আইভি জামানের ‘সাহসী ভাস্কর্যের ভুবন’

আইভি জামান একজন মননশীল ভাস্কর্যশিল্পী। ভাস্কর্য নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের কাছে আইভি জামানকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। তিনি নিজেই নিজের পরিচয় বহন করেন তার কাজের মাধ্যমে। প্রখ্যাত ভাস্কর হামিদুজ্জামান খানের সহধর্মিনী হয়েও আইভি জামান নিজের কাজে আলাদা স্বকীয়তা তৈরি করে নিয়েছেন।

তিনি ভারতীয় ভাস্কর্যরীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন পাশাপাশি ইউরোপের ভাস্কর্যের আধুনিকতাকে সানন্দে গ্রহণ করেছেন। ক্লাসিজমকে কাউন্টার করতে গিয়ে আইভি জামান একটা কল্পনাকুশল, অবিচ্ছেদ্য স্পেস স্ট্যাচুগুলোর চারপাশে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন।

‘সাহসী ভাস্কর্যের ভুবন’ এই শিরোনামে জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালীতে শুরু হয়েছে ভাস্কর্যশিল্পী আইভি জামানের চতুর্থ একক প্রদশর্নী। এর আগে তিনি একাধিক একক ও যৌথ প্রদর্শনী করেছেন। ভাস্কর্যের পাশাপাশি তার চিত্রকর্মও প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে এইবারের প্রদর্শনীতে। জাতীয় জাদুঘরের উদ্যোগে ও অবিন্তা গ্যালারি অব ফাইন আর্টসের সহযোগিতায় এ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। প্রদর্শনী আয়োজন করা হয় জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে।

প্রদর্শনীতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। শিল্প সমালোচক বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান, চিত্রশিল্পী অধ্যাপক রফিকুন নবী, নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, চিত্রশিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী ও জাতীয় জাদুঘরের নবনিযুক্ত মহাপরিচালক আবদুল মান্নান ইলিয়াস। আলোচক ছিলেন প্রখ্যাত ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘ভাস্কর্য করতে শ্রমের সঙ্গে শক্তির প্রয়োজন। লোহা খোদাই করে শিল্পী শিল্প সৃষ্টি করেন। সেখানে মেধা ও শ্রমের মিশেল থাকে। যখন একটি ভাস্কর্য নজরে পড়ে তখন পেশিবহুল একজন মানুষের দেখা পাওয়া যায়।’ সমরজিৎ রায় চৌধুরী বলেন, ‘আইভি স্পেস থেকে বিভিন্ন ফর্ম গড়েছেন। সমগ্র স্তব্ধতার মধ্যে গতি খুঁজেছেন। পাথর, মার্বেল, কিংবা কাঠের চিন্তা তাকে ভর করেছে।’ অধ্যাপক রফিকুন নবী বলেন, ‘আইভি জামান তার শিল্পকর্মে স্পেস ও ম্যাসের ভাস্কর্যভিত্তিক সম্পর্ক বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এ দুরূহ আইডিয়াকে তিনি বিভিন্ন স্ট্যাচুর মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করেছেন।’

তার প্রদর্শনীতে ঠাঁই পেয়েছে ‘টাইমকিপার’, ‘ইয়োগা’, ‘নেচার’, ‘টিয়ারস অব মাদার্স’ শিরোনামের বিভিন্ন ভাস্কর্য। এছাড়াও উঠে এসেছে পুণ্ড্রবর্ধন ও গৌড়বঙ্গের টেরাকোটা, মূর্তিতত্ত্ব, মানুষের জীবনাচার সম্পর্কিত বিভিন্ন ভাস্কর্য। এইসব ভাস্কর্যের রয়েছে আলাদা মাধুর্য্যতা।

পাথর, ব্রোঞ্জ, ইস্পাত এবং কাঠ দিয়ে তৈরি তার বেশিরভাগ ভাস্কর্য। আরও রয়েছে গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি মননশীল ভাস্কর্য।

১৯৯৯ সালে গ্যালারি টোয়েন্টি ওয়ানে আইভি জামানের প্রথম ভাস্কর্য প্রদর্শনী হয়। এরপর ২০০৬ ও ২০০৮ সালে আরও দুটি প্রদর্শনী হলেও গত এক দশকে তিনি কোনো প্রদর্শনী করেননি। বর্তমানে তিনি উদয়ন স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে আছেন এবং পাশাপাশি ভাস্কর্য শিল্প র্চচা করেন।

আইভি জামানের ভাস্কর্য নিয়ে সমালোচকরা বলেন, ‘কখনো কখনো তার কাজ গানের মতো, স্পষ্ট বোঝা যায়, কখনো বোঝা যায় না। আস্তে আস্তে, বারবার দেখতে গিয়ে, একটার পর একটা ইমেজ আলাদা মনে হয়। প্রতিটা ইমেজের আলাদা অর্থ আছে। চোখ বুজে তাকালে, রং ও রেখা আলাদা হয়ে ধরা দেয়, ঘূর্ণনের মতো। একটা ঘূর্ণন আর একটা ঘূর্ণন তৈরি করে। এসব ঘূর্ণন অনেকটা অ্যাবস্ট্রাকট, শব্দ দিয়ে বোঝানো সম্ভব না।’

২৫ জুলাই শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীটি প্রতিদিন সকাল ১০.০০ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৭.০০ মিনিট পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত। প্রদর্শনী চলবে ১০ জুলাই পর্যন্ত।

 

ছবি: লেখক