মৃৎশিল্প ও রায়েরবাজারের কুমোরদের কথা

ঢাকার বেশ প্রাচীন জনপদ রায়েরবাজারের পালপাড়া। পাল বা মৃৎশিল্পীদের বসবাসের কারণেই এলাকাটির এ নাম। যদিও কাগজ-কলমে পালপাড়া বলে কোনো জায়গা এখন আর নেই। পুলপাড়, জাফরাবাদ, সুলতানগঞ্জ, নিমতলী, তল্লাবাগ ইত্যাদি এলাকাজুড়ে ছিল পালদের বাস। তবে পুরো এলাকাটি একসময় জাফরাবাদ মৌজার অন্তর্গত ছিল। এককালে এ এলাকার অসংখ্য মৃৎশিল্পীর হাতে গড়া মৃৎপাত্রের কদর ছিল সারা দেশে।

আগে রায়েরবাজার পালপাড়ায় ছিলো দুই শ্রেণীর পাল। এক শ্রেণীকে বলা হতো রাজবংশী পাল, অপর শ্রেণীকে বলা হতো রুদ্র পাল। নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের রাজবংশী পালরা এ এলাকায় এসে আস্তানা গাড়ে। রাজবংশী পালদের আগমণের আগ থেকেই এখানে বাস করত রুদ্র পালরা। তারা সাধারণত নিত্যপ্রয়োজনীয় মৃৎপাত্র তৈরি করতেন। আর রাজবংশী পালরা তৈরি করতেন নানা দেব-দেবীর প্রতিমা। এ দুই শ্রেণীর পালদের সমন্বয়ে এখানে গড়ে উঠেছিলো মৃৎশিল্পের জমজমাট এক বাজার।

এই শিল্পের ব্যবহার সেই আদিকাল থেকে। পোড়া মাটির নানাবিধ কাজ, গৃহস্থালির নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যাদি, পুতুল, খেলনা, প্রতিমা, প্রতিকৃতি, টব, শোপিসসহ অসংখ্য জিনিস আজও ক্রেতাদের চাহিদা মেটাচ্ছে। একসময় কাউকে মাটির তৈরি হাড়ি কিংবা গণেশের মূর্তি দিলে বিনিময়ে ওই পাত্রে বা মূর্তির পেটে যত চাল ধরে ততটাই দেওয়া হতো শিল্পীকে। এখন সেই রীতি নেই।

বংশনুক্রমে গড়ে ওঠা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। অতীতে গ্রামের সুনিপুন কারিগরের হাতে তৈরী মাটির জিনিসের কদর ছিলো ব্যাপক। পরিবেশ বান্ধব এ শিল্প শোভা পেত গ্রামের প্রত্যেক বাড়িতে বাড়িতে। মাটির তৈরি হাড়ি-পাতিল, কলসি, ফুলের টব, সরা, বাসন, দইয়ের মালসা, সাজের হাড়ি, মাটির ব্যাংক, শিশুদের বিভিন্ন খেলনা সমগ্রী নানা ধরনের তৈজসপত্র তৈরি করত এই এলাকার কুমারেরা। এ শিল্পের প্রধান উপকরণ এটেল মাটি, জ্বালানি কাঠ, শুকনো ঘাষ, খড় ও বালি।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, সহজ যোগাযোগব্যবস্থা, উৎকৃষ্ট মাটি প্রাপ্তি এবং দক্ষ মৃৎশিল্পী থাকায় রায়েরবাজারে গড়ে ওঠে পালদের বসতি। রায়েরবাজারের পশ্চিম পাশ দিয়ে একসময় বয়ে যেত একটি প্রশস্ত খাল। এই খালের এক অংশ বুড়িগঙ্গা এবং অপর অংশ তুরাগ নদের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করত। পালদের তৈরি মৃৎপাত্র নৌকা বোঝাই হয়ে এ খাল দিয়ে দেশের অন্যান্য স্থানে যেত। মৃৎপাত্র কিংবা প্রতিমা তৈরি করতে দুই ধরনের মাটির প্রয়োজন হয়। একটি কালচে এঁটেল মাটি, অপরটি লালমাটি। বুড়িগঙ্গা নদীর উভয় পাড়ে কালচে রঙের মাটি সহজে পাওয়া যেত। আর তুরাগ নদের উত্তর পাড়ে পাওয়া যেত লাল মাটি। গরুর গাড়ি ভর্তি হয়ে এ মাটি নিয়ে আসত মাটি ব্যবসায়ীরা।

