বাংলাদেশের সংগীত বৈচিত্র্যের অমিত ধারা

বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ বাংলা তার অধিবাসীদের দিয়েছিল যেন দুটি মহত্তম প্রতিশ্রুতি। তার পলিবিধৌত ভূমি দিয়েছিল অফুরন্ত শস্যের দানা। এই ভূমির শরীরে সর্বত্র এঁকেবেঁকে যাওয়া অজস্র নদী, সীমাহীন সবুজ প্রান্তর তার সংগ্রামী মানুষের কণ্ঠে দিয়েছিল বিচিত্র সংগীতের অনন্তধারা। নদীমাতৃক উর্বর ভূমির সবুজ এ দেশ যেন সংগীতের জন্য আদিকাল থেকেই উর্বর। বাংলার সংগীতভাণ্ডার তাই সমৃদ্ধ। বাংলাদেশ গানের দেশ। হিন্দু যুগ থেকেই এ দেশে সংগীত অনুশীলন হয়ে আসছে। গুপ্ত, পাল ও সেন রাজাদের রাজত্বকালে বাংলাদেশে পদ্ধতিগতভাবেই সংগীতের অনুশীলন হতো।

লক্ষণ সেনের সময় সমুদ্র গুপ্তের বীণাবাদনে রাজসভা মূর্ত হতো। তাঁর উচ্চমানের বাদন তখনকার সংগীতসম্রাটদেরও তাঁদের নিজ দক্ষতার বিষয়ে কুণ্ঠিত করত, সে কথা তাম্রশাসনে উল্লেখ আছে। লক্ষণ সেনের দরবারে খ্রিস্টীয় বারো শতকে পদ্মা বাই গান্ধার রাগ পরিবেশন করে সভাকে বিমোহিত করেছিলেন এবং সে সময় দরবারের সংগীতাচার্য কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দ, খাম্বাজ, গান্ধার প্রভৃতি রাগ উপমহাদেশের সর্বত্র গাওয়া হতো। তারই পাশাপাশি বাংলাদেশ তার নিজস্ব একটি সুরের ধারা সর্বকালেই জাগরুক রেখেছিল। এই সুরধারা ‘মনসা মঙ্গলে’ তথা ‘বেহুলা কাব্যে’ বাঙ্গাল রাগ নামে উল্লেখ করা হয়েছে, যা আমাদের কাছে রাগ ভাটিয়ালি নামে পরিচিত। এ উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় সংগীত ইতিহাসে খ্রিস্টীয় দশম থেকে এগারোশ’ শতকে রচিত ‘বজ্রগীতি ও চর্যাগীতি’ উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে আছে। শ্রীচৈতন্য দেবের আবির্ভাবের প্রায় আগেই বাংলা ও পূর্ব ভারতে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ সংকীর্তনের গান (পদ) পটমঞ্জুরি, গুঞ্জরি, ভৈরবী, ধানশ্রী, শবরী, মল্লাবি, বাংলাসহ নানা রাগ-রাগিণীতে পরিবেশন করতেন। চর্যাগীতি ও বজ্রগীতি- এ দুটি বাংলাদেশের নিজস্ব নিবন্ধ-প্রবন্ধ-বৌদ্ধগীতি তথা ক্লাসিক্যাল অভিধানযুক্ত অভিঘাত পদ গান। বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা মিলে বৃহৎ বঙ্গে রামানন্দ ও কবীর দোঁহা এবং সখীর মাধ্যমে সংগীতে এক নবধারা এসেছিল। বৈষ্ণব পদের কৃষ্ণকীর্তন ও কালীকীর্তন-এ দুই ধারা বাংলাদেশের চণ্ডীমণ্ডপগুলোকে মুখরিত রাখত। রাধা-কৃষ্ণের অপার্থিব প্রেমলীলা নিয়ে রচিত পদাবলি কীর্তন, ষোলোশ’ শতকে লীলাকীর্তন গাওয়া হতো রাগের আশ্রয়ে। অন্যান্য অঞ্চলের কীর্তনগীতি থেকে বাংলাদেশের পদাবলি কীর্তন রূপে-রসে-বিকাশে এ অঞ্চলের স্বকীয়তা বজায় রেখেছে। বাংলাদেশের পদাবলি কীর্তন বাঙালি জাতির নিজস্ব সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। তারও আগে গৌরচন্দ্রিকা গাওয়া হতো রাগ, তাল ও ভাবের সমাহারে। বাংলায় গাওয়া হতো রাগাশ্রয়ী বিভিন্ন শ্রেণীর গান। নানা রাগ, তাল, ছন্দ ও লয়ে গাওয়া হতো পালাগান, মনসাগান, পদগান, ঝুমুর, চণ্ডীর গান, রামপ্রসাদি, বাউল, ভাটিয়ালি, জারি, সারি, মারফতি, মুর্শিদি, গম্ভীরা, বারানসি, মণিপুরীসহ নানা ধারার গান। এসব গান ছিল রাগাশ্রয়ী। পূর্ববঙ্গ গীতিকা ও মৈমনসিংহ গীতিকার সংগৃহীত গান বাংলার সমৃদ্ধ সংগীতভাণ্ডারের প্রমাণস্বরূপ। পাল রাজাদের সময়ে (পল্লীগীতি) গ্রাম্যগীতি রচনার প্রমাণ তাম্রশাসনে বা বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়। মুসলমান বিজয়ের আগেই বাংলাদেশের সমাজজীবনে গীতিগাথা ও দোহার আবরণে গীত, বাদ্য ও নৃত্যের সম্মিলনে বিশুদ্ধ সংগীতের প্রচলন ছিল।

