মুক্তিযুদ্ধ আমার দেখা সবচেয়ে বড় ঘটনা

বাংলাদেশের বিকল্প ধারার অন্যতম চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেল। এই পর্যন্ত তিনি ৬টি কাহিনি চলচ্চিত্র, ১টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও ১৪টি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। বিষয় বা আধারের বিবেচনায় প্রতিটি চলচ্চিত্রিই তাৎপর্যপূর্ণ। বিষয় হিসেবে তিনি যেমন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোকে নির্বাচন করেছেন, তেমনি সমসাময়িক সংকটগুলোকেও তিনি এড়িয়ে যাননি। কাজ করে যাচ্ছেন এখনো। সম্প্রতি তিনি দেশভাগের উপর দীর্ঘ পরিসরে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন- সীমান্তরেখা। কাজ করছেন ভাষা আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র ও দেশভাগের উপর কাহিনি চলচ্চিত্র রূপসা নদীর বাঁকে নির্মাণে। তার এই সুদীর্ঘ চলচ্চিত্রযাত্রা নিয়ে কথা বললেন বেঙ্গল বারতার সঙ্গে।

আপনি এখন পর্যন্ত সাতটি কাহিনিছবি বা ফিকশন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। এর মধ্যে দুটি কাহিনি দেশীয় সাতিহ্যকর্ম থেকে গ্রহণ করেছেন, আর দুটির কাহিনি-কাঠামো নিয়েছেন বিশ্বসাহিত্যের দুটি ধ্রুপদী সাহিত্যকর্ম থেকে। তবে শেষোক্ত দুটির কাহিনি-কাঠামোটা গ্রহণ করলেও, সে কাঠামোকে ভিত্তি করে কাহিনি দুটো মূলত আপনারই রচনা। সে অর্থে সাহিত্য থেকে আপনার নির্মিত চলচ্চিত্র হচ্ছে স্বল্পদৈর্ঘ্য হুলিয়া আর সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাস থেকে পূর্ণদৈর্ঘ্য লালসালু। চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্যে এই সাহিত্যকর্ম দুটিকে আপনি ঠিক কী কারণে নির্বাচিত করেছিলেন?

মূলত বিষয়বস্তুর কারণে। প্রথমে হুলিয়া-র কথা বলি। হুলিয়া ছবিতে যে যুবকটির কথা বলা হয়েছে, যে ট্রেনে ট্রেনে ঘোরে, যার পেছনে পুলিশের গোয়েন্দা ঘুরছে, তরুণ বয়সে আমাদের বামপন্থী সংগঠন করার ও কাছাকাছি জীবনযাত্রার কারণে যুবকটিকে আমি সহজেই চিহ্নিত করতে পারতাম। ‘হুলিয়া’কবিতাটিও আমার খুব প্রিয় ছিল। হুলিয়া ছবিটি তৈরি করার তাৎক্ষণিক কারণ ছিলো সে সময় দেশে চলমান সামরিক শাসন। একটা দমবন্ধ করা পরিবেশ তখন। ‘হুলিয়া’কবিতার প্রেক্ষাপট যদিও পাকিস্তান আমলে ষাট দশকের জেনারেল আইয়ুবের সময়কাল, কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে জেনারেল জিয়া বা জেনারেল এরশাদের সময়কাল তো তা থেকে খুব একটা আলাদা ছিলো না। আমি দেখাতে চেয়েছিলাম যে স্বৈরাচারের রূপ যুগে যুগেই এক এবং সমাজপ্রগতির সংগ্রাম খুব সুদীর্ঘ এক সংগ্রাম। ‘হুলিয়া’ কবিতাটিতে এসব বক্তব্য তুলে ধরার খুব ভালো সুযোগ ছিলো। আর তাৎক্ষণিক কারণ ছিলো বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে প্রথম যে ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স হয়েছিলো সেটা। ওই কোর্সে আমাদের চিত্রনাট্যের ক্লাস নিয়েছিলেন সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকী। তিনি আমাদের ‘হুলিয়া’কবিতাটির চিত্রনাট্য লিখতে দেন। চিত্রনাট্য লেখার সময় আমি লক্ষ্য করি কবিতাটির চিত্রকল্পগুলো খুবই জীবন্ত ও আমাদের ইতিহাসের জন্যে খুবই অর্থবহ। তখন আমি কবিতাটি নিয়ে একটা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।

