আনন্দময়ীর আগমনে

আকাশে এখন ছেঁড়া মেঘের ভেলা। শহরের ইতিউতি কোথাও যেন কাশফুলের দেখা পাওয়া। আর ভোরবেলা শিউলি ফুলের গন্ধ। দিকে দিকে এখন দেবী-বন্দনা। বছর ঘুরে উমা দেবী আসছেন তাঁর বাপের বাড়ি। ঢাকের ঢ্যাম কুড়কুড়, ঘণ্টা-কাসার টিং টিং, মঙ্গল শাঁখ ও এয়ো স্ত্রীর উলুধ্বনি- মায়ের আগমনে চারদিকে কেবল আনন্দ আয়োজন। ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ভুলে মণ্ডপে মণ্ডপে এখন আনন্দময়ীর আগমনী প্রস্তুতি।

পূজার ইতিহাস

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে আছে, সৃষ্টির আদিতে গোলকস্থ আদি বৃন্দাবনক্ষেত্রের মহারাসমণ্ডলে কৃষ্ণ সর্বপ্রথম দুর্গাপূজা করেন। দ্বিতীয়বার দুর্গার আরাধনা করেন ব্রহ্মা। মধু ও কৈটভ দ্বৈত্যদ্বয়ের নিধনে তিনি শরণাপন্ন হন দেবীর। ত্রিপুরাসুরের সঙ্গে যুদ্ধকালে সংকটাপন্ন মহাদেব তৃতীয়বার দুর্গাপূজা করেছিলেন। এরপর দুর্বাসা মুনির শাপে শ্রীভষ্ট হয়ে দেবরাজ ইন্দ্র যে দুর্গাপূজা করেন, এটা চতুর্থ দুর্গোৎসব। দেবী ভাগবত অনুসারে ব্রহ্মা ও ইন্দ্রের ন্যায় ব্রহ্মার মানসপুত্র মনু পৃথিবীর শাসনভার পেয়ে ক্ষীরোদসাগরের তীরে মৃন্ময়ী মূর্তি নির্মাণ করে দেবী দুর্গার আরাধনা করেন। জাগতিক মায়ার বন্ধন থেকে মুক্তি পেতে ঋষি মাণ্ডব্য, হারানো রাজ্য পুনরুদ্ধারে সুরথ রাজা ও বৈরাগ্য লাভের জন্য সামাধি বৈশ্য, কার্তাবির্জাজুন বধের জন্য বিষ্ণুর অবতার পরশুরাম দুর্গার আরাধনা করেন।

কৃত্তিবাসের রামায়ণে পাওয়া যায়, রাক্ষস রাজা রাবণ বিনাশে দেবী দুর্গার শরণাপন্ন হয়েছিলেন শ্রীরামচন্দ্র। তখন ছিল শরৎকাল। বৃহদ্ধর্মপুরাণে রামের এই অকালবোধনের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। এই পুরাণের মতে, কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গের পর রামচন্দ্রের অমঙ্গল আশঙ্কায় দেবতারা শঙ্কিত হলেন। তখন সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা জানালেন, দুর্গাপূজা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। ব্রহ্মা স্বয়ং যজমানী করলেন রামের পক্ষে। তখন শরৎকাল, দক্ষিণায়ন। দেবতাদের নিদ্রার সময়। ব্রহ্মার স্তব-স্তুতিতে জাগ্রত হলেন দেবী মহামায়া। তিনি উগ্রচণ্ডী রূপে আবির্ভূত হলে ব্রহ্মা বললেন, ‘রাবণবধে রামচন্দ্রকে অনুগ্রহ করার জন্য তোমাকে অকালে জাগরিত করেছি। যত দিন না রাবণ-বধ হয়, তত দিন তোমার পূজা করব। যেমন করে আমরা আজ তোমার বোধন করে পূজা করলাম, তেমন করেই মর্ত্যবাসী যুগ যুগ ধরে তোমার পূজা করবে। যতকাল সৃষ্টি থাকবে, তুমিও পূজা পাবে এভাবেই।’ এ কথা শুনে চণ্ডীকা বললেন, ‘সপ্তমী তিথিতে আমি প্রবেশ করব রামের ধনুর্বাণে। অষ্টমীতে রাম-রাবণে মহাযুদ্ধ হবে। অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে রাবণের দশমুণ্ড বিচ্ছিন্ন হবে। সেই দশমুণ্ড আবার জোড়া লাগবে। কিন্তু নবমীতে রাবণ নিহত হবেন। দশমীতে রামচন্দ্র করবেন বিজয়োৎসব।’ রামচন্দ্রের অকালবোধনই পরে বঙ্গদেশে প্রচার পায়, বর্তমানে যা শারদীয় দুর্গোৎসবের রূপ নিয়েছে। মহাভারতে বর্ণিত আছে, শ্রীকৃষ্ণের রাজত্বকালে দ্বারকা নগরীতে কুলদেবী হিসেবে দেবী দুর্গা পূজিতা হতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে পাণ্ডব পক্ষের অর্জুন ও প্রদুন্ম দুর্গাদেবীর পূজা করেছিলেন।

