আমিনুল ইসলাম তরুণ শিল্পী পুরস্কার ২০১৬

বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের শিল্পী ও আধুনিক শিল্প আন্দোলনের অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ আমিনুল ইসলাম (১৯৩১-২০১১)। সৃজন-উৎকর্ষের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন আধুনিকতার পথ নির্মাণে অন্যতম শীর্ষ শিল্পী এবং পঞ্চাশের দশকেই উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হন শিল্পানুরাগীদের হৃদয়ে। চিত্রবিদ্যাচর্চায় ও আধুনিকতার জিজ্ঞাসায় তিনি প্রথা ভেঙেই অগ্রসর হয়েছিলেন।
প্রথিতযশা এই শিল্পীর স্মৃতি রক্ষার্থে তাঁর পরিবার ২০১৩ সাল থেকে ‘আমিনুল ইসলাম তরুণ শিল্পী পুরস্কার’ প্রদান করে আসছে। দ্বিবার্ষিক ভিত্তিতে অর্থাৎ এক বছর পরপর চারুকলার ক্ষেত্রে অবদানের জন্য দুই জন করে তরুণ শিল্পীকে ‘আমিনুল ইসলাম তরুণ শিল্পী পুরস্কার’ দেওয়া হয়। এই পুরস্কারের প্রতিটির মূল্যমান অন্যূন ১ লাখ টাকা। আবেদনপত্র আহ্বান, বাছাই, প্রদর্শনী আয়োজন, পুরস্কার প্রদানসহ অন্যান্য আয়োজনের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন।
গত বছর পুরস্কারের জন্য আবেদনপত্র গ্রহণ শুরু হয়ে তা শেষ হয় চলতি বছর ৩১ মার্চ। সারা দেশ থেকে ২২-৪০ বছর বয়সী প্রতিশ্রুতিশীল, সক্রিয় ও উদীয়মান শিল্পীরা এই পুরস্কারের জন্য আবেদন করেন। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিল্পকর্ম থেকে প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের পর চূড়ান্ত পর্বের জন্য নির্বাচন করা হয় ১০ জন শিল্পী। বৈচিত্র্যপূর্ণ শিল্পভাবনাগুলোর মধ্য থেকে চূড়ান্ত তালিকায় থাকা শিল্পীরা হলেন- আলী আসগর (পারফরম্যান্স), মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম শুভ (আলোকচিত্র, চিত্রকলা, ড্রয়িং, ভিডিও আর্ট), পলাশ বরণ বিশ্বাস (ছাপচিত্র), পলাশ ভট্টাচার্য (ভিডিও স্থাপনাকর্ম), রাজীব দত্ত (চিত্রকলা, ডিজিটাল কোলাজ), রুপম রায় (স্থাপনাকর্ম), সালমা আবেদিন পৃথী (আলোকচিত্র), শামসুল আলম হেলাল (আলোকচিত্র), শাহনাজ জেরিন সাত্তার (পারফরম্যান্স) ও জিহান করিম (ভিডিও আর্ট)।
চূড়ান্তভাবে বাছাইকৃত দশজন শিল্পীর মধ্যে আমিনুল ইসলাম তরুণ শিল্পী পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন দুজন- মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম শুভ ও রাজীব দত্ত।
গত ২৩ জুলাই সন্ধ্যায় ধানমন্ডিতে জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক বিদ্যাপীঠে এ পুরস্কার বিতরণী ও প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়। বিজয়ী দুজন শিল্পীকে পুরস্কার প্রদান ও মনোনীত দশজন শিল্পীর শিল্পকর্ম নিয়ে এদিন থেকেই শুরু হয় ‘ওপেন স্টুডিও এক্সিবিশন’। অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন বরেণ্য শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, শিল্পী ঢালী আল মামুন, মিসেস রুবী ইসলাম এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক বিদ্যাপীঠ সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু তথ্য তুলে ধরেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশন ভিজুয়াল আর্টস প্রোগ্রামের চিফ কিউরেটর তানজিম ওয়াহাব। বিচারকদের পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন শিল্পী ঢালী আল মামুন। তিনি বলেন চমৎকার সব শিল্পকর্ম থেকে প্রথম ১০টি এবং পরে ২টি বাছাই করা অত্যন্ত দুরূহ ছিল। তবে সমসাময়িক শিল্পচর্চা, স্থানিক বাস্তবতা ও শিল্পী আমিনুল ইসলামের শিল্পভাবনা বিবেচনায় রেখেই চূড়ান্ত বাছাই করা হয়েছে। শিল্পী আমিনুল ইসলামের সহধর্মিণী মিসেস রুবী ইসলাম বলেন, তরুণ চিত্রশিল্পীদের কাছে আমিনুল ইসলাম শুধু শিল্প-শিক্ষক নন, শুভার্থী বন্ধুও ছিলেন।
অনুষ্ঠান শেষে মনোনীত ১০ জন শিল্পীর শিল্পকর্ম নিয়ে ওপেন স্টুডিও প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন আগত অতিথিবৃন্দ। ২৩ জুলাই শুরু হয়ে এই প্রদর্শনী চলে ৬ আগস্ট পর্যন্ত।
শিল্পীদের মাধ্যম ব্যবহারে স্বতঃস্ফূর্ততা, সাহসিকতা ও সাবলীলতা বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তবে কোন বিষয়ে এককভাবে তাঁদের শিল্পভাষার প্রধান নিয়ামক হয়ে ওঠেনি। যান্ত্রিক নাগরিক জীবনের নিরন্তর হতাশা, সামাজিক বৈষম্য আর অসংগতির বল্গাহীন সংস্কৃতি, মানব সম্পর্কের জটিল রসায়নের আদ্যোপান্ত- এসবই শিল্পীদের কাজের বিষয়বস্তু হিসেবে উঠে এসেছে। কখনো হাস্যরস, কখনো ব্যঙ্গ আর কখনোবা প্রহেলিকার রূপককে আশ্রয় করে তাঁরা তাঁদের শিল্পভাষা নির্মাণে সচেষ্ট হয়েছেন। কেউ কেউ ঐতিহ্যগত শিল্পচর্চাকে ধারণাগত চর্চার মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করেছেন।
শিল্পী আমিনুল ইসলাম ১৯৩১ সালের ৭ নভেম্বর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০১১ সালের ৮ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৫৩-৫৬ সাল পর্যন্ত ইতালির ফ্লোরেন্সের অ্যাকাডেমি দ্য বেল আর্তিতে চারুকলায় উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। এরপর ১৯৫৬ সালে ফ্লোরেন্স থেকে ফিরে এসে ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতায় যোগ দেন এবং ১৯৮৩ সালে স্বেচ্ছায় শিক্ষকতা থেকে অবসর নেন। ১৯৬৬ সালে পঞ্চম তেহরান বিয়েনালে ‘গ্র্যান্ড ইম্পিরিয়াল প্রাইজ’, ১৯৮১ সালে একুশে পদক এবং ১৯৮৮ সালে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন এই খ্যাতিমান চিত্রকর।

মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম শুভ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে ভাস্কর্যে ব্যাচেলর ও মাস্টার্স করেছেন এই তরুণ শিল্পী। ছাত্রাবস্থাতেই বিভিন্ন স্কলারশিপ ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। কিউরেট করেছেন একাধিক প্রদর্শনীও। প্রথম ২০০৪-এ লাভ করেন অমিত বসাক মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড, ২০০৬ এ শিল্পী রাশেদ স্মরণে ষষ্ঠ শিল্প প্রদর্শনী পুরস্কার। এরপর ২০১০ সালে এই চারুকলার বার্ষিক শিল্প প্রদর্শনীতে ভাস্কর্যে সেরা পরীক্ষামূলক কাজের স্বীকৃতি পান।  সর্বশেষ গত জুলাইয়ে আমিনুল ইসলাম তরুণ শিল্পী পুরস্কার লাভ করেন। সে প্রসঙ্গেই কথা হলো তরুণ এই শিল্পীর সঙ্গে-

আপনার পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পকর্মের ধরন কেমন?
আমার দৈনন্দিন জীবনের বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে মিডিয়ার সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে আমি আমার কাজটি নির্মাণ করেছি। এই ভিডিওগুলো ফ্লাক্সাস আর্টের সাথে যুক্ত। ভিডিও আর্ট কী এবং এর সঙ্গে অন্যান্য ভিডিও মাধ্যম যেমন সিনেমা বা শর্টফিল্মের তফাত কী, সেই বিষয়গুলো আমার ভিডিওতে বেশি প্রাধান্য দিয়েছি।
তরুণ শিল্পী হিসেবে আমিনুল ইসলাম তরুণ শিল্পী পুরস্কার আপনার জন্য কতটা অনুপ্রেরণাদায়ক?
এটা আমার জন্য একটা বড় ধরণের অনুপ্রেরণা। কারণ, এই পুরস্কার তরুণ শিল্পীদের জন্য এবং তরুণ শিল্পী হিসেবে এই পুরস্কার পাওয়াতে আমার শিল্পচর্চাকে সম্মানিত করা হলো।
এই পুরস্কার আপনার শিল্পসৃষ্টির স্পৃহায় কীভাবে প্রভাব ফেলবে?
বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ‘নিউ মিডিয়াতে’ কাজ করে পুরস্কার পাওয়ায় আমার আত্মবিশ্বাস বাড়ল।
আলোকচিত্র, চিত্রকলা, ড্রয়িং এবং ভিডিও আর্ট- এই মিশ্র মাধ্যমে কাজ করার ভাবনা এলো কীভাবে?
পরিবেশ যতই প্রতিকূল হোক না কেন, আমার শিল্প-অনুশীলন চালিয়ে নেওয়াকে আমি প্রাধান্য দিই। ফলে, যখন যে মাধ্যম আমার হাতের কাছে থাকে, সেটা দিয়েই কাজ করি। এখন আমি সব মাধ্যমেই কাজ করতে  স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।
সমসাময়িক শিল্পজগতের সঙ্গে বাংলাদেশি শিল্পীদের ভাবনার মিল কতখানি?
বাংলাদেশে এখন অনেক নতুন নতুন মাধ্যম ও বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কাজ হচ্ছে। এটা খুবই ভালো দিক। সমসাময়িক শিল্প জগতের সঙ্গে শিল্পীদের ভাবনার মিল থাকতেই হবে, সেটা জরুরি নয়।
আমিনুল ইসলাম তরুণ শিল্পী পুরস্কার ভবিষ্যতে তরুণ শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে সাহায্য করবে কি? করলে সেটা কীভাবে বলে মনে করেন?
বাংলাদেশে আর্ট গ্যালারির সংখ্যা এবং এর প্রচার-প্রসার অনেক কম। এর মধ্যে আমিনুল ইসলাম তরুণ শিল্পী পুরস্কার তরুণ শিল্পীদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা তরুণ শিল্পীদের নতুন কাজ করতে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করবে। যেমন আমি নিউ মিডিয়াতে পুরস্কার পেয়েছি, যারা নিউ মিডিয়াতে কাজ করছে বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে, এখন তারা তাদের এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে যেতে আরও আগ্রহী হবে।

