স্বপন সরোবরে

জুলাইয়ের শেষের দিকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি মাথায় রাত সাড়ে ৯টায় যাত্রা শুরু করলাম। যথাসময়ে ফকিরাপুল থেকে বাস ছেড়ে ভোর ৬টার মধ্যে পৌঁছে দিল বান্দরবান। বান্দরবান শহর থেকে দুর্গম পাহাড়ে যেতে দুটি পৃথক উপজেলা রুমা ও থানচি, এদের আলাদা বাস স্টেশন আছে। আমাদের গন্তব্য রুমা বাজারের দিকে এবং সকালের প্রথম বাস ৮টায়। সৌভাগ্যবশত আগেই অন্য একদলের সঙ্গে মাথাপিছু ভাগাভাগিতে এক চাঁদের গাড়ি পেয়ে গেলাম। পাহাড়ি রাস্তা, চড়াই-উতরাই তো হবেই, তবে সামনে গিয়ে আচমকা ডানে-বাঁয়ে মোড়, গহিন খাত, সরু বা তীর্যক রাস্তা, হাতি চলাচলের পথ, এমন অনেক রোড ডিরেকশন নোটিশ দেখার মতো। জীবনে প্রথম দেখাতে ভীষণ মজা পেয়েছিলাম। মজায় মজায় আধা ঘণ্টা কাটার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গাড়ি থামাল, উঁচু থেকে সাঙ্গু নদের একটা অংশ দেখানোর জন্য। (আসল কারণ, রুটিন ডিউটি। গাড়ির নম্বর, ড্রাইভার, ট্যুরিস্ট সংখ্যা ইত্যাদি চেকআপ)। তবে এমন জায়গায় যাত্রাবিরতির জন্য আর্মির দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসাযোগ্য। এর পরের ২ ঘণ্টা মেঘ, পাহাড় আর সাঙ্গু নদের ছলা কলা দেখতে দেখতে কেটে গেল। কাইক্ষন ছড়া ঘাট থেকে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় রুমা বাজারের দুরত্ব ৪০ মিনিট।

নদের দুই কূলই লোকবসতিপূর্ণ। বুঝলাম রুমা পরিসরে বেশ বড় বাজার। বাজারে ঢুকেই বেশ কয়েকটা খাবার দোকান, দেখেশুনে একটাতে বসে পড়লাম। বাঙালি স্বাদের খাবার বেশ ভালোই। পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা পরের দিন ভোরে বগা লেক যাব। তাই খাওয়ার টেবিলে সিদ্ধান্ত হলো কাছেই রিজুক ঝর্ণা ঘুরে আসার। নৌকায় সাঙ্গু ধরে যেতে আধা ঘণ্টা লাগবে। বান্দরবন জেলাজুড়ে দুটি নদ-নদী আছে। যার একটি সাঙ্গু নদ এবং অন্যটি মাতামুহুরি নদী।

সাঙ্গুর পাড়ঘেঁষা রিজুক ঝর্ণা দেখতে খুবই সুন্দর। সন্ধেটা আমাদের রিজুকের কোলে বসে কাটল। রাতে ফিরে শুরু হলো আরেক দফা যাত্রা প্রস্তুতি। খুব ভোরে রওনা দিতে হবে। উদ্দেশ্য বগালেক। রুমা বাজার থেকে বগালেকে ঝিরিপথ ও গিরিপথ দুভাবেই যাওয়া যায়। ইট ঢালাই করা গিরিপথে জিপ চলাচল করে। আমরা যাব ঝিরিপথে। সকাল সকাল সেনাবাহিনীর অনুমতি নিয়ে এই পথে হাঁটা ধরলাম। পথপ্রদর্শক কাশেম ভাই। প্রম ২০ মিনিট এক বম পাড়ার ভিতর দিয়ে হাঁটলাম।

এরপর ছোট, কিন্তু বেশ খাড়া একটা পাহাড় থেকে নামলাম ঝিরিপথে। জায়গাটা একটা ভ্যালি। চারপাশে উঁচু-নিচু

