কান পেতে রই

ভারতভূমির সংগীতে দারুণ একটা বিষয় আছে। এখানে একই সঙ্গে স্বতন্ত্র দুটি সম্পূর্ণ সংগীতধারা পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত এবং বহমান। নেপাল থেকে শুরু করে বাংলাদেশ, পুরো উত্তর ভারত, পাকিস্তান হয়ে আফগানিস্তান পর্যন্ত উত্তর ভারতীয় ধারা, যাকে বলে হিন্দুস্তানি সংগীত। আর বিন্ধ্য পর্বতের ওপারে দক্ষিণ ভারত। সেখানে চলে কর্নাটকি। দক্ষিণ ভারতীয় সংগীতে আমার জ্ঞানগম্যি সীমিত বলেই এ লেখাটি হিন্দুস্তানি সংগীতের যাত্রাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আমি শাস্ত্রীয় সংগীতের একজন শিক্ষানবিশ শ্রোতা। তাও আবার একেবারে শুরুর দিকের। কান-মন-জ্ঞান এখনও এত চোস্ত হয়ে ওঠেনি, যা দিয়ে ছাপার যোগ্য লেখা তৈরি সম্ভব। তাই আমার এই ‘চেষ্টা’র আগে আপনাদের যদি ‘অপ’ শব্দটি জুড়ে দিতে ইচ্ছে হয়, তবে নিশ্চিন্তে সেটা দেবেন। সাফ জানিয়ে দিচ্ছি, আমি সুরের ভুবনের নান্দনিকতা দিয়ে গানের ব্যাকরণ উপস্থাপন করতে বসিনি। তারচেয়ে বরং সোজা সিঁড়ি বেয়ে হাঁচড়ে-পাঁচড়ে সুরলোকের আসরে যাবার রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছানোর অভিজ্ঞতাটা বলে যাবার একটা চেষ্টা করছি মাত্র।

এক কথায় বললে, হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীত শোনা মানে একটি ‘রাগ’ শোনা। হতে পারে কণ্ঠে বা যন্ত্রে। সেই রাগের ওপরে বিভিন্ন ধরনের রীতির, বিভিন্ন ধরনের গায়কি/গতকারিতে শোনা এবং তার রসাস্বাদন। ব্যস! রাগই আমাদের হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের ভিত্তি এবং মূল শোভা। রাগ মানে নির্দিষ্ট কিছু স্বরকে নিয়ে নিয়ম-কানুন ঠিক রেখে সেটা যত খুশি ইমপ্রোভাইজ করা যায়, মানে আরও মিহি করে বোনা যায়। রাগের স্বর ও নিয়ম-কানুন নির্দিষ্ট হবার কারণে ওই রাগ যখনই গাওয়া/বাজানো হয়, তখনই এক ধরনের পরিবেশ এবং ভাবের সৃষ্টি হয়।

এখানেই হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের জাদু। যদি আপনি মেঘ মালহার (মল্লার) রাগ শুনতে অভ্যস্ত হন, যেকোনো ঋতুতে আপনি চোখ বন্ধ করে ১৫-২০ মিনিট গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনলে বৃষ্টি অনুভব করবেন। একটি রাগ শুধু আকার (আ, ই, উ শব্দ করে) বা সারগম দিয়ে (সা-নি) গেয়ে বা বাজিয়ে পরিবেশন করা যায়। রাগের অবয়ব পুরো প্রতিষ্ঠা করা যায়। একসময় শাস্ত্রীয় সংগীতের মূল রীতিটা এ রকমই ছিল। তবে যুগে যুগে পরিবেশন আরও আকর্ষণীয় করার জন্য সংগীতকে বিভিন্ন প্রকারে অলংকৃত করা হয়েছে। পণ্ডিত-ওস্তাদরা বিভিন্ন ধরনের গায়ন/বাদনরীতি (ধ্রুপদ, খেয়াল) উদ্ভাবন করেছেন। বিভিন্ন অঞ্চলের লোকসংগীতের গায়কি থেকেও এসেছে গায়কির বিভিন্ন অঙ্গ। বড় শিল্পীদের গায়কি/গতকারির স্বতন্ত্রতা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ঘরানা বা স্কুল। বিভিন্ন ঘরানা বিভিন্ন গায়নরীতিতে বিভিন্ন রাগে তৈরি হয়েছে সুন্দর সব বন্দিশ। এজন্য একই রাগ ভিন্ন রীতিতে ভিন্ন অঙ্গে ভিন্ন ঘরানার গায়কের কাছে শুনে ভিন্ন রকম অনুভূতি পাবেন। হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের কণ্ঠের প্রতিষ্ঠিত দুটি ধারা- ধ্রুপদ ও খেয়াল। উপশাস্ত্রীয় ধারাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারা ঠুমরি। এছাড়া যন্ত্রসংগীত তো রয়েছেই।

