পরিবর্তিত বাঙালি সংস্কৃতি

একটা স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি আছে। বাঙালি ভাত-মাছ খায়, লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরে, জারি-সারি-ভাটিয়ালি শোনে- এগুলো বাঙালি সংস্কৃতির উপাদান। এ রকম হাজার হাজার উপাদান আছে, যেগুলো বাঙালিত্বের পরিচয় বহন করে। স্বকীয় বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সংস্কৃতির কারণেই বাঙালি বিশ্বের বুকে আলাদা অস্তিত্ব নিয়ে টিকে আছে, থাকবে। পৃথিবীর বুকে এমন জাতির সংখ্যা খুবই কম, যারা সংস্কৃতির জন্য জীবন বিসর্জন দিয়েছে। বাঙালি দিয়েছে। ভাষা আমাদের সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ। আধিপত্যবাদী সংস্কৃতি আমাদের এই সাংস্কৃতিক অধিকার হরণ করতে চেয়েছিল। বাঙালি তা মানেনি। মানেনি বলেই রফিক-সালাম-বরকত-জব্বার বিসর্জন দিলেন তাঁদের জীবন। বাঙালি রবীন্দ্রনাথের গান শোনে, কিন্তু আধিপত্যবাদী সংস্কৃতি রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করল। বাঙালি তা মানতে পারেনি। বিদ্রোহ-বিপ্লবে ফেটে পড়ল। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, স্বাধীনতা আন্দোলনের নেপথ্যে সংস্কৃতির ভূমিকাই ছিলো মুখ্য।

গুণীজনেরা বলেন, সংস্কৃতি নদীর মতো। নদী যেমন গতিপথ বদলায়, সংস্কৃতিও তার গতিপথ বদল করে। পৃথিবীর সব জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিই সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। বাঙালি সংস্কৃতিও এর বাইরে নয়। শত বছর আগের বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে আজকের বাঙালি সংস্কৃতির বহু অমিল খুঁজে পাওয়া যাবে। বাঙালির প্রাচীন সংস্কৃতি কী ছিল আর বর্তমানে কী আছে, এর মধ্যে কী কী পরিবর্তন ঘটে গেল, সুলুক সন্ধান করা যেতে পারে।

খাদ্যাভ্যাসও সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। ধান চাষ ও চাল উৎপাদন বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ। ধনী-গরিব সবার প্রধান খাবার ছিল ভাত এবং মাছ। ঘি মেশানো ধূমায়িত ভাত খাওয়ার কদর ছিল প্রাচীনকালে। গরম ধূমায়িত ভাতের প্রতিটি কণা থাকত অভিন্ন, একটি থেকে আরেকটি বিচ্ছিন্ন, ঝরঝরে এবং অন্ন ছিল সুসিদ্ধ সুস্বাদু, সাদা রং, সরু ও সৌরভময়। দুধে রান্না করা চালের কথাও জানা যায়। অতীতে শাক ও অন্যান্য ব্যঞ্জনসহকারে ভাত খাওয়ার নিয়ম প্রচলিত ছিল। বিশেষ করে, দরিদ্র জনসাধারণের মধ্যে শাকসবজি, তরকারিসহ ভাত খাওয়ার প্রথা প্রচলিত ছিল। তরকারির মধ্যে বেগুন, কুমড়া, ঝিঙে, করলা, কচু ইত্যাদি খেত বাঙালি। বিয়েশাদি এবং অতিথি আপ্যায়নের সময় খাদ্যের তালিকা প্রসারিত হতো। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ছিল ভাত, গাওয়া ঘি, মৌরলা মাছের ঝোল, নালিতা শাক ইত্যাদি। অতিথি আপ্যায়নে ভাতের সঙ্গে পরিবেশিত হতো দই, পায়েস, ক্ষীর এবং ছানার তৈরি মিষ্টান্ন। কর্পূর মেশানো সুগন্ধি জল পরিবেশনের কথাও জানা যায়। আহারের শেষে পরিবেশন করা হতো সুপারি ও নানা মসলাযুক্ত পান। প্রাচীনকাল থেকেই শুঁটকি বাঙালির জনপ্রিয় খাবার। শামুক, কাঁকড়া, বক, হাঁস, মোরগ, সারস, উট, গরু, শূকর ইত্যাদির মাংস কেউ খেত না। বিভিন্ন তরকারির সঙ্গে টক দই ব্যবহারের প্রচলন তখন থেকেই। ফলের মধ্যে কলা, তাল, আম, কাঁঠাল, বেল, নারকেল ইত্যাদি বাঙালির প্রাচীন খাদ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত। আপেল, আঙুর, নাশপাতি, বেদানা ইত্যাদি আসত বাইরে থেকে, তবে খুবই কম। প্রাচীন বাঙালির খাদ্যতালিকায় ডাল উৎপাদন বা খাবারের উল্লেখ পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে বা পূর্ব ভারতে কখনোই ডালের চাষ হতো না। চাল দিয়ে তৈরি হতো মুড়ি, চিড়া, খই, নাড়– এবং তৈলমুক্ত নানা ধরনের পিঠা।

