পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে

মুক্তিযুদ্ধ। শোষণ, অবিচার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যের এক আবেগঘন প্রতিঘাত। শত সহস্র কবিতা, গল্প, উপন্যাসে তার অনুবাদ হয়েছে, আজও হচ্ছে। শিল্পের নবীনতম মাধ্যম চলচ্চিত্রেও প্রস্ফুটিত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালির রক্তস্নাত বিজয়ের গল্প, হারানোর গল্প। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিস্তর গল্প কবিতার সঙ্গে আঙ্গিকগতভাবে বৈচিত্রপূর্ণ চলচ্চিত্র দেখা গেছে খুবই সামান্য। ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মুক্তিযুদ্ধের টুকরো গল্প বলার জন্য যে অল্প কিছু সিনেমা হয়েছে তা সবই সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি। এ সময়ে দৃষ্টি দিলে চোখে পড়ে দুটি উজ্বল ছবি- মেঘমল্লার ও অনিল বাগচীর একদিন। বাংলাদেশ সরকারের সহযোগীতায় ও বেঙ্গল ক্রিয়েশন্স-এর পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত এ চলচ্চিত্র দু’টি পরিচালনা করেছেন নবীন নির্মাতা জাহিদুর রহিম অঞ্জন ও প্রবীন নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম।
প্রায় দু’শ বছর আগে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ কবিতা হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া বর্ননা করতে গিয়ে কবিতা হয়ে ওঠার প্রকৃয়া নির্ধারণ করতে বলেছিলেন, কবিতা হলো স্তিমিত আবেগের বহিঃপ্রকাশ যা কিনা স্বতস্ফুর্ত সুগভীর অনুভুতির প্রবাহ থেকে উৎসারিত (Poetry is the spontaneous overflow of powerful feelings: it takes its origin from emotion recollected in tranquility.)। আবেগ কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসলে তার পরিশীলিত রূপ বিশুদ্ধ কবিতা হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও বোধ করি এমনটি হওয়ার সময় এসেছে। মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে আবেগ এবং শোকের তীব্রতা সামলে ভিন্ন আঙ্গিকে ছোট ছোট প্লটে মুক্তিযুদ্ধের খন্ডচিত্র বা মাইক্রো ন্যারেটিভ উঠে আসছে চলচ্চিত্রের গল্পে।
মেঘমল্লার মুক্তি পায় ২০১৪ সালের ১২ ডিসেম্বর। কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছোট গল্প রেইনকোট অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যও রচনা করেছেন জাহিদুর রহিম অঞ্জন। গল্পের মূল চরিত্র নূরুল হুদা বাংলাদেশের একটি মফস্বল শহরের সরকারি কলেজের শিক্ষক। স্ত্রী আসমা এবং পাঁচ বছরের মেয়ে সুধাকে নিয়ে তার সুখ-দুঃখের সংসার। তাদের সাথে থাকে নূরুল হুদার শ্যালক অর্থাৎ আসমার ছোট ভাই মিন্টু। একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে মিন্টু মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চলে যায়। আর এদিকে নূরুল হুদাকে রেখে যায় জীবন-মৃত্যুর সংকটের মাঝে। ঘোর বর্ষণের এক রাতে মুক্তিযোদ্ধারা নুরুল হুদার কলেজে এবং পাশের আর্মি ক্যাম্পে আক্রমণ চালায়। পরবর্তীতে নূরুল হুদা এবং তার বন্ধু আবদুস সাত্তারকে তলব করে নির্মম পাক সেনারা। বৃষ্টির মধ্যে যাওয়াার সময় আসমা তার ভাই মিন্টুর ফেলে যাওয়া রেইনকোট নুরুল হুদাকে পরিয়ে দেয়। শুধু রেইনকোট নয়, নুরুল হুদার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা মিন্টু চেতনাও যেন সঞ্চারিত হয়। সে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ভাবতে শুরু করে, যার কাছে মৃত্যু বা আত্মদান কোনো ব্যাপারই না। পাকিস্তানি সেনার অত্যাচর সত্ত্বেও নতজানু হতে অস্বীকার করে। বিদ্রোহ কর বসে সে। ফলাফল- পাক বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু।
বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় চলচ্চিত্র অনুদানের সহায়তায় এবং বেঙ্গল এন্টারটেইনমেন্ট লিমিটেডের প্রযোজনায় চলচ্চিত্রটি পরিবেশনা করে বেঙ্গল ক্রিয়েশন্স। মুক্তির বছরই সেরা পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান পরিচালক জাহিদুর রহিম অঞ্জন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও আলোচিত হয় এ চলচ্চিত্র। ২০১৫ সালের ১০-২০ সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শিত হয়। এছাড়াও এটি একই বছর ভারতের ৪৬তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (আইএফএফআই) প্রতিযোগিতা বিভাগে মনোনীত হয়।
অনিল বাগচীর একদিন চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন স্বনামখ্যাত নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম। এটি মুক্তি পায় ২০১৫ সালের ১৩ নভেম্বর। ছবিটি প্রযোজনা করে বেঙ্গল ক্রিয়েশন্‌স । হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে ছবিটির চিত্রনাট্য সাজিয়েছেন পরিচালক নিজেই। ছবির গল্প আবর্তিত হয়েছে ২৬ বছরের যুবক অনিল বাগচীকে ঘিরে। ছোটবেলা থেকেই ভীতু স্বভাবের সে। অনিল কাজ করে ঢাকায় একটি ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে, থাকে মেসে। অনিলের স্কুলশিক্ষক বাবা ও একমাত্র বড়বোন অতসী থাকে রুপেশ্বর গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধে মাঝামাঝি সময়ে একদিন খুব ভোরে একটা চিঠি পায় অনীল। রুপেশ্বর হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক চিঠিতে জানান যে অনিলের বাবাকে মিলিটারিরা মেরে ফেলেছে। বোন অতসী আছে হেডমাস্টারের বাসায়। অনিল অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বাসে করে যাত্রা করে রুপেশ্বর গ্রামের দিকে। অসাম্প্রদায়িক চেতনার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ ও মানবিক সংকটের নানান মুহূর্ত।
দুটি ছবিতেই শৈল্পিক চিত্রায়ণ ঘটেছে বাংলার রূপ-রস-গন্ধের। বৃষ্টি ও জোছনার আবহে গল্প এগিয়েছে ছোট ছোট প্লটকে কেন্দ্র করে যা কিনা স্বাধীনতা সংগ্রামের গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের পাশ কাটিয়ে ছোট ছোট উপাখ্যানকে উপজীব্য করে তোলে। বোঝাই যাচ্ছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক চলচ্চিত্র যেন যাত্রা করেছে তার অনিবার্য পরিপক্বতার দিকে। গত বছরের অনিল বাগচীর একদিন আর তার আগের বছরের মেঘমল্লার আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নতুন ছবির সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। এসব ছবি গল্প বলেছে মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখ ইমেজ থেকে দূরবর্তী মানুষের জীবনের। মুক্তিযুদ্ধের কালে সামান্য আটপৌরে জীবনের আখ্যান আমাদের সামনে উপস্থাপিত হচ্ছে এখন। বাংলা চলচ্চিত্রের পূবাকাশে দেখা দিচ্ছে নতুন দিনের আভাস।