দুর্গা ও দুর্গাপূজা-সংক্রান্ত কাহিনীগুলোর মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় ও লোকমান্য হলো দেবীমাহাত্ম্যমে বর্ণিত কাহিনীটি। দেবীমাহাত্ম্যম প্রকৃতপক্ষে ‘মার্কণ্ডেয় পুরাণ’-এর একটি নির্বাচিত অংশ। সাতশ শ্লোকবিশিষ্ট এই দেবীমাহাত্ম্যমই শ্রীশ্রী চণ্ডী গ্রন্থ। চণ্ডীপাঠ দুর্গোৎসবের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গও বটে। দেবীমাহাত্ম্যমের কাহিনী অনুসারে পুরাকালে মহিষাসুর দেবগণকে একশ বছরব্যাপী এক যুদ্ধে পরাস্ত করে স্বর্গের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। অসুরদের অত্যাচারে পৃথিবী অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। শান্তিপুরী স্বর্গ থেকে বিতাড়িত দেবগণ প্রথমে প্রজাপতি ব্রহ্মা এবং পরে তাকে মুখপাত্র করে শিব ও নারায়ণের সমীপে উপস্থিত হন। মহিষাসুরের অত্যাচার কাহিনী শ্রবণ করে তারা উভয়েই অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হন। সেই ক্রোধে তাদের মুখমণ্ডল ভীষণাকার ধারণ করে। ইন্দ্রাদি অন্য দেবতাদের দেহ থেকেও সুবিপুল তেজ নির্গত হয়ে সেই মহাতেজের সঙ্গে মিলিত হয়। সুউচ্চ হিমালয়ে স্থিত ঋষি কাত্যায়নের আশ্রমে সেই বিরাট তেজপুঞ্জ একত্রিত হয়ে এক নারীমূর্তি ধারণ করল। ইনিই দুর্গা। অন্যদিকে দৈত্য, বিষ্ম, রোগ, পাপ, ভয় ও শত্রু হতে যিনি রক্ষা করেন তিনিই দুর্গা। আবার মার্কণ্ডেয় পুরাণমতে, দুর্গম নামক অসুরকে বধ করায় দেবীর নাম হয় দুর্গা। বাঙালিরা একে দশভুজারূপে পূজা করে থাকেন। দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধের মাধ্যমে দেবতাদের স্বর্গ ফিরিয়ে দিয়ে শান্তির পরশ ছড়িয়ে দেন। তাই তাকে বলা হয় দুর্গতিনাশিনী। দেবী দুর্গা শক্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত। আবার দুর্গাকে বলা হয় দুর্গতিনাশিনী, দুশভুজা, মঙ্গলময়ী, শক্তিদায়িনী, পরমাপ্রকৃতি, আদ্যশক্তি ও স্নেহময়ী মা।

দুর্গার কাঠামোগত পরিচিতি

দেবী পূজার মূল উৎস হচ্ছে সনাতন ধর্মের আদি শাস্ত্র বেদ। অভৃশ্য ঋষির কন্যা ব্রহ্মবাদিনী বাক সর্বপ্রথম তাঁর অতীন্দ্র ধ্যাননেত্রে আবিষ্কার করেন দেবীসুক্ত। এই দেবীসুক্তই হচ্ছে মাতৃবন্দনার মঙ্গলসূত্র। শক্তি পূজার দুটি দিক আছে, একটি হলো আধ্যাত্মিক এবং অন্যটি হলো আধিভৌতিক। মাতৃসাধক আধ্যাত্মক্ষেত্রে মহামায়া আদ্যাশক্তির আরাধনা করেন এবং অন্তরে কাম-ক্রোধাদি-রিপু ও ইন্দ্রিয়দিগকে জয় করে আধ্যাত্মিক কল্পনা ও মুক্তি লাভ করেন। অন্যদিকে আধিভৌতিক ক্ষেত্রে সাধক তাঁর পূজা-বন্দনা করেন দেশ ও সমাজের বাহ্য শত্রুর ও অন্ত-বিপ্লবের কবল হতে দেশ-জাতিকে মুক্ত করতে।