শত বছরের ব্যবধানে বাঙালির খানাপিনার সংস্কৃতিতে অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। ভাত-মাছ এখনো বাঙালির প্রধান খাবার। কিন্তু ধান উৎপাদনে এসেছে পরিবর্তন। এসেছে উচ্চফলনশীল জাতের ধান। ঘি মেশানো ভাতের কথা এখন কেউ চিন্তাও করে না। ভাতের পাশাপাশি এখন যুক্ত হয়েছে আটা-ময়দার তৈরি রুটি এবং নানা ধরনের বিস্কিট, চানাচুর, সেমাই, নুডলস ইত্যাদি। ডাল এখন বাঙালির প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত। নিত্যকার খাদ্য হিসেবে মুরগির মাংস এখন সাধারণ ব্যাপার। মুরগির মাংস ছাড়া তো এখন অতিথি আপ্যায়নের কথা ভাবাই যায় না। কাঁকড়া খাওয়া এখন চিংড়ি খাওয়ার মতো একধরনের বিলাসিতা বটে। বড় বড় হোটেল-রেস্তোরাঁয় কাঁকড়া নানাভাবে প্রক্রিয়াজাত করে পরিবেশন করা হচ্ছে। বকের মাংস খাওয়াও বর্তমানে একধরনের বিলাসিতা। এখন অতি উচ্চমূল্যে বিক্রি হয় বড় বড় বাইম মাছ। ঝিনুকও উঠে এসেছে খাদ্যতালিকায়। সেদ্ধ করা ঝিনুক সস দিয়ে খাওয়ার স্বাদই আলাদা! এসেছে হালিম, কাবাব আরও কত কিছু।

অতিথি আপ্যায়নেও এসেছে পরিবর্তন। আগে বড় বড় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের আপ্যায়ন করা হতো মাটিতে চাটাই পেতে কলাপাতায়। তারপর এলো মাটির সানকি বা বাসন। এরপর এলো চিনামাটি, কাচ, স্টিলের থালাবাসন। অতিথিদের এখন চেয়ার-টেবিলে খাবার পরিবেশন করা হয়। খাবারের পর আগের মতো সেই মিষ্টান্নের সমাহার চোখে পড়ে না। বহুজাতিক কোম্পানির বিভিন্ন পানীয়, যেমন- কোকাকোলা, ফানটা, মিরিন্ডা, সেভেনআপ, পেপসি ইত্যাদি খাবারের পর পরিবেশন করা হয়।

