পুরো বাংলাদেশটাকেই ভালো লাগে

চলাফেরায় ও কথাবার্তায় মমতা এবং ব্যক্তিত্বের ছাপ সুস্পষ্ট। থাকেন ছোট ছেলে আহসান হাবীবের সঙ্গে। সাদা শাড়ি পরে যখন সামনে এসে বসলেন তিন সূর্যসন্তানের জননী। হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও আহসান হাবীবের মা তিনি। তার প্রত্যেক সন্তানই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। ৮৩ বছরের জীবনে পেয়েছেন যেমন অনেক, তেমনি হারিয়েছেনও। মুক্তিযুদ্ধে হারিয়েছেন স্বামী, গত বছর ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যান বড় ছেলে হুমায়ূন আহমেদ। নারী দিবসের বিশেষ সংখ্যায় এবারের কথোপকথনের আয়োজনে জীবনদর্শন, চিন্তাভাবনা, অতীত ও বর্তমান নিয়ে কথা হলো রত্নগর্ভা আয়েশা ফয়েজের সঙ্গে।

আপনি একজন রত্নগর্ভা মা। সন্তানদের কি এভাবেই যেভাবে মানুষ করতে চেয়েছিলেন?

সন্তান লালন-পালন কিংবা বড় করার পেছনে সব বাবা-মায়ের একটা উদ্দেশ্য থাকে- সে মানুষের মতো মানুষ হবে, একজন সৎ ও আদর্শবান মানুষের সব গুণ তার মধ্যে থাকবে। আমিও এমনই চেয়েছিলাম। আমার সন্তানরা আল্লাহর রহমতে তেমনই হয়েছে। ওদের পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার কোনো ইচ্ছা ছিল না। চেয়েছিলাম ঠিক এমনই কিছু সুসন্তান, যারা মানুষের মতো মানুষ হবে।

আপনার বিয়ে হয় কোন সালে? আপনার স্বামী মানুষ হিসেবে কেমন ছিলেন? আপনার ছয় ছেলেমেয়ে কারও মধ্যে কি আপনি তাঁর ছায়া দেখতে পান?

বিয়ের পর এরই মধ্যে অনেক সময় পার হয়ে গেছে, তাই বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক মনে করতে পারছি না। আমার স্বামীর কথা যদি বলতে হয় এক কথায় বলব, ভীষণ ভালো একজন মানুষ ছিলেন তিনি। খুবই খেয়ালি, আমুদে-মিশুক একজন মানুষ ছিলেন। সবার সঙ্গেই ছিলো তার সখ্য। আমি মনে করি, এমন একজন মানুষ পুলিশে কখনোই মানানসই ছিল না। আমার মনে হয়, কোনো কলেজ অথবা ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হলে বেশি মানাত। একজন সৎ ও হাসিখুশি মানুষ ছিলেন বলে সবাই তাকে খুব পছন্দ করতেন। ছেলেমেয়েগুলো তার এসব গুণ পেয়েছে। প্রত্যেক সন্তানের মধ্যেই আমি উনার নীতি, সদ্য হাস্যময়ী স্বভাব খুঁজে পাই।

আপনি তো আপনার স্বামীর চাকরির সুবাদে দেশের অনেক জায়গাতেই গিয়েছেন, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দেশের বাইরেও গিয়েছেন। দেশে ও দেশের বাইরে আপনার প্রিয় জায়গা কোনগুলো?