পাহাড়, মাঝখানে সমতল। এর মাঝে একটা ছড়া। সরু তবে স্রোতস্বিনী। কাশেম ভাই বললেন, বর্ষায় পানি বাড়ার সাথে সাথে তার আস্ফালনও বেড়ে যায়। আসলে পুরো ঝিরিপথটাই এই ছড়া ঘিরে। ছড়া ধরে হাঁটতে থাকলে এক সময় বগামুখ পাড়ার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া যাবে। পায়ের নিচে ছোট ছোট নুড়ি আর ছোট-বড় পাথরের ফাঁক গলে বেশ সাবধানেই পা ফেলতে হয়।

গত ২৪ ঘণ্টায় আমার চোখ নানা নয়নাভিরাম সৌন্দর্য দেখছে এবং আরও যে দেখবে তার মানসিক প্রস্তুতিও আছে। কিন্তু ঝিরিপথে নেমে প্রথম অনুভূত হলো, কানের কী আরাম! অবিরাম ঝিঁঝি গোত্রীয় পোকার ডাক, সাথে নাম না জানা পাখির সুরেলা বোল আর ছড়া দিয়ে জল গড়ানোর শব্দ শুনে মনে হয় পাখির পালক দিয়ে কান চুলকাচ্ছি। আহা…

কাশেম ভাইয়ের তাড়া খেয়ে বুঝলাম ইন্দ্রিয়দ্বয় এত সুখ পেয়ে গেলে পা চালানো মুশকিল। তার মধ্যে ছোট-বড় অনেক ঝিরিতে আমরা প্রচুর সময় নিয়ে ফেলেছি। এই পথে লোকজন বিশেষ নেই। দু-একজনের সাথে দেখা হয়েছে, তারা কাঠুরে। ঘণ্টা তিনেক পরে একটা ঘর দেখলাম। তার সামনে এক কিশোর ছিপ দিয়ে মাছ ধরছে। কাশেম ভাই বললেন, উপরে পাড়া আছে। এখানে টুরিস্ট এবং কাঠুরেদের জন্য চায়ের দোকান। বাইরে চুলায় মাছ ভাজা হচ্ছিল, ভিতরে তিন-চারজন আদিবাসী তার অপেক্ষায়। আমরা যাওয়াতে এক প্লেট ভাজা মাছ আমাদের দিয়ে গেল। চা খেতে খেতে কাশেম ভাই শুরু করলেন বগালেকের গপ্প যা আসলে মিথ হিসেবে পরিচিত। অনেক অনেক বছর আগে এখন যেখানে লেক সেখানে বম পাড়া ছিল। চারিদিকে ছিল গভীর জঙ্গল। হঠাৎ একবার পাড়ায় অদ্ভুত এক উপদ্রব শুরু হলো। প্রতিদিন কারো না কারো গৃহপালিত পশু উধাও হয়ে যেত। এক-দুজন আদিবাসী জঙ্গলে গিয়ে আর ফেরেনি। আতঙ্কিত গ্রামবাসী পাহারা বসাল, জানা গেল বিশাল বড় একটা সাপ পাড়ায় আসে খাবার খেতে। এভাবে তো চলতে পারে না। তাই তারা সাপটাকে ফাঁদ পেতে শিকার করলেন। প্রথা অনুযায়ী, শিকারের ভাগ সবাই পেলেন। এক বৃদ্ধা সাপের মাংস খেলেন না এবং ওই রাতেই স্বপ্ন দেখলেন, পাড়ার ভীষণ বিপদ। গ্রামপ্রধানকে জানালে তিনি বিশ্বাস করলেন না। অগত্যা বৃদ্ধা তার একমাত্র ছেলেকে নিয়ে পাড়া ছেড়ে চলে যান। বৃদ্ধা যওয়া মাত্র পাড়াটা মাটিতে দেবে গভীর লেকে পরিণত হয়। পানির রং ছিল রক্তিম। বম ভাষায় সাপকে বগা বলা হয়। অনেকে বগা বলতে ড্রাগনও বোঝে। লেকের নামকরণ হলো বগালেক। পরে যদিও আরও কয়েকভাবে গল্পটা শুনেছি, তবে সবই কাছাকাছি। সাপ কেন্দ্রিক। গালগপ্পে অনেক সময় কেটে গেল।

