উৎসবমুখর বেঙ্গল বই প্রাঙ্গণ

শহর ঢাকায় দম ফেলার জায়গা বড় কম। উপলক্ষ আরও কম। তাইতো ফুরসত পেলেই দল বেঁধে হাজির হয়ে যায় খোলা ময়দানে কিংবা পড়ার টঙ দোকানে। অবিরাম আড্ডার সুযোগ পেলে উৎসবমুখো বাঙালিকে আর কে পায়! আড্ডা, গান, মানসম্মত খাবারের সন্ধান পেলে বাঙাল হয়ে যায় ‘পঙ্গপাল’। কিন্তু রোজকার নয়টা-পাঁচটার ঘড়িবাঁধা জীবনে সেই সুযোগ কই? নগরের নতুন ‘বাতিঘর’ বেঙ্গল বই তাই বেছে নিয়েছে ছুটির দুদিন শুক্র ও শনিবার- পুস্তক প্রেমী আর আড্ডা পিপাসুদের জন্য আয়োজন করেছে পালাগান ও যন্ত্রসংগীতের। সেই সঙ্গে ছিলো প্রতি সপ্তাহের নিয়মিত আয়োজন সকালের নাস্তা। গত ২৪ ও ২৫ নভেম্বর এরকম নানাবিধ আয়োজনে বেঙ্গল বই প্রাঙ্গণ ছিলো উৎসবমুখর।

সকালের নাস্তায় গরম গরম লুচির স্বাদ নিতে কলাবাগান থেকে ছুটে এসেছিলেন স্থপতি শুভ্র সুমন। মুগ্ধতার কথা জানাতে নিজের উচ্ছ্বাস গোপন করলেন না। বললেন, সকালের রোদে বেঙ্গল বইয়ের উঠোনে বসে লুচি আর লাবড়া খেতেই এসেছিলাম। কিন্তু নাস্তা শেষে হারিয়ে গেলাম বইয়ের রাজ্যে। ধোঁয়াওঠা কফির কাপের সঙ্গে পচ্ছন্দের বইটি হাতে নিয়ে চুপটি করে কোন এক কোণে বসে বসে বইয়ের মাঝে ডুব দিতে সত্যি দারুণ এক আয়োজন। আগামী সপ্তাহে লুচির গন্ধেই হাজির হয়ে যাবো আবার।

জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক আনিসুল হকও হাজির হয়েছিলেন সকালের নাস্তা খেতে। সেখানে ছবি তুলে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘বাড়ির কাছে বেঙ্গল বই। সেথা শুক্র শনিবারে দেশি নাশতা। ডায়েট মাথায় উঠল।’

সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোকে রাঙিয়ে তুলতে ছিলো সাংস্কৃতিক আয়োজন। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটায় লোকগান ও মহুয়ার পালা পরিবেশন করেন ইসলাম উদ্দিন বয়াতী এবং মিলন বয়াতী ও তার দল। পালাগান, লোকগান যে আমাদের রক্তে মিশে আছে তারই প্রমাণ দিলেন শত শত দর্শক শ্রোতা। নির্ধারিত চেয়ার ভর্তি হয়ে চারিদিকে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন দর্শকেরা। পেছন থেকে উঁকি দিয়েও দেখা যাচ্ছিল না। তাই কেউ কেউ অবস্থান নিয়েছেন বেঙ্গল বইয়ের দোতলার বারান্দায়। সেখানেই কথা হয় বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা আহসান হাবিবের সঙ্গে। ছুটির সন্ধ্যা উপভোগ করতে সস্ত্রীক মোহাম্মদপুর থেকে চলে এসেছেন বেঙ্গল বইয়ে। বই বিপনির প্রসংশা করে তিনি বলেন, এরকম আয়োজনের আসলে প্রয়োজন হয়ে পড়েছিলো। তবে শুধুমাত্র ধানমণ্ডিতেই নয়, উত্তরা, মিরপুর প্রতিটি আবাসিক এলাকাতেই এরকম বই পড়া এবং কেনার জায়গা থাকা উচিত। সময় করে নিয়মিতই এখানে আসব বই কিনতে এবং পড়তে।

