সশস্ত্র সহযোগিতায় স্থানীয় বিহারি বাসিন্দারা এ হত্যাকাণ্ড চালায়। এই হত্যাকাণ্ডে নিরীহ ৩৯ পাড়াবাসীসহ হালিশহরসংলগ্ন তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল (ইপিআর) ক্যাম্পের ৪০ জন সদস্য নিহত হন। বাসসের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২৫ মার্চ কালরাতের পরপরই ইপিআর ক্যাম্পের সদস্যরা সীমিত শক্তি নিয়েই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শুরু করেন। এ সময় দক্ষিণ হালিশহর এলাকার স্থানীয় জনগণও ইপিআর সদস্যদের সঙ্গে যোগ দেন। পাকবাহিনী খুব দ্রুতই এ খবর পেয়ে বঙ্গোপসাগর উপক‚লবর্তী এ এলাকায় হামলা চালানোর জন্য অগ্রসর হয় এবং একপর্যায়ে ক্যাম্পসহ গোটা এলাকা ঘিরে ফেলে। ফলে দুর্বল প্রতিরোধ ব্যূহ ভেঙে গেলে ইপিআর সদস্যরা সংলগ্ন নাথপাড়ার বিভিন্ন বাড়িতে আশ্রয় নেন। এরপর পাকবাহিনী ও তার দোসররা নাথপাড়ার ঘরে ঘরে ঢুকে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং গোটা পাড়া আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়। নাথপাড়ার এই নির্মম হত্যাযজ্ঞকে স্মরণ রাখতে ওই স্থানে ‘শহীদ বেদি’ শীর্ষক একটি স্মৃতি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়। প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী ঢালী আল মামুনের নকশায় এই স্মৃতি ভাস্কর্যটি নির্মিত হয়েছে।

বরিশাল। মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য বিজয় বিহঙ্গ

নগরীর আমতলার মোড় সড়কদ্বীপ। সমতল ভূমি থেকে ৩০ ফুট উঁচুতে মুক্ত বলাকা ডানা মেলে জানান দেয় বিজয় ও স্বাধীনতার। স্বাধীনতার স্মারক ভাস্কর্য ‘বিজয় বিহঙ্গ’ শত্রুমুক্ত পবিত্র ভূমিতে তরুণ প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দেয় স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা। সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে লক্ষ্য প্রাণ ও ত্যাগের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনা আমাদের বিজয়, আমাদের স্বাধীনতা। মুক্তির সোপান তাই লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত। সেই রক্তে রঞ্জিত প্রতীকী লাল ইটের বৃত্তাকার সোপানের কেন্দ্র থেকে উঠে আসা ত্রিকোণ বেদির ওপর স্থাপিত হয়েছে আমাদের সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতীক বেয়নেট আকৃতির ইস্পাত মনুমেন্ট, যার ত্রিকোণ আকৃতি জল, স্থল ও আকাশে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ার উপমা। ইস্পাত ব্যবহারের ভাস্কর্যের ফর্মে রয়েছে শাণিত প্রত্যয়। সমতল থেকে ৩০ ফুট উচ্চতার মনুমেন্ট সৃষ্টি করেছে শক্তির শিখরে আকাশ স্পর্শ করার সাহস। এর উচ্চতার শিখরে তাকালে শহীদ ও যোদ্ধাদের ত্যাগ ও সাহসের বিশালতার প্রতি মন শ্রদ্ধায় ভরে ওঠে; চিরদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে ও নিজেকে দেখতে শিখবে বাঙালি জাতি। ৮ ডিসেম্বর শত্রæমুক্ত হয় বরিশাল। ১৬ ডিসেম্বর আমরা অর্জন করি পূর্ণাঙ্গ বিজয়। যুদ্ধ শেষ, তাই সাহসী বীরদের প্রতীকী ইস্পাত মনুমেন্টকে ঘিরে শত্রুমুক্ত স্বদেশের নীলাকাশে রুপালি ডানা মেলে দিয়েছে আটটি পাখি, আমাদের মুক্ত-স্বাধীন নতুন জীবনের প্রতীকী ফর্মে। যুগ-যুগান্তর ধরে মুক্তির সংগ্রামের কথা নতুন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দেবে স্বাধীনতার স্মারক ভাস্কর্য ‘বিজয় বিহঙ্গ’।

