প্রদোষে প্রাকৃতজন

শুধু বাংলা সাহিত্যের নয়, প্রদোষে প্রাকৃতজন- এর মতো উপন্যাস বিশ্ব সাহিত্যের সম্পদ। সদ্য প্রয়াত শওকত আলী রচিত এই উপন্যাসটির বিষয়বস্তু ও শৈলী দুদিক দিয়েই অনন্য এক উচ্চতায় পৌঁছেছে। উপন্যাস হিসেবে এর আকার খুব বড় নয়, ২০০ পৃষ্ঠারও কম। কিন্তু এর গভীরতা, ব্যাপ্তি আর ওজনের কারণে এটি হয়ে উঠেছে চিরকালীন বাংলা সাহিত্যর এক মূল্যবান সম্পদে।

উপন্যাসটির গভীরতা এর দর্শনে। চিরায়ত সব প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হয়েছে গতিশীল উপস্থাপনায়। রাজনীতি, অর্থনীতি আর সৃষ্টিতত্ত্ব সমস্ত কিছুই এই উপন্যাসের বিষয় হয়ে উঠেছে। সেগুলো পাতায় পাতায় উঠে এসেছে। আর লেখক প্রতিটি শব্দেই যেন ইঙ্গিত দেন এসবের। প্রতিটি ছত্রই একেকটা গভীর চিন্তার দরজা খুলে দেয়। ফলে আকারে ছোট হলেও এটি হয়ে উঠেছে ওজনে ভীষন ভারি। তথাপি এটি মুহুর্তের জন্যও ছন্দ হারায়নি, অযথা কঠিন হয়ে ওঠেনি। মানূষ প্রাণীটার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সে গল্প শুনতে চায়, বলতে চায়। আর লেখক সেটি করেছেন সুচারুভাবে।

প্রথমেই চোখে পড়ে এর ভাষাশৈলী। ধ্রুপদী সংগীতের মতো এর ছন্দময় ভাষা কারও কারও কাছে কঠিন ঠেকতে পারে, কিন্তু এর ভেতরে প্রবেশ করতে পারলে পাওয়া যায় আকন্ঠ সুধাপানের তৃপ্তি। তবে তার থেকেও বেশী গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ভাষা দিয়ে একটি ঐতিহাসিক উপন্যাসের আবহ তৈরী করা। চৌরাসিয়ার পাহাড়ি ধুন মনোযোগ দিয়ে শুনলে যেমন মনে হয় পাহাড়ি ঝর্ণার কলকল শব্দ টের পাওয়া যাচ্ছে, এই উপন্যাসের ভাষা তেমনি নিয়ে যায় সূদুর অতীতে। ঐতিহাসিক উপন্যাসের যারা ভক্ত, সেইসব বৈশ্বিক পাঠকেরা ওরহান পামুকের মাই নেম ইজ রেড পড়ে একই কারণে বিমুগ্ধ হন। প্রদোষে প্রাকৃতজন পড়ার পর একজন পাঠকের অনুভূতি বলতে গিয়ে তাই পামুকের থেকে শব্দ ধার নিয়ে বলতে হয়, ‘অন্ধ লোকটির সারা মুখ এরকম হাসিতে উদ্ভাসিত হলো, যেন সে তুষারপাত দেখছে।’

ভাষাশৈলী এই উপন্যাসের পাটাতন আর তার ওপরে যত্ন করে সাজানো হয়েছে নৃতত্ব, দর্শন, ইতিহাস। গভীর মানবিকতায় বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে মানুষে মানুষে সম্পর্ক, সভ্যতার সংকট আর মানবজীবনের সুখ-দুঃখের গাথা। সেই গাথা কখনো সামষ্টিক আবার কখনো ব্যাক্তির বোধের গহীনে।