আবার আমরা ছড়া ধরে হাঁটছি। ছড়ার কাছে জোঁক কম। স্রোতে জোঁক থাকে না। এই এক ছড়া বার দশেক এপার-ওপার করলাম। কোথাও জল বুকসমান, কোথাও কোমর বা হাঁটু পর্যন্ত। কোথাও স্রোত এত বেশি যে সবাই একে অন্যের হাত ধরে পার হয়েছি। কাশেম ভাইয়ের সাথে দড়ি ছিল। আমাদের দরকার হয়নি। পাহাড়ে বৃষ্টি হলে ছড়াগুলোতে ঢল নামে। পানি বেড়ে যায় দ্বিগুণ তিনগুণ। কিছুক্ষণের মধ্যে এক গাল হেসে রোদ উঠল। এক সবুজের কত যে রং তা পাহাড়ে না গেলে বোঝানো যাবে না। আলোর সাথে রঙের খেলা। সেই খেলাতে কখনো কখনো প্রজাপতিরা এসে যোগ দেয়। তাদের রূপ দেখে চুপ করে থাকা ছাড়া কিছুই করার নেই। এত সৌন্দর্য একসাথে দেখার অভ্যেস নেই তো, তাই স্তদ্ধ হয়ে বসে থাকি। সহযাত্রী আরমান এসে বলল, আর আধা ঘণ্টা পর ঝিরিপথ শেষ হবে। এই পথের শেষে গিয়ে দেখলাম একটা বেশ বড় ঝর্ণা। কাশেম ভাইয়ের কথামতো এরপর আর পানি পাব না। খাড়া পাহাড়ে উঠতে হবে এক ঘণ্টা। ধরে নিলাম ঘণ্টা দুয়েক লাগবে। তখন মধ্য দুপুর। শেষ ঝর্ণা পেয়ে আমরা সবাই ক্ষণিক জলকেলি করে নিলাম। কাশেম ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, রাস্তা কোন দিকে? আসলে ঝর্ণাটা ছিল পাশাপাশি দুটো পাহাড়ের পেটের মধ্যে। আর এই ঝর্ণা থেকেই ঝিরিপথের উৎপত্তি। সুতরাং, রাস্তা তো আর দেখছি না। কাশেম ভাই দেখালেন, ওই দিকে…রাস্তা দেখে তো আমার চোখ ছানাবড়া। মানে কী? এই খাড়া ঝর্ণাটাই নাকি রাস্তা।

অগত্যা একে একে সবাই উঠতে শুরু করল। পানির গতি তীব্র, তাই যথাসম্ভব পাশ কাটিয়ে ওঠা হচ্ছে। কিন্তু পানির ছিটায় পাথরগুলো ভীষণ স্যাঁতসেঁতে। আঁকড়ে ধরার মতো প্রায় কিছুই নেই। ঘণ্টা দেড়েক পর বিশাল এক শালবাগান পেরিয়ে বগামুখ পাড়ায় পৌঁছলাম। আমরা এক চায়ের দোকানে চা খাচ্ছিলাম। এখান থেকে দশ মিনিট উপরে উঠলে বগালেক। চা খেতে খেতে শুনলাম, রুমা বাজার থেকে বগালেক হেঁটে আসতে সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টা লাগে। আমরা ছয় ঘণ্টা লাগিয়েছি। নিজেদের কৃতিত্বের প্রশংসা না করে কই যাই। এর পরও হেলতে-দুলতে ১০ মিনিটের রাস্তা ২০ মিনিট লাগিয়ে পৌঁছলাম বগালেকের পাড়ে। তখন বিকেল চারটা। রোদটা একটু নরম হয়ে এসেছে। লেকের পানি কাকচক্ষুর মতো স্বচ্ছ টলটলে। একে একে আমরা সবাই বসে গেলাম রূপবানের রূপ দেখতে। ওপারে লারাম সিয়ামের কটেজ। ওই দূরে আর্মি ক্যাম্প। বাকিটা সব পাহাড়। লেকের উপর দিয়ে মেঘেরা ঘুরেফিরে বেড়ায়। ঘরগুলো অস্পষ্ট হয়ে যায়। আড়াই হাজার ফিট উপরে এমন স্বপন সরোবর দেখার জন্য বারবার ট্রেকিং করা যায়।