আসছে সাকরাইন

বাংলা প্রবাদে বলা আছে বারো মাসে তেরো পার্বণের কথা। আদতে পার্বণ আরও অনেক বেশি। তেমনি এক পার্বণ পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি। বাংলা পৌষ মাস এর শেষ দিনটিকে উদযাপন করা হয় পৌষ সংক্রান্তি হিসেবে। আবার মকর সংক্রান্তির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে ভারতীয় জ্যোতিষ শাস্ত্রে। নিজ কক্ষপথ থেকে সূর্যের মকর রাশিতে প্রবেশ করার বিষয়টিকে ইঙ্গিত করে থাকে মকরসংক্রান্তি শব্দটি। পৌষ সংক্রান্তি যে শুধু বাঙালিরা উৎযাপন করে থাকে তাও নয়। নানা রঙে আর ঢঙে এই উৎসব পালিত হয় ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড, লাওস, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়াসহ এশিয়ার আরও বেশ কয়েকটি দেশে । বিভিন্ন বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে উদযাপিত উৎসবগুলোর নামও দেশভেদে পেয়েছে ভিন্নতা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এর নাম আউনি বাউনি। নেপালে এই দিবসটি চলে মাঘি নামে, থাইল্যান্ডে সংক্রান, কম্বোডিয়ায় মহাসংক্রান লাওসে পিমালাও এবং মিয়ানমারে থিং ইয়ান নামে উদযাপিত হয়ে থাকে। নতুন ফসল ঘরে তোলার আনন্দে কেউ উদযাপন করে পৌষ সংক্রান্তি আবার ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক তাৎপর্যকে প্রাধান্য দিয়ে কেউ কেউ নিয়মিত পালন করে থাকে পৌষ মাসের শেষ দিনটি। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র গ্রন্থ মহাভারতেও উল্লেখিত আছে এ উৎসবের।

বাংলাদেশে পৌষ সংক্রান্তি সবচেয়ে বর্ণিলভাবে পালিত হয় পুরান ঢাকাতে। এখানে এর নাম সাকরাইন উৎসব। এর মূল আকর্ষণ ঘুড়ি ওড়ানো এবং ঘুড়ি কাটাকাটির প্রতিযোগিতা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ফানুস ওড়ানো এবং আতশবাজি পোড়ানো। পৌষ সংক্রান্তিতে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রচলন বহু আগের, সেই মুঘল আমল থেকে। ঐতিহ্যবাহী এই উৎসবকে আমুদে করে রেখেছে পুরান ঢাকার অধিবাসীরা। তারা সাকরাইন পালন করে যাচ্ছেন বছরের পর বছর। ঢাকার বাকি এলাকায় এই উৎসবের তেমন সাড়া না পাওয়া গেলেও লক্ষ্মীবাজার, তাঁতিবাজার, শাঁখারিবাজার, ধুপখোলা, সদরঘাট, লালবাগ, বংশাল, সুত্রাপুর এবং আশেপাশের এলাকার উৎসবের চিত্র দারুণ রঙিন।

পৌষের শেষ দিনে আকাশ ছেয়ে যায় রং বেরঙের ঘুড়িতে। ছবি: কে এম আসাদ

পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের স্থানীয় নাজমুল ইসলাম নাবিল প্রাধান্য দিয়েছেন তাদের পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের নিজস্বতার উপর। তিনি বললেন, ‘খুব ছোট বেলা থেকেই আমি সাকরাইন উৎসব পালন করে আসছি। সেসময় আমার চাচারা ছিলেন এর আয়োজক। ঘুড়ি উড়িয়ে আর গ্যাস বেলুন দিয়ে আমরা এটি উদযাপন করতাম। শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষজন পুরান ঢাকায় আসতো এই উৎসব উদযাপন করার জন্যে।’

সাকরাইন-এর আয়োজন শুরু হয় নির্ধারিত দিন এর ১৪-১৫ দিন আগে থেকে। রঙিন কাগজ কেটে ঝালর বানিয়ে কিংবা পাখি, ফুল আর নানা ধরণের আকৃতি বানিয়ে পুরানো বাড়িগুলোর ছাঁদে, জানলা, বারান্দায় ঝুলিয়ে দেয় স্থানীয়রা। স্থানীয় বাজারে হঠাৎ করেই বেড়ে যায় ঘুড়ি, ফানুশ, আতশবাজির বিকিকিনি। বর্তমানে একেকটি ঘুড়ি বিক্রি হয় ১০ টাকা থেকে শুরু করে ৬০ টাকায়।