মহাশক্তি শ্রীদুর্গা দেহ দুর্গের মূল শক্তি। আধ্যাত্মিক ভাবনা দুর্গা কাঠামোতে অন্তর্নিহিত। দুর্গার দশ হাত দশ দিক রক্ষা করার প্রতীক, দশ প্রহরণ এক দেবতার সাধনালব্ধ বিভূতি। দেবী ত্রিভঙ্গা-ত্রিগুণাত্মিকা শক্তির প্রতীক, অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ তমঃ গুণের প্রতীক। দেবী ত্রিনয়নী- একটি নয়ন চন্দ্রস্বরূপ, একটি সূর্যস্বরূপ এবং তৃতীয়টি অগ্নিস্বরূপ। তাঁর ত্রিনয়নের ইঙ্গিতেই নিয়ন্ত্রিত হয় ত্রিকাল। দেবী সিংহবাহনা-তামসিক পশুশক্তির অধিপতি পশুরাজ সিংহ। মহিষাসুর-দেহস্থ প্রবল রিপুর প্রতীক। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্যের ঘনীভূত মূর্তি মহিষাসুর। শিব-সর্বপুরি অধিষ্ঠিত শিবমঙ্গল ও স্থিরত্বের প্রতীক। দেবীর ডানপাশে ওপরে লক্ষ্মী-ধনশক্তি বা বৈশ্যশক্তির, গণেশ-ধনশক্তির বা শুদ্র শক্তির, সরস্বতী-জ্ঞানশক্তি বা ব্রহ্মণ্যশক্তির, কার্তিক ক্ষত্রিয় শক্তির প্রতীক। শক্তিগুলো অনুভূতির বিষয়, অনুভূতির আকার নেই। আকার দেওয়া হয়েছে মানুষের বোঝার সুবিধার জন্য। সব শক্তিই ব্রহ্মশক্তি। সাধকের হিতার্থে ব্রহ্মের নানান রূপ কল্পনা। তার দশ হাতে দশ রকম অস্ত্র সুশোভিত। তার ডান হাতে ত্রিশূল, খড়গ ও চক্র; বাম হাতে শঙ্খ, ঢাল, কুঠার ও ঘণ্টা।

পূজার বর্ণনা

আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথানুসারে দুর্গোৎসব কখনো পনেরো, দশ বা পাঁচ দিনের। দুর্গাপূজার শুরু হয় মহালয়ায়। এদিন দেবীপক্ষের সূচনা হয়। ভোরবেলা পিতৃতর্পণের মাধ্যমে দেবীপক্ষকে আহহ্বান জানান ভক্তরা। শোক, তাপ, দুঃখ, অমঙ্গল, অন্ধকার হরণ করে শুভ, মঙ্গল, আনন্দদায়ক ও আলোর দিশারী অসুরবিনাশিনী মাকে হিমালয় থেকে মর্ত্যে বরণ করে নেবেন তারা। সমবেত কণ্ঠের স্তব- ‘হে দেবী, তুমি জাগো, তুমি জাগো, তুমি জাগো। তোমার আগমনে এই পৃথিবীকে ধন্য করো। কলুষতা মুক্ত করো। মাতৃরূপে, বুদ্ধিরূপে, শক্তিরূপে আশীর্বাদ করো পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে। বিনাশ করো আমাদের অসুর প্রবৃত্তিকে।’ এর ঠিক পাঁচ দিন পর মহাষষ্ঠীতে বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস।

মহাসপ্তমীতে নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপন, সপ্তম্যাদিকল্পারম্ভ, সপ্তমীবিহিত পূজা। কদলীবৃক্ষসহ আটটি উদ্ভিদ এবং জোড়াবেল একসঙ্গে বেঁধে শাড়ি পরিয়ে একটি বধূ আকৃতিবিশিষ্ট করে দেবীর পাশে স্থাপন করা হয়। এই হলো ‘নবপত্রিকা’, প্রচলিত ভাষায় যাকে ‘কলাবউ’ বলে।