এ দেশে মোগল শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বহু আগে থেকেই যে সুফি-সাধকদের আগমনের একটা ধারা প্রবহমান ছিল, তা মোগল আমলেও অব্যাহত ছিল। এসব সুফি সম্প্রদায় বাংলার জনগণের সাংস্কৃতিক জীবনে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করে। বাংলা ভাষায় তাদের মতবাদ প্রচার ও প্রসার লাভ করে এবং এর প্রভাবে বাংলার সংগীত এক ভিন্ন নবচেতনা লাভ করে। গজল ও মুর্শিদি গানে বাংলার নদী-প্রান্তর মুখরিত হয়ে ওঠে। হিন্দুদের সত্যপীর বা সত্যনারায়ণ মাহাত্ম্য এবং মুসলমানদের যোগ কলন্দর- এই দুই কালজয়ী রচনা সুফি প্রভাবেই সম্ভব হয়েছিল।

‘মোগল সাম্রাজের পতনের পর দিল্লি থেকে সেনিয়া কলাবন্ত বাহাদুর খাঁ ও মৃদঙ্গি পীরবক্স বিষ্ণুপুরে কয়েক বছর অধিষ্ঠান করেন। সে সময় থেকেই পূর্ব বাংলায় উচ্চাঙ্গসংগীতের বিকাশ, মোগল আমলের শেষ পর্যায়ে মুর্শিদাবাদ ও ঢাকার নবাবদের সংগীতের যোগাযোগ ছিল। মোগল সম্রাট শাহজাহানের মৃত্যুর পর পলায়নপর শাহ সুজা পূর্ববঙ্গের ঢাকা, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম হয়ে আরাকানে পালিয়ে যান। সে সময় তাঁর পারিষদবর্গের মধ্যে খোদা বক্স নামে একজন সেনিয়া কলাবন্ত ছিলেন। পূর্ব বাংলার কুমিল্লা সংগীতের একটি পীঠস্থান হিসেবে দীর্ঘকাল থেকে পরিচিত। সেখানে উচ্চাঙ্গসংগীতের সূত্রপাত শাহ সুজার পারিষদে থাকা খোদা বক্সের মাধ্যমেই হয়েছিল। ব্রিটিশ রাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর নাটোরের মহারাজের আমন্ত্রণে সেনিয়া ঘরানার শিষ্য সুবিখ্যাত রসুল বক্স সেখানে অবস্থান করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে পূর্ববঙ্গে উচ্চাঙ্গ, ধ্রুপদ ও যন্ত্রসংগীতের প্রকৃত চর্চা শুরু হয় ত্রিপুরার মহারাজ বীরচন্দ্র মানিক্যর দরবারে। তাঁর আমন্ত্রণে প্রখ্যাত সেনিয়া রবাবিয়া কাশিম আলী খাঁ ও তখনকার বাংলার শ্রেষ্ঠ গায়ক ধ্রুপদিয়া বঙ্গনাথ যদুভট্ট ত্রিপুরায় অবস্থান করেন। ওই দু’জন মহাগুণীর আবির্ভাবে পূর্ববঙ্গে কণ্ঠ ও যন্ত্রসংগীতে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। যদুভট্ট পরে কলকাতায় ফিরে যান এবং কাশিম আলী খাঁ ঢাকার অদূরে জয়দেবপুরের রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণের আমন্ত্রণে জয়দেবপুরেই আমৃত্যু থেকে যান। তাঁর অবস্থান ও শিক্ষাগুণে জয়দেবপুর ও ঢাকায় উচ্চস্তরের সংগীত গড়ে উঠেছিল। ঢাকার নবাব আহসানউল্লাহ ও ঢাকার জমিদার ভ্রাতৃদ্বয় রূপলাল দাস ও রঘুনাথ দাসের প্রাসাদে প্রায়ই সংগীত মাহফিলের আয়োজন করা হতো। কাশিম আলী খাঁ ও তাঁর সহযোগী শিষ্য সরোদিয়া ওস্তাদ এনায়েত হোসেন খাঁ ও তাঁর সংগতিয়া তবলিয়া ওস্তাদ আতা হুসেন খাঁ ঢাকার এসব মাহফিলে নিয়মিত যোগদান করতেন। মহারানী ভিক্টোরিয়া ভারতসম্রাজ্ঞী উপাধিতে ভূষিত হন ১৮৭৭ সালের ২ জানুয়ারি। সে উপলক্ষে আমন্ত্রিত হয়ে সরোদিয়া এনায়েত হুসেন খাঁ ও তবলিয়া আতা হুসেন খাঁ সর্বপ্রথম ভারতীয় সংগীতশিল্পী হিসেবে লন্ডন যান। আমন্ত্রিত হয়েও বার্ধক্যহেতু কাশিম আলী খাঁ লন্ডন যাননি। এনায়েত