লালসালু ছবিটা তৈরির ক্ষেত্রে বিষয়টা ছিল যে দেশে ইসলামী মৌলবাদ যে হারে বাড়ছিল তাতে ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে একটা ছবি তৈরি করার কথা আমি ভাবছিলাম। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, সিসিফাস ও উপন্যাসে ঐতিহ্যজিজ্ঞাসা নামে সাহিত্য-সমালোচনামূলক আমার একটা বই আছে। ওই বইটা লিখতে গিয়ে লালসালু উপন্যাসটি আমাকে বহুবার পড়তে হয়েছে। উপন্যাসটির মাঝে যে অপার চালচ্চিত্রিক সম্ভাবনা আছে এটা আমি তখন আবিষ্কার করি। আমার ছবির জন্যে চিত্রনাট্যের কাহিনি মূলত আমি নিজেই লিখি। কিন্তু যেহেতু ধর্মীয় কুসংস্কার ও ইসলামী মৌলবাদের বিরুদ্ধে লালসালু-র মতো শক্তিশালী একটা উপন্যাস আমাদের সাহিত্যে রয়েছে, তাই আমি ছবিটার জন্যে আলাদা কোনো গল্প লেখার প্রয়োজন দেখিনি। লালসালু উপন্যাসকেই চলচ্চিত্রায়িত করাটা যথার্থ মনে করেছি।

লালসালু সিনেমায় মজিদ চরিত্রে রাইসুল ইসলাম আসাদ

লালসালু-র চলচ্চিত্রায়নের কপিরাইট তো প্রথমে নিয়েছিলেন শাজাহান চৌধুরী। কিন্তু তিনি নির্মাণ করতে পারেননি। পরে আপনি চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন। ঘটনাটা কি একটু বিস্তারিত বলবেন?

আগেই বলেছি, আমি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপর সাহিত্য-সমালোচনামূলক একটা বই লিখেছিলাম। তখনই আসলে আমি লালসালু উপন্যাসটি নিয়ে একটা চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে মনস্থির করি। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর বইগুলির স্বত্ব তখন দেখতেন তার বন্ধু সানাউল হক। আমি সানাউল হকের সঙ্গে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করলে উনি আমাকে বলেন যে কিছু দিন আগে শাজাহান চৌধুরী নামের একজনকে উনি লালসালু-র চিত্রস্বত্বটি দিয়েছেন। তখন আমি শাজাহান চৌধুরীর কাছ থেকে লালসালু-র চিত্রস্বত্বটা কিনে নিই।

হ্যামলেট থেকে নদীর নাম মধুমতী আর সফোক্লিসের অ্যান্টিগনে থেকে নির্মাণ করেছেন রাবেয়া। এই মিথস্ক্রিয়ার কারণ কি আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে এক ধরণের ধ্রুপদী সাহিত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে যাচাই করার আকাঙ্ক্ষা, নাকি অন্য কিছু?

যে কোনো চলচ্চিত্রকার চাইবেন তার শিল্পকে কালের সীমা ছাড়িয়ে একটা চিরন্তন রূপ দিতে বা আপনি যে রকম বলেছেন সেই ক্ল্যাসিক বা এপিক রূপ দিতে। এখন সেরকমটি করতে প্রয়োজন একটা বড় প্রেক্ষাপট, যে প্রেক্ষাপটে আপনি আপনার ছবির ঘটনাকে, চরিত্রদেরকে ও চরিত্রদের অন্তর্দ্বন্দ্বকে সাজাবেন। সে বিশাল চালচিত্রটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যথেষ্টই ছিলো। ত্রিশ লক্ষ মানুষের নিহত হওয়া, প্রায় দুই লক্ষ নারীর ধর্ষিত হওয়া, প্রায় এক কোটি শরণার্থীর প্রতিবেশী ভারতে আশ্রয় নেওয়া- মুক্তিযুদ্ধের সব ঘটনাই তো মহাকাব্যিক। তো মুক্তিযুদ্ধের সেই সুবিশাল এপিক চালচিত্রের প্রেক্ষাপটে আমি হ্যামলেটের আদলে তরুণ মুক্তিযোদ্ধা বাচ্চুর অন্তর্দ্বন্দ্বটাকে তুলে ধরতে চেয়েছিলাম। সে কি তার রাজাকার চাচাকে হত্যা করবে নাকি করবে না? দেশ বড় না রক্তের সম্পর্ক বড়? শেষে অবশ্য বাচ্চুর কাছে তার দেশপ্রেমই বড় হয়। সে তার রাজাকার চাচাকে হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের পথ ত্বরান্বিত করে। ফলে বলতে পারেন যে একটা ক্ল্যাসিক বা এপিকে রূপ দেবার চেষ্টা নদীর নাম মধুমতীতে ছিলো।