মহাষ্টমীতে মহাষ্টম্যাদিকল্পারম্ভ, কেবল মহাষ্টমীকল্পারম্ভ, মহাষ্টমীবিহিত পূজা, বীরাষ্টমীব্রত, মহাষ্টমী ব্রতোপবাস, কুমারী পূজা, অর্ধরাত্রবিহিত পূজা, মহাপূজা ও মহোৎসবযাত্রা, সন্ধিপূজা ও বলিদান। কুমারী পূজা নিয়ে একটু বলা যাক। বৃহদ্ধর্মপুরাণের মতে, দেবী চণ্ডীকা এক কুমারী কন্যারূপেই দেবতাদের সামনে আবিভর্‚তা হয়েছিলেন। দেবী ভগবতী কুমারীরূপেই আখ্যায়িত। কুমারী পূজার দিন সকালে পূজার জন্য নির্দিষ্ট কুমারীকে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয়। তাকে সাজানো হয় ফুলের গহনা ও নানাবিধ অলঙ্কারে। পায়ে আলতা, কপালে সিঁদুরের তিলক, হাতে ফুলের বাজুবন্ধ, কুমারী মেয়েটি যেন সত্যিই দেবীর প্রতিরূপ। মণ্ডপে সুসজ্জিত আসনে বসিয়ে তার পায়ের কাছে রাখা হয় বেলপাতা, ফুল, জল, নৈবেদ্য ও পূজার নানাবিধ উপাচার।

কুমারী দেবীর কাছে ভক্তদের মিনতি- ‘কাত্যায়নায় বিদ্মহে কন্যাকুমারী ধীমহি তন্নো দুর্গি: প্রচোদয়াত’ অর্থাৎ, হে দুর্গা, তুমি কন্যা ও কুমারী। আমরা কাত্যায়নকে জানব। সে জন্য তোমাকে ধ্যান করি। তুমি আমাদের শুভ কাজে প্রেরণা দাও।

তবে সব পূজামণ্ডপে কুমারী পূজার চল নেই। বর্তমান বাংলাদেশে ও ভারতে শুধু রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের পূজামণ্ডপগুলোতে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। মহানবমীতে কেবল মহানবমীকল্পারম্ভ, মহানবমী বিহিত পূজা। বিজয়া দশমীতে বিহিত বিসর্জনাঙ্গ পূজা, বিসর্জন, বিজয়া দশমী কৃত্য ও কুলাচারানুসারে বিসর্জনান্তে অপরাজিতা পূজা।

বাংলায় দুর্গোৎসবের ইতিহাস

বাংলায় দুর্গোৎসবের প্রবর্তন কে কবে করেছিলেন, সে সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য নেই। বাংলায় যে দুর্গাপূজা প্রচলিত, তা মূলত মহিষাসুরমর্দিনীর পূজা। মহিষাসুরমর্দিনীর পূজার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে (রচনাকাল আনুমানিক অষ্টম শতাব্দী)। এ ছাড়া দুর্গাপূজার কথা পাওয়া যায় মার্কণ্ডেয় পুরাণ (মূল পুরাণটি চতুর্থ শতাব্দীর রচনা, তবে দুর্গাপূজার বিবরণসংবলিত সপ্তশতী চণ্ডী অংশটি পরবর্তীকালের সংযোজন), বৃহন্নন্দীকেশ্বর পুরাণ (সঠিক রচনাকাল অজ্ঞাত), কালিকা পুরাণ (রচনাকাল নবম-দশম শতাব্দী) ও বৃহদ্ধর্মপুরাণে (রচনাকাল বারোশ’ শতাব্দী)। নবম-বারোশ’ শতাব্দীর মধ্যকার সময়ে নির্মিত একাধিক মহিষাসুরমর্দিনীর মূর্তি বাংলার নানা স্থান থেকে আবিষ্কৃতও হয়েছে।

একাদশ শতাব্দীর বাঙালি পণ্ডিত ভবদেব ভট্ট দুর্গার মাটির মূর্তি পূজার বিধান দিয়ে গেছেন। চতুর্দশ শতাব্দীতে মিথিলার কবি বিদ্যাপতি ‘দুর্গা ভক্তি-তরঙ্গিণী’ ও বাঙালি পণ্ডিত শূলপাণি ‘দুর্গোৎসব-বিবেক’ বই দুটি থেকে দুর্গাপূজার কথা জানা যায়। অর্থাৎ, চতুর্দশ শতাব্দীতেই বাংলায় দুর্গাপূজা ছিল রীতিমতো ‘উৎসব’। দুর্গাপূজার প্রাচীনত্ব অনুধাবনে আরও একটি উল্লেখযোগ্য প্রমাণ রঘুনন্দনের ‘দুর্গাপূজা তত্ত¡’ গ্রন্থটি। নবদ্বীপের এই স্মার্ত পণ্ডিতের লেখা গ্রন্থটিতে দুর্গাপূজার যাবতীয় বিধান রয়েছে। পুরাণ ও স্মৃতিশাস্ত্র থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করে পূজাপদ্ধতি লিখেছেন তিনি।

