‘আমার আসল পরিচয় আমি বাঙালি’

১৯৮৬ সালের কথা। স্থাপত্যবিদ্যার তরুণ এক ছাত্র বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার, কয়েকটি বইয়ের নাম বলবেন যেগুলো পড়লে স্থাপত্য নিয়ে অনুপ্রাণিত হতে পারি?’ স্বভাবসুলভ স্নেহমিশ্রিত ভর্ৎসনার সুরে স্থপতি মাজহারুল ইসলাম উত্তর দিলেন, ‘আগে বাঙালি হোন, তারপরে স্থাপত্য।’
সবার ওপরে বাংলাদেশকে স্থান দিতেন স্থপতি মাজহারুল ইসলাম। শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তিনি ছিলেন প্রভাবশালী একজন স্থপতি। বাংলাদেশে স্থাপত্যচর্চার এই পথিকৃৎ স্থাপত্যশিল্পীকে আরও নিবিড়ভাবে জানার জন্য সম্প্রতি ধানমন্ডির বেঙ্গল গ্যালারিতে, বেঙ্গল ইনস্টিটিউট আয়োজন করে ব্যতিক্রমধর্মী এই অনুষ্ঠানের। গত ৫ মে সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে পড়ে শোনানো হয় তাঁর ওপর লিখিত সাক্ষাৎভিত্তিক বই ‘বাংলাদেশের স্থপতি : সংলাপে মাজহরুল ইসলাম’। ‘রিসাইটিং মাজহারুল ইসলাম: আ রিডিং অ্যান্ড ডিসকাশন’ নামের এই অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বইটির সম্পাদক কাজী খালেদ আশরাফ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে মঞ্চের দুদিকে অবস্থান নেন দুজন পাঠক। দুজনই স্থপতি- অপি করিম ও ইকবাল হাবিব। দুজনই পালা বদল করে মাজহারুল ইসলামের ভূমিকায় পাঠ করে যান বইয়ের বিভিন্ন অংশ। আর দর্শকদের সামনে উন্মেষ হতে থাকে এই মহান স্থপতির ভাবনা-দর্শন। বাংলাদেশের পথিকৃৎ এই স্থপতি দেশের স্থাপত্যচর্চার ক্ষেত্রে নব্য ধারণা সঞ্চার করে কেমন করে একক প্রচেষ্টায় ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে স্থাপত্যকে উন্নত পর্যায়ে নিয়ে গেছেন এই কথোপকথনে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। এ ছাড়া তাঁর ভিন্নধর্মী ভাবনাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
গোটা বই যেমন ১০টি অধ্যায়ে বিভক্ত, এখানেও ভিন্ন ভিন্ন পর্বে সেখান থেকে আবৃত্তি করা হয়। বইয়ের আলোকেই পরিচয় পাওয়া যায় রাজনীতি-সচেতন একজন সংস্কৃতিমান দার্শনিকের। যিনি সারা জীবন অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করেছেন এবং সৃজনশীল মাধ্যমে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সমাজে কাজ করার জন্য আর্কিটেক্টের বিশেষ কোনো ভূমিকা আছে কি না, এমন আলোচনা দিয়ে শুরু হয়ে আলোচনা পূর্ব-পশ্চিম গড়িয়ে শেষ হয়েছে স্থাপত্যের চিহ্ন নিয়ে। বইতে যেমন করে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে আলাপ এগিয়েছে, তেমনি এখানেও প্রশ্নোত্তর ঢঙে পাঠ করে গেছেন পাঠক অপি করিম ও ইকবাল হাবিব। তাঁদের সাবলীল উপস্থাপনায় বইয়ের ভাষা আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে এদিন।
আলোচনার শুরুতেই মাজহারুল ইসলাম এক প্রশ্নের উত্তরে বলছেন, ‘আমাদের থেকে বেশি অন্য কোনো দেশে স্থপতির প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না।’ তবে সংলাপ এগিয়েছে যে বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে, তার মূল কথা হলো ব্যক্তির সাংস্কৃতিক পরিচয়।
বাঙালিত্বের সাধনা এবং মানবিক হওয়া ও দেশের প্রতি অঙ্গীকার তাঁর জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে গিয়েছিল। জীবনচর্চার মধ্য দিয়েই বাঙালির সাংস্কৃতিক অনুভব ও পরিচয় পাওয়া যায়। তাই বলতেন, ‘আমি যদি আমার মাটির উপর শক্ত করে না দাঁড়াই, আমার যদি শেকড় না থাকে, তাহলে আমি পথচ্যুত।’
পাঠ গড়াতে থাকে। আলোচনার বিষয়বস্তু আধুনিক বাস্তুকলা থেকে শুরু করে জীবনাচরণ, দর্শন, মার্ক্স, রবীন্দ্রনাথ উত্তীর্ণ হয়ে চিহ্ন-প্রতীকে এসে স্থির হয়। প্রতিটি বিষয়েই তীক্ষ্ন ও স্পষ্ট মন্তব্য করেন মাজহারুল ইসলাম। এর মাধ্যমে শুধু স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে ছাড়িয়ে একজন চিন্তাবিদ দার্শনিক ও বাংলাদেশের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ দেশপ্রেমিকের সন্ধান পাওয়া যায়।
অনুষ্ঠানের শেষ ভাগে হয় আলোচনা পর্ব। সেখানে বক্তব্য দেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সৈয়দ সাদ আন্দালিব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও সোনিয়া আমিন, স্থপতি সাইফ উল হক, এহসান খান ও কাজী খালেদ আশরাফ।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে আলোচকবৃন্দ স্থপতি মাজহরুল ইসলামের কর্ম ও জীবন নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেন। এই অংশে আলোচকবৃন্দ মত দেন যে মাজহারুল ইসলাম আর যা-ই করুন, বাঙালিত্বের সঙ্গে কখনো আপোস করেননি। পুরোদস্তুর বাঙালি হয়ে কীভাবে আন্তর্জাতিক বোধে উদ্দীপিত একজন মানব হওয়া যায়, তারই উদাহরণ ছিলেন তিনি।