রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত স্থান

জমিদারি কাজে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করেছেন বিশ্বকবি। খাজনা আদায়ের জমিদার নন, বরং মানুষের পাশে থেকে মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়ে ক্রমেই হয়ে উঠেছেন আপামর জনগোষ্ঠীর বাবুমশাই। এসব এলাকায় এসে কাচারি-কুঠিবাড়ী কিংবা বজরায় দিনাতিপাত করার সময় তাঁর কলম কথা বলেছে কাগজের সঙ্গে। গান কিংবা গল্প, কবিতা অথবা উপন্যাস- প্রকৃতির ভালোবাসায় রচনা করেছেন বহু কিছু। জমিদারি কাজে এসেছেন, কিন্তু আপন করে নিয়েছেন এ দেশের প্রকৃতিকে, মাটিকে। রবীন্দ্রনাথের তেমনই কিছু আপন করা, স্মৃতিতে জড়িয়ে রাখা জায়গা নিয়ে এবারের আয়োজন।

শিলাইদহ

১৮৯৯ সালে জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে রবীন্দ্রনাথ এই শিলাইদহে আসেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সময়ে এই শিলাইদহের পদ্মা পাড়েই সর্বপ্রথম মস্তবড় নীলকুঠি তৈরি করেন। যখন নীলের ব্যবসা গুটিয়ে সাহেবরা চলে যায়, তখন তিনতলার কুঠিরের নিচতলায় জমিদারি খাজনা গ্রহণের কাচারি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং অন্য দুই তলা বাসস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। নীলকুঠির প্রমত্তা পদ্মার গর্ভে বিলীন হবে, এমন আশঙ্কায় ভেঙে ফেলা হয়। এরপর নতুন করে ১৮৯২ সালে নির্মাণ করা হয় বর্তমানের স্মৃতিধন্য এই শিলাইদহ কুঠিবাড়ী; এবং কুঠিবাড়ী থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে নির্মাণ করা হয় খাজনা আদায়ের জন্য দ্বিতলবিশিষ্ট কাচারি ভবন।

২২ বিঘা জমিতে প্রায় চার বিঘার ওপর প্রাচীরবেষ্টিত তিনতলা ভবন এই কুঠিবাড়ী। বাড়িতে কামরার সংখ্যা ১৮টি। নিচতলায় ৯টি, দোতলায় ৭টি, তিনতলায় দুটি কামরাসহ সবমিলে ১৮ কামরা। এসব কামরায় শতাধিক দুর্লভ ছবি ও কবির ব্যবহৃত পালকি, চেয়ার-টেবিল, খাট, গদিচেয়ার, নৌকা, সোফাসেট, লেখার টেবিল, আলমারিসহ বিভিন্ন আসবাব সংরক্ষিত রয়েছে। কুঠির পেছনেও রয়েছে একটি আকর্ষণীয় লোহার তৈরি পেঁচানো সিঁড়ি। কবিগুরুর সাহিত্যজীবনের বিরাট অংশে জড়িয়ে আছে পদ্মা ও গড়াই নদী। এখানেই কবির যৌবনের প্রথম ছোটগল্পের সূত্রপাত ঘটেছিল। শিলাইদহে বসেই রবীন্দ্রনাথ পল্লীর অনুকূল পরিবেশের রূপ দর্শন করে অনর্গল লিখেছেন। এটা ছিল সাহিত্য সৃষ্টির উর্বর স্থান। সোনার তরী, মানসসুন্দরী, উর্বশী, চিত্রা, ক্ষণিকা, গীতিমাল্যের অনেক কবিতা, গানসহ নোবেলপ্রাপ্ত ‘গীতাঞ্জলি’ এই শিলাইদহে বসেই তিনি লিখেছিলেন। তা ছাড়া এই শিলাইদহে গগন হরকরা রচনা করেন, ‘আমার সোনার বাংলা’। আর সে জন্যই কবি লিখেছেন ‘আমার জীবনের যৌবন ও প্রৌঢ় জীবনসায়াহ্নে সাহিত্য সাধনার তীর্থস্থান ছিল পদ্মাপ্রবাহ চুম্বিত শিলাইদহ। কবি এখানে একটানা ১৮৯৯ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত জমিদারি পরিচালনায় থেকেছেন। এ ছাড়া সাহিত্য সাধনার জন্য দূর থেকে বারবার ছুটে এসেছেন শিলাইদহে। সাহিত্য সাধনার জন্য কবি কতবার যে শিলাইদহে এসেছেন, তার কোনো হিসাব নেই। ঐতিহাসিক কুঠিবাড়ীর পশ্চিমে রয়েছে কবির সাহিত্য সাধনার এক মহতী নিদর্শন ‘বকুলতলার ঘাট’। এই বকুলতলার পুকুরঘাটে বসেই তিনি রচনা করেছিলেন ‘যেদিন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে’।