বাংলার অন্যতম প্রাচীন দুর্গাপূজা হলো পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের মৃন্ময়ী মন্দিরের পূজা। দেবী মৃন্ময়ী ছিলেন মল-ভূম রাজ্যের রাজরাজেশ্বরীমূল-রাজবংশের কুলদেবী। এখানকার পূজাপদ্ধতি বাংলায় প্রচলিত দুর্গাপূজা থেকে অনেকটাই আলাদা; কিছুটা আলাদা এখানকার দুর্গাপ্রতিমার গড়নও। মৃন্ময়ী দেবী সপরিবারা বটে, কিন্তু লক্ষ্মী-গণেশ ও কার্তিক-সরস্বতী এখানে স্থানবদল করে থাকে। অর্থাৎ, লক্ষ্মীর স্থলে গণেশ ও গণেশের স্থলে লক্ষ্মী এবং কার্তিকের স্থলে সরস্বতী ও সরস্বতীর স্থলে কার্তিক। এই রূপে দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণের রীতিকে জগৎমল প্রথা বলা হয়।

কোনো কোনো ইতিহাসবেত্তা প্রাচীন দুর্গাপূজার স্থান হিসেবে রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংস নারায়ণের কথা উল্লেখ করেন। সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে মোগল শাসনামলে বাংলার দেওয়ান রাজা কংসনারায়ণ স্রেফ খ্যাতি লাভের নিমিত্তে আট লাখ ব্যয়ে ঘটা করে দুর্গাপূজা করেন। নদিয়ার ভবানন্দ মজুমদার, বড়শিয়ার সাবর্ণ রায়চৌধুরী, কোচবিহার রাজবাড়ী সর্বত্রই মহাসমারোহে দুর্গোৎসবের আয়োজন করেন। তাই বলা যায়, সপ্তদশ শতাব্দীতেই দুর্গোৎসবের সূচনা।

ঢাকার দুর্গোৎসবের ইতিহাস খুব পুরনো নয়। অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্তের আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, ১৮৩০ সালে সূত্রাপুরে নন্দলাল বাবুর মৈশুণ্ডির বাড়িতে ঘটা করে আয়োজন করা হয় দুর্গাপূজার। দোতলা বাড়ির সমান উঁচু ছিল সে প্রতিমা। বিশ শতকের শুরুতে দুর্গাপূজা ছিল পারিবারিক। জমিদার বা ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরা সেকালে পূজার আয়োজন করতেন। ত্রিশের দশকে শুরু হয় বারোয়ারি পূজা। আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিরা সম্মিলিতভাবে পূজা করতেন। প্রথমদিকে কেবল বাবুগিরি ও ইংরেজদের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখার জন্যই পালিত হতো এ উৎসব। বাবুদের সামাজিক মর্যাদা লাভের উপায়ও ছিল এ উৎসব! পূজায় ইংরেজদের আপ্যায়নের জন্য থাকত ব্রান্ডি, শেরি, শ্যাম্পেন। থাকত আমোদ-প্রমোদের সুব্যবস্থার অংশ হিসেবে বাইজি নাচ, কবিগান, চরস ও তামাকের ধোঁয়াও।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর দুর্গাপূজা হয়ে যায় সর্বসাধারণের উৎসব, তখন পূজা পালনে আসে ভিন্নতা। দেশভাগের পর বাংলাদেশে এককভাবে পূজা করাটা বেশ ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে ওঠে। ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণ নির্বিশেষে মিলেমিশে পূজা করার চল শুরু হয়। তবে এখনো পারিবারিক পূজার চল রয়ে গেছে বাংলাদেশের অনেক এলাকায়। পাকিস্তানি শাসনামলেও পূজার আনন্দে ভাটা পড়েনি। এ সময়ের পূজার স্মৃতিচারণা করেন মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি বাসুদেব ধর। স্মৃতি রোমান্থন করতে গিয়ে তিনি চলে যান সত্তরের দশকের দিনগুলোতে। তিনি বলেন, ‘পূজা শুরু হতো মহালয়া থেকে। মহালয়ার ভোরে সে কী ধুম! ভোরে রেডিও আকাশবাণীতে কৃষ্ণ ভদ্রের দরাজ গলায় মহালয়া শুনতাম পরিবারের সবাই মিলে। সে আসরের জন্য কত কী আয়োজন! সেদিন গেছে। তখন প্রতিমা নির্মাণের খরচ ছিল খুব কম। প্রতিমার সাজসজ্জা ছিল সাধারণ। ভ্যানে বা নৌকায় করে প্রতিমা আসত বাড়িতে। মায়েরা প্রতিমা বরণ করে নিতেন। এ গ্রাম-ও গ্রাম ঘুরে ঘুরে পূজা দেখতাম। অষ্টমী বা নবমীর সন্ধ্যায় হতো আরতি প্রতিযোগিতা। ঢাকের ঢেম কুড়কুড় ছড়িয়ে পড়ত গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে।’ স্বাধীনতার পর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে শুরু হয় কেন্দ্রীয় দুর্গাপূজা।