আসলে আমার এই পুরো বাংলাদেশটাকেই ভালো লাগে। ইকবালের বাবার যেহেতু সরকারি চাকরি ছিল, সেহেতু আমাকে একেকবার একেক জায়গায় থাকতে হয়েছে। বগুড়া, সিলেট, রাঙামাটি, বান্দরবান- এ জায়গাগুলোতে থেকেছি। আমি যখন যে জায়গায় থেকেছি, সে জায়গার প্রতি সব সময়ই তখন আমার একটা মায়া জন্মে যেত। আমাদের দেশ ও দেশের মানুষগুলোই এমন। তাই বলব, প্রতিটি জায়গায়ই আমার প্রিয়। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দেশের বাইরে আমেরিকা, সিঙ্গাপুর গিয়েছিলাম। আমেরিকা সুন্দর। মনে পড়ে, একবার আমেরিকায় এক সাংবাদিক আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমেরিকা ভালো লাগে নাকি বাংলাদেশ? আমি বলেছি, বাংলাদেশ। কারণ, বাংলাদেশে আমি ইচ্ছা করলেই একটা রিকশা নিয়ে যে কোনো জায়গায় চলে যেতে পারি, রাস্তাঘাট না চেনা থাকলেও ক্ষতি নেই। আশপাশের মানুষই আমাকে রাস্তা চিনিয়ে দেবে। আসলে, আমার মতো মানুষের জন্য আমার দেশই ভালো। আমেরিকায় সবকিছু পরিপাটি, সাজানো-গোছানো। একবার একটা সুন্দর জায়গা দেখে হুমায়ূনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওটা কী?’ ও বলল, ‘কবরস্থান।’ আমি বললাম, তোরা জিয়ারত করিসনি কেন? জিয়ারত করে আয়। ও হাসতে হাসতে বলল, ‘মা, ওটা কুকুরের কবরস্থান।’

ছেলেদের মধ্যে কার বই পড়তে ভালো লাগে? হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে কি কখনও বইমেলায় গিয়েছিলেন? বইমেলা নিয়ে তাঁর প্রস্তুতি বা উচ্ছ্বাস কেমন দেখতেন?

আমার ছেলেরা সবাই লেখালেখি করে। তাদের বইয়ের পাশাপাশি অন্য অনেক লেখকের বইও পড়ি। ছেলেদের সবার সব বই-ই পড়ার চেষ্টা করি। তবে হুমায়ূনের সব বই আমি পড়েছি, এ ব্যাপারে নিশ্চিত। ওর লেখার ধরণটা একটু ভিন্ন রকম। বই হাতে নিলে পড়া শেষ না করে উঠতে পারি না। মনে হয়, যেন কারও না কারও জীবনের গল্পের সঙ্গে তার লেখাগুলো মিলে যেত। ওর বইগুলো খুব ছোট ছোট হতো। তবে আমি ব্যক্তিগত মোটা বই পড়তে পছন্দ করতাম, যেগুলো পড়তে সময় লাগে, তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে না যায়। একবার সে কথাটা ওকে বললাম। সে তার পরে একটি বড় বই লিখল। বইমেলায় ও খুব একটা যেতে চাইত না। পাঠকদের হুড়োহুড়ি আর ভিড় খুব একটা পছন্দ করত না। আমি ওকে বলতাম, ওরা তো তোর জন্যই আসে, তুই বিরক্ত হোস কেন? একবার ওকে বললাম, আমাকে বইমেলায় নিয়ে যেতে। ও একটা র‌্যাবের গাড়িতে করে আমাকে বইমেলায় নিয়ে গেল।

বইমেলা আর নতুন বইকে নিয়ে ওর উচ্ছ্বাসটা ছিল অন্যরকম। ওর লেখা প্রতিটি নতুন বইয়ের একটি কপি ও আমাকে পাঠাত। জিজ্ঞেস করত কেমন লেগেছে। আমি যদি বলতাম ভালো, অনেক খুশি হতো। মেনে নিত যে বইটি আসলেই ভালো হয়েছে। আসলে ও আমার কথা খুব বিশ্বাস করত। কিছু পরিবর্তন করতে বললে করে দিত। বইমেলায় তার বইগুলো পাঠকনন্দিত হয়েছে শুনলেই তার মধ্যে একটা আনন্দের ভাব দেখা দিত। খুব দুশ্চিন্তামুক্ত হতো। ওর লেখা একটি নাটক এইসব দিনরাত্রিতে যখন টুনি ক্যান্সার রোগে মারা যায়, তখন সেটি নিয়ে অনেক প্রতিবাদ ও আন্দোলন হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে কোথাও কোথাও মিছিল হলো। ব্যানারে লেখা হলো- টুনির কেন মৃত্যু হলো/হুমায়ূন আহমেদ জবাব চাই। এর আগে আমি ওকে বলেছিলাম, হুমায়ূন, তুই টুনিকে মারিস না। ও খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়েছিল, কেন সে সেটা করতে পারবে না। বলেছিল, মা, আমি যদি টুনিকে না মারি, তখন বিষয়টি এমন দাঁড়াবে যে টাকা থাকলেই সব হয়, মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকেও বাঁচানো যায়। কিন্তু বাস্তবতা তো এত সহজ নয়, মা। টাকা থাকলেই সব হয় না, এটাই আমি আমার পাঠককে বোঝাতে চাই। কোথাও কেউ নেই নাটকে বাকের ভাইকে নিয়েও হয়েছিল আরেক কাহিনী, সেটা তো ইতিহাস।