এবার আসা যাক বাঙালির পোশাক-পরিচ্ছদ ও সাজসজ্জার সংস্কৃতি বিষয়ে। বাঙালির পোশাকের আদি রীতি ছিলো সেলাইবিহীন একবস্ত্র। বাঙালি পুরুষেরা ধুতি আর মেয়েরা শাড়ি পরত। আর্থিক অবস্থা ভালো হলে গায়ের ওপর একখণ্ড কাপড়ের ব্যবহার ছিল। এটা পুরুষের ক্ষেত্রে ছিল উত্তরীয়, মেয়েদের ক্ষেত্রে ওড়না। এই ওড়না প্রয়োজনে ঘোমটার কাজ করত। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তে এক কাপড়ই যথেষ্ট ছিলো এবং এরা প্রয়োজনে এর আঁচল দিয়েই ঘোমটার কাজ চালাত। পরে সেলাই করে জামাকাপড় উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে আমদানি হলো। সপ্তম ও অষ্টম শতকের দিকে কাপড়ে ফুল, লতাপাতা ইত্যাদির নকশার প্রচলন হয়। নর্তকীরা কোমর থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত আঁটসাঁট পাজামা আর গলায় বড় একটা ওড়না ব্যবহার করত। সাধু-সন্ন্যাসী ও দরিদ্র শ্রমিকেরা পরত নেংটি। সৈন্য ও মল্লবীররা পরত হাঁটু পর্যন্ত আঁট-পাজামা। শিশুরা পরত হাঁটু পর্যন্ত ধুতি নয়তো আঁট-পাজামা। বাঙালিরা কোনো কালেই মাথায় কোনো আবরণ দেয়নি। ছিল লম্বা বাবরি চুল। কোঁকড়া কোঁকড়া চুল কাঁধের ওপর থোকায় থোকায় ঝুলত। কেউ কেউ আবার মাথার ওপর পেঁচানো ঝুঁটি রাখত। মেয়েদেরও ছিল লম্বা চুল। ঘাড়ের ওপর খোঁপা করে বাঁধা। কেউ কেউ পেছনে এলিয়ে দিত। সাধু-সন্ন্যাসীদের লম্বা জটা দুই ধাপে মাথার ওপর জড়ানো থাকত। শিশুদের চুল তিনটি ‘কাকপক্ষ’ গুচ্ছে মাথার ওপর বাঁধা থাকত। সৈন্য ও প্রহরীরা ফিতাবিহীন পায়ের কণ্ঠা পর্যন্ত ঢাকা চামড়ার জুতা পরত। সাধারণ লোকেরা জুতা ব্যবহার করত না। ধনীরা কাঠের পাদুকা ব্যবহার করত। বিবাহিত নারীরা কপালে কাজলের টিপ, সিঁথিতে ও ঠোঁটে সিঁদুর, পায়ে লাক্ষারস, দেহ ও মুখে চন্দনের গুঁড়া ও চন্দন বাটা এবং জাফরান ব্যবহার করত। পুরুষেরা হাতের নখ বড় রাখত এবং নখে রঙ লাগাত। বিলাসিনীরা ঠোঁটে লাক্ষারস ও খোঁপায় ফুল গুঁজে দিত। অনেকে গলায় ফুলের মালা দিত। অনেক সময় বুকের কাপড় সরে গেলে ফুলের মালা দিয়ে বুক ঢেকে লজ্জা নিবারণ করত। বারাঙ্গনারা দেহে পাতলা কাপড় পরত, বাহুতে সোনার বাজু, সুগন্ধি তেল দিয়ে চুল চ‚ড়া করে বেঁধে তাতে ফুলের মালা জড়িয়ে নিত। কানে পরত কচি তালপাতার দুল। গ্রামের মেয়েরা আবার নগরের মেয়েদের সাজসজ্জা পছন্দ করত না। নগরের মেয়েরা বাঁকাভাবে পা ফেলে কোমর দুলিয়ে হাঁটত আর সেটা গ্রামের মেয়েরা যদি নকল করার চেষ্টা করত, তাহলে সামাজিক শাস্তির ব্যবস্থা ছিলো। তাদের বলা হতো, সোজা পা ফেলে চলতে। এরাও কপালে কাজলের টিপ পরত; বিবাহিতরা হাতে দিত শক্সেখর সাদা বালা, কানে কচি রীঠাফুলের দুল এবং চুলে তেল। পুরুষেরা মাঠে আর মেয়েরা সংসারের হাটবাজার করা থেকে শুরু করে সব কাজ করত। সূর্য কার্পাস ও রেশম কাপড়ের জন্য বাংলাদেশ ছিলো বিখ্যাত। তবে এসব ছিল উচ্চবিত্তের জন্য। সাধারণ দরিদ্রের কপালে জুটত মোটা ছিন্ন ও জীর্ণ কার্পাস কাপড়।