এই সব ধরনের সংগীত পরিবেশন করা হয় বৈঠকি চালে। পরিবেশন মূলত একক হয়। মানে প্রধান একজন গায়ক/বাদককে কেন্দ্র করে সব আয়োজন। তিনি কণ্ঠ দিয়ে বা বাদ্যযন্ত্র দিয়ে সুরের নেতৃত্ব দেন, বাকিরা সঙ্গত করেন। যুগলবন্দীর ক্ষেত্রে গায়ক/বাদক একাধিক হয়। প্রধান শিল্পীকে একটানা ‘টোনিক’ সাপোর্ট দেবার জন্য সাথে ১-২ জন তানপুরা বাদক থাকেন (এঁরা সচরাচর প্রধান শিল্পীর শিষ্য হন)। একজন তালবাদ্য বাদক থাকেন, যিনি তবলা বা পাখোয়াজ নিয়ে তাল বা ঠেকা ধরে রাখেন। কণ্ঠশিল্পীর হাত সচরাচর খালি থাকে। কখনো তাঁর হাতে সুরমণ্ডল বা তানপুরা থাকতে পারে। কণ্ঠশিল্পীকে সুরের আবহ ধরে রাখার সহায়তা করার জন্য আগের যুগে একজন সারেঙ্গীবাদক থাকতেন, যে কাজটা এখন হারমোনিয়াম দিয়ে করা হয়ে থাকে। প্রধান শিল্পী বসেন মাঝখানে, সবার সামনে। শিল্পীর পিছনে তানপুরাবাদকরা থাকেন। ডানপাশে থাকে তবলা, বামে সারেঙ্গী/হারমোনিয়াম। যুগলবন্দী হলে প্রধান দুজন শিল্পী পাশাপাশি বসেন। অনেক সময় জ্যেষ্ঠতা অনুসারে শিল্পী সামনে-পিছনে বসতে পারেন।

কণ্ঠসংগীত ও যন্ত্রসংগীতের উপস্থাপনার মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। পাশাপাশি ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুমরি বা যন্ত্রসংগীতের অনেকগুলো অংশ থাকে, যেগুলো শিল্পী একটির পর একটি জোড়া দিয়ে পরিবেশন করেন। তবে সব শিল্পী একই ক্রমে যে জোড়া দেবেন তা নয়। তাঁর শিক্ষা, চর্চা বা বিশ্বাসভেদে এই ক্রমের পরিবর্তন হয়।

হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের সবচেয়ে পুরাতন ধারা/শৈলী হলো ধ্রুপদ। সুর-তালের বিশুদ্ধতার দিক দিয়ে এখানে বিধিনিষেধ বেশি। এর সাথে তালের জন্য ব্যবহার করা হয় পাখোয়াজ। এই গানের চরিত্র অপেক্ষাকৃত গম্ভীর। শুরু হয় আলাপ দিয়ে। সনাতন মন্ত্রের মতো- আ, রে, নি, না, রি, ই, নোম, তোম শব্দগুলো ব্যবহার করে আলাপ করা হয়। এখানে খুব যত্ন করে বিস্তার করে রাগের রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়। আলাপ শুরু হয় খুব ধীরগতিতে, অতি-বিলম্বিত বা বিলম্বিত লয়ে। সচরাচর ষড়জ (টোনিক স্বর) থেকে আলাপ শুরু হয়। কখনো রাগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বর বা বাদী স্বর থেকেও আলাপ শুরু হতে পারে। এরপর শিল্পী প্রথমে নিচের দিকের সপ্তকে গিয়ে (গম্ভীর স্বরে) সেখানের এই রাগের বৈশিষ্ট্যগুলো ফুটিয়ে তোলেন। তারপরে ওপরের দিকের সপ্তকের কাজ দেখিয়ে আবার ষড়জে ফেরেন। এখানে শিল্পী ধীরে ধীরে রাগটির পরিচয় করান। গুরুত্বপূর্ণ (বাদী-সমবাদী) স্বরগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করেন। একে একে রাগের ভাঁজ খোলেন। ধ্রুপদের এই অংশটি সবচেয়ে জটিল ও দুরূহ। শিল্পীর রাগ বোঝার গভীরতা এবং উপস্থাপনদক্ষতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হয় আলাপে। যে শিল্পী যত দক্ষ, তিনি তত সুন্দর করে আলাপের মাধ্যমে রাগের মূলভাব প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেন। আলাপের সময় কিন্তু তালযন্ত্র ব্যবহার করা হয় না।