ঘুড়ি, আতশবাজি, ফানুশ এর সাথে যুক্ত হয় মা-খালাদের পিঠা পুলির আয়োজন। হরেক রকমের পিঠা আর মুখরোচক খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেন আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য। আপনি যদি পুরান ঢাকার স্থানীয় অধিবাসী না হয়ে থাকেন, আপনাকে এই চমৎকার উৎসব উপভোগ করার জন্য অবশ্যই ‘নেমন্তন্ন’ পেতে হবে স্থানীয় কোন বন্ধুর কাছ থেকে। নতুবা সুযোগ উৎসব এর প্রাণকেন্দ্র পুরান ঢাকার জড়সড় হয়ে থাকার বাসা গুলোর ছাদে প্রবেশের সুযোগ মিলবে না। আর উঁচু কোন স্থান ছাড়া পুরো এলাকার নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখার উপায় নেই।

আজকাল ডিজে পার্টি হয় গভীর রাত অবধি। ছবি: আবদুল্লাহ হিল কাফী

ধানমন্ডির বাসিন্দা শারমিন জাহান খুব আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘আমার খুবই ভাল লাগছে যে এবারই প্রথম সাকরাইন উৎসবে যোগদান করব। এর আগে সাকরাইন নিয়ে অনেক শুনেছি সবার কাছ থেকে যে অনেক কিছু হয় এ উৎসবে। অনেক মজা হয়। আমি এবার খুব আনন্দিত যে নতুন কিছু দেখতে পারব।’

প্রতিবছর সাকরাইন উৎসবে অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিয়া শেফা। তিনি বলেন, ‘এটা এমন একটি ঐতিহ্যবাহী আয়োজন যা পুরান ঢাকার সমৃদ্ধ সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে। এ ধরনের অনুষ্ঠান হালের গ্যাজেট প্রিয় তরুণ প্রজন্মেকে একটু শ্বাস নেয়ার জায়গা করে দেয়। এ ছাড়াও অংশগ্রহণকারীদের খুব আপন এ উৎসব ।’

পৌষের শেষ বিকেলের আকাশ সেজে ওঠে অজস্র ঘুড়ির রঙে। সন্ধ্যা নামতেই ঘুড়িও নেমে যায় আকাশ থেকে। তবে ঘুড়ির জায়গা দখল করে নেয় আরও রঙিন, আরও উজ্জ্বল আলোর ঝকঝকানি। প্রায় সবগুলো ছাদ থেকেই ক্ষণে ক্ষণে আকাশে উদগত হয় ফানুস, ড্রাম সার্চ লাইট আর লেজার লাইট দিয়ে আকাশ এর গায়ে যখন আঁকিবুঁকি করা হয়। গোটা পুরান ঢাকা যেন রূপ নেয় একটি স্বর্গরাজ্যে। পাড়ায় পাড়ায় থাকে যায় উৎসবের আমেজ। সন্ধ্যার উৎসব রাত বাড়তে আরও উদ্দাম হয়ে ওঠে। পটকা আর আতশবাজির গগনবিদারী শব্দের সঙ্গে চলতে থাকে অত্যুৎসাহীদের ‘ফায়ার ব্রিদিং’। মুখে কেরোসিন নিয়ে হাতে ধরা কাঠি আর সলতের উপর ফুকে দিলেই আগুন এর হল্কা বেড়িয়ে আসে।

আতশবাজি আর ড্রাম সার্চ লাইটের আলোয় উজ্বল পুরান ঢাকার আকাশ। ছবি: নিজামুদ্দিন হালদার

ঐতিহ্যবাহী উৎসবে আধুনিক সংযোজন হল ডিজে বা ডিস্ক জকির কসরত। পুরান ঢাকার ডিজেদের পকেট রমরমা এই দিনটিতে। ভাল দামে তাদের ভাড়া করা হয় বিকেল থেকে শুরু করে সারা রাত আধুনিক গান এর তালে উৎসবের উৎসাহে সবাইকে মাতিয়ে রাখার জন্য।

বাংলা পঞ্জিকাকে ধরে প্রতি বছর ইংরেজি জানুয়ারি মাসের ১৪ এবং ১৫ তারিখ এই উৎসব পালিত হয়। এবারও পুরান ঢাকা প্রস্তু ঐতিহ্যের জৌলুশ দেখিয়ে দিতে।