স্বাধীনতার ৩৭ বছর পর নির্মাণ করা হয় বরিশালে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্মারক ভাস্কর্য ‘বিজয় বিহঙ্গ’। চারুকলা বরিশালের উদ্যোগে অর্থায়ন ও বাস্তবায়নে ছিল বরিশাল সিটি করপোরেশন। ভাস্কর্যের নাম প্রস্তাবনা করেন আমিনুল হাসান লিটু। কনসেপ্ট-ডিজাইন ও ভাস্কর্যশিল্পী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের অধ্যাপক প্রখ্যাত ভাস্কর শিল্পী হামিদুজ্জামান খান ও ভাস্কর আমিনুল হাসান লিটু। সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন ২৭টি সাংস্কৃতিক সংগঠনের জোট বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদ। ২০০৮ সালের ২৮ মে বিজয় বিহঙ্গের ভিত্তিফলক স্থাপন করেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র আওলাদ হোসেন দিলু। ২০০৯ সালের ২৩ মার্চ কাজ শেষে বিজয় বিহঙ্গের উদ্বোধন করেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. শওকত হোসেন হিরন। বিজয় বিহঙ্গের পাদদেশে রয়েছে একটি মঞ্চ, যেখানে জাতীয় দিবসগুলোতে আয়োজন করা হয় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের।

বিজয় বিহঙ্গ, বরিশাল

যশোর। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা স্মৃতির ভাস্কর্যের শহর

মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেক গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের ধারক যশোর। দেশের প্রথম মুক্ত জেলা যশোর। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর মুক্ত হয় যশোর জেলা। মুক্তিযুদ্ধের সেসব গৌরবগাথা স্মৃতি নিয়ে যশোর শহরের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য। রয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ। অনেক জেলা শহরে এত ভাস্কর্য নেই। তাই যশোরকে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যের শহরও বলা হয়।

উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে যশোর শহরে প্রবেশ করতে পালবাড়ী মোড়ে নির্মিত হয়েছে ‘বিজয় ৭১’ নামের এক বিশাল ভাস্কর্য। সারা দেশের মধ্যে যশোর জেলা পাকবাহিনীর কবল থেকে প্রথম মুক্ত হয়। যশোর ক্যান্টনমেন্ট ছিল পাকবাহিনীর ঘাঁটি। সে হিসেবে হানাদার বাহিনীর হাত থেকে যশোর জেলা মুক্ত হওয়া একটি বিশাল বিজয় এবং গুরুত্ব বহন করে। ‘বিজয়-৭১’-এর মাধ্যমে সে বিষয়টি দেখানো হয়েছে। ফুটিয়ে তোলা হয়েছে স্বাধীনতার বিজয় উল্লাসে মানুষ ঢুকছে শহরে। এই ভাস্কর্য তৈরি করেন যশোর সুলতান আর্ট কলেজের প্রিন্সিপাল খন্দকার বদরুল ইসলাম।

যশোরসহ দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম বিদ্যাপীঠ যশোর মাইকেল মধুসূদন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ (এমএম কলেজ)। দীর্ঘদিন ধরে যশোরবাসী এবং ওই কলেজের ছাত্রদের চাওয়া ছিল, সেখানে একটি ভাস্কর্য নির্মিত হোক। অবশেষে তা পূরণ হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে ‘চেতনায় চিরঞ্জীব’ নামের ভাস্কর্য। এর শিল্পী যশোর চারুপীঠের অধ্যক্ষ মাববুব জামাল শামীম। তিনি বলেন, চেতনায় চিরঞ্জীব ভাস্কর্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে আগুনের শিখা। যে আগুন জ্বলেছিল ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়, সমগ্র জাতির মধ্যে, বাঙালি জাতির মধ্যে।

যশোর শহরের পুরনো কসবা ট্রাফিক আইল্যান্ডের পশ্চিম পাশে একটি ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে ১২ বছর আগে। ভাস্কর্যের নাম ‘জাগ্রত বাঙালী’। এর শিল্পী হলেন রকিবুল ইসলাম শাহীন। এ ভাস্কর্যের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে একটি সুন্দর নতুন স্বপ্ন। সে স্বপ্ন অবশ্যই স্বাধীনতার। সাদা কবুতর উড়িয়ে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে শান্তির কথা।