ছেলেমেয়েরা তো সবাই অনেক ব্যস্ত যার যার কাজে। এখন কীভাবে সময় কাটে আপনার?

ছেলেমেয়েরা সব বড় হয়েছে, তাই হয়তো সব সময় ওরা কাছে থাকে না। সময় কাটানো কঠিনই বটে, তবে খাওয়া-দাওয়া, নামাজ, ঘুম আর এর ফাঁকে বই পড়তে পড়তেই এখন সময় চলে যায়।

আপনার আত্মজীবনী লেখার পেছনে কার অনুপ্রেরণা সবচেয়ে বেশি ছিলো?

হুমায়ূনের অবদানটাই বেশি এক্ষেত্রে, জাফরও মাঝেমধ্যে উৎসাহ দিত। হুমায়ূন একদিন বলল, ‘মা, তুমি তো লেখালেখি করো, তো একটা জীবনী লিখে ফেল না! তোমার জীবন তো বিচিত্র সব অভিজ্ঞতায় ভরপুর, পাঠকদের ভালো লাগবে।’ তারপর আমি অনেক সময় নিয়ে লিখলাম। কিন্তু চিন্তা করিনি, ওটা বই হিসেবে বের করব। একবার যখন খুব অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিলাম, তখন ইকবাল জীবনীটাকে বই হিসেবে ছাপিয়ে আমাকে সারপ্রাইজ দিয়েছিল। ওভাবেই লেখা হয়ে গেল। খুব খুশি হয়েছিলাম সেদিন।

আপনি চারটি প্রজন্ম দেখেছেন। যখন আপনি তরুণী ছিলেন, তখনকার নারীদের ঘরের বাইরে অবস্থান আর এখনকার সময়ে নারীদের বাইরে অবস্থান কীভাবে দেখছেন? গণজাগরণ মঞ্চে নারীদের যে অবস্থান, সেটাকেই বা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

আমি যখন তরুণী ছিলাম, তখন মেয়েদের ঘরের বাইরে যাওয়া খুব কঠিন ছিলো। পর্দা নিয়ে ছিলো অনেক কড়াকড়ি। শিক্ষার দিক থেকেও মেয়েরা ছিল পিছিয়ে। পঞ্চম শ্রেণী পাসের পরই মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার একটা হিড়িক পড়ে যেতে। মুসলিম পরিবারগুলোতে এই সমস্যা আরও বেশি ছিল। আমার শ্বশুর মাওলানা ছিলেন। পর্দার মধ্যেই থাকতে হতো সব সময়। আমি বলছি না এটা খারাপ কিছু, তবে সবকিছুই একটি সীমা এবং সহনীয় পর্যায়ে থাকা উচিত। এখনকার নারীরা তো স্বাধীনতা পেয়েছে বাইরে পড়াশোনা-ঘোরাঘুরিসহ অনেক ব্যাপারেই। সেটা ভালো। শাহবাগে নারীদের যে অবস্থান, এটা অনেক ভালো লেগেছে। মনে হচ্ছে, এখনকার সময়ের নারীরাও পুরুষের পাশাপাশি তাদের দাবি আদায়ে সোচ্চার হয়েছে। আমিও সেখানে গিয়ে ওদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম একদিন। এই যে নারীদের এ অবস্থান, বিশ বছর আগে এটা ভাবাই যেত না। ওরা যা করছে, আসলে এটাই হওয়া উচিত ছিল।

আপনি তো ৫২, ৬৯, ৭১ ও ৯০ দেখেছেন। ২০১৩-এর শাহবাগও দেখছেন। অনেকে বলছেন, এটি দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ। আপনার কী মনে হয়?