হুসেন খাঁর সংগীত শুনে ব্রিটিশ সংগীতশিল্পীরা খানিকটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, ভারতীয় সংগীতও শ্রোতৃমণ্ডলীকে বিমোহিত করার শক্তি রাখে। ঢাকার নবাব দরবারে সে সময় আচ্ছন বাই ও তাঁর তবলিয়া সুপ্পন খাঁ নিযুক্ত হন। আচ্ছন বাই অতি সুরেলা কণ্ঠের অধিকারী দক্ষ গায়িকা ছিলেন। সুপ্পন খাঁ লক্ষ্ণৌর বিখ্যাত তবলিয়া আবেদ হুসেন খাঁর ঘরানার পূর্বপুরুষ। ঢাকায় তবলা ঘরানার পত্তন হয় প্রধানত আতা হুসেনের প্রধান শিষ্য প্রসন্ন বণিক এবং সাধু ওস্তাদ ও তাঁর দুই পুত্র গোলাপ ও মাহতাবের কীর্তিসূত্রে। প্রসন্ন বণিকের অমরকীর্তি তাঁর রচিত ‘তবলা তরঙ্গিনী’ ও ‘পাখোয়াজ ও মৃদঙ্গ শিক্ষা’ দুটি, যা আজো সংগীতের উচ্চ শিখরে সমাদৃত। ঠিক একই সময়ে কাশিম আলী খাঁর কিছু তালিম নিয়ে নিজ প্রতিভাগুণে কিংবদন্তিতে পরিণত হন সেতারিয়া ভগবান দাস। ঢাকার বসাকদের মধ্যে পাখোয়াজ বাদনের খুবই ভালো চর্চা ছিল। ঢাকার নবাবপুরের বসাকদের কেউ কেউ বিষ্ণুপুরের যদুভট্টের কাছে ধ্রুপদ ধামা তালিম নিয়ে আসেন। তাঁদের মধ্যে আলোচিত ছিলেন হরি কর্মকার। হরি ও মুড়াপাড়ায় জমিদারের নিযুক্ত ইমদাদ হুসেন খাঁ ঢাকাকে গায়নবিদ্যার এক পীঠস্থানে পরিণত করেন। এই নব অনুশীলন ধারার শ্রেষ্ঠ ফসল খেয়ালিয়া ও টপ্পা গায়ক ঢাকার হাসনু মিয়ার শিষ্য হেকিম মোহাম্মদ হোসেন। মোহাম্মদ হোসেন কলকাতার মোরাদ আলী ও ভারতের প্রখ্যাত সংগীতের প্রবাদপুরুষ কালে খাঁ এবং রামপুরের বিখ্যাত তসদ্দুক হোসেনের কাছ থেকে তালিম নেন। সংগীতের সব গুণীর পৃষ্ঠপোষকতায় পূর্ববঙ্গের বেশ কয়েক জমিদার পরিবার অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। ভাওয়ালের জমিদার, মুড়াপাড়ার জমিদার, ঢাকার নবাব পরিবার, ঢাকার রূপলাল ও মধুরানাথ দাসদের অবদান এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। ভারত-বিখ্যাত মহৎ খেয়ালিয়া বীণকার ওস্তাদ কালে খাঁ ছিলেন বিখ্যাত ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁর চাচা। কালে খাঁ ঢাকার কলুটোলায় থাকতেন। তাঁর পরিবারের কয়েকজন ঢাকায় এসে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে নিতে চাইলে তিনি তাদের ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি প্রায় বলতেন, ‘মেরা মুলকমে কদরদান রইস আদমি কাহাঁ হ্যায়। ঢাকাহি মেরে লিয়ে আচ্ছা হ্যায়।’ মুড়াপাড়ার জমিদার দরবারে তিনি দরবারি গায়করূপে ঢাকায় ছয়-সাত বছর অতিবাহিত করেছিলেন। ঢাকা হলো গান ও তালের শহর। তাই ঢাকার লেখক হেকিম হাবিবুর রহমান লিখলেন, ‘ঢাকার জনসাধারণের মাঝে বাংলার অন্যান্য স্থানের চেয়ে এই আকাক্সক্ষা (গান-বাজনার) বেশি রয়েছে এবং সময়ই তাদের আকাক্সক্ষা অব্যাহত রেখেছে।’  গান গাওয়ার জন্য কলকাতা থেকে ঢাকায় আসার আগে ইন্দুবালা কালী দেবীর কাছে প্রার্থনা করলেন, ‘মা, ঢাকা যাচ্ছি, ঢাকা তালের দেশ। তালগান আমার তত রপ্ত নয়। বায়না নিয়েছি যেতে হবে। মান রাখিস মা।’ আর ১৮৪০-এ ইঞ্জিনিয়ার কর্নেল ডেভিডসন ঢাকাবাসীকে আখ্যায়িত করেছেন ‘মিউজিক্যাল পিপল’ হিসেবে।