একটা লোকজ গীতিময়তা বা লিরিক্যাল রূপ দেবার চেষ্টাও ছিলো। যে সব সংগীত বা সংগীতাংশ নদীর নাম মধুমতী ছবিটার আবহসংগীতে ব্যবহার করা হয়েছে সেসবে বাংলার ওই লোকজ রূপটা তুলে ধরতে চেয়েছিলাম। আমাদের গ্রামবাংলা এত সুন্দর যে এপিক রূপ দিতে চাইলেও কোনো ‘শুষ্কং কাষ্ঠং’ ক্ল্যাসিক আমরা করতে চাইনি। গীতিময়তার এ বাংলায় ঘটে যাওয়া এক এপিক দ্বন্দ্বের রূপায়ণের চেষ্টা ছিল ছবিটিতে। তবে আমাদের তো কোনো টাকা-পয়সা ছিলো না। ফলে সম্পদের অভাব, এবং বিশেষ করে সেনাবাহিনী, বিডিআর, পুলিশ কারও সহায়তা না পাওয়ায় ছবিটির অ্যাকশন দৃশ্যগুলি খুবই দুর্বল রয়ে যায়। অনেক কিছুই আমরা আমাদের ইচ্ছানুযায়ী করে উঠতে পারিনি।

আর রাবেয়ার ক্ষেত্রে সফোক্লিসের অ্যান্টিগনের যে দ্বন্দ্ব, যে প্রিয়জনের মৃতদেহের সৎকারের মানবিক কর্তব্য ও রাষ্ট্রশক্তির আদেশ, এ দুই দ্বন্দ্বের মাঝে মানবিক কর্তব্যবোধ ও ভালবাসাই যে বড়, পাকিস্তান সেনাবাহিনির আদেশকে উপেক্ষা করে রাবেয়া কর্তৃক তার ভাইয়ের লাশ কবর দেওয়ার চেষ্টার মাঝে তা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। ছবিটিতে তাই একটা ক্ল্যাসিক বা এপিক দ্বন্দ্বের এই রূপটি আছে।

রাবেয়া চলচ্চিত্রে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন বন্যা মির্জা

মুক্তিযুদ্ধকে বিষয় করে আপনি বেশ কটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, দেশভাগ নিয়ে বানিয়েছেন চিত্রা নদীর পারে। সম্প্রতি তৈরি করেছেন প্রামাণ্যচিত্র সীমান্তরেখা। এই যে আপনার অধিকাংশ কাজেই বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের গল্প বলেছেন, তার কারণ কী? আপনি একটা সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা অনুভব করেন বলে এই উপস্থাপন, নাকি এটা আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি উপস্থাপনের প্রয়াস?