আলাপ শেষে আসবে বাণী বা কথা। সেখানে তালবাদ্য যোগ হবে। ধ্রুপদের প্রবন্ধের চারটি ধাতু/তুক বা অংশ থাকে। স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী, আভোগ তুকগুলো সচরাচর ৪ লাইনের সাহিত্য, হিন্দি/উর্দু বা ব্রজ ভাষায় রচিত। আবার কেবল স্থায়ী ও অন্তরা এ দুই তুকের ধ্রুপদ গানের প্রচলনও আছে। প্রমে গাওয়া হয় স্থায়ী। এরপর অন্তরা হয়ে আবার স্থায়ীতে ফেরা হয়। তারপর সঞ্চারী, আভোগ গেয়ে আবার স্থায়ীতে ফেরা। সচরাচর ৭, ১০ বা ১২ মাত্রায় বাঁধা সাহিত্য গাওয়া হয়। ১০ মাত্রার ‘সাদরা’ বা ১৪ মাত্রার ‘ধামার’ বেশি প্রচলিত।

ধ্রুপদের আনন্দ এর দীর্ঘ, বিস্তারিত, বিশুদ্ধ আলাপে। এছাড়া তাল নিয়ে খেলাও দারুণ। শিল্পী কখনো কখনো শুরু করা লয় থেকে আড়াই বা তিন গুণ পর্যন্ত গতি বাড়ান। কান সমৃদ্ধ হতে থাকলে একসময় ধ্রুপদের অলংকারগুলোর (আশ, ন্যাস, মীড়, গমক, মূর্ছান, স্পর্শন ও কম্পন) বিশেষ আনন্দ পাওয়া যায়।