এই উপন্যাসের চরিত্রগুলো আমাদের কালের না, অথচ তাদের সঙ্গে আমাদের জীবনকে মেলাতে কষ্ট হয় না। ঐতিহাসিক উপন্যাস হলেও এতে রাজারাজড়া নেই, বরং পুরোটা জুড়ে আছে সাধারণ মানুষ, তাদের জীবন আর জিজ্ঞাসা। যেমন, বসন্ত দাস। এক কৌতুহলী দুষ্ট ছেলে। পৃথিবীটা, এর মানুষগুলোকে জানার ব্যাপারে তার অসীম আগ্রহ। তাই সে কম বয়সে বেরিয়ে পড়ে। বণিকবৃত্তি নেয়। নানাদেশ ঘুরে নানা অভিজ্ঞতায় তার মনে যেসব প্রশ্ন জাগে সেগুলা যুগে যুগে দার্শনিকরা করেছেন। কার্ল মার্ক্স সমন্ধে যেমনটা বলা হয় যে তিনি মার্ক্সবাদের জন্ম দেননি বরং সেটিকে খুঁজে পেয়েছেন। বসন্তও তেমনি। বণিক বসন্তের মনে ভাবনা জাগে, ‘পথে দস্যু যা হস্তগত করে তা কতটুকু? পক্ষান্তরে নিজ নিজ গৃহেই অপসৃত হয়ে চলছে তাঁরা। গ্রামপতি নেয়, বাজারপুরুষ নেয়, ব্রাহ্মণেরা নেয়- কে তাদের শ্রমলব্ধ অংশ নেয় না? আশ্চর্যের বিষয়, এই চিন্তাটুকু মানুষ করতে চায় না।’ আজকের দিনেও বসন্তের এই চিন্তা প্রাসঙ্গিক। যেমনটা শিল্পী শ্যামাঙ্গের। সে দেবদেবীর মূর্তি গড়ার চেয়ে মানুষের গল্প বলে যে মূর্তি, প্রেমের ইঙ্গিত বয়ে চলে যে মূর্তি, সাধারণ জীবনের চিত্র আকে যে মূর্তি সেটি গড়তে চায়। সে যেন লালনের মতো বলে ওঠে, মানুষ ভজলেই ভগবান পাওয়া যাবে। আবার এই শ্যামাঙ্গই শত বিপদেও বাপ-দাদার ধর্ম ছাড়ে না। প্রেমের অমোঘ টানেও সংস্কার ছাড়তে তার কষ্ট হয়। ওদিকে আজীবন শাস্ত্র পাঠ করা পণ্ডিত সোমজিতের সামনে এসবের অসারতা ভেসে উঠে।

এইসব দার্শনিক প্রশ্নের বাইরেও একেবারে আটপৌরে প্রশ্নগুলো উঠে আসে। বৃদ্ধ বিদেশি বণিক বসন্তকে হতাশ হয়ে বলে, বণিকদের রক্ষা করাই শাসকের কাজ অথচ শাসকদল লিপ্ত শোষণে। আর এর খেসারত যে কেবল গোটা দেশকেই দিতে হয় তা না, শাসকের পতনও হয়ে ওঠে অবশ্যম্ভাবী।

এই প্রদোষকালে নিরঞ্জনের মতো তরুণেরা আবেগী হয়ে উঠলেও মিত্রানন্দের মতো ধীমানেরা সঠিক সময়ের অপেক্ষা করে। এক জীবনে না হলেও মানুষের দীর্ঘকালের সংগ্রাম যাতে সঠিক ধারায় চলে সেটিই তার লক্ষ্যে হয়ে ওঠে। এই দুই দর্শনের টানাপোড়েনও চিরায়ত।

এই উপন্যাসের একটি দারুন দিক হচ্ছে এর শক্তিশালী নারী চরিত্রগুলো। ছায়াবতীর মতো প্রচণ্ড শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব, মন্দিরের নৃত্যকলা পটিয়সীদের সমাজ পরিবর্তনের লড়াইয়ে চরম আত্মত্যাগের পাশাপাশি মাধবীলতার মায়ের মাতৃরুপ।

