আধুনিক স্থাপত্যে ঐতিহ্য আর বর্তমানের সমন্বয়

বাংলাদেশের অন্যতম মেধাবী স্থপতি মেরিনা তাবাশ্যুম । জন্ম ১৯৬৮ সালে। পড়াশোনা করেছেন হলিক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এ। বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগ থেকে পাশ করে প্রতিষ্ঠা করেন আরবানা। কাশেফ মাহবুব চৌধুরীর সঙ্গে সম্মিলিতভাবে নকশা করেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অবস্থিত স্বাধীনতা স্তম্ভের। এরপর গড়ে তোলেন নিজের প্রতিষ্ঠান এমটিএ। ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে পাঠদান করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাসে। বর্তমানে তিনি ‘বেঙ্গল ইন্সটিটিউট ফর আর্কিটেকচারস্ ল্যান্ডস্কেপস্ এন্ড সেটেলমেন্টস্’ এ ডিরেক্টর (একাডেমিক) হিসেবে কর্মরত আছেন। তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে আছে রাজধানীর লালমাটিয়ার এ ফাইভ অ্যাপার্টমেন্ট রেসিডেন্স। উত্তরার ফায়দাবাদ-এ অবস্থিত তার নকশা করা বাইত উর রউফ জামে মসজিদ সম্প্রতি মনোনয়ন পেয়েছে আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার-এ।

আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার গোটা পৃথিবীর মধ্যেই অন্যতম সম্মানজনক একটা স্বীকৃতি। এত বড় পুরস্কারের জন্য মনোনীত হওয়াটা আপনার জন্য কতখানি অনুপ্রেরণার?
এখানে মনোয়ন পাওয়া অবশ্যই বড় একটা সম্মান। সাড়ে তিনশ’রও বেশি কাজ জমা পড়েছিল তার থেকে মাত্র ১৯টি প্রজেক্ট পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে। সেই হিসেবে বিরাট বড় অর্জন। অ্যাওয়ার্ড মূলত একটা স্বীকৃতি দেয়। এতে কাজের একধরণের প্রচার হয়। সেটা খুবই ইতিবাচক। কারণ অনেকদিন ধরে আমরা একটা ডিজাইন করি, সেটা তৈরি করা হয়, মানুষ সেটা ব্যবহার করে। অনুপ্রেরণা তো বটেই তবে আমি এটাকে শুধু স্বীকৃতি হিসেবেই দেখতে পছন্দ করি। সত্যিকারের অনুপ্রেরণা পাই তখন যখন দেখি মানুষ আমার ডিজাইন করা স্থাপনা সুন্দরভাবে ব্যবহার করতে পারছে, সেটা গ্রহন করতে পারছে।
সোশ্যাল মিডিয়াতে খুব সাড়া পেয়েছেন নিশ্চয়ই?
হ্যাঁ, ফেসবুক তো মেজর একটা মিডিয়া এখন। এই প্রজেক্টের একটা ভিডিও প্রচুর শেয়ার হয়েছে। অনেক ভালো ভালো কমেন্ট এসেছে। কেউ যখন ইতিবাচক কোন মন্তব্য করছে তখন অনুপ্রেরণা পাই। আবার কেউ কেউ নেতিবাচক মন্তব্যও করেছে যেটা খুব ভালো লাগেনি।
এর পূর্বে আর কোন অ্যাওয়ার্ড বা সম্মাননায় এমন সাড়া পেয়েছেন?
আমি সাধারণত আমার প্রজেক্টগুলো কোন অ্যাওয়ার্ড এর জন্য পাঠাই না। আমার ডিজাইন করা স্থাপনা যাদের জন্য বানানো হয় তারা যদি গ্রহণ করে এবং ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারে বা তাদের কাজে লাগে সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার। অবশ্য আমার প্রথম নকশা করা বিল্ডিং, ইন্ডিয়া থেকে জে কে সিমেন্ট অ্যাওয়ার্ড জিতেছিল। এরপর আর কোন কাজ অ্যাওয়ার্ডের জন্য দেইনি। তবে এর আগে ২০০৪ এ আগা