যশোরের সরকারি মহিলা কলেজে মুক্তিযুদ্ধের কোনো ভাস্কর্য ছিল না। ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকদের অনেক দিনের দাবি ছিল, একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করা হোক। এর পরিপ্রেক্ষিতে কলেজের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-কর্মচারীদের তোলা অর্থে ‘প্রদীপ্ত স্বাধীনতা’ নামে একটি ভাস্কর্য তৈরি করা হয়। স্বাধীনতা দিবসের ৩৫ বছর পূর্তিতে এই ভাস্কর্যের উদ্বোধন করেন কলেজ অধ্যক্ষ সরদার মোহাম্মদ একরামুল আজিজ। ভাস্কর্যটি তৈরি করেন যশোর সুলতান আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ খন্দকার বদরুল ইসলাম। ভাস্কর বলেন, বিভিন্ন রঙের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের নানা বিষয় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ভাস্কর্যের কালো অংশ দিয়ে শোক, সাদা অংশ দিয়ে শান্তি, সবুজ অংশ দিয়ে সবুজ শ্যামল বাংলাদেশ এবং ওপরের লাল সূর্য দিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম বোঝানো হয়েছে। ৯টি সূর্যের ছটা দিয়ে সংগ্রামের নয় মাসকে বোঝানো হয়েছে।

যশোর সরকারি সিটি কলেজে ২০০৮ সালে নির্মাণ করা হয় ভাস্কর্য। বর্ণিল এ ভাস্কর্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামের ঐতিহাসিক সালগুলো নান্দনিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ভাস্কর হচ্ছেন খন্দকার বদরুল ইসলাম। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছয়টি ঐতিহাসিক সাল এ ভাস্কর্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ভাস্কর বলেন, যে ভাবনায় সালগুলো ভাস্কর্যে স্থান পেয়েছে তা হচ্ছে, ’৫২-এর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, স্বদেশ চেতনার উন্মেষ, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, প্রতিবাদী ভাবনার প্রকাশ, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, প্রতিরোধ উপলব্ধির বিচার, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, বাঙালি জাতির আত্মশক্তির প্রতিষ্ঠা, ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচন, জাতীয় আকাক্সক্ষা নির্ধারণ এবং ’৭১-এর মুক্তিসংগ্রাম।

সরকারি সিটি কলেজের ভাস্কর্য, বিজয়-৭১ ও চেতনায় চিরঞ্জীব; যশোর

সিলেট। চেতনা ৭১

তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে তুলে ধরতে কয়েকটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হলেও বৃহত্তর সিলেটের কোথাও নির্মিত হয়নি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিভাস্কর্য ।

অবশেষে প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই ক্যাম্পাসের গোলচত্বরে তৈরি করল বৃহত্তর সিলেটের প্রথম মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিভাস্কর্য ‘চেতনা ৭১’। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষকদের উৎসাহ-উদ্দীপনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৫-০৬ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রছাত্রীদের উদ্যোগে ও প্রথম ব্যাচের (১৯৯০-৯১) শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তায় ভাস্কর্যটি নির্মিত হয়েছে। ২০১১ সালের ৩০ জুলাই ভাস্কর্যটির উদ্বোধন করেন শাবিপ্রবির ভিসি প্রফেসর ড. সালেহ উদ্দিন।

ভাস্কর্যটিতে স্বাধীনতার পরিচয় বহন করা স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ওপরে তুলে ধরার ভঙ্গিমায় একজন ছাত্র আর এক ছাত্রীর হাতে মহান সংবিধানের প্রতীকী বই। প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয়ে স্থায়ীভাবে নির্মিত হয়েছে ‘চেতনা ৭১’ ভাস্কর্যটি। ভাস্কর্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য এবং একাডেমিক ভবনগুলোর লাল ইটের সঙ্গে মিল রেখে ভিত্তি বেদির তিনটি ধাপ বানানো হয়েছে লাল ও কালো সিরামিক ইট দিয়ে। এর মধ্যে নিচের ধাপের ব্যাস ১৫ ফুট, মাঝের ধাপ সাড়ে ১৩ ফুট এবং ওপরের ধাপ ১২ ফুট। প্রতিটি ধাপ ১০ ইঞ্চি করে উঁচু। বেদির ধাপ তিনটির ওপরে মূল বেদিটি ৪ ফুট উঁচু, তার ওপরে ৮ ফুট উঁচু মূল ফিগার। ভাস্কর্য নকশা প্রণয়ন ও নির্মাণ সম্পন্ন করেন নারায়ণগঞ্জে স্থাপিত ‘নৃ-স্কুল অব স্কাল্পচার’-এর প্রতিষ্ঠাতা শিল্পী মোবারক হোসেন নৃপাল। ভাস্কর্যের মডেলটি দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্থাপনের লক্ষ্যে ডিজাইন করা হয়েছে, যেখানে নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ধারক ও বাহক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