ঊনিশ শতকের ঢাকার পেশাদার ঢোল বাদন দল

‘লক্ষ্ণৌ শহর বিখ্যাত কণ্ঠসংগীতের জন্য আর ঢাকা তবলা ও সেতারের জন্য। ঢাকার সেতার ও তবলা তার নিজস্ব ঘরানার জন্ম দিয়েছিল।’- আইনজীবী হৃদয়নাথ মজুমদার উল্লেখ করলেন তাঁর স্মৃতিকথায়। ১৯৩৯ সালে ঢাকায় বেতার কেন্দ্র স্থাপন ও পরের বছর তা প্রচার শুরু করলে ঢাকা তথা সমগ্র পূর্ব বাংলায় উচ্চাঙ্গসংগীতের এক নবদিগন্ত খুলে যায়। ভারতের বিভিন্ন স্থানের বহু গুণী ব্যক্তি ঢাকায় যেতে শুরু করেন। ঢাকায় বেতার কেন্দ্র স্থাপন সংগীতজ্ঞ কেশবচন্দ্রের অন্যতম কীর্তি বলা যায়। ঢাকায় উচ্চাঙ্গসংগীতের প্রচার, প্রসার ও প্রভাব লক্ষ্য করে তিনি নিজ উদ্যোগে ব্রিটিশ সরকারকে বুঝিয়ে ঢাকায় বেতার কেন্দ্র স্থাপন করতে রাজি করিয়েছিলেন। ঢাকা ছাড়াও পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশে সংগীতে উচ্চধারার প্রচার ও প্রসারে কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, সিলেট, বরিশাল ও চট্টগ্রামের ভ‚মিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

পূর্ব বাংলায় উচ্চাঙ্গসংগীতের চর্চা ও প্রসার প্রধানত ঢাকা শহরকে কেন্দ্র করে হলেও ময়মনসিংহ জেলায় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগেই উচ্চাঙ্গসংগীতের চর্চা শুরু হয়েছিল। উচ্চাঙ্গসংগীতের প্রসারে বৃহৎ জেলা ময়মনসিংহের রাজ এস্টেটের জমিদার মহারাজ শশীকান্ত আচার্য সংগীতানুরাগী ও বিদ্যোৎসাহী ছিলেন। তাঁর দরবারে খেয়ালিয়া পণ্ডিত বজরঙ্গ মিশ্র, রামপুরের প্রখ্যাত তবলিয়া ওস্তাদ মসিৎ খাঁ, কেরামতুল্লাহ খাঁ, জিয়ন খাঁ অধিষ্ঠিত ছিলেন। মুক্তাগাছার জমিদার কুমার জিতেন্দ্রকিশোরের সংগীত সাধনা, সংগীতজ্ঞানের জন্য বিশেষ পরিচিতি ছিল। তাঁর দরবারে রামপুরের প্রখ্যাত খেয়ালিয়া খৈরুদ্দিন খাঁ ও মহম্মদ দীন খাঁ অধিষ্ঠিত ছিলেন। জিতেন্দ্রকিশোর বারানসির প্রখ্যাত তবলিয়া পণ্ডিত মৌলভী রামমিশ্রকে তাঁর দরবারে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। জিতেন্দ্রকিশোর ভারতীয় উচ্চাঙ্গসংগীতের বিভিন্ন রূপরীতির ও রচনার সংগ্রাহক হিসেবে বিখ্যাত হয়েছিলেন। তৎকালীন ভারতের বিখ্যাত ও বিরল সংগীত মহাসম্মেলনের প্রায় সব কটিতেই তিনি বিচারক হিসেবে আমন্ত্রিত ছিলেন। ময়মনসিংহের গৌরীপুরের রাজপরিবারের উচ্চাঙ্গসংগীতের প্রচার ও প্রসার বিষয়ে তাঁদের অবদান সারা ভারতেই বিরল। গৌরীপুরের রাজদরবারে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন সেকালের বিখ্যাত সেতারবাদক ওস্তাদ ইনায়েৎ হুসেন খাঁ এবং বিখ্যাত ওস্তাদ মহম্মদ আলী খাঁ। ময়মনসিংহ জেলার এসব কৃতী জমিদার সংগীতচর্চা ও প্রসারে সাংগীতিক দলিলপত্রাদির সংগ্রহ ও রক্ষণের এক মহৎ উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

