প্রচার মাধ্যমে প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি

বাংলাদেশ বেতারের বহির্বিশ্ব কার্যক্রম বিভাগের পরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন কামাল আহমেদ। পেশায় সরকারি কর্মকর্তা হলেও নেশা এবং ভালোবাসা রবীন্দ্রসংগীত ঘিরে। এই আবেগ সঙ্গে করেই দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চর্চা করছেন রবীন্দ্রসংগীত। এর মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে ১৫টি অ্যালবাম যার মধ্যে ১০টি রবীন্দ্রসংগীতের, ১টি তিন কবির গান, দুটি হারানো দিনের গান, একটি আধুনিক গান এবং একটি অ্যালবাম বঙ্গবন্ধু স্মরণে। ভূষিত হয়েছেন সার্ক কালচারাল অ্যাওয়ার্ড (২০১০), বঙ্গবন্ধু গবেষণা ফাউন্ডেশন অ্যাওয়ার্ড (২০১৫), অদ্বৈত মল্লবর্মণ অ্যাওয়ার্ড (২০১৭), বীর শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত অ্যাওয়ার্ডসহ বিভিন্ন সম্নাননা  ওপুরস্কারে। ঢাকা এবং কলকাতার বিভিন্ন টেলিভিশনে নিয়মিত  এ শিল্পির সঙ্গে  আলাপচারিতা গড়ালো সংগীত ব্যবস্থাপনা ঘিরেই

বাংলাদেশ ও ভারতে নিয়মিত গানের অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন আপনি। দুদেশের টিভি চ্যানেলেই আপনাকে দেখা যায়। দুই বাংলার মধ্যে গুণগত কোনো পার্থক্য ধরা পড়ে আপনার কাছে?

যেহেতু ঢাকায় থাকি, এখানেই বেশি প্রোগ্রাম করা হয়। তবে কলকাতায় কাজ করতেও ভালো লাগে। ওখানকার কলাকুশলীদের পেশাদারিত্ব মুগ্ধকর। আমাদের এখানে পেশাদার এবং দক্ষ কলাকুশলী অপেক্ষাকৃত কম।

এর কারণ কী হতে পারে?

এর একটা কারণ হতে পারে, এখানে শিক্ষা সমাপ্ত হওয়ার আগেই পারফর্ম করতে চাওয়ার প্রবণতা। শিল্পী হিসেব তৈরি না হয়ে, অর্থাৎ ভালো করে না শিখে মঞ্চে, টেলিভিশনে পারফর্ম করছে অনেকেই। তাই উন্নতি করার সুযোগও কমে যাচ্ছে। শিল্পী কলাকুশলী উভয়ের মধ্যেই এই ব্যাপারটা দেখা যায়। আমাদের এখানেও অনেক গুণী এবং দ্যুতিমান শিল্পী আছেন। কিন্তু না শিখেই পারফর্ম করতে চাওয়াদের দল ভারি।

দুই বাংলায় দর্শকের তারতম্য কেমন?

বাংলাদেশে শুদ্ধ সংগীতের শ্রোতা সীমিত। ঢাকা থেকে কলকাতায় পরিনত দর্শকের সংখ্যা বেশি মনে হয়েছে। আর অবশ্যই সংগীতের সামগ্রিক উন্নতির জন্য এটা খুবই জরুরি। ভালো পরিবেশনার মাধ্যমেই তো ভালো ‘কান’ তৈরি হতে হবে। নবীন প্রবীণ যেই হোক, ভালো শিল্পীদের প্রমোট করতে হবে। তাহলেই ভালো পরিবেশনা এবং উন্নত শ্রোতা বৃদ্ধি পাবে। বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসব যেমন ভালো প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, তাই শাস্ত্রীয় সংগীত নিয়ে সবার আগ্রহও বাড়ছে। কিন্তু পপুলার মিডিয়াতে শুদ্ধ সংগীতের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। এক্ষেত্রে ভাবনা এবং সহযোগীতা উভয়েরই ঘাটতি আছে।

এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আপনি রবীন্দ্রসংগীত চর্চার সঙ্গে জড়িত। এই সময়ের মধ্যে রবীন্দ্রসংগীতের শ্রোতা কি বৃদ্ধি পেয়েছে?

শ্রোতা বেড়েছে ঠিকই। তবে রবীন্দ্রসংগীতের শ্রোতা আগেও খুব বেশি ছিল না এখনও না। রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সংস্থার মতো বিভিন্ন সংগঠনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্টায় রবীন্দ্রসংগীত অনুরাগীর সংখ্যা কিছুটা বাড়ছে।

রবীন্দ্রচর্চা বাড়লেও বলা চলে সেই সীমিত গণ্ডিটাই কেবল বেড়েছে। এই গণ্ডি ভেঙ্গে সাধারণ মানুষের মাঝে রবীন্দ্রসংগীত ছড়িয়ে দিতে হলে কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?