চেতনা ৭১, সিলেট

রাজশাহী। স্বাধীনতার স্মৃতি সাবাশ বাংলাদেশ

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়ে বাঙালিকে নিশ্চিহ্ন করার যে প্রয়াস চালিয়েছিল, তাতে আক্রান্ত হয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। পরে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ ঘাঁটি গেড়ে বসে এখানে। এ সময় তাদের বিতাড়িত করতে গিয়ে শাহাদাত বরণ করেন অধ্যাপক হাবিবুর রহমান, অধ্যাপক মীর আবদুল কাইউম, অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দারসহ নাম না জানা অনেক শিক্ষার্থী ও কর্মচারী। আর এসব শহীদের স্মৃতি অম্লান করে রাখার জন্য রাবির সিনেট ভবনের দক্ষিণ পাশে নির্মাণ করা হয় ‘সাবাশ বাংলাদেশ’।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় জনসংযোগ দফতর সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের উদ্যোগে শিল্পী নিতুন কুন্ডু ভাস্কর্যের নির্মাণকাজ শুরু করেন। এর নির্মাণকাজ শেষ হতে সময় লাগে এক বছর। বিনা পারিশ্রমিকে শিল্পী এই ভাস্কর্য নির্মাণ করে দেন বলে জানা গেছে। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ১৯৯২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি এটি উন্মোচন করেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধ স্মারক ভাস্কর্যটি দাঁড়িয়ে আছে ৪০ বর্গফুট জায়গাজুড়ে। সেখানে রয়েছে দু’জন বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতিকৃতি। একজন রাইফেল হাতে দৌড়ের ভঙ্গিতে রয়েছেন, যার পরনে প্যান্ট ও মাথায় এলোমেলো চুলের প্রাচুর্য, যা অসম সাহসের প্রতীক। আর শহুরে সভ্যতার প্রতীক অন্যজন রাইফেল উঁচু করে দাঁড়িয়ে বাঁ হাতটি মুষ্টিবদ্ধ করে জাগানো, যা বিপুল উল্লাসের প্রতীক। সেটাও এ রকম যে আমাদের দেশটা সামনে এগোনোর পথ খুঁজে পেয়েছে। এ দু’জন মুক্তিযোদ্ধার পেছনে ৩৬ ফুট উঁচু একটি দেয়ালও দাঁড়িয়ে আছে। দেয়ালের উপরিভাগে শূন্য বৃত্ত রয়েছে, যা দেখায় সূর্যের মতো, যা বাংলাদেশের পতাকার একটি ভাস্কর্য ফর্ম। ভাস্কর্যটির বেদির বাম ও ডান পাশে ছয় ফুট বাই পাঁচ ফুট দুটি ভিন্ন চিত্র খোদাই করা হয়েছে। এতে ছাত্র, যুবক, মা, বোন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থাপিত করেছে সমগ্র বাংলাদেশের প্রতীক হিসেবে। ডান দিকের দেয়ালে রয়েছে দু’জন যুবক-যুবতী। যুবকের কাঁধে রাইফেল, মুখে দাড়ি, কোমরে গামছা বাঁধা যেন বাউল। বাম দিকের দেয়ালে রয়েছে মায়ের কোলে শিশু, দু’জন যুবতীর একজনের হাতে পতাকা। পতাকার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে এক গেঞ্জি পরা কিশোর। শিল্পী নিতুন কুন্ডু তার মন তুলি দিয়ে এমনভাবে ভাস্কর্যটি তৈরি করেছেন যে দেখলে মনে হয়, ১৯৭১ সালের অর্জিত স্বাধীনতার প্রতিচ্ছবি। শুধু তা-ই নয়, ভাস্কর্যের মধ্য দিয়ে শুধু অতীত আর বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের দিকেও সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

সাবাশ বাংলাদেশ, রাজশাহী