স্থানীয় পালদের মধ্যে ছিল দুটি ভিন্ন দল। একদল শুধু তৈরি করত। অপর দল তৈরি জিনিস মহাজনদের কাছে বিক্রি করত। বাইরের ব্যবসায়ীদের কাছে সহজে বেচাকেনার জন্য ১৯১৮ সালে গড়ে উঠেছিলো গদিঘর। সামান্য পয়সার বিনিময়ে এই গদিঘর ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করত। এই গদিঘরের কর্তারা হিন্দুদের জন্য এখানে একটি মন্দির নির্মাণ করেন। আর এখানে আগত মুসলমান ব্যবসায়ীদের নামাজের জন্য দুটি মসজিদও নির্মাণ করা হয়। মন্দির এবং মসজিদগুলো আজও আছে। আছে গদিঘরের সেই জীর্ণ বাড়িটিও।

একসময় পাল পরিবারের সংখ্যা বেড়ে হয় সাত শতাধিক। কিন্তু গত শতকের ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে পাকিস্তান কায়েমের আন্দোলন শুরু হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এ পাড়ায়। মুসলিম লীগের কিছু গুণ্ডা নানাভাবে নির্যাতন করে তাদের। মন ভেঙে যায় এখানকার অবস্থাসম্পন্ন পালদের। পাকিস্তান হওয়ার পর কেউ কেউ দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যায়। ১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক হামলায় রায়েরবাজারের পালদের ওপর ধ্বংসযজ্ঞ চলে। সেইসময় মোহাম্মদপুর থেকে আসা বিহারিরা এবং হাজারীবাগের ট্যানারিতে কর্মরত নোয়াখালী অঞ্চলের শ্রমিকরা উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে একযোগে আক্রমণ করে পুরো পালপাড়া লণ্ডভণ্ড করে দেয়। আগুন দিয়ে প্রতিটি ঘর জ্বালিয়ে দেয়।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে পালরা দলে দলে দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যায়। মাত্র শতাধিক পাল রয়ে যান পালপাড়ায়। কয়েক বছর পর পালদের জীবনে আবার দুর্যোগ নেমে আসে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনা এবং বিহারিরা পালপাড়া আক্রমণ করে বহু লোককে হতাহত করে। ঘরবাড়িতে লুটপাট চালায়। হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া পালরা পুরো ৯ মাস এখানে-সেখানে পালিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে থাকে। দেশ স্বাধীন হলে আবার তারা ফিরে আসে। কিন্তু আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। কেউ কেউ পেশা পরিবর্তন করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। এভাবে পালদের সংখ্যা কমতে কমতে বর্তমানে পাঁচ-ছয়টি পরিবারে এসে নেমেছে। একসময় রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধ দোকানগুলোতে বসত মৃৎশিল্পের পসরা। এখন সেসবের কিছুই নেই। পালপাড়ার পশ্চিম দিক দিয়ে বয়ে যাওয়া খালটিও খুঁজে পাওয়া যায় না।

অন্যদিকে আরেক সঙ্কট তো আছেই। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি প্লাস্টিক, অ্যলোমিনিয়াম, মেলামাইন ও স্টিলের জিনিসপত্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাজারে টিকতে পারছে না মৃৎশিল্পের আসবাবপত্র। বর্তমানে এ ব্যবসায় মন্দাভাব থাকায় এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের চলছে দুর্দিন। অনেকেই বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে দিয়ে ঝুকছে বিভিন্ন পেশার দিকে। বাজারজাতকরণের অভাবে ও উৎপাদন খরচের তুলনায় সঠিক মূল্য না পাওয়ায় এ পেশা বাদ দিয়ে অন্য পেশায় জড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে অনেকেই। এদের মধ্যে অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়ে কৃষি, মৎস্য চাষ, রিকশা, ভ্যান নির্মাণ ও চালানোসহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হয়ে তাদের সংসার চালাচ্ছে।  অন্যদিকে, বাপ-দাদার এ পেশায় এখনও যারা রয়েছে তারা অনেকে দিন কাটাচ্ছে নিদারুণ দৈন্যে।

তবে তাদের আশার পালে মৃদু হাওয়া লাগছে। বিলুপ্তির পথে চলে যাওয়া কুমোরশিল্প আবার যেন ফিরে আসছে তাঁদের নিখুঁত কাজের মাধ্যমে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সাহায্যে দেশ ছেড়ে বিদেশেও এখন ছড়িয়ে পড়ছে কুমোরদের হাতে তৈরি সুন্দর সুন্দর জিনিস।