আর দুই তরুণী মাধবীলতা আর লীলাবতী। অন্তঃস্বত্ত্বা মাধবী বিপর্যয়ের সময় কোনরকম একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়ে কেবল সন্তুষ্ট হয় না, তার স্বামীকে আপন করে পেতে ইচ্ছা হয়। একজন সুচিন্তিত স্থপতি যেমনটা ভাবেন, উপন্যাসিক মাধবীর এই আকুলতার মাধ্যমে বুঝিয়ে দেন খাদ্য আর বস্ত্রের মতো মানুষের আরেকটি মৌলিক চাহিদা হচ্ছে বাসস্থান। আর সেটি কেবল ঘুম আর বিশ্রামের জন্য নয়, এর রয়েছে ‘ব্যাক্তিগত স্থানের’ চাহিদা। অন্যদিকে লীলাবতী সবার উপরে স্থান দেয় প্রেমকে। সংস্কার, বিশ্বাস এসবের বাইরে তাঁর কাছে বড় হয়ে ওঠে ভালোবাসা, সংসার, সন্তান। সে জীবনের বীজকে লালন পালন করে মহীরুহে পরিনত করতে চায়।

এইসব ব্যক্তিগত কাহিনীর আদলে যেমন সামষ্টিক জিজ্ঞাসা উঠে আসে, লেখক তেমনিভাবে সামষ্টিক প্রশ্নও সরাসরি তুলে ধরেন নানা বক্তব্যে। এই মাটির শাসক কে হবে, কে হবেন ধর্মগুরু, কোন বিশ্বাসটি টিকে থাকবে সেগুলো নিয়ে আজকের দিনেও আমরা লড়াই করে যাচ্ছি। খুব সরলভাষায় একজন সুফী সাধক বলে ওঠেন, যে শাসক এই মাটিকে ভালোবাসে একে আঁকড়ে ধরবে, মানুষকে নিজের মনে করবে, সেই হবে দেশের প্রকৃত শাসক। তা সে সনাতন ধর্মের হোক কিংবা একেশ্বরবাদের। আর এই আলাপে উঠে আসে কি করে ইসলাম এই অঞ্চলের মানুষের মাঝে জায়গা করে নেয়।

অথচ ইতিহাসের সেই দুষ্টচক্র বারবার ফিরে আসতে দেখি আমরা। সেই অশান্ত প্রদোষকাল ফিরে ফিরে আসতে দেখি। লেখকের ভাষায়, বরেন্দ্র-বং-সমতটের মানুষগুলো যেন অধীর অপেক্ষায় আছে। কিন্তু কেন সেই অপেক্ষা? কেউ জানে না কিসের অপেক্ষায় দিন গুনছে তারা। লোভ হিংসা প্রতিহিংসা প্রতারণা যুদ্ধ ধ্বংস প্রেম সমস্ত কিছু একাকার হয়ে অপেক্ষায় আছে সেই অনাগত প্রহরটির জন্য।

ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার যেমনটা বলেন, অতীতে বাস করে বর্তমান, বর্তমানে অতীত। উপন্যাসটা তেমনিভাবে অতীত আর বর্তমানের নাগরদোলায় এক দুর্দান্ত ভ্রমণে নিয়ে যায়। আর সেটিই প্রদোষে প্রাকৃতজন-এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। এটি সময়-স্থানের ধারণাকে একাকার করে চিরন্তন হয়ে উঠেছে। শৈলী আর মানবতাবোধের মিশেলে হয়ে উঠেছে এক ধ্রুপদ, চিরন্তন সাহিত্যে। সংজ্ঞানুসারে যাকে আমরা বলি ক্লাসিক। আর তাই এটি হয়ে উঠেছে বাংলা সাহিত্যর অন্যতম সেরা ক্লাসিক।

লেখক: শওকত আলী

প্রকাশক: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউ পি এল)

প্রকাশকাল: ১৯৮৪

মূল্য: ২৬০ টাকা