একজন শিল্পী সেটাই আঁকতে চাইবেন, যা তার অভিজ্ঞতা বা জানাশোনার মধ্যে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ আমি প্রত্যক্ষ করেছি। বলতে পারেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে বড় ঘটনা। তখন বয়স কম। সংবেদনশীল ছিলাম। আর ওই বয়সে মানুষ যা দেখে বা যে সব অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যায় সারা জীবন সে সবের ছাপ তার মনের ভেতরে রয়েই যায়। তাই আমি যখন কোনো ছবি তৈরি করার কথা ভাবি কিংবা চিত্রনাট্য লিখি তখন ১৯৭১-এর দেখা বা শোনা কোনো ঘটনা বা বিষয়ের কথাই প্রথমে মনে পড়ে।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে, যেটা আগে বলেছি যে, যে কোনো শিল্পীই চাইবেন তার শিল্পকর্মকে, তার চরিত্রগুলোকে কোনো মহাকাব্যিক বা এপিক চালচিত্রের প্রেক্ষাপটে উপস্থিত করতে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আমাকে সে মহাকাব্যিক চালচিত্রটা জুগিয়েছে। নদীর নাম মধুমতীতে তরুণ মুক্তিযোদ্ধা বাচ্চুর অন্তর্দ্বন্দ্ব, রাবেয়াতে ভাইয়ের লাশ কবর দেওয়ার দায়বদ্ধতা কিংবা জীবনঢুলীর দরিদ্র ঢাকী জীবনকৃষ্ণ দাসের যে জীবন সংগ্রাম সে তো কেবল একাত্তরের মতো এপিক প্রেক্ষাপটের কারণেই সম্ভব হয়েছে। চরিত্রদের এসব দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তোলার জন্যে মুক্তিযুদ্ধের মহাকাব্যিক প্রেক্ষাপটটি যে কোনো শিল্পীকে আকর্ষণ করবে। আমাকেও করেছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভ্যুদয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চারটি ঘটনার তিনটি নিয়েই আপনি কাজ করেছেন। কিন্তু ভাষা আন্দোলন নিয়ে এখনও কোনো কাজ আপনি করেননি। এর কারণ কী?

আমার একাধিক প্রামাণ্যচিত্রে ভাষা আন্দোলনের বিষয়টি এসেছে- ১৯৭১তে, স্বপ্নভূমিতে। আর আপনার জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, আমি ভাষা আন্দোলনের অন্যতম এক আদি পুরুষ শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উপর একটা প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করছি। এ ছবিটাতে ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনের বিষয়টি খুব বড় করে আসবে।

সীমান্তরেখা মূলত সাতচল্লিশের দেশভাগের উপর নির্মিত হলেও তাতে শিকড়চ্যুত নিজ বাসভূমি থেকে উৎখাত হওয়া মানুষদের বিষয়টি উঠে এসেছে। স্বপ্নভূমিও অনেকটা সেই ধরণের মানুষদের নিয়েই কাজ। এই প্রামাণ্যচিত্রের উপজীব্য মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে বাংলাদেশে আটকে থাকা বিহারীরা, যাদেরকে পাকিস্তানও গ্রহণ করেনি, বাংলাদেশও নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করেনি। কর্ণফুলীর কান্নায় যে পাহাড়িদের দেখা পাওয়া যায়, তারাও যেন অনেকটা তেমনই চরিত্র, নিজ দেশে তারা প্রথম শ্রেণীর নাগরিক হতে পারছেন না। এই যে বিশেষ এক শ্রেণীর বিভিন্ন জাতির মানুষের গল্প আপনি বারবার করে বলছেন, সেটা কি কোনো সচেতন বোধ বা জায়গা থেকে? নাকি বলতে বলতেই বারবার তাদের কথা চলে আসছে?

