মুক্তির গান

১৯৭১। দেশজুড়ে চলছে মুক্তির সংগ্রাম। ব্যারাক, শরণার্থী শিবিরে ঘুরে বেড়াচ্ছে একটি ট্রাক। যন্ত্রযানের যাত্রীর সবাই শিল্পী। ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’ নামের এই শিল্পীদলটি গান করে। তারা শরণার্থী শিবিরে যায়, হাসপাতালে যায়, গেরিলা ক্যাম্পে যায়। ন্যূনতম সংগীতায়োজনের মাধ্যমে উজ্জীবিত করে তোলে নিপীড়িত মুক্তিকামী শরণার্থী আর অসমসাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের। আর এসবই ক্যামেরায় ধরে রেখেছিলেন তরুণ এক মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা- লিয়ার লেভিন।

তারপর কেটে গেছে কুড়ি বছর।

১৯৯১ সালের নিউইয়র্ক। তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদ লিয়ার লেভিনের হদিস খুঁজে পান। যোগাযোগ করেন যদি লিয়ার লেভিনের ধারণ করা ফুটেজ দিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করা যায়। জন্ম নেয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম প্রাঞ্জল চিত্রায়ণ মুক্তির গান

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ দিয়ে শুরু হয়ে এই প্রামাণ্যচিত্র শেষ হয়েছে একটি বিশেষ প্রশ্ন দিয়ে- যাদের কল্যাণে আমরা স্বাধীন দেশ পেলাম, আমরা কি পারব তাদের সেই মহান লক্ষ্য সমুন্নত রাখতে? এর মাঝে বয়ে যাওয়া দৃশ্যাবলির মধ্যে রয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ সমর, মৃতের বীভৎস শব, ভয়ার্ত শরণার্থীদের জীবন। টুকরো টুকরো ফিল্ম ফুটেজের মাঝে আছে পোষা টিয়া পাখির খাঁচায় বন্দী জীবন, গরম ভাতে ডাল মেখে খাবার সুখ, রণাঙ্গনের প্রশিক্ষণ, পুতুল নাচের রূপকে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়গাথা। বলতে গেলে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ এক বয়ান। যার দৈর্ঘ্য মাত্র এক ঘণ্টা ১৫ মিনিট। এত স্বল্প সময়ের প্রামাণ্যচিত্রে ব্যাপক বিস্তৃত এক সময় ও বাস্তবতা ধরতে যথার্থ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন তারেক-ক্যাথরিন যুগল।

মহান মুক্তিযুদ্ধের এই আখ্যানমালা গাঁথা হয়েছে মূলত এগারটি গান দিয়ে। দেশে দেশে ভ্রমি তব রূপগান গাহিয়ে, এইনা বাংলাদেশের গান গাইতে রে দয়াল, কৃষাণ মজুর বাংলার সাথীরে, নৌকা এবার চলে মোদের যুদ্ধের সামান লইয়া, ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা, বল বলরে বল সবে বল বাঙালির জয়, আমার সোনার বাংলা, আমাদের সংগ্রাম চলবে, যশোর খুলনা বগুড়া পাবনা ঢাকা বরিশাল, বাংলা মা’র দুর্নিবার আমরা তরুণ দল, আমি দ্যাশেরও লাগিয়া- শিরোনামের গানগুলোতে মুক্তিযুদ্ধ ছাড়াও রয়েছে দেশাতত্মবোধের নস্টালজিয়া। যার অপেক্ষায় নিঃস্ব শরণার্থীরা পেয়েছে বেঁচে থাকার প্রেরণা। উজ্জীবিত হয়েছে সবাই দেশের জন্য বারে বারে।

মুক্তির গান প্রামাণচিত্রের একটি দৃশ্য। ছবির উৎস

দলনেতা মাহমুদুর রহমান বেনু, তার স্ত্রী শাহিন সামাদ, স্বপন চৌধুরী, বিপুল ভট্টাচার্য, দেবব্রত চৌধুরী, তারেক আলীদের মতো সতের জন তরুণ শিল্পীদের এ দলটি সীমান্তের এ ফ্রন্ট থেকে ও ফ্রন্টে ছুটে বেড়িয়েছে মুক্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে, শোকার্ত মানুষকে আশার বাণী শোনাতে। সেই সোনাঝরা আখ্যান লিয়ার লেভিনের ক্যামেরা আর তারেক-ক্যাথরিনের সম্পাদনার পথ ঘুরে আজীবনের জন্য এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে বাঙালির আর্কাইভে।

মুক্তির গান বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের প্রধানতম ‘ফাউন্ড ফুটেজ’ ফিল্ম। এখানে লেভিনের ধারণকৃত ফুটেজ ছাড়াও ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন দেশের সংবাদচিত্র- আর্কাইভ থেকে সংগৃহীত ফুটেজ। অবশ্য ছবির গল্পভাষ্য নির্মাণের প্রয়োজনে কিছু সংক্ষিপ্ত দৃশ্য নতুন করে তারেক মাসুদ ধারণ করেছেন ১৯৯৩-৯৪ সালে। মুক্তির গানে শুধু বিভিন্ন উৎস থেকেই যে সংগৃহীত দৃশ্যের সমাহার ঘটেছে তা-ই নয়, শব্দ যোজনার ক্ষেত্রেও যুক্ত হয়েছে অনেক কিছুই।

প্রামাণ্যচিত্রটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ক্যাথরিন মাসুদের সঙ্গে তারেকের নির্মাতা হিসেবে যে যূথবদ্ধতা তা প্রথম ও প্রগাঢ়ভাবে লক্ষ করা যায় এ ছবিতে। জাতীয় ইতিহাসের এক লুপ্ত অধ্যায়কে সিনেমার পর্দায় জীবন্ত করে তোলা সম্ভব হয়েছে তারেক মাসুদের মতো প্রতিভাবান জাতীয় ইতিহাসকারের কারণে।

১৯৯৫ সালে মুক্তির গান ছবিটি উপস্থাপিত হয় সিনেমার পর্দায়। তরুণ প্রজন্মের অনেক দর্শক প্রমবারের মতো আয়ত ফ্রেমে মুক্তিযুদ্ধের একটি প্রত্যক্ষ ভাষ্য দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন এ ছবির মধ্য দিয়ে। যার দৃশ্য শেষেও মনে গেঁথে থাকে বৃদ্ধ কৃষক ও তরুণ মুক্তিযোদ্ধার প্রতিশ্রুত দেশমাতৃকার স্মৃতি-প্রতিজ্ঞা।

তারেক মাসুদ মুক্তির গান নির্মাণের জন্য পেয়েছিলেন ফিল্ম সাউথ এশিয়ার বিশেষ সম্মাননা (১৯৯৭)।