শহরনামা’য় বিম্বিত দৃশ্যাবলী

একটি শহর, আরও নির্দিষ্ট করে বললে একটি রাজধানীর সামগ্রিক মূল্য ও ইতিহাস নির্ণীত হতে পারে কোন মানদণ্ডে? বানিজ্য-বৎসল ভৌগোলিক অবস্থান অথবা সে শহরের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পূর্ণ বয়ান এই প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ। সুদীর্ঘ ইতিহাসমণ্ডিত শহরগুলো যে ক্রমাগত বিচ্যুত হচ্ছে তার নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি থেকে তা সাম্রাজ্যবাদের মৌলিক অস্ত্র গ্লোবালাইজেশনের এক অবশ্যাম্ভাবি ফলাফল। তাই আমাদের বর্তমান বিশ্বে এই প্রাণের শহরগুলো পরিণত হচ্ছে একটি আরেকটির নিরেট প্রতিবিম্বে। অথচ একটি শহরের রাজধানীতে রূপান্তরিত হওয়ার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া এবং তার নিরন্তর আলো বাতাসে মিশে থাকে সেই শহরের মানুষের আশৈশব স্মৃতি, উদ্যম এবং কীর্তি।

পুঁজিবাদি নগরায়নের এই ক্লোনিং প্রোজেক্টের আওতাভুক্ত নগরগুলোর প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার একটি অলাভজনক উদ্যোগ- ‘শহরনামা: টোপোগ্রাফি অফ মিরর সাইট’। বৃত্ত আর্টস ট্রাস্টের তত্ত্বাবধানে এবং ন্যাশনাল কালচার অ্যান্ড আর্টস ফাউন্ডেশনের সার্বিক সহযোগিতায় এই শিল্প প্রদর্শনীটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঢাকার বেশ কয়েকটি স্থানে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলা এবং বৃত্ত আর্টস ট্রাস্ট প্রাঙ্গণ। এ উদ্যোগের প্রদর্শন সহযোগি হিসেবে আছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন।

শিল্পকলা ভিত্তিক এই আয়োজনের মোট তিনটি পর্ব। যার প্রথম অংশের সূচনা হয়েছে গত ২ জানুয়ারি, ‘মুভিং অবজেক্ট’ শিরোনামে। তিন সপ্তাহব্যাপী কর্মশালায় ১০ জন শিল্পী অংশগ্রহণ করেছিলেন। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারি শিল্পীদের নির্মিত কাইনেটিক শিল্পকর্মের প্রদর্শনী এরই মাঝে শুরু হয়েছে ‘বৃত্ত স্পেস ফর কনটেম্পোরারি হাবে’। ৩০ জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যেখানে প্রদর্শিত হবে কাজগুলি।

কিউরেটিং টোপোগ্রাফির বর্তমান উদ্যোগে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ৬টি রাজধানী শহর। কুয়ালালামপুর, জাকার্তা, নম পেন, তাই পেই, ব্যাংকক এবং ঢাকা এই ভিন্ন ৬টি শহর ৬টি ভিন্ন থিম নিয়ে কাজ করেছে। অন্য যেকোনো  শিল্প প্রদর্শনী থেকে অনেকাংশে ভিন্ন ‘শহরনামা’। গত ৩০ জানুয়ারি বৃত্ত আর্টস ট্রাস্ট প্রাঙ্গণে উদ্বোধনের মাধ্যমে শুরু হয় একটি শহরের গল্পগুলো পড়তে চাওয়ার এই উৎসব। থিমটি গড়ে উঠেছে মূলত পুরনো ঢাকার স্থাপত্যকে কেন্দ্র করে। এই সংস্থার ঢাকা কিউরেটর মাহবুবুর রহমান জানান, যেহেতু এই শহরেই তাঁর বেড়ে ওঠা কাজেই এই শহর ঢাকার সামগ্রিক গ্লানি, সংঘর্ষ, বেদনা ও আনন্দ উদ্ভুত এক প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরতে চেয়েছেন এই শিল্প প্রদর্শনীর মাধ্যমে। অযত্নে অবহেলায় চাকচিক্য হারাতে বসা পুরান ঢাকার স্থাপত্যের সঙ্গে এখানকার মানুষের দৈনন্দিন সম্পর্কের টানাপোড়েনকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে ২-৫ ফেব্রুয়ারী অবধি গোটা শাহবাগ জুড়ে চলতে থাকা গ্রাফিতি, চলচ্চিত্র ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী এবং পারফরম্যান্স আর্টের মাধ্যমে। আবর্জনায় কলঙ্কিত ডাস্টবিন, ফুটপাথের বহুল ব্যবহৃত দেয়ালগুলো হঠাৎ উজ্জল রঙের প্রাচুর্যে চোখ ফেরাতে বাধ্য করে চলেছিল পথচারীদের।

পারফর্মেন্স, লাইভ এবং গ্রাফিতি আর্টে অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের মাঝে উল্লেখযোগ্য শিমুল দত্ত, রূপম রায়, শ্যামল সরকার, রনি মজুমদার, কামরুজ্জামান স্বাধীন, রাজিয়া আন্দালিব প্রিমা প্রমুখ। এছাড়া মোল্লা সাগর পরিচালিত গঙ্গাবুড়ি এবং রুবাইয়াৎ হোসাইন পরিচালিত আন্ডার কন্সট্রাকশন চলচ্চিত্র দুটি প্রদর্শনের সময় মুক্ত আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন সংশ্লিষ্ট শিল্পীবৃন্দও।

স্যানডি ঝিউ-চি লো কিউরেটিং টোপোগ্রাফির চিফ কিউরেটর মনে করেন, নগরকেন্দ্রিক ইউটোপিয়ান কল্পনার পুরোটা প্রকাশ সম্ভব শুধুমাত্র সৃষ্টিশীল শিল্পের মাধ্যমে।