বীরের দেশে বলী

বীরের দেশ চট্টগ্রাম। সৌন্দর্য, স্থাপনা, ঐতিহ্য, প্রকৃতি, সমুদ্র, পাহাড়, বন্দর, বাণিজ্য, সুর-সঙ্গীত, সাহিত্য, সংস্কৃতি সবকিছুর মিশেলে এক অনন্য সুন্দর বিভাগ। এই অঞ্চলেই ১৯০৯ সালে আবদুল জব্বার সওদাগর নামের চট্টগ্রামের বদরপতি এলাকার একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ব্রিটিশদের শাসন, বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে তরুণদের একীভূত করতে একটি খেলার আয়োজন করেন, যার নাম কুস্তি বা বলীখেলা।

‘বলী’ শব্দটি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা। কুস্তি শুনতে প্রমিত শোনালে আঞ্চলিকতার প্রভাবে তা বলীখেলায় নামান্তরিত হয়েছে। এই খেলার সূচনা ব্রিটিশদের শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হলেও এখন তা উৎসবে পরিণত হয়েছে। এই সময়ের অনেকেই এখন আগের ইতিহাস জানেন না। এই উৎসবকে ঘিরে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘির ময়দান ও এর আশেপাশে বিশাল এলাকাজুড়ে মেলা বসে।

প্রতিবছর ১২ বৈশাখ আবদুল জব্বারের বলীখেলা হলেও তিন দিনের লোকজ মেলা শুরু হয় ১১ বৈশাখ থেকে। মেলার প্রধান আকর্ষণ বলীখেলা। প্রতিবছর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, টেকনাফ, টাঙ্গাইল, কুমিল্লাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বলীরা বলী ধরতে আসেন। তাদের দেখতে যেমন দর্শনার্থীদের ভিড় থাকে তাদের বলীখেলা উপভোগ করার জন্যও হাজার হাজার দর্শনার্থী ভিড় জমায়।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন বলেন, ‘ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছাড়াও বার্মার আরাকান অঞ্চল থেকেও নামীদামী বলীরা এ খেলায় অংশ নিতে চট্টগ্রাম আসতেন। দেশ বিভাগের আগে একবার এক ইংরেজ গভর্নর সস্ত্রীক আবদুল জব্বারের বলীখেলা দেখতে এসেছিলেন বলে জানা যায়। আবার ১৯৬২ সালে দু’জন ফরাসি মল্লবীর আবদুল জব্বারের বলীখেলায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। এখন বিদেশ থেকে কোনো বলী না এলেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিবছর জব্বারের এ বলীখেলায় অংশ নেয় অর্ধশত বলী।’

অবশ্য চট্টগ্রামে বলীদের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। এই শহরটিকে বলা হয় বীরের শহর। বলী থেকেই এই বীর উপাধি পেয়েছে চট্টগ্রামবাসী। এখানকার মানুষ দৈহিকভাবে শক্তিশালী। প্রাকৃতিক বা জিনগত কারণে পেশিশক্তি বহুল মানুষ এই অঞ্চলে বেশি জন্মগ্রহণ করেন। প্রচণ্ড দৈহিক শক্তির অধিকারী মল্ল বা বলীরা সুঠামদেহী সাহসী পুরুষের অধিকারী ছিলেন। বংশানুক্রমিকভাবে এদের শারীরিক কসরত প্রদর্শন ছিল পছন্দের কাজ।