উস্তাত রশিদ খাঁ। ধ্রুপদ খেয়াল শেষে আসর সমাপ্ত করেন ঠুমরি দিয়ে।

খেয়াল এখন হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রচলিত ধারা। খেয়াল মানেই ফ্রি ইমপ্রোভাইজেশন, যেখানে শাস্ত্রীয় রীতিনীতি বজায় রেখেও শিল্পী পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে ইমপ্রোভাইজ করতে পারেন। ফ্রি ইমপ্রোভাইজেশন হলেও শিল্পী সচরাচর কয়েকটি ধাপে খেয়াল পরিবেশন করেন এবং ওই ধাপগুলোর মধ্যেই ইমপ্রোভাইজেশনের সুযোগ নেন। ধ্রুপদের চেয়ে খেয়ালের অংশ বা অঙ্গ বেশি। অঙ্গের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবেগোয়ালিয়র ঘরানাকে যেহেতু সকল ঘরানার জননী ধরা হয়, তাই তাদের আট অঙ্গের খেয়াল সর্বজনগ্রাহ্য। তবে আজ যেসব নামী গায়ক আছেন, তাঁদের বেশির ভাগই এই আট অঙ্গ হুবহু অনুসরণ করেন না। গোয়ালিয়রের খেয়ালের শুরুতে আলাপ নেই। সুর লাগিয়েই বন্দিশ গাওয়া শুরু। তবে আগ্রা ঘরানার গায়কেরা শুরুতে ধ্রুপদের মতো আলাপ করতেন। এখন কেউ কেউ সুর লাগিয়ে সংক্ষিপ্ত আলাপ করেন যেটাকে আওচার বলে। এরপর মূল খেয়াল শুরু হয় বন্দিশ-এ-নায়েকী দিয়ে। এই অংশে ওই খেয়ালের বন্দিশ বা মূল সাহিত্য ও সুরের যিনি রচয়িতা, তাঁর সেই মূল সুর অপরিবর্তিত রেখে গাওয়া হয়। এখানে কয়েকবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ওই ক’ লাইনই গাওয়া হবে। এরপর শিল্পী চলে যাবেন বন্দিশ-এ-গায়কিতে, যেখানে তিনি মূল কম্পোজিশনটি ইমপ্রোভাইজ করার সুযোগ পান। এরপরে শিল্পী চলে যাবেন রাগকে আরও বিস্তৃত করতে। এটাকে বিস্তার বা বড়হত বলে। এখানে রাগের স্বরগুলোর বিভিন্ন কম্বিনেশন করে শিল্পী পরিবেশন করবেন। কিছুটা গানের কথা গাইবেন, আবার মাঝে সুরের বিভিন্ন কম্বিনেশনগুলো ঢুকিয়ে দেবেন। সেই সুরগুলো শুধু আ-কার বা স্বরের নামগুলো দিয়ে গাইতে পারেন। এভাবে শুনতে শুনতে কখন দেখবেন ঢুকে পড়বেন বহলাওয়া নামের একটা মজার রাজ্যে, যেখানে দোলনায় দোলার মতো খেলা হবে। হালকা চালে ঘোরাঘুরির মধ্যে খুব আলতো করে সুর ছুঁয়ে যাবেন মীড় নিয়ে। কখনো বা একটু জোরে গমক দিয়ে। এরপরে আসবে বোল-বাঁট। এখানে বন্দিশের কথাগুলো বিভিন্নভাবে তালের প্যাটার্নের মধ্যে ভাগ করে দেবেন শিল্পী। তালের ওপরে কখনো দীর্ঘ করে গানের কথা বসাবেন, কখনো সংক্ষিপ্ত করে। এ পর্যায়ে এসে গানের চরিত্র কিছুটা বদলে যাবে। সুরের বিভিনড়ব প্যাটার্নের ওপর দিয়ে দ্রুততার সাথে ওঠা-নামা, চরকিকাটা, দৌড়-ঝাঁপ, যেটাকে আমরা তান বলি। তবে প্রম শুরু হবে গানের কথা নিয়েই, যেটাকে বলা হয় বোলতান। এটা খানিকক্ষণ চলার পরে আসবে তান। এখানে আ-কারে বা স্বরের নাম ধরে (সারগাম) দ্রুত ওঠানামা হতে থাকবে। মৌলিক স্তরের শ্রোতাদের অন্য অঙ্গগুলো ভালো লাগতে সময় লাগলেও এই অংশটি ভালো লাগবে সহজেই। এরপরে সেই গতির মধ্য দিয়ে ঢুকে যাবে তার পরের অংশে, যার নাম লয়কারি। লয়কারি মানে বিভিন্ন প্রকারের গতির খেলা। এখানে শিল্পী তাঁর নিজের দখল অনুযায়ী লয় বাড়িয়ে দেখাতে থাকবেন। কে কত গুণ গেলেন, এটা গণনার বিষয়। তবে খুব তৈরি গলা ছাড়া দ্রুতলয়ের তান বা লয়কারি আনন্দের বদলে কানের পীড়ার কারণ হতে পারে।

এগুলো তো গেল খেয়ালের অঙ্গের কথা। কান সাফ হতে থাকলে একসময় খেয়ালকে আরও সুন্দর করার জন্য বিশেষায়িত লহক, গমক, ডগর, মীড়, সুঁত, ঘসীট ধরনের জিনিসগুলোর সূক্ষ্ম মজা পাওয়া যাবে।

খেয়াল গাওয়া শেষ করে কোনো কোনো শিল্পী তারানা গাইতে পারেন। তারানা গাওয়া হয় ‘নোম তানা র্দেনা তাদানি ওদানি দের দানি ইয়া লালি’ ধরনের শব্দ ব্যবহার করে। যন্ত্রশিল্পীদের আলাদা বাদনরীতি আছে। তবে এখন ধ্রুপদ বা খেয়াল গায়নশৈলীর অনেক কিছু ঢুকে গেছে ওখানে। তবে কণ্ঠসংগীতের মতো একইভাবে এখানে ঘর, শিক্ষা বা শিল্পীর নিজস্বতার কারণে বাজনার ধারা ভিন্ন হতে পারে।

যন্ত্রীরা প্রায় সবাই আলাপ দিয়ে শুরু করেন। ধ্রুপদের মতো অত বিস্তারিত না হলেও খেয়ালের মতো আবার অত সংক্ষিপ্তও নয়। এর মাঝামাঝি আকারের একটা আলাপ হবে। তারপরে আসবে জোড়। জোড় মানে দুটি অংশকে জোড়া দেওয়া। আলাপ আর কম্পোজড্ কম্পোজিশনকে জোড়া দেবার কাজ। এ অংশে শিল্পী ক্রমশ ছন্দে প্রবেশ করেন। এতক্ষণ ধরে বিস্তার করা রাগকে জোড়া দেবার কাজ চলে কম্পোজড্ কম্পোজিশন বা গতের সাথে।

এরপর আসবে বিলম্বিত গৎ। এখানে গৎ বা বন্দিশ বিলম্বিত লয়ে শুরু করা হয়। মূল সুরে বিলম্বিত লয়ে বিভিন্নভাবে গতের স্থায়ী অন্তরাকে প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে গতের বিভিন্ন অংশের বিস্তারিত কম্পোজিশন দেখা যায়। এরপর খেয়ালের মতোই শিল্পী ইমপ্রোভাইজ করার ক্ষমতা দেখান। শিল্পী চলে যান দ্রুত গতে। দ্রুত লয়ে তাল বাজানো হয়। এখান থেকে বাজনা ঘন হতে থাকে। এরপর যন্ত্রসংগীত শেষ হয় ঝালা দিয়ে। এ সময় বাদ্যযন্ত্রে ঝড় ওঠে। শিল্পী তাঁর সব দক্ষতা দিয়ে রাগের স্বরগুলোতে খুব দ্রুত চলতে থাকেন। ঝালার পরে শিল্পী হালকা মেজাজের ওই রাগের উপরে তৈরি ধুন বা তারানা বাজাতে পারেন।

আসরের প্রাথমিক শ্রোতা বা বোদ্ধা উভয়কেই আনন্দ দেয় ঠুমরি। ঠুমরি হিন্দুস্তানি উপশাস্ত্রীয় সংগীতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং জনপ্রিয় ধারা। ঠুমরি হলো চঞ্চল স্বভাবের ভাবপ্রধান গান। এ গানে প্রেম, বিরহ, বিবাদ, অপেক্ষা, অভিমান, অভিযোগ, মিলনের অভিব্যক্তিগুলো সুর ও বাণীর সংমিশ্রণে ফুটিয়ে তোলা হয়। শাস্ত্রীয় সংগীতের চেয়ে ঠুমরি অনেক বেশি বাণীপ্রধান। প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট করে উচ্চারণ করা হয় এবং প্রতিটি শব্দের আবেগকে সময় নিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়। ঠুমরি ব্রজ, হিন্দি, উর্দু, পাঞ্জাবি ভাষায় রচিত হয়েছে। এছাড়া বাংলাসহ অন্যান্য কিছু ভাষায়ও কিছু রচনা আছে। বেনারস, পাঞ্জাবসহ হাতেগোনা কয়েকটি গায়নরীতিতে গাওয়া হয় ঠুমরি। সচরাচর সহজ তাল ও হালকা রাগে বাঁধা হয় ঠুমরি। রাগের শুদ্ধতার চেয়ে বেশি নজর দেওয়া হয় বোলের বা অভিব্যক্তি প্রকাশের উপরে। এতে স্থায়ীর পাশাপাশি একাধিক অন্তরা থাকে। খটকা, মুড়কি, গিটকিরি এবং পুকার ঠুমরি গানের প্রধান অঙ্গ। খটকা মানে ঝুঁকে ঝুঁকে বোল বলা হয়, গিটকিরি তানের মতো বোল হয় সুরের কম্পনের সাথে, কয়েকটি সুরের উপরে শান্ত চালে বোল বসিয়ে তৈরি মুড়কি। পুকারের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসে কাতরতা। গানের বাণীর সাথে এগুলো মিশিয়ে সুন্দর বোল তৈরি করে উপস্থাপন করা হয়।

চলে যাবার আগে বলি, আমাদের দেশে শুদ্ধ গান শোনার-শেখার সুযোগ খুব একটা নেই। ধর্মীয় কুসংস্কার কাটিয়ে উঠে সংগীতের উপকারী দিকগুলো এখনো সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাছাড়া পর্যাপ্ত শিল্পী ও আয়োজকদের অভাব। এর মাঝে টুকটাক যে আয়োজন হয় তাই আমাদের ভরসা। তবে বছরের নভেম্বর মাসটা আমার মুখ হাসি হাসি থাকে। কারণ বেঙ্গলের পাঁচ দিনের শাস্ত্রীয় সংগীতের আয়োজন। দিন গুনে গুনে সেই অভিসারের অপেক্ষায় থাকি। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শাস্ত্রীয় সংগীত সম্মেলন বাংলাদেশে, বিষয়টি আমাকে গর্বিত করে।

সবার জীবন সুরেলা হোক।