কাজী মোতাহার হোসেন

 

একজন বিখ্যাত লেখক, বিজ্ঞানী, পরিসংখ্যানবিদ এবং সাংবাদিক হিসেবে কাজী মোতাহার হোসেন একটি অতি পরিচিত নাম। সাহিত্যে বিচিত্রতা তাঁকে বিখ্যাত করতে সক্ষম করেছে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। দাবা খেলায়ও প্রতিভার পরিচয় দিয়ে গিয়েছেন কাজী মোতাহার হোসেন।

১৮৯৭ সালের ৩০ জুলাই কুষ্টিয়া জেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামে কাজী মোতাহার হোসেন জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম কাজী গওহর উদ্দিন আহমেদ এবং মায়ের নাম তছিরুন্নেসা। তাঁর বাবার গ্রাম ফরিদপুরের বাগমারায় অতিবাহিত হয় শৈশবকাল। সেখানেই একটি প্রাথমিক স্কুল এবং বাবার কাছ থেকে তাঁর প্রথম শিক্ষাপ্রাপ্তি। পরে মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে তিনি ভর্তি হন কুষ্টিয়া জিলা স্কুলে। সেখানে জ্যোতিন্দ্রনাথ রায় এবং জ্যোতিন্দ্র মোহন বিশ্বাসের কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন। সে সময় যন্ত্র-সংক্রান্ত কোর্সে তিনিই একমাত্র ছাত্র ছিলেন। ১৯১৫ সালে তিনি সেখান থেকে প্রবেশিকা পাস করেন।

এরপর তিনি আইএসসি কোর্সের জন্য কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, স্টার্লিংয়ের মতো মহান শিক্ষকদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করতে থাকেন। কিন্তু মধ্য পথে একটি অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার কারণে তাঁকে রাজশাহী কলেজে চলে আসতে হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও এ সময় তাঁর দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যায়। রাজশাহী কলেজ থেকে ১৯১৭ সালে তিনি আইএসসি পাস করেন।

আইএসসি পাস করার পর গণিত ও পদার্থবিদ্যার ওপর উচ্চশিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে তিনি ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। ১৯১৯ সালে তিনি সেখান থেকে বিএ পাস করেন।

১৯২০ সালে সাজেদা খাতুনের সঙ্গে কাজী মোতাহার হোসেন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিখ্যাত লেখক কাজী আনোয়ার হোসেন, জোবাইদা মির্জা, সানজীদা খাতুন তাঁদেরই ঘরে জন্মলাভ করেন।

১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ঢাকা কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যায় এমএ পাস করেন তিনি। এ সময় সদ্য প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সত্যেন বোসের কাছ থেকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ সাহায্য পেয়েছিলেন। পরে সত্যেন বোসের উৎসাহ-উদ্দীপনায় তিনি পরিসংখ্যানের ওপর অধ্যায় করতে কলকাতা যান। এ সময় পরিসংখ্যান এ উপমহাদেশের জন্য একটি নতুন বিষয় ছিল। বিখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিশ কলকাতায় ভারতীয় ছাত্রদের এই নতুন বিষয়ে শিক্ষার উদ্দেশ্যে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। এখান থেকে ১৯৩৮ সালে কাজী মোতাহার হোসেন ডিপ্লোমা অর্জন করেন।

১৯২৩ সালে কাজী মোতাহার হোসেন সে সময় সদ্য প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে একজন প্রদর্শক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে কাজী মোতাহার হোসেন ১৯৬০ সালে  ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’ উপাধি অর্জন করেন, যা ছিল তাঁর অসামান্য সাফল্যের স্বীকৃতি। ১৯২৬ সালে তিনি কাজী আবদুল ওদুদ, সৈয়দ আবুল হোসেন এবং আবুল ফজলের সঙ্গে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানের পত্রিকা ‘শিখা’র সম্পাদক হিসেবে কাজী মোতাহার হোসেন কিছু সময় কাজ করেন। মুসলিম সমাজের স্বাধীনতায় পত্রিকাটির ভূমিকা ছিল সক্রিয়। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সমালোচনামূলক সমর্থিত লেখনীর অবদান ছিল অনস্বীকার্য।  ১৯৬১ সালে কাজী মোতাহার হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি সে সময়ের পরিসংখ্যানের নেতৃত্ব প্রদানকারী স্কুল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যাটিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৬৪ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানকার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে কর্মরত থাকেন। পরে ১৯৬৬ সালে বার্ধক্যের কারণে তিনি সেখান থেকে অবসর নেন। ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাজী মোতাহার হোসেনকে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত করে।

কাজী মোতাহার হোসেন আরেকটি বিষয়ে বিশেষ দক্ষতার অধিকারী ছিলেন, সেটি হলো দাবা খেলা। তিনি সাতবার ভারত দাবা চ্যাম্পিয়ন হন। তাঁর জন্যই সে প্রজন্মের কাছে দাবা একটি জনপ্রিয় খেলায় পরিণত হয়। শুধু তা-ই নয়, কাজী মোতাহার হোসেন বাংলাদেশের ‘দাবাগুরু’ হিসেবেও পরিচিত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৫ সালে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপকের খ্যাতি অর্জন করেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ অবস্থানে সজ্জিত ছিলেন।

কাজী মোতাহার হোসেন বিজ্ঞান, ধর্ম, সংস্কৃতি ও সংগীত-সংক্রান্ত অনেক বই লিখেছিলেন। তার মধ্যে ‘সঞ্চারণ’, ‘নজরুল কাব্য পরিচিতি’, ‘গণিত শাস্ত্রের ইতিহাস’, ‘আলোকবিজ্ঞান’, ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ উল্লেখযোগ্য। কাজী মোতাহার হোসেনের প্রথম প্রকাশিত বই ‘সঞ্চারণ’, যা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃকও প্রশংসিত হয়েছিল। বাংলা একাডেমি তাঁর কাজগুলো চারটি খণ্ডে প্রকাশ করে।

কাজী মোতাহার হোসেন ফাউন্ডেশনের অধীনে ২০০৪ সালে ‘স্মৃতিকথা’ নামে বই প্রকাশিত হয়, যেখানে ১৮ জন মনীষীর জীবনী উল্লেখ ছিল। একই বছরে তাঁর ‘গণিত শাস্ত্রের ইতিহাস’ ফাউন্ডেশন থেকে পুনর্মুদ্রণ হয়। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ফেলো।

কাজী মোতাহার হোসেন তাঁর সমগ্র জীবনে অসংখ্য মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অর্জন করেছেন। তার মধ্যে একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক ডিএসসি পুরস্কার, নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক, স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার, মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার উল্লেখযোগ্য।

১৯৮১ সালের ৯ অক্টোবর কাজী মোতাহার হোসেন মৃত্যুবরণ করেন। যুক্তিবিদ্যা, প্রাঞ্জলতা, ভাষার স্বচ্ছতা এবং সরলতা তাঁর কাজকে একদিকে যেমন তাঁকে সবার থেকে আলাদা করেছে, অন্যদিকে তাঁকে করে তুলেছে অমর।