খান অ্যাওয়ার্ডের জন্য আমার একটা প্রজেক্ট মনোনিত হয়েছিল। এ ফাইভ অ্যাপার্টমেন্ট নামে আবাসিক ভবন ছিল ওটা। এবার আবারও চূড়ান্ত পর্বে আমার ডিজাইন মনোনয়ন পেয়েছে। কারন এখানে কাজ জমা দিতে হয় না। অন্য কেউ মনোনয়ন করে। অ্যাওয়ার্ডের জন্য কাজ পাঠাইনা তার আরেকটা কারণ হচ্ছে আজকাল ছবি দেখেই বিভিন্ন পুরস্কার দেওয়া হয়। সরাসরি সাইটে এসে সেটা যাচাই বাছাই না করলে সত্যিকারের বিচার হয় না বলেই এরকম প্রতিযোগিতায় আমার ডিজাইন পাঠাই না। একটা বিল্ডিং এর শুধু বাইরের রূপটাই জরুরি নয়। স্থান-কালভেদে এর চারপাশের পরিবেশের সাথে ঠিকমতো খাপ খাচ্ছে কিনা সেটা বেশি জরুরি। তাই সরেজমিনে পরিদর্শন না করা হলে কোন অ্যাওয়ার্ডের জন্য ডিজাইন পাঠাই না।
বাইত উর রউফ মসজিদের কাজ কবে শুরু করেছিলেন?
২০০৫-এ মসজিদটার নকশা শুরু করেছিলাম। মসজিদের জন্য জায়গাটা দান করেছিলেন আমার নানী সুফিয়া খাতুন। ফরিদাবাদ জায়গাটা ঢাকা শহরের প্রান্তে হওয়াতে নাগরিক সুযোগ সুবিধা তেমন ছিলো না। তখন একটা মসজিদের খুব দরকার ছিলো ওখানে। তাই আমার নানী ওই জায়গাটা মসজিদ নির্মাণের জন্য দান করেন। এর নকশা করতে আমার প্রায় এক বছর সময় লেগেছে। তারপর প্রাথমিক কাজ শুরু হয় নানীর দেওয়া তহবিল থেকেই। পরবতীকালে বিভিন্ন অনুদান থেকে তহবিল সংগ্রহ করে এর নির্মাণ কাজ শেষ করা হয়। এই তহবিল সংগ্রহ করার কাজটা ছিলো প্রধান চ্যালেঞ্জ। তবে ধীরে ধীরে এর সব কাজ সম্পন্ন করা হয়।
আগের প্রশ্নে যদিও কিছুটা উত্তর আছে তবুও আবার প্রশ্নটা করতে চাই। নির্দিষ্টভাবে এই মসজিদের নকশা কেন বেছে নিয়েছিলেন? সাধারণত আমাদের দেশে নারীদের মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া বা মসজিদ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় কম।
মসজিদ হোক বা চার্চ হোক যেকোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটা আধ্যাতিক ব্যাপার আছে। একটা নির্দিষ্ট স্পেস বা জায়গার মধ্যে স্পিরিচুয়াল পরিবেশ তৈরি করা খুব সোজা কাজ নয়। কিন্তু এটা আমার মধ্যে আগ্রহের উদ্রেক করে। বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় বিখ্যাত মসজিদে আমি গিয়েছি। বা আমাদের যেসব পুরোনো মুসলিম স্থাপত্য আছে সেগুলো স্পিরিচুয়ালি খুবই আপলিফটিং। এসব ভবনের মধ্যে প্রবেশ করলেই একধরণের শান্তি শান্তি লাগে। ধর্মীয় ভবনের এই ব্যাপারটা ধরে রাখতে হলে স্পেস, তার আকার, আলো বা শব্দের প্রবাহ সবকিছু ঠিক রাখতে হয়। তো এসব ঠিক রাখতে গেলে নারী পুরুষের পার্থক্য নেই। স্পিরিচুয়ালিটি সবার মধ্যেই আছে। এর বাইরে থাকে ব্যবহারিক ব্যাপারগুলো। এসব তো না বোঝার কারণই নেই। যেমন আবুধাবিতে ওদের দেশের মসজিদ নির্মাণ করার জন্য উপদেষ্টা হিসেবে আমি একটা গাইডলাইন করে দিয়েছি। সেটা একটা বই আকারেও প্রকাশিত হয়েছে। তো আমার জন্যে খুবই আগ্রহের একটা প্রজেক্ট ছিল এটা। আমার সব নকশাতেই আলোর প্রাধান্য থাকে এখানেও আছে। উপাদান হিসেবে আলোর ব্যবহার অনেকটা ঐশ্বরিক মনে হয়।