১৯৭১ সালে তোমাদের বয়সী ছেলেমেয়েরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নির্দ্বিধায়, দেশ স্বাধীন করেছে। ওরা না থাকলে তো স্বাধীনতা আসত না। স্বাধীনতার পরও অনেক কাজ বাকি ছিল। শাহবাগের ছেলেমেয়েরা  সেই বাকি কাজটি সম্পূর্ণ করার জন্য আন্দোলন করছে। আসলে রাজাকাররা ১৯৭১-এ যে অপকর্ম করেছে, তার শাস্তি কী দিলে সর্বোচ্চ হবে, তা বলতে পারছি না। ফাঁসির ওপরে তো এখন কোনো শাস্তি নেই। তবে সেটাই হোক। দেখে ভালো লাগছে যে, আমাদের এই ছেলেমেয়েরা দেশের জন্য একসঙ্গে হয়েছে। এটা দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ কি-না জানি না। তবে এটাই হওয়ার দরকার ছিল।

আপনি তো যুদ্ধ দেখেছেন, যুদ্ধ-পূর্ববর্তী আর পরবর্তী এবং বর্তমান সময়ের বাংলাদেশ নিয়ে আপনি কী ভাবেন? একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আমরা কতটুকু এগোতে পেরেছি।

যুদ্ধের আগের বাংলাদেশ এবং যুদ্ধের পরের বাংলাদেশ সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। যুদ্ধের আগে মানুষ ছিল একটা শোষণের খাঁচায় বন্দি। তখন সম্পদ ছিল কম, সুযোগও ছিল কম। সে সময় এত দুর্নীতি ছিল না। রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতা ছিল, কিন্তু তা এখনকার মতো নয়। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দেশে অনেক অভাব ছিল। দেশ অনেক সংকটে ছিল। এখন দেশের অনেক উন্নতি হয়েছে সব দিকেই। কিন্তু দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা এত পরিমাণ বেড়েছে, মনে হয় যুদ্ধের পরপরই যে নতুন বাংলাদেশ পেয়েছিলাম, সেটিই ভালো ছিল। তবে আমি আশাবাদী, নিশ্চয় সুদিন আসবেই।

৮ মার্চ সারা বিশ্বে নারী দিবস পালিত হয়। এই দিনটি নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

নারীর জন্য আলাদাভাবে কোনো দিবসের দরকার বোধহয় নেই। তার পরও নারী দিবস পালিত হচ্ছে, তাতেও তো ক্ষতি নেই। একটি বিশেষ দিন না হয় থাকলই! দিনটি যদি নারীদের কোনো কাজে আসে তবেই সার্থকতা।

আপনার বয়স এখন কত একটু বলবেন? জীবনের এতগুলো বছর পার করার পর কোনো ইচ্ছা কি অপূর্ণ আছে?

আমার বয়স এখন ৮১ বছর। আল্লাহ আমাকে অনেক দিয়েছেন, তাই আমি কৃতজ্ঞ। আমার ছেলেমেয়েরা মানুষের মতো মানুষ হয়েছে, এটা আমার অনেক বড় প্রাপ্তি। অপ্রাপ্তির কিছুই নেই জীবনে।

দেশের মানুষের প্রতি আপনার কি কিছু বলার আছে?

তেমন কিছু বলার নেই। শুধু বলব, আপনারা আমার ছেলেদের ভালোবেসেছেন, সব সময় তাদের পাশে থেকেছেন, এ জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমি খুব গৌরব বোধ করি এ জন্য। হুমায়ূনের জন্য লাখো মানুষ কেঁদেছেন, তাকে ভালোবেসেছেন, সম্মান দিয়েছেন- এ জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। হুমায়ূনের মৃত্যুর পরও আপনারা আমাদের কাছে আসছেন, আমাদের মনে রাখছেন, ভালো লাগে আমার। আমি দোয়া করি, আপনারা সবাই ভালো থাকুন সব সময়। দেশকে ভালোবাসুন!

 

ছবি: খালেদ পারভেজ রানা