কুমিল্লার ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংগীতের ক্ষেত্রে বিখ্যাত হয়েছিল সংগীতসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁর জন্মস্থান এবং তাঁর পরিবারের সংগীতের ক্ষেত্রে অবদানের জন্য। সারা উপমহাদেশে যন্ত্রসংগীতের ক্ষেত্রে এই পরিবারের অবস্থান ছিল শীর্ষে। একই পরিবারের এত প্রথিতযশা যন্ত্রশিল্পীর আবির্ভাব খুবই বিরল। ভারতীয় সংগীতকে সর্বপ্রথম বিশ্বের কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কৃতিত্ব তাদেরই। তাঁর পুত্র ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ (সরোদ), জামাতা পণ্ডিত রবিশঙ্কর (সেতার), কন্যা রওশন আরা বেগম ওরফে অন্নপূর্ণা (সেতার ও সুরবাহার) ও ভ্রাতুষ্পুত্র ওস্তাদ বাহাদুর খান (সেতার ও সরোদ) সংগীতজগতে উজ্জ্বল হয়ে আছেন।

বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী ও বরিশালও উচ্চাঙ্গসংগীত চর্চায় রেখেছিল উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিখ্যাত সুরেন্দ্রলাল দাসের উদ্যোগে তিরিশের দশকের শেষের দিকে চট্টগ্রামে প্রথম সংগীত মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সংগীত মহাসম্মেলন সে সময়ে যথেষ্ট আলোচিত হয়েছিল। এই সংগীত সম্মেলনের পর চট্টগ্রামের গুরুত্ব সংগীতজগতে যথেষ্ট বেড়ে যায়। এর ফলে ওস্তাদ আবদুল করিম খাঁ, গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তী, ওস্তাদ মুশতাক আলী খাঁ, পণ্ডিত রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, রাধিকামোহন মৈত্র, গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, বীরেন্দ্রকিশোর সংগীত পরিবেশনে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। নদীবিধৌত জেলা বরিশালের বীণকার শ্রী বিষ্ণুপদ ভট্টাচার্য পূর্ববঙ্গে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। বরিশালের তারাপদ চক্রবর্তী, সে সময়ে তাঁর মতো সুকণ্ঠ গায়ক খুবই বিরল ছিল। শীতল চন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন বিখ্যাত এস্রাজবাদক, ধ্রুপদ গায়ক বিপিনচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নামও উল্লেখযোগ্য। অন্য জেলা শহরগুলোও উচ্চাঙ্গসংগীত চর্চায় রেখেছিল উল্লেখযোগ্য অবদান।

এই উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের সংগীতধারা ও রীতি থেকে তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের সংগীতধারা ও রীতি আবহমান কাল থেকেই বৈচিত্র্যপূর্ণ। নদীমাতৃক এ দেশে শত স্রোতধারায় যুগ যুগ ধরে যে কত রকমের গীত রীতির প্রচলন রয়েছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নানা সংগীতধারা যুগে যুগে এই ভাণ্ডারকে করেছে বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ। এত বিবিধ সংগীতধারা প্রমাণ করে, বাঙালি জাতি তার স্বকীয় প্রতিভার বিশুদ্ধ সংগীতের অনুশীলন আদিকাল থেকেই করে আসছে।