বর্তমানে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কুঠিবাড়ী সংরক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে। কুঠিবাড়ীর লাল-খয়েরি রঙ পরিবর্তন করায় কুঠিবাড়ী তার সৌন্দর্য হারিয়েছে, এমন অভিযোগ এখানে আসা পর্যটকদের। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যজীবনের বিরাট অংশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পদ্মা নদী। তাই পদ্মা নদীর ঢেউয়ের মতো করেই কুঠিবাড়ীর চারপাশে প্রাচীর দেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে কুঠিবাড়ীর সম্মুখে গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের বাগান।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত আরেকটি নিদর্শন টেগোর লজ কুষ্টিয়া শহরের মিলপাড়ায় অবস্থিত। মূলত এটি ছিল রবীন্দ্রনাথের ব্যবসায়িক দপ্তর। ১৮৯৫ সালে তিনি নিজেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুই ভাগ্নে সুরেন্দ্রনাথ ও বলেন্দ্রনাথের সহায়তায় শিলাইদহে প্রথম রবিঠাকুর ব্যবসা শুরু করেন, কোম্পানির নাম দেওয়া হয় ‘টেগোর অ্যান্ড কোম্পানি’। সে বছরই ব্যবসায়িক সুবিধার্থে টেগোর অ্যান্ড কোম্পানি শিলাইদহ থেকে কুষ্টিয়া শহরে স্থানান্তরিত করা হয়। এ সময় নির্মাণ করা হয় টেগোর অ্যান্ড লজ। শহরের পূর্বপাশে মিলপাড়ায় অবস্থিত লাল দ্বিতল ভবনটি কবিপ্রেমীদের আজও আকৃষ্ট করে। এই টেগোর লজে বসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯৫-১৯১১ সাল পর্যন্ত ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। এ সময় তিনি এখানে বসেই অসংখ্য ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার্থে অনেক পত্র রচনা করেন। পত্র ছাড়াও বহু কবিতা লিখেছেন এই টেগোর লজে বসেই, যা পরে ‘ক্ষণিকা’ এবং ‘কথা ও কাহিনী’তে প্রকাশিত হয়।

শাহজাদপুর

শাহজাদপুরের কাচারিবাড়ীটি রবীন্দ্রনাথের পৈতৃক জমিদারি তত্ত্বাবধানের কাচারি ছিল। তারও আগে অষ্টাদশ শতাব্দীতে এটি নীলকরদের নীলকুঠি ছিল। সে কারণে এখনো অনেকে একে কুঠিবাড়ী বলে। পরে রবীন্দ্রনাথের দাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর এটি নিলামে কিনে নেন। এখানে রয়েছে জমিদারির খাজনা আদায়ের কাচারির একটি ধ্বংসাবশেষ, একটি বেশ বড় দ্বিতল ভবন। বর্তমানে এখানে নির্মিত হয়েছে একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম। দ্বিতল ভবনটি বর্তমানে রবীন্দ্র-জাদুঘর হিসেবে ব্যবহƒত হচ্ছে এবং আঙিনার বিস্তৃত জায়গাজুড়ে তৈরি করা হয়েছে সুদৃশ্য একটি ফুলবাগান। রবীন্দ্রনাথ পিতার আদেশে ঊনত্রিশ বছর বয়সে ১৮৯০ সালে জমিদারি তত্ত্বাবধানের জন্য প্রথম শাহজাদপুর আসেন। রবীন্দ্রনাথ এখানকার প্রকৃতি ও মানুষের বিচিত্র জীবনপ্রবাহের সৌন্দর্য দেখে অভিভূত হন। এখানে এসে তাঁর লেখা একটি কবিতায় তিনি বলেছেন :