যে সংগঠনগুলো রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে কাজ করছে তাদের মধ্যে উদারতার ঘাটতি থাকতে পারে। আসলে রবীন্দ্রনাথকে ছড়িয়ে দিতে হবে তরুণসহ সব শ্রেণির মানুষের মাঝে। এই জন্যে তাঁর সুর এবং স্বরলিপি অবিকৃত রেখে রবীন্দ্রনাথকে আরও সহজভাবে উপস্থাপন করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

আমাদের লোকগানের মধ্যে যেটা দেখায় যায় যে রিমিক্স’বা ‘ফিউশন’ করার পরে সেটা পুনরায় জনপ্রিয় হচ্ছে তরুণদের মাঝে। রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে এরকম নীরিক্ষা আপনি কেমন চোখে দেখেন?

নতুন সংগীতায়জনে অবশ্যই রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া যাবে। তবে সবার আগে তাঁকে বুঝতে হবে। শিল্পীর বোধের মধ্যে যদি রবীন্দ্রনাথের বাণী ও সুর প্রোথিত থাকে তাহলে মিউজিক কম্পোজিশনে আধুনিকতা আসতেই পারে। অন্যথায় রবীন্দ্রনাথকে বিকৃত করা হবে। কিন্তু না শিখে, রবীন্দ্রনাথকে না বুঝে এটা করে তাহলে সেটা অপপ্রয়াস হবে। গ্রহণযোগ্য হতে হলে অবশ্যই সীমার মধ্যে, পরিমিতির মধ্যে থাকতে হবে।

সামাজিক মাধ্যমে শিল্পীরা এখন নিজেরাই আত্মপ্রচার করতে পারেন। তাতে টেলিভিশনের চেয়ে বেশি মানুষের কাছে পৌছানো সম্ভব। তাদের এই প্রচেষ্টাকে কীভাবে দেখেন?

পরিস্কারভাবেই বোঝা যায় এখানে মান নিয়ন্ত্রণের সুযোগ নেই। যার যেমন ইচ্ছা তেমন করে কিছু একটা করেই সবার সামনে উপস্থাপন করছে। এতে করে যেমন হাস্যকর পরিস্থিতিও তৈরি হয় তেমনি ভালো ভালো কাজ সহজে দেখার সুযোগ পায় মানুষ। তাই ভালোমন্দ দুটি দিকই আছে। সবচেয়ে বেশি জরুরি শিল্পীর দায়বদ্ধতা। নিজেকে উপস্থাপন করতে হলে সবারই উচিত আরও দায়িত্বশীল হওয়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিপরীতে প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ করতে হবে।

বেসরকারি গণমাধ্যমের জন্য এই কাজটি সহজ হলেও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তো এই কাজটি কঠিন।  

কঠিন হলেও বৃহত্তর কল্যাণের কথা বিবেচনা করে এই কাজটি করতে হবে। সৃজনশীল কাজের যে যেটার উপর দক্ষ তাকে সেখানে নিয়োগ করতে হবে। না হলে সঠিকভাবে এর নিয়ন্ত্রন এবং বিপনন সম্ভব নয়। রেডিও হোক, টেলিভিশন হোক ওই বিষয়ে বিষেশজ্ঞ ব্যক্তিকেই নিয়োগ করতে হবে।

এখানে একটি প্রশ্ন চলে আসে। আপনি নিজে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। আবার রবীন্দ্রসংগীত চর্চা করেন। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে এভাবে মিলে যাওয়া কি কাকতাল ছিল?

না। এটি একদমই আমার চাওয়া পাওয়া। ভেতর থেকে চাইলে এবং সততার সঙ্গে চেষ্টা করা যায় তাহলে সবই পাওয়া যায় যদি সেই মেধাটুকু থাকে। তবে এর আগে আমি বিভিন্ন জায়গায় বলেছি যে সরকারি যেসব প্রচার মাধ্যম আছে সেখানে ‘প্রফেশনাল ক্যাডার থেকে কর্মকর্তা নিয়োগ করা উচিত। তাতে বিষয়ভিত্তিক আগ্রহী কর্মকর্তা নির্বাচন করা সম্ভব হবে।

ছাত্রজীবন থেকে আপনার সংগীত চর্চা শুরু। সেই গল্পটা একটু বলবেন?

আমার কাছে ব্যাপারটা খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। কারণ, সংগীত চর্চার জন্য যে পরিবেশ দরকার, আমার পরিবার ছিল তার ঠিক প্রতিকূল। এমনিতে গ্রামে বড় হয়েছি, প্রকৃতির কাছ থেকেই সুর শিখেছি। কিন্তু পদ্ধতিগতভাবে শেখার অবকাশ হয়নি। আমি প্রথম হারমোনিয়াম কিনি অষ্টম শ্রেণির বৃত্তির টাকা দিয়ে। হারমোনিয়াম কিনে সেটা কিন্তু বাসায় তুলতে পারিনি। অন্যের বাসায় রেখে আসতে হয়েছে। চার বছর পর যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম তখন হারমোনিয়ামটা হলে নিয়ে এলাম। এবং প্রথম বর্ষে থাকতেই ছায়ানটে ভর্তি হয়ে গেলাম। তখন থেকেই মূলত পদ্ধতিগতভাবে সংগীতের হাতেখড়ি। আসলে ইচ্ছা এবং একাগ্রতা থাকলে সবই সম্ভব।