সময়ের ব্যবধানে বাঙালির পোশাক-পরিচ্ছদ ও সাজসজ্জার সংস্কৃতিরও বহু পরিবর্তন ঘটেছে। এখন কেউ সেলাইবিহীন বস্ত্র পরে না। তার বদলে স্থান করে নিল লুঙ্গি। পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে লুঙ্গির পাশাপাশি বাঙালি প্যান্ট পরতে শুরু করল। অভিজাতরা পরতে শুরু করল প্যান্ট-স্যুট-টাই। নারীদের শাড়ির পরিবর্তে এলো সালোয়ার-কামিজ, কাঠের খড়মের বদলে চামড়া ও প্লাস্টিকের জুতা। জমিদার আমলে সাধারণ মানুষ জুতা পরলেও জমিদারের বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় জুতা খুলে যেতে হতো। এখন কি সেটা আর ভাবা যায়? শত শত বছর ধরে বাঙালি মাথায় কোনো আবরণ দিত না। মুসলিম সংস্কৃতির প্রভাবে এলো টুপি, পাগড়ি। নারীরা পরতে শুরু করল বোরকা। ঠোঁটে লাক্ষারস ব্যবহারের বদলে এলো লিপিস্টিক ও নখের নেইল পলিশ। ফুলের মালা দিয়ে বুক ঢাকার পরিবর্তে চালু হলো ব্লাউজ ইত্যাদি। কানের কচি তালপাতা ও রীঠাফুলের দুলের বদলে এলো সোনা-রুপাসহ অ্যামিটিশনের নানা গহনা। সূ² কার্পাস ও রেশম কাপড় উধাও হয়ে এখন প্রচলিত হয়েছে নানা ধরনের কাপড়। এখন মেহেদিগাছ থেকে মেহেদি পাতা সংগ্রহ করে কষ্ট করে বেটে হাতে লাগাতে হয় না। বিভিন্ন কোম্পানি ‘সাজ’, ‘শাহজাদী’ ইত্যাদি নাম দিয়ে বাজারে এনেছে নানা প্যাকেটজাত মেহেদি।

খেলাধুলায়ও কম পরিবর্তন আসেনি। বাঙালির প্রাচীন খেলার মধ্যে ছিল হা-ডু-ডু বা কাবাডি। এ ছাড়া ছিল দাঁড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, নৌকাবাইচ, এলাটিং-বেলাটিং, ঘুড়ি ওড়ানো, বলিখেলা, কড়ি, মার্বেল, ষোলঘুঁটি, লাটিম, ডাংগুলি বা ডাণ্ডাগুলি, এচিং-বিচিং, ওপেন্টি বায়স্কোপ, কুতকুত, ফুল টোকা, পুতুলখেলা, নুনতা, পানি ঝুপ্পা, কানামাছি, গাইগোদানি, টোপাভাতি, লুডু ইত্যাদি। গ্রামগঞ্জের কোথাও কোথাও এখনো এসব খেলার প্রচলন থাকলেও মহানগর এবং নগর সভ্যতায় এখন আর এসব খেলার চল নেই। এসবের বদলে ধীরে ধীরে প্রচলন ঘটতে শুরু করল ক্রিকেট, ফুটবল ইত্যাদি খেলা। শহরে, এমনকি গ্রামেও এখন ঢুকে পড়েছে হকি, ভিডিও গেমস এবং কম্পিউটার বা ইন্টারনেটভিত্তিক নানা খেলা। বাঙালির বিনোদনে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। একসময় যাত্রাপালার প্রচলন ছিল। এখন সেই স্থান দখল করেছে থিয়েটার, সিনেমা, রেডিও ও টেলিভিশন। এসেছে ব্যাটারিচালিত নানা খেলনা গাড়ি, প্লাস্টিকের পুতুল, পশুপাখিসহ কত কী। এখন আগের মতো আর কবিগানেরও প্রচলন নেই। পুঁথিপাঠও তেমন দেখা যায় না।

অন্যদিকে, প্রাচীনকালে বাঙালির সংগীতকলা ছিল সংস্কৃত স্তোত্রসংগীত প্রভাবিত। সে সময়কার বৈষ্ণব ভাবাশ্রিত ধর্মসংগীতগুলো আজও পূর্ব ভারতীয় মন্দিরগুলোতে গীত হয়। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে কবি জয়দেব বিরচিত ‘গীতগোবিন্দম’ এ জাতীয় সংগীতের একটি বিশিষ্ট উদাহরণ। ছিল জারি-সারি-ভাটিয়ালি গান। আঠারো ও উনিশ শতকে বাংলায় প্রচলতি হলো বাউলসংগীত। তান্ত্রিক কর্তাভজা সম্প্রদায় ও ইসলামি সুফি দর্শনের ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল এই গানে। তারপর এলো রবীন্দ্রসংগীত। বাঙালির সংগীতের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ একটি ধারা। এই গানগুলোর কথায় প্রাচীন হিন্দু ধর্মশাস্ত্র উপনিষদ, মধ্যযুগীয় বৈষ্ণব পদাবলি ও বাউল গানের প্রভাব গভীর। তারপর এলো নজরুলসংগীত ও অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী সংগীত। ১৮৬৭ সালে আয়োজিত হিন্দুমেলা বা স্বদেশি মেলায় দেশাত্মবোধক গানের ধারণাটির উদ্ভব হলো। বাংলা আধুনিক গানের ধারাটিও যথেষ্ট সমৃদ্ধ। ১৯৯০-এর দশক থেকে পাশ্চাত্য ধ্যানধারণা ও আধুনিক নগরজীবনকেন্দ্রিক বাংলা ব্যান্ড সংগীতের উদ্ভব হলো। এখন এই ব্যান্ড সংগীতেরই জয়জয়কার।