সাতচল্লিশের দেশভাগ আমাকে তাড়িত করে। আমি মনে করি আমাদের আজকের অনেক রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যার মূল হচ্ছে ১৯৪৭-এর দেশভাগ। দেশভাগের ফলে যে লক্ষ লক্ষ পরিবারকে তাদের জন্মভূমির ভিটেমাটি ছেড়ে উদ্বাস্তু হয়ে আরেক দেশে যেতে হয়েছে এ বিষয়টি আমাকে খুবই ব্যথিত করে। দেশ তো কেবল একটা রাষ্ট্রের নাম নয়। দেশ হচ্ছে জন্মভূমি। আমি যেখানে জন্মেছি, বড় হয়েছি, সেই ছোট শহর বা গ্রামটি, গ্রামের পাশের নদীটি, আমার স্কুল, আমার প্রতিবেশিরা, গাছপালা, প্রকৃতি, এই সব নিয়েই দেশ। ১৯৪৭ সালে কোনো রাজনৈতিক বা রাজনৈতিক সংগঠনের এই ক্ষমতা থাকা উচিৎ ছিলো না যে তারা বলতে পারবে- না, এটা তোমার দেশ নয়, তোমার দেশ ওইখানে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সাতচল্লিশ সালে ঠিক সেটাই ঘটেছিল এবং লক্ষ লক্ষ পরিবারের জীবনে নেমে এসেছিলো চরম বিপর্যয়। একজন শিল্পী হিসেবে, একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে তা আমাকে খুবই ব্যথিত করে। দেশভাগ নিয়ে আমি আগে একটা কাহিনিচিত্র তৈরি করেছিলাম- চিত্রা নদীর পারে। এরপর প্রায় তিন বছর গবেষণা ও শুটিং করে আমি এই সীমান্তরেখা প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণ করি। এই ছবিতে আমি বুঝতে চেয়েছি এই যে র‌্যাডক্লিফ লাইন, এ কি কেবল ভারত ও বাংলাদেশ দুই স্বাধীন রাষ্ট্রের মাঝের তারকাঁটার বেড়া, নাকি এটা হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যেকার বিভাজন রেখা, নাকি পূর্ববঙ্গ আর পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের মাঝে আচরণগত যে সব পার্থক্য আছে তাই-ই? নাকি আমাদের মনোজগতে বিভেদের এমন কোনো অদৃশ্য সীমান্তরেখা রয়েছে যা আমাদের মিলতে দেয় না। সীমান্তরেখা ছবিটি সেটা বুঝতে চাওয়ারই এক চেষ্টা।

নদীর নাম মধুমতি চলচ্চিত্রের স্থির চিত্র

আর স্বপ্নভূমি ছবিটার বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের উর্দূভাষী মুসলমানদের নিয়ে। ১৯৪৭-এ পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর এরা বিহার ছাড়াও কলকাতা শহর, উত্তর প্রদেশ, এমন কী সুদূর হায়দ্রাবাদ থেকেও এদেশে এসেছে। যদিও বাঙালিরা এসব উর্দুভাষী মুসলমানদের সবাইকেই ‘বিহারী’ বলে, তবে তারা বিহার ছাড়াও ভারতের নানা জায়গা থেকেই এসেছে। এরা জিন্নাহর ভুয়া দ্বি-জাতি তত্ত্বের সবচেয়ে দুঃখজনক শিকার। এই বিহারীরা ইতিহাসের এক ভাগ্যাহত জাতি এবং দুর্ভাগ্যতাড়িত এক বিরল জনগোষ্ঠী, যারা দুই-দুইবার রাষ্ট্রচ্যুত হলো, ১৯৪৭-এ একবার, ১৯৭১-এ আরেকবার। পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর অনেক আশা নিয়েই তারা তাদের তৎকালিন স্বপ্নভূমি পাকিস্তান তথা পূর্ব-পাকিস্তানে এসেছিল। তাদেরকে অনেক রকম প্রলোভন দেওয়া হয়েছিল। তাছাড়া সে সময় বিহারে ভয়াবহ দাঙ্গা হয়েছিল। ফলে বিহারে মুসলমানদের থাকাটাও নিরাপদ ছিল না। তাই তারা পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। কিন্তু পাকিস্তান শাসকেরা বরাবরই, এই মূলত শিক্ষাহীন ও নেতৃত্বহীন উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীটাকে, বাঙালিদের আন্দোলন-সংগ্রামের বিরুদ্ধে লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করেছে। ১৯৭১-এ তা চরমে পৌঁছায়। এ সময় তারা পাকিস্তান সেনাবাহিনির সঙ্গে মিলে বাঙালিদের বিরুদ্ধে গণহত্যাতে অংশ নেয়। নিজেরাও অনেক ক্ষেত্রে গণহত্যার শিকার হয়। সে ছিল এক ভয়াবহ সময়কাল! বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বিহারীদেরকে মোহাম্মদপুর, মিরপুর, সৈয়দপুর, রংপুর, খুলনার খালিশপুর ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় ক্যাম্পে রাখা হয়। আজ এত বছর ধরে তারা ক্যাম্পেই বসবাস করছেন। তাদের কথা কেউ তেমন বলে না। সত্যিকারের এক ভাগ্যহীন জাতি বাংলাদেশের এই উর্দুভাষী বিহারীরা। আমি তাই বিহারীদের নিয়ে স্বপ্নভূমি ছবিটা বানাতে চেয়েছিলাম, যে ছবিতে এদের দুঃখ-কষ্ট ও সমস্যার কথা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