মসজিদের নকশা করতে গিয়ে কখনও কোন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন?

না, ডিজাইন করতে গিয়ে কখনওই চ্যালেঞ্জিং মনে হয়নি। এটা সহজেই হয়ে যায়। তবে ভবন তৈরির উপাদান বাছাই করার কাজটা সতর্কতার সাথে করতে হয়। কারন স্থাপত্য নকশা অনেকটা রান্না করার মতো। ঠিক ঠিক উপাদান বাছাই করতে পারলে বাকি কাজটা সহজ হয়ে যায়।
আগা খান অ্যাওয়ার্ডের জন্য বিভিন্ন দেশের যে ১৯টি স্থাপত্যকর্ম মনোনয়ন পেয়েছে তাদের মধ্যে ব্যাপক বৈচিত্র লক্ষ্য করা যায়। এর মধ্যে বাইত উর রউফ মসজিদের বৈচিত্র বা বিশেষত্ব কী?
আগা খান অ্যাওয়ার্ডের আলাদা মানদণ্ড আছে। প্রথমত এর নকশা শৈলী তারপর দেখা হয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক গুরুত্ব। সাংস্কৃতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যাবে যে ইসলাম ধর্ম আমাদের দেশের সংস্কৃতির একটা বড় অংশ। আর আমি এই মসজিদের নকশা করার সময় সুলতানী আমলের মসজিদের নকশা অনুসরণ করার চেষ্টা করেছি। কারণ এই সময়কার মসজিদগুলোর স্থাপত্য একদম মৌলিক ও খাঁটি। এবং ওই সময়কার মসজিদের নকশাগুলোকে আমার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মনে হয়। এখন আর মসজিদ নির্মানে স্থাপত্যশৈলির সংস্কৃতি একদমই নেই। তাই চেষ্টা করেছি সেই ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত করার। পুরনো ঐতিহ্য আর বর্তমান ধারার মিশেলে একধরণের নকশা আমি করেছি এখানে। আমাদের দেশে মসজিদ নির্মাণে কোন স্থাপত্য নীতিমালা অনুসরণ করা হয় না। সাধারণত অনুদান নির্ভর।
বাংলাদেশ থেকে বাইত উর রউফ মসজিদ ছাড়াও কাশেফ মাহবুব চৌধুরীর আরেকটা স্থাপত্য নকশা মনোনয়ন পেয়েছে। তো এরকম বড় বড় অ্যাওয়ার্ড নমিনেশন নতুনদের কীভাবে অনুপ্রাণিত করবে বলে মনে করেন?
এই অ্যাওয়ার্ডের একটা বিশেষত্ব হলো একটা নির্দিষ্ট ঘরানার স্থাপত্যকর্মকে ওরা উৎসাহ দেয়। যেসব স্থাপত্যকমের্র সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব আছে সেগুলোকে প্রাধান্য দেয় ওরা। এসব স্থাপত্যকর্ম তাই স্থাপত্যশৈলির চেয়েও বেশি কিছু যা কিনা নির্দিষ্ট কিছু মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তো এরকম কাজ যখন স্বীকৃতি পায় তখন নবীনরা একধরণের উৎসাহ পাবে। তাছাড়া আর্কিটেক্ট দিয়ে নকশা করানোর সামর্থ সবার নেই। সেই জায়গা থেকেও আর্কিটেক্টদের মধ্যে এক ধরণের সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলবে এ ধরণের পুরস্কার বা স্বীকৃতি।
সামাজিক প্রেরণা বা মোটিভেশন ছাড়া আর কী কী উপাদান ভবন নকশার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে?
অনেক কিছুই। যেমন ইতিহাস, পুরোনো স্থাপত্য, দেশীয় প্রামানিক কোন স্থাপত্য। তাই কোন নকশা করার আগে আমি এধরনের পুরোনো দেশীয় স্থাপত্যকর্ম ভালো করে পাঠ করি। এছাড়া প্রকৃতি থেকেও উৎসাহ পাই। আবার অ্যাজটেক, মায়া, হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো সভ্যতার বিভিন্ন স্থাপত্যকর্ম থেকেও আমি অনুপ্রাণিত হই। যেগুলো ছিল খুবই নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য আর্কিটেকচার ফর্ম। তারপর বিভিন্ন মহান আর্কিটেক্টের কাজ থেকেও আমি উৎসাহিত হই। যেমন কানের (লুই আই কান) লেখা, দর্শন, চিন্তা আমাকে অনুপ্রেরণা দেয়। ক্লায়েন্টরাও আমাকে উৎসাহ না যোগালে ডিজাইন ভালো হয় না। তাই যাদের সঙ্গে কাজ করি তাদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পাই।
ভবিষ্যতে বড় পরিসরে আর কোনো কাজ করার ইচ্ছা আছে কি?
এমনিতে আমি খুব বেছে বেছে কাজ করি। এর মধ্যে উল্লেখ করার মতো আছে পানিগ্রাম রিসোর্ট। যশোরের তাহেরপুর গ্রামে নির্মাণ হচ্ছে রিসোর্টটি। মাঝে তহবিল সংকটের কারনে বন্ধ ছিলো তবে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন এটাকে পুনরায় শুরু করতে সহযোগিতা করছে। যেহেতু রিসোর্টটি একদম প্রত্যন্ত গ্রামে হচ্ছে তাই স্থাপত্য নকশায়ও গ্রামীণ ঐতিহ্য ধরে রাখা হচ্ছে। উপাদান হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে মাটি, বাঁশ। লোকজ ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রয়াসও থাকছে এখানে। আরেকটা জরুরি কাজ হচ্ছে এখানকার স্থানীয় জনগনকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা। এধরনের প্রজেক্টগুলোর মাধ্যমে দেশের জন্যও কাজ করা যায়। আর্কিটেকচার ইজ আ প্রফেশন অব রেসপনসিবিলিটি। তাই নতুন আর্কিটেক্টদেরও মাথায় রাখতে হবে যে আমাদের দেশটা দরিদ্র হওয়া সত্বেও বলতে গেলে বিনা পয়সায় আমাকে আর্কিটেক্ট বানিয়েছে। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই সমাজকে কিছুটা ফিরিয়ে দেওয়া বা সমাজের জন্য কাজ করা উচিত। শুধু নকশা প্রণয়ন করে দিলেই স্থপতির দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।

বেঙ্গল বারতাকে সময় দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

আপনাকেও ধন্যবাদ।