আলোকচিত্রে চা বাগানের পূর্বাপর

সকালের সজীবতা থেকে শুরু করে দিনমান ‘টা’ এর সঙ্গে জুতসই সঙ্গী চা। রাস্তার টং থেকে বিলাসী ড্রইং রুমে সমস্ত শ্রেণিপেশার মানুষের সর্বাঙ্গীন সঙ্গী এই পানীয়। এতে ‘নাই কোনো মাদকতা দোষ, সেবনে চিত্ত হয় পরিতোষ’। তাই কিনা চা মিশে আছে সকল শ্রেণীপেশার মানুষের দৈনন্দিন জীবনধারার অত্যাবশ্যকীয় অংশ হিসেবে। দেশে বিদেশে প্রায় একই চিত্র। সেকারণেই বিশ্বজুড়ে পানীয়ের জনপ্রিয়তায় চায়ের অবস্থান দুই নম্বরে।

চায়ের উদ্ভবের পর আমাদের উপমহাদেশে এর উৎপাদন, বিপণন এবং এই শিল্পের সঙ্গে সাধারণের সংশ্লিষ্টতার রয়েছে এক বিদগ্ধ ইতিহাস ও বর্তমান। ধারণা করা হয়, চীন দেশে প্রথম চা পানের প্রচলণ শুরু হয়ে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথম ইউরোপে চা নিয়ে আসে। তারপর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও অন্যান্য ইংরেজ কোম্পানি বৈশ্বিক চা ব্যবসায় এগিয়ে যায়। তাদের হাত ধরে চা প্রবেশ করে ভারতীয় উপমহাদেশে। তবে থেকে বাংলাদেশেও শুরু হয় চা চাষ।

সেই থেকে শুরু হয় দাসত্বের,সাংস্কৃতিক ইতিহাস বিমোচনের আর শৃংখলিত জীবনের এক অসহায় ইতিহাস। যা এখনো চলছে। অশিক্ষা এখনো প্রবল ভাবে থাবা বিস্তার করে আছে তাদের মধ্যে। তাদের বাসস্থান জরাজীর্ণ, মজুরি যৎসামান্য, সামাজিকভাবে বৈষম্যের শিকার এবং তাদের চলাচলের উপর অদৃশ্য বিধিনিষেধ। এখনো তারা মৌলিক অনেকগুলো অধিকার থেকে বঞ্চিত অথচ তাদের এই মানবেতর জীবনের কথা থেকে গেছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের আড়ালেই। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রতি বছর লাখ লাখ কেজি চা উৎপাদন করে এবং দেশীয় ও বৈশ্বিক বাজারে বিক্রি করে। অথচ শ্রমিকদের জানতে দেওয়া হয়নি তাদের বঞ্চনার মাত্রা।

একজন চা বাগান শ্রমিকের ঘর, বেগমখান চা বাগান, হবিগঞ্জ, বাংলাদেশ। ছবি: ফায়হাম ইবনে শরীফ

চলমান এ অনাচার ও বাংলাদেশের চা শিল্প এবং এ শিল্পে জড়িত শ্রমিকদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে উপজীব্য করে তোলা আলোকচিত্রকে নিয়ে আলিয়সঁ ফ্রসেজ দো ঢাকার লা গ্যালারিতে ফায়হাম ইবনে শরীফের ‘চা-চক্র: বাংলাদেশের চায়ের গল্প’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনী শুরু হয়েছে।

প্রদর্শনীতে ফায়হাম ইবনে শরীফ এর তোলা মোট ৪৮ টি আলোকচিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। এসব ছবিতে উঠে এসেছে চা শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের চিত্র। একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে একজন চা বাগান শ্রমিকের ঘর। আরেকটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে ওজনবাবুর সামনে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে চা বাগানের নারী শ্রমিকরা। মাপা হচ্ছে তাদের সারাদিনের সংগ্রহ করা চা-পাতা। উল্লেখ্য, বাংলাদেশীয় চা সংসদ ও বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের মধ্যকার চুক্তি অনুযায়ী, প্রত্যেক শ্রমিককে দিনে অন্তত ২৩ কেজি পাতা তুলতে হবে। তাহলেই সেই শ্রমিক তাদের সাপ্তাহিক মজুরির জন্য বিবেচিত হবে।

চা শ্রমিকদের আন্দোলনরত ছবিও স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে। একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে বংশ পরম্পরায় চাষাবাদ করা জমিতে শিল্পাঞ্চল স্থাপন করার সরকারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাচ্ছেন চান্দপুর চা বাগানের শ্রমিকেরা। ঐতিহাসিকভাবেও চা বাগানের শ্রমিকেরা ভূমির ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত।

চা শ্রমিকদের আর্থ সামাজিক অবস্থান ও জীবন ফুটিয়ে তোলার ব্যাপারে একটি শৈল্পিক উদ্যোগ, ‘চা চক্র’। প্রদর্শনীর আলোচিত্রী ফায়হাম ইবনে শরীফ পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। কাউন্টার ফটো থেকে আলোকচিত্র বিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি গত তিন বছর তিনি দেশের বিভিন্ন চা বাগানে চা শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এর আগে তিনি চা শ্রমিকদের জীবন যাত্রা নিয়ে ঢাকা ও হবীগঞ্জের চুনারুঘাটে অনুষ্ঠিত দুটি দলীয় আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে অংশ নেন।

চা বাগানের কাছাকাছি একটি খাবারের রেস্টুরেন্টে ক্লান্তি জুড়িয়ে নিচ্ছেন একজন। চন্ডি চা বাগান, হবিগঞ্জ, বাংলাদেশ। ছবি: ফায়হাম ইবনে শরীফ

গত ১৯ জানুয়ারি, শুক্রবার বিকেলে প্রদর্শনীটি উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব মুজিবুল হক এমপি। এসময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. ফখরুল আলম এবং আলোকচিত্রী হাসান সাইফুদ্দিন চন্দন। এ ছাড়াও সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চা বাগানের প্রবীণ চা শ্রমিক মহাবীর কল।

প্রদর্শনীটি চলবে ২৬ শে জানুয়ারি পর্যন্ত। সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা এবং শুক্রবার ও শনিবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা এবং বিকাল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রদর্শনীটি খোলা থাকবে। রোববার সাপ্তাহিক বন্ধ। প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত।