আলো হাতে চলিয়াছে

কে না জানে, যে দেশের লাইব্রেরি যত সমৃদ্ধ, সে দেশ তত উন্নত। দেশজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এসব লাইব্রেরি সমৃদ্ধ করার জন্য কাজ করছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। প্রায় দুই যুগ ধরে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে শিল্প ও সংস্কৃতিচর্চায় অনন্য অবদান রেখে আসছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। এবার প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে চিত্রকলার বই বিতরণ করল প্রতিষ্ঠানটি। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ৭০টি শাখা গণগ্রন্থাগারে নিজেদের প্রকাশিত ৪০ হাজার আর্ট ক্যাটালগ ও ফোলিও বই বিতরণ সম্পন্ন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গণগ্রন্থাগারগুলোতে বিপুলসংখ্যক বই বিতরণের ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় গত ২৮ এপ্রিল। এ উপলক্ষে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজন করা হয় একটি সংবাদ সম্মেলনের। সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়েরের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিসচিব আকতারী মমতাজ ও গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আশীষ কুমার সরকার। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী।

বেঙ্গল ফাউন্ডেশন বই বিতরণের এ কাজ সম্পন্ন করেছে মাত্র ৬০ দিনে। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় গণগ্রন্থাগারগুলোয় ২৩৭ রকমের ৫৬৪টি চিত্রকলা-সম্পর্কিত বই ও ক্যাটালগ উপহার হিসেবে পাঠিয়েছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। আর এ কাজ করতে তাদের সহযোগিতা করেছে সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর।

বিতরণ করা এই ক্যাটালগগুলোতে আছে ১ হাজার ২০০ শিল্পীর কাজের প্রতিলিপি, শিল্পীর সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং প্রদর্শনী ও শিল্পীরীতি সম্পর্কে শিল্প-সমালোচকদের প্রবন্ধ। এ ছাড়া শিশুশিল্পী ও নারী শিল্পীদের কাজের প্রতিলিপিও সংকলিত আছে এসব ক্যাটালগে। আরও আছে বাংলাদেশের ১০০ জন শিল্পীর সিরিজ শেকড়ে ও সৃজনে এবং ৯টি ফোলিও।

অনুষ্ঠানে আট মিনিটের একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এ তথ্যচিত্রে দেখানো হয়েছে, কীভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গণগ্রন্থাগারে বইগুলো পৌঁছানো হয়েছে।

জ্ঞান ও সংস্কৃতিচর্চার একটি মাইলফলক হিসেবে এই কার্যক্রমকে বিবেচনা করা যেতে পারে। অনুষ্ঠানের বক্তাদেরও মত এমনই। প্রধান অতিথি আসাদুজ্জামান নূর মনে করেন, যথেষ্ট বই পড়া না হলেও দেশে বই পড়ার অভ্যাস কমে যায়নি। এ জন্য পাঠককে আরও উৎসাহ ও প্রেরণা দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘এই বিশালসংখ্যক শিল্পবিষয়ক পাঠ্যসম্পদ সারা দেশের গণগ্রন্থাগারগুলোতে থাকায় সব ধরনের মানুষ এগুলো দেখার ও পড়ার সুযোগ পাবে। এ জন্য আমি বেঙ্গল ফাউন্ডেশনকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। ভবিষ্যতে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন প্রকাশিত অন্যান্য পত্রিকা, ম্যাগাজিন বিশেষ করে শিশুদের জন্য প্রকাশিত ম্যাগাজিন জল পড়ে পাতা নড়ের ব্রেইল সংস্করণ নিয়েও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সহায়তায় বিভিনড়ব কর্মসূচি হাতে নিতে চাই। বইকে যত বেশি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া যাবে, তত বেশি আমাদের চারপাশের অন্ধকারের শক্তি কমে আসবে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে আমরা যত বেশি এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসব, সাধারণ মানুষও তত বেশি আমাদের সঙ্গী হবে।’

আশীষ কুমার সরকার বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের এ ধরনের বিষয়ে পড়ার ও জানার সুযোগ এভাবে আর হয়নি। যে গ্রন্থাগারগুলোতে বই দেওয়া হয়েছে, সেখানে আমরা আলাদা বুক কর্নার করে দিয়েছি, যাতে সহজেই বইগুলো সংগ্রহ করে পড়া যায়।’ বেঙ্গল ফাউন্ডেশন সারা বছরই শিল্পের প্রায় সব ধরনের মাধ্যম নিয়ে কাজ করে। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমি সংগীতে প্রয়াত ওয়াহিদুল হক, চিত্রকলায় প্রয়াত কাইয়ুম চৌধুরী এবং আমাদের প্রয়াত সহকর্মী সুবীর চৌধুরীর অবদানের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করি। যে শিল্পীদের ক্যাটালগ, ফোলিও আমরা সারা দেশের গণগ্রন্থাগারগুলোতে পৌঁছে দিয়েছি, তাঁদেরকে আমি বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই।’

বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের এই উদ্যোগের ফলে বিপুলসংখ্যক শিল্পবিষয়ক পাঠ্যসম্পদ সারা দেশের গণগ্রন্থাগারগুলোতে থাকায় সব ধরনের মানুষ এগুলো দেখার ও পড়ার সুযোগ পাবে। এভাবে এই প্রকল্প আরও ছড়িয়ে পড়বে। আলোকবর্তিকার মতো একটি একটি করে ছড়িয়ে পড়বে সারা দেশে। এই মশালবাহী প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল ফাউন্ডেশন যেন আলো হাতে চলছে। ধীরে ধীরে এর আলোয় আলোকিত হয়ে উঠবে সারা দেশ।