‘নদী ভরা কূলে কূলে, ক্ষেত ভরা ধান।

আমি ভাবিতেছি বসে কী গাহিব গান।

কেতকী জলের ধারে

ফুটিয়াছে ঝোপে-ঝাড়ে,

নিরাকুল ফুলভারে বকুল-বাগান।

কানায় কানায় পূর্ণ আমার পরাণ’

(ভরা ভাদরে, সোনার তরী)

রবীন্দ্রনাথ ১৮৯০ থেকে ১৮৯৬ পর্যন্ত মোট সাত বছর জমিদারির কাজে শাহজাদপুরে আসা-যাওয়া এবং অবস্থান করেছেন। তাঁর এই শাহজাদপুরে আসা-যাওয়া শুধু জমিদারি তত্ত্বাবধানের বস্তুনিষ্ঠ প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এই জমিদারির প্রয়োজনকে ছাপিয়ে প্রাধান্য পেয়েছে কবির সাহিত্য সৃষ্টির অনুপ্রেরণা ও সৃজনশীলতা। এ সময়ের মধ্যে এখানে তিনি তাঁর অনেক অসাধারণ কালজয়ী সাহিত্য রচনা করেছেন। এর মধ্যে ‘সোনার তরী’ কাব্যের ‘ভরা ভাদরে’, ‘দুই পাখি’ ‘আকাশের চাঁদ’, ‘হৃদয় যমুনা’, ‘প্রত্যাখ্যান’, ‘বৈষ্ণব কবিতা’, ‘পুরস্কার’ ইত্যাদি অসাধারণ কবিতা রচনা করেছেন। ‘চৈতালী’ কাব্যের ‘নদীযাত্রা’, ‘শুশ্রুষা’, ‘ইছামতি নদী’, ‘বিদায়’, ‘আশিস গ্রহণ’ ইত্যাদি কবিতা এবং ‘কল্পনা’ কাব্যের ‘যাচনা’, ‘বিদায়’, ‘নরবিরহ’, ‘মানস-প্রতিমা’, ‘লজ্জিতা’, ‘সংকোচ’ ইত্যাদি বিখ্যাত গান রচনা করেছেন। তাঁর শাহজাদপুরে রচিত ছোটগল্পের মধ্যে ‘পোস্টমাস্টার’, ‘ছুটি’, ‘সমাপ্তি’, ‘অতিথি’ ইত্যাদি বিখ্যাত। আর প্রবন্ধের মধ্যে ‘ছেলে ভুলানো ছড়া’, ‘পঞ্চভূত’-এর অংশবিশেষ এবং ‘ছিন্নপত্র’ ও ‘ছিন্নপত্রাবলী’র ৩৮টি পত্র রচনা করেছেন। এ ছাড়া তাঁর ‘বিসর্জন’ নাটকও এখানে রচিত। সবচেয়ে বড় কথা, তাঁর পরবর্তী সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে শাহজাদপুরের প্রভাব বিশেষভাবে বিদ্যমান।

