একুশে গ্রন্থমেলা: প্রকাশ বেদনা, প্রকাশের বেদনা

‘বই ছাড়া একটা ঘর আত্মাহীন শরীরের মতো’, বলেছিলেন মার্কাস সিজারো। অমর একুশে গ্রন্থমেলা অনেকটা সে রকমই। জড়িয়ে থাকা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, শহীদদের রক্তস্নাত বর্ণমালা, আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি চর্চা। তাই তো প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি এলেই বইমেলা মুখর হয় লেখক-পাঠক-দর্শনার্থীর মিলনোৎসবে। যেন নতুন বইয়ের ঘ্রাণ বয়ে আনে বসন্ত দিনের আগমনী বার্তা। সময়ের প্রয়োজনে, বাংলা একাডেমির চেনা চৌহদ্দি আগেই ছড়িয়েছে, এবারও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইরাজ্যের কলেবর বেড়েছে কয়েক গুণ। ব্যবস্থাপনাতেও খানিক পরিকল্পনার ছাপ, হকারমুক্ত ফুটপাত, সিসি টিভির নজরদারি, সবাই ইতিবাচক, শুধু বদলায়নি পদচারণাপ্রসূত ধুলাবালির উৎপাত। সাম্প্রতিক সময়ের লেখক-ব্লগারদের ওপর ধারাবাহিক হামলা-খুন-জখম মেলা জমে ওঠার ক্ষেত্রে অন্তরায় হতে পারে বলেও অনেকের আশঙ্কা অন্তত এখন পর্যন্ত অমূলক প্রমাণিত হয়েছে। মেলায় লোক আসছেন। বই দেখছেন, বই কিনছেনও। অপেক্ষাকৃত কম বই প্রকাশিত হবে বলে যে সন্দেহ, তাও আশা করি মাসান্তে ভুল প্রমাণিত হবে। ভেঙে যাবে আগের বছরের রেকর্ড।

অস্বীকার করার জো নেই, এই মেলাতেই বের হয়েছে হাসান আজিজুল হকের আগুনপাখি। হুমায়ুন আজাদ ও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর চিন্তাশীল লেখা। প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ কিংবা ইমদাদুল হক মিলন, সেলিনা হোসেন, শহীদুল জহির থেকে হালের নতুন নতুন ফিকশন ও নন-ফিকশন লেখকদের বই প্রকাশ আর প্রাপ্তির উপলক্ষ এখন একটাই- অমর একুশে গ্রন্থমেলা। শত শত তরুণের স্বপ্ন ও রক্তক্ষরণের স্মারক এই বইমেলা। কয়েক বছর ধরেই পাচ্ছি বিশ্বসাহিত্যের, জ্ঞানভাণ্ডারের আশ্চর্য সব মানিক রতন ভাষান্তরের মাধ্যমে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও গবেষণামূলক বই প্রকাশের হারও ইতিবাচক। একুশে বইমেলাকে ঘিরে নানা রকম অনুষ্ঠান-আলোচনা-বৈঠকি সচল রাখে আমাদের সাহিত্যের অগ্রযাত্রাকেও।

এখনো এই মেলায় বাবা তাঁর সন্তানকে আনেন, পরিচয় করিয়ে দেন রক্তভেজা বর্ণমালা আর সদ্য আঠার গন্ধ মাখা বইয়ের সঙ্গে। হয়তো কোনো নাম করা লেখককে দেখলে কোলের শিশুটিকে উঁচিয়ে ধরে বলেন, ‘উনি লেখক, উনি কবিতা কি গল্প কি নাটক কি উপন্যাস বা অন্য কিছু লেখেন’। লেখকরাও দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসেন মেলার সময়টায়। আড্ডা, আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্কে হয় ভাবের বিনিময়, বোধের বিনিময়। এই যে বইয়ের কাছে যাওয়া, সেই সূত্রে লেখকের সঙ্গে পাঠক, পাঠকের সঙ্গে পাঠক, লেখকের সঙ্গে লেখক, সর্বোপরি মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্মিলন এটা অমর একুশে গ্রন্থমেলার সবচেয়ে বড় অবদান।

বাংলাদেশে সারা বছরে যত সৃজনশীল ও মননশীল বই প্রকাশিত হয়, তার প্রায় নিরানব্বই ভাগ প্রকাশিত হয় ফেব্রুয়ারিতে। এটা একই সঙ্গে আশা ও হতাশার ব্যাপার। আশার এই কারণে, এর মাধ্যমে একটি সময়খণ্ডে লেখা ও লেখকের মেলবন্ধন রচিত হয়। আর হতাশার এ কারণে যে, এর পরেই যেন বিস্মৃতি ও বন্ধ্যাকাল দেয় হানা। সেই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে, এই যে হাজার হাজার বই বের হয় বইমেলায়, এর কতটুকু মানসম্মত? অনেকে বলেন, শত ফুল ফুটতে দাও। এর মধ্যে পুজোর ফুলও নিশ্চয় ফুটবে। কিন্তু আমরা দেখেছি বেশির ভাগ প্রকাশনা সংস্থারই কোনো বাছাই কমিটি নেই। কোন পাণ্ডুলিপি বই হবার যোগ্য আর কোনটা নয়, সেটা নিশ্চিত হবেন কীভাবে?

সার্বক্ষণিক লালন ও চর্চাহীন চেতনা থেকে পোশাকি উৎসবের জন্ম হতে পারে। কারণ এতে জেঁকে বসে নানান বিচ্যুতি। যেমন অমর একুশে গ্রন্থমেলা এখন অনেকটাই পরিণত হয়েছে দেশীয় প্রকাশকদের বই প্রকাশ আর বিক্রির লাভ-লোকসানের ক্ষেত্র হিসেবে। এই মেলায় যত বই বের হয়, শিল্প-সাহিত্যে যে উন্মাদনা তৈরি হয়, তার অপমৃত্যু দেখা যায় মাসটা পেরোলেই। আমাদের বইয়ের পরিবেশন ও বিপণন চেইন গত দশকেও যেটুকু ছিল, সেটাও এখন নষ্ট হয়ে গেছে। এখন জেলা-উপজেলা শহরগুলোতে তো দূরের কথা, অনেক প্রকাশনার বই বিভাগীয় শহরগুলোতেও পৌঁছায় না। ফলে আমাদের বই উৎপাদন, পরিবেশন ও বিপণনের ভরসা শুধু অমর একুশে গ্রন্থমেলা। এ কারণে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হলেও অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুধুই দেশীয় প্রকাশকদেরই মেলা। যেখানে অন্য দেশের বইগুলোকে ঢুকতে দেওয়া হয় না প্রকাশকদের ভয়ে, তেমনটি হলে পাঠক ভিনদেশি বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় ধারার বইগুলো কিনবে, দেশীয় বই কিনবে না। কিন্তু বই আর আট-দশটা পণ্যের মতো নয়, এর সঙ্গে জ্ঞান ও মননের বিষয়ও জড়িত। সে কারণে বই আসার দুয়ার বন্ধ করা যাবে না। প্রয়োজনে দেশীয় পরিবেশক প্রথা চালু করা যায় কি না, বা অন্য কোনো উপায় আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।

বিদেশে একটি বই বের হবার আগে ও পরে তাকে ঘিরে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা ও আলোচনা-সমালোচনা হয়। প্রকাশকরা তাঁদের ভালো বইগুলো নিয়ে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজির হন, লেখককে হাজির করেন পাঠকের সামনে, আয়োজন করেন পাঠসন্ধ্যার, যেখানে পাঠকরা প্রশ্ন করেন লেখককে, লেখক জবাব দেন। এভাবে বই শুধু একটি বস্তুগত ব্যাপারে আবদ্ধ থাকে না, বোধের উন্নয়ন ও চিন্তা বিনিময়ের দ্বিপক্ষীয় আদান-প্রদানের সঙ্গ হয় বইয়ের মারফতে। একজন নতুন পাঠক সেই অনুষ্ঠানে বসে হয়তো আগ্রহী হন সাহিত্যচর্চায়। এই প্রক্রিয়া বিশ্বজুড়েই চলে পুরো বছর ধরে। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা কেবল ফেব্রুয়ারি মাসেই সেই সুযোগ পাই। আর বছরের অন্য সব সময় আমরা থাকি বইবিমুখ। এ জন্য পাঠের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। প্রয়োজন স্কুল-কলেজে বন্ধ পড়ে থাকা লাইব্রেরির তালাগুলো ভাঙা। সর্বোপরি প্রয়োজন বাংলা ভাষার চর্চা ও ব্যবহারকে উৎসাহিত করা। একজন মানুষ ভালো ইংরেজি পারলে তাকে আমরা কোম্পানির বড় কর্তা বানাই, যে যত ইরেজি মিশিয়ে কথা বলছে, তাকে তত স্মার্ট হিসেবে বিবেচনা করি। পরভাষা শিখব না কেন? অবশ্যই শিখব। কিন্তু কেউ শুদ্ধভাবে বাংলা বললে তাকে কি আমরা চাকরি-বাকরি-ব্যবসা-বাণিজ্যে বাড়তি সুবিধা দেই? দিচ্ছি? মায়ের ভাষার অধিকার রক্ষার পাশাপাশি আমাদের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে কিন্তু এই অর্থনৈতিক বিষয়টিও জড়িত ছিল। আমরা যেন সেই বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করি। তাহলে বই, শিল্প-সাহিত্য সবই এগিয়ে যাবে, মোচন হবে ভাষাশহীদের রক্তের ঋণ। নয়তো আমাদের ভবিষ্যতের পাথেয় শুধু শহীদ মিনার আর সালাম-রফিকের কবরে ফুল দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা।

 

ছবি: টুটুল নেছার