আর কর্ণফুলীর কান্না পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তথা পাহাড়ি-বাঙালি সংঘাতের উপর ছবি। পার্বত্য চট্টগ্রাম অতীতে ছিল ছবির মতোই সুন্দর একটা অঞ্চল। কিন্তু ষাটের দশকে কাপ্তাই বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ার ফলে কৃত্রিমভাবে যে কাপ্তাই হৃদ তৈরি করা হয় তাতে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলো তাদের হাজার হাজার একর চাষের জমি হারিয়ে ফেলে। প্রায় এক লক্ষ পাহাড়ি মানুষ আভ্যন্তরীণভাবে উদ্বাস্তু হয়ে পরে। পাহাড়িদের জীবনে দ্বিতীয় বড় সংকটটি ঘটে যখন সমতলভূমি থেকে প্রায় পাঁচ লক্ষ বাঙালিকে এনে কৃত্রিমভাবে পাহাড়ে বসানো হয়। এ ঘটনাটি পাহাড়ি-বাঙালি সম্পর্কে চরম তিক্ততা সৃষ্টি করে। পাহাড়ি যুবকেরা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। গড়ে তোলে শান্তিবাহিনী। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও নানা অপরেশন চালায়। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও অনেক ঘটে।

আমি যখন কর্ণফুলীর কান্না ছবিটা তৈরি করি তখন আমার ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী’ বন্ধুরা খুশি হননি। বলেছেন, আমি নাকি “চাকমাদের দালালি” করেছি! আবার আমি যখন স্বপ্নভূমি ছবিটা তৈরি করি, তখন তারা বলেছে আমি নাকি “বিহারীদের দালালী” করছি! চিত্রা নদীর পারে করার সময়ও আমাকে বলা হয়েছে আমি নাকি “হিন্দুদের দালাল”! তো আমি এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আসলে আমি মনের ভেতরে ঠিক করেছি যেখানেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রশক্তিটির মালিক বাঙালি-মুসলমান শাসকশ্রেণী কোনো দুর্বল সংখ্যালঘুর উপর নিপীড়ন-বঞ্চনা করবে সেটা নিয়েই আমি ছবি তৈরি করব।

লালন ফকিরকে নিয়ে আপনার দুটো কাজ আছে। ১৯৯৬ সালে লালন শাহ ও বাউলতত্ত্ব নিয়ে তৈরি করেন প্রামাণ্যচিত্র অচিন পাখী। আর ২০০৩ সালে লালনের জীবনী নিয়ে কাহিনিচিত্র বা ফিকশন লালন। লালনকে নিয়ে আপনার এই আগ্রহের কারণ কী?