ঠাকুর পরিবারে জমিদারি ভাগাভাগির ফলে শাহজাদপুরের জমিদারি চলে যায় রবীন্দ্রনাথের অন্য শরিকদের হাতে। তাই ১৮৯৬ সালে তিনি শেষবারের মতো শাহজাদপুর থেকে চলে যান। এর পরে তিনি আর শাহজাদপুরে আসেননি। শাহজাদপুর ছিল রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত প্রিয় এবং ভালোবাসার একটি স্থান। তাঁর ভালোবাসার কথা তিনি বিভিন্ন লেখায়, বিশেষ করে ‘ছিন্নপত্র’ ও ‘ছিন্নপত্রাবলী’তে গভীর আবেগ এবং আন্তরিকতার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। ১৮৯৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর শাহজাদপুর থেকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি স্পষ্টই বলেছেন, ‘এখানে (শাহজাদপুরে) যেমন আমার মনে লেখার ভাব ও ইচ্ছা আসে, এমন কোথাও না।’ (ছিন্নপত্র, পত্র সংখ্যা-১১৯) এ ছাড়া অন্যান্য লেখায়ও শাহজাদপুর সম্পর্কে তাঁর আবেগময় ভালোবাসার কথা ব্যক্ত করেছেন। তাঁর মৃত্যুর এক বছর আগে ১৯৪০ সালে শাহজাদপুরের তৎকালীন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হরিদাস বসাকের চিঠির জবাবে তিনি লিখেছেন, ‘শাহজাদপুরের সাথে আমার বাহিরের যোগসূত্র যদিও বিচ্ছিন্ন, তবুও অন্তরের যোগ নিবিড়ভাবে আমার স্মৃতির সঙ্গে জড়িত। আমার প্রতি সেখানকার অধিবাসীদের শ্রদ্ধা এখনো যদি অক্ষুণœ থাকে, তবে আমি পুরস্কার বলে গণ্য করব’ (শাহজাদপুরে রবীন্দ্রনাথ, মোহাম্মদ আনসারুজ্জামান)। শাহজাদপুরের প্রতি রবীন্দ্রনাথের এই ভালোবাসা একে দিয়েছে মর্যাদা ও গৌরবের এক ভিন্ন মাত্রা। শাহজাদপুরও রবীন্দ্রনাথকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে হৃদয়ে লালন করছে।

এ ছাড়া প্রতিবছর সরকারি উদ্যোগে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের আয়োজনে তিন দিনব্যাপী ব্যাপক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যথাযোগ্য মর্যাদায় ও উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে রবীন্দ্র জš§জয়ন্তী পালিত হয়।

দক্ষিণডিহি

দক্ষিণডিহি গ্রামের বেণীমাধব রায়চৌধুরীর কন্যা ভবতারিণী দেবী ওরফে মৃণালিনী দেবীকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর, ১২৯০ বঙ্গাব্দের ২০ অগ্রহায়ণ বিয়ে করেন। ১৯৪০ সালে বেণীমাধব পরিবারসহ কলকাতায় চলে যান। ফুলতলা বাজার থেকে দক্ষিণডিহি গ্রামের দূরত্ব সাড়ে তিন কিলোমিটার। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মা সারদা দেবীর বাবার বাড়ি (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মামাবাড়ি) এবং মাতামহী দিগম্বরী দেবীর বাড়িও ছিল এ এলাকায়। আর তাঁর পূর্বপুরুষেরা খুলনার রূপসা উপজেলার পিঠাভোগে বাস করতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল ভবতারিণী ওরফে মৃণালিনী দেবীর। মৃণালিনীর বয়স তখন মাত্র ১০ আর রবীন্দ্রনাথের ২২ বছর। বিয়ে উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ বর সেজে দক্ষিণডিহিতে আসেননি, কনেকে কলকাতার জোড়াসাঁকোতে নিয়ে গিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করা হয়েছিল।