উৎসব-আনন্দেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। দুর্গাপূজ পূজা, লক্ষী পূজা, মনসা পূজা, সরস্বতী পূজাসহ নানা পূজা-উৎসব ছিল বাঙালিদের মধ্যে। তারপর মুসলিম প্রভাবে এলো ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, মহররম, আশুরা ইত্যাদি উৎসব। আগের মতো এসব উৎসব এখনো প্রচলিত বটে, তবে উৎসবের ধরন পাল্টে গেছে। সময়ের সঙ্গে ঈদ-সংস্কৃতির পরিবর্তন হয়েছে, হচ্ছে। শত বছর আগের যে ঈদ-সংস্কৃতি, তার সঙ্গে বর্তমানের ঈদ-সংস্কৃতির ঢের তফাৎ। বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমান সমাজেও গত তিন দশকে ঈদ-সংস্কৃতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। তখনকার ঈদ-সংস্কৃতি বর্তমানের সঙ্গে মৌলিকভাবে ঠিক থাকলেও আনুষঙ্গিক বহু কিছুর পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। পূজা ও ঈদ উৎসবের সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে থার্টিফার্স্ট নাইট, ভ্যালেন্টাইনস ডে, জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী ইত্যাদি।

ভাষা সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাঙালির ভাষার পরিবর্তনও লক্ষণীয়। মুসলমান প্রভাবে বাংলা ভাষায় প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দ ঢুকতে শুরু করল। ঔপনিবেশিক প্রভাবে ঢুকতে শুরু করল প্রচুর ইংরেজি শব্দ। আবার বঙ্কিমচন্দ্র যে ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন, রবীন্দ্রনাথ সেই ভাষা বদলে দিলেন। তাঁর সাহিত্যের ভাষা হলো আরও আধুনিক। মানিক-তারাশঙ্করের মতো ঔপন্যাসিকেরা ভাষাকে করলেন আরও আধুনিক। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্যে ভাষার বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল। বর্তমানের ভাষা তো আগের চেয়ে অনেক পরিবর্তিত। এখন ভাষা নিয়ে চলছে দারুণ বিতর্ক। চলতি পথে, রাস্তায় ফুটপাতে, বাস, ট্রেনে, টেলিভিশনের নাটক, টক শো এবং রেডিওতে কান পাতলেই এখন প্রকৃত বাংলা ভাষার ব্যবহার শোনা যায় না। মানুষের আর্থসামাজিক পরিবর্তন এবং যোগাযোগের মাত্রাভেদের ওপর ভাষার পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এবং হচ্ছে।

সংস্কৃতির উপর্যুক্ত অনুষঙ্গগুলো ছাড়াও হাজার হাজার অনুষঙ্গ আছে। গ্লোবালাইজেশনের কারণে আমাদের সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটছে। এই পরিবর্তনে আনন্দ যেমন আছে, বেদনাও কম নয়। সংস্কৃতির পরিবর্তনে আনন্দ কী? আগেই বলেছি, বাঙালির সংস্কৃতি ছিল সেলাই ছাড়া কাপড় পরা। বাঙালি শাড়ি ও ধুতি পরত। তারপর লুঙ্গির প্রচলন শুরু হলো। আমরা এখন প্যান্ট-শার্ট পরি। কিন্তু এগুলো তো বাঙালির পোশাক নয়। এই দেশের, এই মাটির, এই সংস্কৃতির পোশাক নয়। তবু আমরা পরছি। আবার বাঙালি হাত দিয়ে ভাত খেত, এখনো খায়। তবে কোনো কোনো বাঙালি এখন কাঁটাচামচ ব্যবহার করে। বাঙালি ঢেঁকি দিয়ে ধান ভানত, চালের গুঁড়া করত, গরু দিয়ে ধান মাড়াত। কিন্তু এখন মেশিন এসেছে। মেশিনই সব করে দিচ্ছে। আগে গৃহকোণ থেকে নারীর বের হওয়াটা বাঙালি সংস্কৃতির মধ্যে ছিল না। এখন অফিস-আদালতে চাকরি করছে নারীরা, দেশ শাসন করছে নারী। আগে জমিদারি, সামন্ত প্রথা ছিল বাঙালির সংস্কৃতি। এখন তো ভাবাই যায় না। এ রকম বহু পরিবর্তন ঘটে গেছে বাঙালি সংস্কৃতির। তবে এগুলো ইতিবাচক পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের ফলে বাঙালির জীবনযাপন উন্নত হয়েছে এবং হচ্ছে। এই সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আমাদের আনন্দ দেয়। সংস্কৃতি হারিয়ে গেছে বলে এতে হা-হুতাশের কিছু নেই, বেদনার্ত হওয়ারও কোনো কারণ নেই।