 

রাজীব দত্ত
শিল্পের প্রাথমিক পাঠ নিয়েছেন প্রকৃতির আশ্রয়ে। আর আনুষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে। সম্প্রতি সেখান থেকে বিএফএ এবং এমএফএ শেষ করে যুক্ত হয়েছেন শিক্ষকতায়। পাশাপাশি চলছে আপন শিল্পসৃজন। ২০০৯-এ সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম আয়োজিত কার্টুন প্রতিযোগিতায় পুরস্কার লাভ করেন। এ বছর আমিনুল ইসলাম তরুণ শিল্পী পুরস্কারপ্রাপ্ত দুজন শিল্পীর মধ্যে তিনি একজন। সে প্রসঙ্গেই কথা হলো মৃদুভাষী এই শিল্পীর সঙ্গে-

শিল্প সৃষ্টির অনুপ্রেরণা লাভ করেন কীভাবে?
আশপাশ থেকে, বয়ে যাওয়া সময় থেকে। শিল্পী তো মৌমাছির মতোই।
তরুণ শিল্পী হিসেবে আমিনুল ইসলাম তরুণ শিল্পী পুরস্কার আপনার জন্য কতটা অনুপ্রেরণার?
এতজন আর্টিস্টের মধ্য থেকে আমাকে বাছাই করা হলো, এটা অবশ্যই বেশ প্রেরণাদায়ক। কাজের স্বীকৃতির বিষয় তো আছেই, এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সামর্থও দরকার শিল্পীদের। সেদিক থেকেও এই পুরস্কার একটা বড় পাওয়া।
এই পুরস্কার আপনার শিল্পসৃষ্টির স্পৃহায় কীভাবে প্রভাব ফেলবে?
প্রভাব বলতে কাজে আরও নতুনত্ব ও বৈচিত্র্য তৈরি করার চেষ্টা বাড়বে।
মিশ্র মাধ্যমে শিল্প সৃষ্টি করার ভাবনা এলো কীভাবে?
একই সময়ের ভেতরে, একই সঙ্গে আমরা অনেকগুলো স্তরের মধ্যে বাস করি। এই স্তরের অনুভ‚তিটাই নানান মিডিয়াতে কাজ করতে আমাকে প্রয়াসী করে তোলে। আর একটা বিষয় হলো সীমাবদ্ধতা। এক ধরণের সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে আরেকটা পার হবার চেষ্টা থেকেও বোধ হয় নিজেকে নানানভাবে প্রকাশের ইচ্ছা জেগে ওঠে।

সমসাময়িক শিল্পজগতের সঙ্গে বাংলাদেশি শিল্পীদের ভাবনার মিল কতখানি?
এখন সবকিছুই গ্লোবাল। ভাবনা দ্রুত শেয়ার করা যায়। তাই মিলও তৈরি হয়।
আমিনুল ইসলাম তরুণ শিল্পী পুরস্কার ভবিষ্যতে তরুণ শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে কীভাবে সাহায্য করবে বলে মনে করেন?
এ পুরস্কারের কারণে তরুণরা নতুন নতুন করে কাজ করার সামাজিক-অর্থনৈতিক সমর্থন পাবে। এ রকম আরও দরকার। নানা দিক থেকে।

আপনার পুরস্কারপ্রাপ্ত আর্টওয়ার্ক সম্পর্কে বলবেন?
এটা রমিজ নামের একটা চরিত্রকে নিয়ে আমার আশপাশকে, সময়কে মোকাবেলার চেষ্টা। সাহিত্যের টেক্সটের সঙ্গে চিত্রভাষার ‘টেক্সটকে’ ব্যবহার করে একটা ভাষা তৈরির চেষ্টা।