চট্টগ্রামের ২২টি মল্ল পরিবারের রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাসও। এই অঞ্চলে কর্ণফুলী ও শঙ্খ নদীর মধ্যবর্তী স্থানের ঊনিশটি গ্রামে মল্ল বা পালোয়ান উপাধিধারী মানুষের বসবাস ছিল। পটিয়ার আশিয়া গ্রামের আমান শাহ মল্ল, আনোয়ারা চাতুরি গ্রামের চিকন মল্ল, বাঁশখালীর কাতারিয়া গ্রামের চান্দ মল্ল, জিরি গ্রামের ঈদ মল্ল ও নওয়াব মল্ল, পারি গ্রামের হরি মল্ল, পেরলা গ্রামের নানু মল্ল, পটিয়ার হিলাল মল্ল ও গোরাহিত মল্ল, হাইদগাঁও গ্রামের অলি মল্ল ও মোজাহিদ মল্ল, শোভনদণ্ডী গ্রামের তোরপাচ মল্ল, কাঞ্চননগরের আদম মল্ল, ঈশ্বরখাইনের গনি মল্ল, সৈয়দপুরের কাসিম মল্ল, বোয়ালখালী পোপাদিয়ার যুগী মল্ল, খিতাপচরের খিতাপ মল্ল, ইমামচরের ইমাম মল্ল, নাইখাইনের বোতাত মল্ল, মাহাতার এয়াছিন মল্ল, হুলাইনের হিম মল্ল, গৈরলার চুয়ান মল্লরা বসবাস করতো। ওইসময় এই মল্লবীরেরাই ছিলেন বলীখেলার প্রধান আকর্ষণ এবং বলীখেলা আয়োজনের মূল অনুপ্রেরণাও। সময়ের সাথে সাথে এইসব মল্ল বা বলীরা এখন হারিয়ে গিয়েছে।

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আবদুল জব্বারের বলীখেলার ১০৯তম আসর বসে লালদীঘির ময়দানে। ১০২জন বলী নিবন্ধন করলেও ৮৬জন বলী খেলায় অংশ নেন। এর মধ্যে ৭৮ জন ছিলেন শৌখিন বলী। বাকি আটজন সরাসরি চ্যালেঞ্জ রাউন্ডে খেলেন।

বিভিন্ন রাউন্ড পেরিয়ে প্রায় হাজার দশেক দর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে ফাইনাল খেলেন কুমিল্লার শাহজালাল বলী এবং কক্সবাজারের চকরিয়ার জীবন বলী। চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে হাজার হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে করতালি ও ঢাকঢোলের বাদ্য-বাজনার তালে তালে উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশে বলীখেলার ফাইনাল পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। লালদীঘি মাঠে বলীখেলার উদ্বোধন করেন সিএমপির ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কমিশনার মো. মাসুদুল হাসান। প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।

বলীর জন্য ১৫ মিনিট নির্ধারিত সময়ে খেলা শেষ না হওয়ায় খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। বাড়তি সময়ের মাত্র ১ মিনিটের মধ্যে জীবন বলী কুমিল্লার শাহজালাল বলীকে হারিয়ে দেন। জীবন বলীর পুরো নাম তারিকুল ইসলাম জীবন। নয় বছর যাবৎ বলী খেলছেন জীবন। স্বপ্ন ছিল জব্বারের বলীখেলায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার। এবার সে স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তারিকুল ইসলাম জীবন বলীর জীবনযাপন খুবই সাদামাটা। কক্সবাজারের চকরিয়ায় ফুড কর্ণার নামে একটি দোকান চালান জীবন। সেই আয় দিয়ে তার সংসার চলে।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন চ্যাম্পিয়ন জীবন বলীকে বিজয়ের মুকুট পরিয়ে দেন। জীবন বলীকে নগদ ২০ হাজার টাকা এবং চ্যাম্পিয়ন ট্রফি তুলে দেয়া হয়। রানারআপ শাহজালাল বলী পান নগদ ১৫ হাজার টাকা ও একটি ট্রফি।

এইবার অবশ্য দিদার বলী বলী ধরতে আসেননি। ১০৮ তম আসরসহ ১৩ বারের চ্যাম্পিয়ন কক্সবাজারের রামুর দিদার বলী বর্তমানে অবসরে। বার্ধক্যের কারণে তিনি বলীখেলা থেকে অবসর নেন।

১৯০৯ সালে শুরু হওয়া বলীখেলা চলছে এখনো পর্যন্ত। সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে চট্টগ্রামের এই ঐতিহ্যের কথা, সংস্কৃতির কথা, গোটা বাংলাদেশের কথা তুলে ধরা হবে, এই আশা গোটা চট্টগ্রামবাসীর।