লালন ফকির নিয়ে আমার আগ্রহ প্রথম দিকে আর দশজন বাঙালি বুদ্ধিজীবীর মতোই ছিল। তা হচ্ছে লালনের গানের অসাম্প্রদায়িক বাণী। কিন্তু সেই নব্বই দশকে অচিন পাখী প্রামাণ্যচিত্রটি করার জন্যে, বাউল-ফকিরদের নিয়ে গবেষণা করার সময়, বিশেষ করে লালনপন্থী তাত্ত্বিক গুরু মহিন শাহ, বাদের শাহ এঁদের সঙ্গে দিনের পর দিন আলোচনার ফলে আমি বুঝতে পারি লালন ফকির কেবলই এক অসাম্প্রদায়িক বাণীর গান রচয়িতা নন। তিনি আরো অনেক কিছুই। জানতে-বুঝতে পারি যে বাউল-ফকিরেরা হচ্ছেন বস্তুবাদী। সর্ব অর্থেই। বাংলার বাউল-ফকিরেরা সমাজের নিম্নবর্গের দরিদ্র মানুষ। দরিদ্র বলে এই মানবদেহটা ছাড়া তাদের আর কোনো সম্পদ নেই। তাই মানবদেহটাকেই তারা তাদের সাধনার বিষয় ও উপাদানে পরিণত করেছেন। এ এক গভীর মানবতাবাদ। আর বুঝতে হবে, এ মানবতাবাদ পশ্চিমা রেনেঁসার মানবতাবাদ থেকে আসেনি, এ একেবারেই বাংলার নিজস্ব লোকজ এক মানবতাবাদ। বিষয়টা আমি যত বুঝতে পারি লালন ও লালনপন্থীদের সম্পর্কে আমার আগ্রহ ততই বাড়তে থাকে। আমি ঠিক করি, লালন ফকির যে বড় মাপের একজন মানুষ ও দার্শনিক, এবং আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিতে তার যে অবস্থান ও অবদান, ফলে ওঁকে নিয়ে কেবল অচিন পাখীর মতো এক ঘণ্টার একটা প্রামাণ্যচিত্রই যথেষ্ট নয়। সুযোগ পেলে ওঁকে নিয়ে আমি পূর্ণদৈর্ঘ্য একটা ছবি বানাব। সে সুযোগটা আমার সামনে আসে ২০০৩ সালে। লালন ছবিটাতে আমরা আর দশটা বায়োপিকের মতো লালনের কেবল একরৈখিক একটা জীবনচিত্র তুলে ধরতে চাইনি। আমরা লালন ফকিরের দর্শনটা তুলে ধরতে চেয়েছি। আর সেটা চেয়েছি ওঁর গানগুলির মধ্য দিয়ে। আমার সব সময় ইচ্ছে ছিলো মিউজিক্যাল ঘরানার একটা ছবি তৈরি করা। লালনের চেয়ে একটা মিউজিকাল ঘরানার ছবির বিষয়বস্তু ভালো আর কী হতে পারে, যিনি নিজেই একজন গান-রচয়িতা? সে কারণেই একটা মিউজিক্যাল ঘরানার ছবির মতোই গানে গানে আমরা লালনের দর্শনটা বলতে চেয়েছি। কতটা সফল হয়েছি জানি না, তবে আমাদের চেষ্টাটা ওরকমই ছিলো।

চিত্রা নদীর পারে সিনেমায় রওশন জামিল ও আফসানা মিমি

লালন ছাড়াও আপনি নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে আরেকটি প্রামাণ্যচিত্র বানিয়েছেন। তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে নি:সঙ্গ সারথি। এই প্রামাণ্যচিত্রটি তৈরির কারণ কী?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাজউদ্দীন আহমদ একজন ব্যতিক্রমী রাজনীতিবিদ ছিলেন। তার মেধা, মননশীলতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা নিয়ে উনি যে কোনো দেশেই ভালো রাজনীতিবিদদের একজন রোল মডেল হতে পারতেন। বঙ্গবন্ধুর এক আদর্শ ছায়াসঙ্গী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। বঙ্গবন্ধু খুব সুযোগ্য মানুষটিকেই বেছে নিয়েছিলেন তার পার্শ্বচর হিসেবে। বাঙালিদের স্বাধিকার ও এদেশে গণতন্ত্রের বিকাশে তাজউদ্দীন আহমদের বিশাল ভূমিকা ছিলো। তবে তার সবচেয়ে সফল অবদান হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারটাকে সঠিকভাবে নেতৃত্ব দেওয়া ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে একটা সফল পরিণতিতে পৌঁছানো। এক্ষেত্রে উনি একজন যথার্থ পাইলটের কাজ করেছেন। তাজউদ্দীন আহমদের উপর তাই আমার বিশেষ শ্রদ্ধা ছিল। ফলে তার পরিবার থেকে তার কন্যা সিমিন হোসেন রিমি যখন আমাকে তাজউদ্দীন আহমদের উপর একটা প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করতে বললেন, আমি সাগ্রহে রাজি হয়েছি। আমি মনে করেছি আমাদের রাজনীতিতে ব্যতিক্রমী এই মানুষটার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোটা আমার কর্তব্য। সে কারণেই আমি তাজউদ্দীন আহমদ: নিঃসঙ্গ সারথি ছবিটা তৈরি করি।

 

ছবি কৃতজ্ঞতা: তানভীর মোকাম্মেল