আনন্দলোকে পটচিত্রলোকে

যথার্থ রসিক শিল্পের মাঝে আনন্দলোকের সন্ধান পায়। সঙ্গীত, সাহিত্য, চিত্রকলা এমনকি নবীনতম মাধ্যম- চলচ্চিত্রের রসে অবগাহন করেও এরূপ মানসিক তৃপ্তি লাভ করা সম্ভব। নাগরিক যাপনে হাঁসফাঁস করতে করতে অনেকেই খুঁজে ফেরেন এমনই আনন্দলোক। ইএমকে সেন্টারে প্রদর্শিত পটচিত্রের সম্ভার হতে পারে তেমনই আনন্দের উৎস।

পটের জমিনে আশৈশব নিভৃত স্বপ্নের ছবি এঁকে চলেছেন শিল্পী শম্ভু আচার্য। তার বাছাইকৃত চিত্রকর্ম নিয়ে ‘পটচিত্র কথা’ শীর্ষক একক প্রদর্শনী চলছে ধানমণ্ডির এডওয়ার্ড এম কেনেডি সেন্টারে। প্রদর্শনীটি শুরু হয়েছে ৮ জুলাই; উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ ফোকলোর রিসার্চ সেন্টারের সভাপতি ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ জমির।

পটচিত্রে সাধারণত একটি পটের ওপর কয়েকটি ধারাবাহিক ছবির মাধ্যমে ফুটে উঠত কোনো গল্প বা আখ্যান। তবে শম্ভু আচার্য্যের এবারকার চিত্রাবলিতে একেকটি ফ্রেমে স্থান পেয়েছে একটি করে চিত্র। তবে গল্প হারিয়ে যায়নি। মানুষ, সমাজ, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন গল্প লুকিয়ে আছে এসব চিত্রের গভীরে। শুধু তাই নয় আধুনিক মনন ও মানসের বহিঃপ্রকাশও দেখা যায় কিছু কিছু চিত্রে।

যেমন, ‘আমার অধিকার’সিরিজের ছবিগুলোর কোনোটিতে দেখা যাচ্ছে নববিবাহিত দম্পতির বরযাত্রা, কোনোটিতে গ্রামীণ নারী নদীর পানিতে মেলে দিয়েছে এলো চুল আবার কোনোটাতে চিত্রিত হয়েছে মুক্তপক্ষ বিহঙ্গ। বিষয়ে এবং বৈচিত্র্যে ‘গাজির পট’, ‘সীতার বনবাস’ যেমন আছে তেমনি যোগ হয়েছে আধুনিক কালের নানা উপাত্ত। ‘জীবন যুদ্ধে’ দেখা যায় শ্রমজীবী এক নারী বুকের দুধ পান করাচ্ছেন তার শিশুকে। ‘জয়তু’ বন্দুক হাতে দুয়ারে দাঁড়িয়ে এক যোদ্ধা, সঙ্গে তার পরিণীতা মনে করিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধের কথা। প্রদর্শনীতে আছে ‘দুহিতা’ আর ‘কলাবতী বউ’ শিরোনামের ‘ডাবল কোডেড’ ছবিও।

বিভিন্ন আকারের প্রায় অর্ধশত পটচিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে এ প্রদর্শনীতে। বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন অনুষঙ্গ উঠে এসেছে শম্ভু আচার্য্যর প্রাঞ্জল পটচিত্রের মাধ্যমে।

শম্ভু আচার্য্যই সম্ভবত একমাত্র সমসাময়িক বাংলাদেশী পেশাদার পটচিত্রী। উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এবং নিজের সন্তানদেরও প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন যাতে শিল্পমাধ্যমটি হারিয়ে না যায়।

মূলত দ্বাদশ শতাব্দি থেকে বঙ্গদেশে পটচিত্র শিল্পের চর্চা হয়ে আসছে। সাধারণত বংশ পরম্পরায় কিছু শিল্পী-পরিবার সাংস্কৃতিক পুরাকথা, ধর্মীয় ঘটনাবলী ও গ্রামীণসমাজের গল্পগুলো নিজেদের চিত্রকর্মে ফুটিয়ে তুলে ধর্ম প্রচারে ব্যবহার করতেন। পটুয়া শম্ভু আচার্য্য’র পরিবারও একইরকম ঐতিহ্যগতভাবে চর্চা করে আসছেন পটচিত্রের।

সাধারণত, মূল চরিত্রটি মাঝে রেখে পারিপোষক চরিত্রগুলোকে জ্যামিতিক আঙ্গিকে সাজিয়ে গঠন করা হয় পটচিত্র। ‘পটচিত্র কথা’র বিষয়বস্তুর মাঝে মহাভারত, মনসার পট,লক্ষ্মীর পট, কৃষ্টির পট, রাসলীলা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। উপকরণের ব্যপারেও পটুয়া ব্যবহার করেছেন তেতুল বিচি, কুপির কালি, এলা মাটি, তিলক মাটি, রাজানীল, জিংক অক্সাইড, সিঁদুর, ডিমের কুসুম, সাবুদানা, বেলের কষ ইত্যাদি প্রাকৃতিক উপরণ।

প্রদর্শনীতে ছবি ক্রয় করারও সুযোগ থাকছে। প্রদর্শনী চলবে ২০ জুলাই পর্যন্ত।