কবিগুরুর শ্যালক নগেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী ওই বাড়ির দ্বিতল ভবনসহ ৮ দশমিক ৪১ একর জমির মালিক ছিলেন। তাঁর দুই ছেলে বীরেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী ও ধীরেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী ৭ দশমিক শূন্য ৮ একর জমির স্বত্বাধিকারী হন। তাঁদের মৃত্যুর পর এবং উত্তরাধিকারীদের অনুপস্থিতির কারণে তা অবৈধ দখলে চলে যায়। পরে দ্বিতল ভবনসহ এই জমি সরকারের অর্পিত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত হয়। দীর্ঘদিন চেষ্টার পর অবশেষে ১৯৯৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বাড়িটি অবৈধ দখলমুক্ত হয়। এরপর জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, খুলনার সুধীজন, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, স্থানীয় রবীন্দ্রপ্রেমী ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে বাড়িটিকে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক চর্চার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে সাধারণ মানুষের উপযোগী করে রবীন্দ্র কমপ্লেক্স ভবন প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠার পর পর্যটনপল্লী হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়। জরাজীর্ণ দ্বিতল ভবনের সামনে স্থাপন করা হয় বিশ্বকবি ও মৃণালিনী দেবীর আবক্ষ মূর্তি এবং নির্মাণ করা হয় মৃণালিনী মঞ্চ। মঞ্চের বেশ দূরে একটি ভবনে স্থাপন করা হয় রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়িকে ঘিরে দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্স ভবন গড়ে উঠলেও দীর্ঘ ১৫ বছরে ভগ্নদশা দ্বিতল ভবনটি উল্লেখযোগ্য মেরামত হয়নি। বাস্তবায়িত হয়নি সীমানাপ্রাচীর তৈরি, কমপ্লে· ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন সময়ে ওপর মহলের দেওয়া আশ্বাস। সংস্কারের অভাবে বাড়ির দ্বিতল ভবনের ইট-কাঠ, আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র এমন ভগ্নদশা যে, সামান্য ধাক্কা দিলেই ঝরে পড়বে। তার পরও জরাজীর্ণ ভবনটি কালের সাক্ষী হয়ে আজও স্বমহিমায় ও গর্বে দাঁড়িয়ে আছে।

আত্রাইয়ের পতিসর

পতিসর নওগাঁর আত্রাই থানার অধীন একটি গ্রাম। এখানে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর এস্টেটের একটি কাচারি ছিল। রবিঠাকুর জমিদারি পরিদর্শন উপলক্ষে অনেক সময় পতিসরে অতিবাহিত করতেন। হয় পতিসরের কাচারিবাড়ী, নয়তো তার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নাগর নদীতে নৌকায় দিনাতিপাত করতেন তিনি। পিতার নির্দেশে তিনি শিলাইদহ-শাহজাদপুর-পতিসরে এসেছিলেন। দেখাশোনা করতেন জমিদারির। প্রজাসাধারণের কাছে জমিদারবাবু তথা ‘বাবুমশাই’ নামে তাঁর পরিচয় ছিল। প্রজাদের সঙ্গে তাঁর আচরণ, গ্রামীণ মানুষের সর্বমুখী উন্নতির জন্য কল্যাণী কর্মসূচি গ্রহণ করতেন।

জমিদার ও কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কালীগ্রাম পরগণার জমিদারিপ্রাপ্ত হয়ে প্রথম আসেন ১৮৯১ সালের ১৫ থেকে ১৮ জানুয়ারির কোনো একদিন। এর আগে কবি শাহজাদপুর শিলাইদহে আসতেন। জমিদারি ভাগাভাগির পর কবি কালীগ্রাম পরগনার জমিদারিপ্রাপ্ত হন। ১৮৯১ সালের পর কবি বহুবার এসেছেন পতিসরের কুঠিবাড়ীতে নাগর নদীর পথে বজরায় চড়ে। পতিসর কবিকে মায়ার বাঁধনে ফেলে। ফলে কবি যতবার পতিসরে আসতেন, অবস্থান করতেন দীর্ঘ সময়।

জমিদার রবীন্দ্রনাথ নিজেকে প্রথাসিদ্ধ জমিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাননি। তাই ভালোবাসা পেয়েছেন, কাছের মানুষ হতে পেরেছেন প্রজাদের। পতিসরের প্রজাদের জন্য তাঁর ভালোবাসার কমতি ছিল না। তাই ছিন্নপত্রের এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘অন্তরের মধ্যে আমিও যে এদেরই মতো দরিদ্র, সুখ-দুঃখ কাতর মানুষ। এসব ছেলেপিলে, গরু-লাঙল, ঘরকন্নাওয়ালা সরল হৃদয় মানুষ প্রথম থেকে আমাকে কী ভুলই না জানত! আমাকে এখানকার প্রজারা যদি ঠিক জানত, তাহলে আপনাদের একজন বলে চিনতে পারত।’ জমিদারি কার্য পরিচালনার পাশাপাশি চলত তাঁর সাহিত্যচর্চা। পতিসরে অবস্থানকালে আছে তাই তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্য রচনা। ‘দুই বিঘা জমি’সহ ‘কথা ও কাহিনী’র পুরো অংশই পতিসরে অবস্থানকালে রচিত। এ ছাড়া কাব্যগ্রন্থ চিত্রা, চৈতালী, কল্পনা, ক্ষণিকা, ছড়াছবির অনেক কবিতা এখানকার রচনা। ছোটগল্প প্রতিহিংসা, ঠাকুরদা, উপন্যাস গোরা ও ঘরে বাইরের অংশবিশেষ রবীন্দ্রনাথ পতিসরে বসে লিখেছিলেন।

