কাঠমাণ্ডু ট্রিয়েনালে বাংলাদেশের আট শিল্পী

শেষ হলো কাঠমাণ্ডু ট্রিয়েনাল। নেপালের শিল্প ও সংস্কৃতি বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে সিদ্ধার্থ আর্টস ফাউন্ডেশন কাঠমাণ্ডু ট্রিয়েনাল নামে এই অবাণিজ্যিক শিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করে থাকে। এখানে নেপালসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের কাজ একসঙ্গে প্রদর্শনীর মাধ্যমে শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব অনুসন্ধান করা হয়।

মূল অনুষ্ঠান শুরু হয় ২৪ মার্চ, সমাপ্ত হয় ৯ এপ্রিল। তৃতীয়বারের মতো আয়োজিত এই আসরটি। প্রথম দুবার অবশ্য ‘কাঠমাণ্ডু ইন্টারন্যাশনাল আর্ট ফেস্টিভ্যাল’ নামে ২০০৯ ও ২০১২ সালে দুটি ভিন্ন থিম নিয়ে আয়োজিত হয়েছিল। ২০১৫ সালে প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের কারনে পিছিয়ে এবং ‘কাঠমাণ্ডু ট্রিয়েনাল’ শিরোনামে এ অনুষ্ঠান আবার আয়োজন করে সিদ্ধার্থ আর্টস ফাউন্ডেশন। নতুন এ ধরণে নেপালের সাথে বহির্বিশ্বের শিল্পী, কিউরেটর, শিল্পোদ্যক্তা এবং প্রতিষ্ঠানের সংযোগ ঘটাতে চেয়েছেন আয়োজকরা। সে লক্ষ্যেই ২৫টিরও বেশি দেশ থেকে এ সম্মিলনে যোগ দিয়েছেন ৫০ জনেরও অধিক শিল্পী।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস অর্থাৎ ২৬ মার্চে শুরু হয় বাংলাদেশী শিল্পীদের প্রদর্শনী। নেপালে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশফী বিনতে শামস ও কাঠমাণ্ডু ট্রিয়েনালের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সঙ্গীতা থাপা নেপালের ললিতপুরের পার্ক গ্যালারিতে যৌথভাবে উদ্বোধন করেন অনুষ্ঠানটি। বাংলাদেশ থেকে ৮ জন শিল্পী তাদের শিল্পকর্মের উপস্থাপন করেন ‘আপহিভালস’নামক ওই প্রদর্শনীতে। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের ভিজ্যুয়াল আর্টস প্রোগ্রামের সহযোগীতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী শিল্পীরা হলেন শিশির ভট্টাচার্য, ঢালী আল মামুন, দিলারা বেগম জলি, মুস্তাফা জামান, প্রমথেশ দাশ পুলক, রাজীব দত্ত, জিহান করিম এবং মার্জিয়া ফারহানা।

তিন প্রজন্মের শিল্পীদের কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়েছে এই প্রদর্শনীতে। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক কুহেলিকা উঠে এসেছে শিশির ভট্টাচার্যের চিত্রকর্মে তেমনি ভিডিও আর্টের মাধ্যমে শিল্পী ঢালী আল মামুন আলোকপাত করেছেন ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের বিভীষিকা। দিলারা বেগম জলির সুচি-শিল্পে ফুটে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বাংলার নারীদের দুর্দশা। বাংলাভাষার শক্তি ও রসবোধের সৌকর্য সন্ধান করেছে তরুণ শিল্পী রাজীব দত্তের শিল্পকর্মে। প্রদর্শনীতে ছিল মুস্তাফা জামানের ভিডিও কর্ম যেখানে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আগ্রাসী মনোভাব তুলে এনেছেন তিনি। তরুণ শিল্পী জিহান করিমের শিল্পকর্ম তুলে ধরেছে অনিয়ন্ত্রিত নগরায়নের ভয়াবহ প্রভাব। আবার উচ্চাকাঙ্খী প্রত্যাশা বাস্তবের মুখে পড়লে কীভাবে ভেঙে পড়ে তেমন চিত্র অংকন করেছেন শিল্পী প্রমথেশ দাশ পুলক।

বিভিন্ন দেশের এবং বিভিন্ন প্রজন্মের শিল্পীদের মেলবন্ধনের মাধ্যমে নতুন নতুন শিল্পমাধ্যমের পরিচয় ঘটেছে এ উৎসবে। সম্পূর্ণ নতুন ধারার সৃজনশীল মাধ্যমে শিল্পীরা উপস্থাপন করেছেন নতুন নতুন শিল্প ভাবনা।

বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী শিল্পীদের মধ্যে ঢালী আল মামুন ও রাজীব দত্ত বেঙ্গল বারতার কাছে সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরলেন তাদের সেই অভিজ্ঞতার কথা।

ঢালী আল মামুন

প্রতিবেশী দেশ হিসেবে নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে কিছুটা সামঞ্জস্য আছে। তবুও বাংলাদেশের উৎসবগুলোর সঙ্গে এর কিছু পদ্ধতিগত পার্থক্য ছিল। এ উৎসবে সমসাময়িক শিল্পমাধ্যমগুলোর সম্মিলন ঘটেছে। এমনকি চেতনার দিক থেকেও এটি ছিল সমসাময়িক শিল্পভাবনার মিলনমেলা যেখানে অনেকগুলো মিশ্র মাধ্যমের শিল্পকর্ম একসঙ্গে স্থান পেয়েছে। নতুন একটা পরিস্থিতে সময় এবং স্থানের ধারণাকে কাজে লাগিয়ে জ্ঞানের হেজিমনির বিস্তার ঘটে এরকম বৃহৎ আয়োজনে। এর মাধ্যমেই ফুটে ওঠে একটি জনপদের জ্ঞান ও দর্শন সমাচার। আবার গোলকায়নের ফলে সমসাময়িক চিন্তাভাবনাগুলো একাকার হয়ে যাচ্ছে যার ভিড়ে আড়াল হয়ে যাচ্ছে ক্ষুদ্রক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর শিল্প সংস্কৃতি। তবে এসব উৎসবের মাধ্যমেই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর শিল্প তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে।

রাজীব দত্ত

বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী প্রদর্শনীটি হয়েছে কাঠমাণ্ডুর পার্ক গ্যালারি নামে একটা জায়গায়। একইরকমভাবে ভিন্ন ভিন্ন ভেন্যুতে ভিন্ন ভিন্ন প্রদর্শনী হয়েছে। কারন মূল উৎসবের ব্যপ্তি ছিল অনেক বড়। বিভিন্ন দেশ ও ভাষার শিল্পীদের কাজ একসঙ্গে দেখার সুযোগ পেয়েছে সবাই। এতে করে সাংস্কৃতিক বিনিময় হয়েছে যা বেশ ইতিবাচক। প্রদর্শনীর দর্শকেরাও ছিল বেশ স্বতস্ফুর্ত। আর অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশের শিল্পকর্ম বাড়তি প্রশংসা পেয়েছে।