কিছু ঐতিহ্য সব সময়ই অমলিন। পূজা উপলক্ষে এখনো মেলা বসে। নাগরদোলা, গজা-মুরালি-সন্দেশের দোকান, আলো ঝলমলে পূজার মণ্ডপগুলো, মাইকে গান- এসব এখনো চোখে পড়ে। সারা দিনজুড়ে ঢাকিদের সমাগম, ভক্তদের ভিড়, পুরোহিতদের হাতে ভক্তের প্রসাদ গ্রহণ, সন্ধ্যায় আরতি ও নৃত্য- সব মিলিয়ে উৎসবের ছোঁয়ার কমতি নেই কোথাও। দিন পাল্টেছে, উৎসবে হয়তো নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। কিন্তু উৎসবের এই চিরাচরিত রূপ বদলায়নি এতটুকু।

পুজোর সাজ পোশাকেও সেকেলে ভাবটা থেকে গেছে। পূজা মানেই পাড়ার দিদি-বউদিদের এক প্যাঁচে পরা গারদের শাড়ি। লাল পেড়ে সাদা শাড়ি, আলতা রাঙা পায়ে নূপুর পড়ে পূজামণ্ডপে আসবেন তারা। ধূতি- সাদা পাঞ্জাবি উঠে যায়নি, বরং পরনের ধরনে এসেছে নানা বৈচিত্র্য। পূজার নৈবদ্যের পুরনো ধারা বজায় রেখেছেন ভক্তরা। মৌসুমি ফলের ভোগের পাশাপাশি খিচুড়ি প্রসাদ, মিষ্টান্ন কি বাঙালি সহজে ভুলে! তারপর রয়েছে মণ্ডা-মিঠাই, মুড়ি-মুড়কি।

বিজয়া দশমী

পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিন। দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা মর্ত্যলোক ছেড়ে স্বর্গ শিখর কৈলাসে স্বামীগৃহে ফিরে যাবেন। পেছনে ফেলে যাবেন ভক্তদের শ্রদ্ধা আর বেদনাশ্রু। সকালেই দেবীর দশমীবিহিত পূজা সমাপন ও দর্পণ বিসর্জনের পর্ব শেষ হবে। প্রতিমা বিসর্জনের আগে এয়ো স্ত্রীরা দেবী দুর্গাকে বেদনাবিধুর বিদায়লগ্নে তেল, সিঁদুর ও পান দিয়ে মিষ্টিমুখ করাবেন। এরপর শোভাযাত্রাসহকারে দেবী প্রতিমা বিসর্জনে চলবে ভক্তরা। শোভাযাত্রা শেষে মন্দিরে ফিরে শান্তিজল ও আশীর্বাদ গ্রহণ করে ঘরে ফিরবেন ভক্তরা।

শরৎকালের দুর্গোৎসব শুধু উৎসব নয়, মহোৎসব। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, আধ্যাত্মিকতার অনুভূতি, সংস্কৃতি, বৈচিত্র্য, বাণিজ্য, বিদ্যাচর্চা, সামাজিক প্রীতির বন্ধন, হাজার বছরের বাঙালির সমন্বয় ও শান্তির ঐতিহ্যকে প্রকাশ করে। বিশ্বজননীর পূজা বাঙালি হিন্দুর হৃদয়কে প্রসারিত করে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষকে, সব দেশের মানুষকে আপন করে নিতে শিখিয়ে উৎসবকে বিশ্বজনীন উৎসবেও পরিণত করেছে।

 

ছবি: নয়ন কুমার