প্রবন্ধ ‘পঞ্চভূত’-এর কোনো কোনো অংশ, ‘রাজা-প্রজা’র অংশবিশেষসহ পতিসরে রচিত গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বিধি ডাগর আঁখি’, ‘বঁধূ মিছে রাগ করো না’, ‘জলে ডোবা চিকন শ্যামল’ ও ‘আমি কান পেতে রই’। ছিন্নপত্রাবলীর বেশ কিছু চিঠি পতিসরে বসে লেখা। ছিন্নপত্রাবলীর একটি চিঠি এই রকম, ‘এই অতি ছোটো নদী এবং নিতান্ত ঘোরো রকমের বহিঃপ্রকৃতি আমার কাছে বেশ লাগছে। ঐ অদূরেই নদী বেঁকে গিয়েছে। ওখানটিতে একটি ছোটো গ্রাম এবং গুটিকতক গাছ, এক তীরে পরিপক্ব প্রায় ধানের ক্ষেত, অন্য তীরে শূন্য মাঠ ধু-ধু করছে।’

ছোট্ট গ্রাম্য নদী নাগর। সাধারণ হওয়া সত্তে¡ও হয়তো রবীন্দ্রনাথের চোখে একসময় অসাধারণ হয়ে ওঠে, সে জন্য এ নদীর ঘরোয়া রূপের ছবি এঁকেছেন শিশুপাঠ্য ‘আমাদের ছোট নদী’ কবিতায়। পতিসর ও নাগর নদীর আটপৌরে রূপের টানে মুগ্ধই হয়েছেন জমিদার রবীন্দ্রনাথ। ছিন্নপত্রাবলীর পৃষ্ঠা ৩০৭-এর একটি চিঠির ভাষা তাই এমনই, ‘অনেক দিন পর আমার নির্জন বোটটির মধ্যে এসে ভারী আরাম বোধ হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন বিদেশ থেকে বাড়ি ফিরে এসেছি।’ পতিসরের স্নিগ্ধ পরিবেশ মুগ্ধ করেছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে।

‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে/সব গাছ ছাড়িয়ে’ কবিতার তালগাছটি পতিসরেরই। ১৯৬২ সালের প্রবল ঝড়ে তালগাছটি উপড়ে গেলে একই স্থানে রোপণ করা হয় নতুন তালগাছ। জমিদার বাবু নেই। কিন্তু তাঁর রচনার স্মৃতি ধরে রাখতে সেই তালগাছের স্থানে রোপিত হয়েছিল নতুন তালগাছ, যা আজও সব গাছ ছাড়িয়ে আকাশেই উঁকি মারছে।

কুঠিবাড়ীর সিংহদ্বার প্রবেশমুখ পেরিয়েই রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্য। এখানে সংগৃহীত আছে রবীন্দ্রনাথের ব্যবহার্য কিছু সামগ্রী, বিছানা, বাথটাব, সিন্দুক, পারিবারিক কিছু ছবি, বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনসহ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তির সঙ্গে তোলা আলোকচিত্র।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর হাজারো স্মৃতিবিজড়িত নাগর নদীর তীরের পতিসর কুঠিবাড়ীতে সর্বশেষ আসেন ১৯৩৭ সালে।

এই মাটিতে কবির পদযুগল বিচরণ করেছে। ধূলিকণায় লেগে রযেছে তাঁর স্পর্শ, বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে তাঁর কণ্ঠস্বর। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কর্মময় জীবনের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পতিসরের স্মৃতি। কবির স্মৃতিকে নিজের অনুভবের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার জন্য আজও কবিভক্তরা ছুটে যান পতিসর। প্রতিবছর আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করা হয় কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী।