ঐ নতুনের কেতন ওড়ে

ততক্ষণে নির্ধারিত আনুষ্ঠানিকতা শেষ। জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনের ভেতর থেকে ভেসে আসছে লাইসা আহমেদ লিসার মায়াভরা কণ্ঠ- এ সমূদ্রে আর কভু হব নাকো পথহারা। ‘পথহারা’ না হবার প্রত্যয়দীপ্ত তরুণ কবি ও লেখকেরা তখনও সৌজন্য বিনিময় করছেন পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে। নিরন্তর শুভকামনায় বিশেষ দিনটি বিশেষ হয়ে রইল আলতাফ শাহনেওয়াজ, রাজীব হাসান, মিজানুর রহমান বেলাল, হোসনে আরা জাহান, তাপস রায় ও মামুন সিদ্দিকীর। এ ছয়জন তরুণ লেখক ভূষিত হলেন ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার’-এ।

দশমবারের মতো কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার প্রদান করা হলো গতকাল ৩০ জানুয়ারি। জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সম্মানীয় অতিথি বিশিষ্ট রবীন্দ্র গবেষক ও প্রাবন্ধিক মার্টিন কেম্পশেন, বিশেষ অতিথি কথাসাহিত্যিক, শিল্প-সমালোচক ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, কালি ও কলম প্রকাশক আবুল খায়ের, এমিরেটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান এবং কালি ও কলম সম্পাদক আবুল হাসনাত। এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কালি ও কলম সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি এমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। বক্তব্য রাখেন কালি ও কলমের প্রকাশক আবুল খায়ের। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন কালি ও কলম সম্পাদক আবুল হাসনাত। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালন করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী। বিজয়ীদের উদ্দেশ্যে শংসাবচন পাঠ করেন রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ, অধ্যাপক মাহবুব সাদিক এবং কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। এই পুরস্কারের ওপর নির্মিত একটি ভিডিওচিত্রও প্রদর্শন করা হয় এসময়।

অনুষ্ঠানের সভাপতি এমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান পুরস্কৃতদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘কালি ও কলম পুরস্কার’ পাওয়া তরুণদের অনেকেই সাহিত্যক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। তাদের একজন এবার বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন। সুতরাং কালি ও কলম পুরস্কার অপাত্রে পড়েনি।

সাহিত্যের প্রগতি ধরে রাখেন নবীন সাহিত্যশ্রমিকেরা। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রথাবিরোধী নতুন চিন্তা সঞ্চারের মাধ্যমে কালে কালে সাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করেন তরুণ সাহিত্যিকরা। তাদের মাধ্যমেই সাহিত্য-সংস্কৃতি বিকাশ লাভ করে। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বললেন তেমনটিই, চার হাজারের বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহ্যের ধারা বহমান পুরস্কারপ্রাপ্ত তরুণ লেখকদের সৃষ্টিতে। বাঙালির সংস্কৃতির ঘাটতি পূরণের জন্য সবার প্রতি বাংলার চর্চা দৃঢ় ও অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।

বক্তব্য রাখছেন কালি ও কলম প্রকাশক জনাব আবুল খায়ের

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, কালি ও কলম এদেশের পাঠকদের জন্য সাহিত্য রুচি গড়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাহিত্যকে বাংলাদেশ ছাড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গসহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে কালি ও কলম। পুরস্কারপ্রাপ্তদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, যে  কোনো পুরস্কার আনন্দদায়ক, সে সঙ্গে দায়িত্ববোধ তৈরি করে। আজকে যারা পুরস্কার পেলো, তাদের কাছ থেকেও আরো বেশি ভালো লেখা প্রত্যাশা করবো।

সম্মানীয় অতিথি মার্টিন কেম্পশেন তার শুভেচ্ছা বক্তব্যে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। কালি ও কলম দুই বাংলার মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ‘আপনারা একটা কাজ শুরু করেছেন, যেটা আমাদের প্রত্যেক সংস্কৃতির জন্য খুবই প্রয়োজন। পুরস্কারপ্রাপ্তরা একাকী ধৈর্য্য ধারণ করে দিনের পর দিন তাদের সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখবেন’, বলে পুরস্কারপ্রাপ্তদের অভিনন্দন জানান মার্টিন কেম্পশেন।

ড. আনিসুজ্জামান ও আবুল হাসনাতকে ধন্যবাদ জানিয়ে কালি ও কলম প্রকাশক আবুল খায়ের বলেন, আমি অত্যন্ত ভাগ্যবান যে গত ১৫ বছর ধরে কালি ও কলম নিয়মিত প্রকাশ হয়ে আসছে।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে প্রকাশিত অনূর্ধ্ব ৪০ বছর বয়সী বাংলাদেশি তরুণ কবি ও লেখকরা এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। ২০১৭ সালের কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কারের পাঁচটি বিভাগে বিজয়ী ছয়জন হলেন- কবিতায় যৌথভাবে জুমজুয়াড়ি গ্রন্থের জন্য মিজানুর রহমান বেলাল ও নিশিন্দা পাতার ঘ্রাণ গ্রন্থের জন্য হোসনে আরা জাহান, কথাসাহিত্যে এই বেশ আতঙ্কে আছি গ্রন্থের জন্য তাপস রায়, প্রবন্ধ গবেষণা ও নাটক বিভাগে নৃত্যকী গ্রন্থের জন্য আলতাফ শাহনেওয়াজ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের অজানা ভাষ্য গ্রন্থের জন্য মামুন সিদ্দিকী এবং শিশু-কিশোর সাহিত্যে হরিপদ ও গেলিয়েন গ্রন্থের জন্য রাজীব হাসান। বিজয়ীদের মোট পাঁচ লক্ষ টাকা, প্রত্যেককে একটি করে ক্রেস্ট ও শংসাবচন প্রদান করা হয়।

পুরস্কার, সম্মান, সম্মানী সবকিছুতেই রয়েছে অনুপ্রেরণার উৎস। নিজেদের অভিব্যক্তি ব্যাক্ত করতে গিয়ে এমনটাই বললেন পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকবৃন্দ। বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় নতুন ভাবনার চাষ করার প্রত্যয় ব্যক্ত হলো তাদের কণ্ঠে।