কিন্তু সব পরিবর্তনে আনন্দিত হওয়ার কারণ নেই। সংস্কৃতির এমন কিছু উপাদান আছে, যেগুলোর পরিবর্তন ঘটলে জাতিগত সংকট সৃষ্টি হয়। যেমন- বাঙালি ভাত-মাছ খায়। এখন যদি বার্গার বা পিৎজা দিয়ে ভাত-মাছকে অপসারণ করে দেওয়া হয়, তাহলে ক্ষতির কারণ আছে। ক্ষতিটা কীভাবে হচ্ছে? চালের তৈরি বাঙালির পিঠার কথাই ধরা যাক। পিঠা চাল থেকে এসেছে। কারণ, বাংলায় ধান হয়। গম বাঙালির নিজস্ব নয়। ধান থেকে বাঙালি খই, মুড়ি, ভাত, চিড়া, চালভাজা এবং কত রকমের পিঠা বানাত। এগুলো বানাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তেল লাগত না। এগুলো বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি হারিয়ে যাবে যদি বাইরের খাবারগুলো আসে। তাতে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হবে। এই সংস্কৃতিগুলো অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। বাঙালি ভাত ছেড়ে পিৎজা ও বার্গার খেতে শুরু করলে দেশের ধান উৎপাদনকারী কৃষকশ্রেণী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শুকনো খাবারের পরিবর্তে বাঙালির মধ্যে ব্যাপকভাবে তেলের ব্যবহারের ফলে শরীরে নানা রোগবালাই বাসা বাঁধছে। বাঙালি তার নিজস্ব বিনোদন বাদ দিয়ে যখন বিদেশি চ্যানেল দেখে, হিন্দি সিরিয়াল দেখে, তখন বিদেশি পণ্যের বিজ্ঞাপনটাও দেখে। সেই বিজ্ঞাপন দেখে বিদেশি পণ্যের প্রতি আসক্ত হয়। বাঙালি যখন বিদেশি সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত হয়, তখন শুধু তার সংস্কৃতির চিহ্নগুলো হারায় বা সাংস্কৃতিক ক্ষতি হয় তা নয়, অর্থনৈতিক ক্ষতিও হয়। বাঙালি জারি-সারি-ভাটিয়ালি বাদ দিয়ে যখন ব্যান্ড সংগীতে আসক্ত হয়, তখন বাঙালির চিরায়ত ভাবুকতা উধাও হয়ে অস্থিরতার সৃষ্টি হবে। বাঙালির জারি-সারি-ভাটিয়ালি বা রবীন্দ্র-নজরুলসংগীত চিত্তকে প্রশান্তি দেয়, অপর পক্ষে পাশ্চাত্য প্রভাবিত ব্যান্ড সংগীত চিত্তকে উত্তেজিত করে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটছে এবং ঘটবে, এটাই স্বাভাবিক। কিছু কিছু পরিবর্তনকে স্বাগত জানানো যায়। কিন্তু সব পরিবর্তনকে মেনে নিলে জাতিগত সংকট যে তৈরি হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

 

তথ্যসূত্র:

বাঙ্গলার ইতিহাস: কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়
মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য: সেলিম আল দীন
বাংলার লোকসংস্কৃতি: ওয়াকিল আহমদ
প্রাক-পলাশী বাংলা: সুবোধকুমার মুখোপাধ্যায়