মূলত বইয়ের দোকান ঘুরে দেখতে বেঙ্গল বইয়ে এসেছিলেন সুস্মিতা খান। আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলিনা এট চ্যাপেল হিল এর সহযোগী গবেষক হিসেবে কাজ করছেন তিনি। বইয়ের সমারোহ তাকেও মুগ্ধ করেছে। তিনি বললেন, বই পড়া এবং কেনার এরকম ধারণা একেবারেই নতুন না হলেও বেঙ্গল বই সবাইকেই ছাড়িয়ে গেছে। প্রবেশ মুখেই ওয়াকিলুর রহমানের ভাস্কর্য এবং গাছপালা ঘেরা পরিসর ইট কাঠের এ শহর থেকে একটু হলেও প্রশান্তি দিলো। তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে তিন তলার শিশুদের কর্ণার। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এখানকার কফির স্বাদও দারুণ লেগেছে। অন্যদের চেয়ে দেশি বইয়ের সংগ্রহ বেশি থাকায় বেঙ্গল বইকে এগিয়ে রাখলেও বইয়ের সংখ্যা আরও বেশি হওয়া উচিত বলেও মত দিলেন তিনি।

শনিবার সন্ধ্যাও মুখর ছিলো দর্শনার্থীদের পদচারণায়। এদিন সন্ধ্যা শুরু হয় গিটার এভং সরোদের মিশ্র যন্ত্রসংগীত দিয়ে। এসময় সারগীত বাদন পরিবেশন করেন মো: নাসির উদ্দিন। মো: সাখাওয়াত হোসেনের তবলার সঙ্গে প্রথমে রাগ কিরওয়ানী তারপর ধুন এবং সবশেষে ফিউশন পরিবেশন করেন তারা। সারগীত শেষ হলে তবলা, বেহালা ও বাঁশির সমবেত যন্ত্রসংগীত পরিবেশন করেন সবুজ আহমেদ, শান্ত আহমেদ ও কামরুল আহমেদ। রাগ চন্দ্রকোষ এবং শেষে ধুন এর মাধ্যমে পরিবেশনা শেষ করেন তারা। একই সঙ্গে যন্ত্রসংগীত এবং বইয়ের রাজ্য ঘুরে দেখতে এসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইশান শাহরিয়ার। বাদ্যযন্ত্রের চেয়ে বইয়ের মাঝেই ডুবে ছিলেন তিনি। ‘ঢাকায় যতগুলো বড় বড় বইয়ের দোকান আছে তার মধ্যে বেঙ্গল বই দেখলাম সবচেয়ে বড় এবং সমৃদ্ধ। বই কিনতে এবং পড়তে নিয়মিতই এখানে আসা হবে’, বললেন ইশান।

উল্লেখ্য, চলতি মাসের ১৪ তারিখ ধানমন্ডিতে যাত্রা শুরু করে বই বিপনি- বেঙ্গল বই। এর দোতলা এবং তিনতলাজুড়ে আছে দেশি বিদেশি বই। নিচতলায় সব ধরনের পাঠকের জন্য আছে পুরনো বই ও ম্যাগাজিন এবং চায়ের ব্যবস্থা। দোতলায় বইয়ের পাশাপাশি আছে একটি ক্যাফে। আর তিনতলার প্রায় পুরোটাজুড়ে রয়েছে শিশুদের জন্য বই আর বিভিন্ন শিক্ষাসহায়ক উপকরণ।

ভবিষ্যতে বেঙ্গল বইয়ে নিয়মিত পাঠচক্র, কবিতা পাঠের আসর, নতুন লেখা ও লেখকের সঙ্গে পরিচিতিমূলক সভা, প্রকাশনা উৎসব, চিত্র ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীসহ নানা আয়োজন থাকবে বলে জানালেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাব্যবস্থাপক আতাউর রহমান। এছাড়া আগামী শুক্র ও শনিবার সকালের খাবারসহ সন্ধ্যায় শিশুদের জন্য পাপেট শো এবং থিয়েটার পরিবেশনার কথা রয়েছে বলেও জানান তিনি।