কীর্তিমান লেখক সৈয়দ শামসুল হক

সৈয়দ শামসুল হক বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপ্রতিম এক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন। সাহিত্যের সকল শাখায় তাঁর সৃজনী উৎকর্ষ, বহুমুখীন কর্মের যে উজ্জ্বল স্বাক্ষর তিনি রেখে গেছেন, তা বাংলা সাহিত্যের ভুবনকে সমৃদ্ধ করেছে। সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে সৈয়দ শামসুল হকের বিচরণ ছিল না। এই বিচরণ হীরকখণ্ডের মতো দ্যুতিময় ও প্রভাময়। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক সৃজনে তাঁর জুড়ি ছিল না। কবিতায় এমন শৈলী ও স্ককীয় এক ভাষা তিনি নির্মাণ করেছেন, যা বিষয়ে ও প্রকরণে অনন্য। ছন্দ ও বাকপ্রতিমা নিয়ে তিনি নিত্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। আর নাটকে? একের পর এক নাটকে মানবজীবনের জটিল গ্রন্থি মোচন করেছেন। কখনো মুক্তিযুদ্ধ, ঐতিহ্য কিংবা মানবমনের গহন আবর্ত থেকে উন্মোচন করেছেন এমন সব অনুষঙ্গ, যার সঙ্গে মানবিকতা বোধ এক সেতু রচনা করে।
প্রেমের কবিতার সমৃদ্ধ ভুবনে যে আবেগ, আকুতি ও ভাবনার জন্ম দেন তিনি তা হয়ে ওঠে নব্য-ভাবনায় সমৃদ্ধ। এই সৃজনে দেশপ্রেম ও সমকালীন জীবনযন্ত্রণাও মুখ্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ বিগত চার দশক ধরে যে সামাজিক সংকটের অন্তর্মুখীন চাপে বিপর্যস্ত হয়েছে তা যে- কোনো সৃজনশীল মানুষের জীবন ও মননে হয়ে উঠেছিল এক যন্ত্রণাময় অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতার বহুস্তর তাঁর কবিতার বিষয় এবং আমাদের যাপিত জীবন তাঁর কবিতায় প্রণিধানযোগ্য হয়ে উঠেছে। সময়ের আততি ও দুঃখকষ্ট এবং যাতনার ছবি পঙ্ক্তির পর পঙ্ক্তির মধ্য দিয়ে উচ্চকিত এক বোধ তৈরি হয়েছে তাঁর কলমে। সৈয়দ শামসুল হকের হাতে যখন গুঞ্জরিত হয় এই বোধ তখন তা হৃদয়ে গেঁথে যায়। সেই কবে আমরা তাঁর ক্ষীণকায় একটি কাব্যগ্রন্থ বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা পাঠ করে মোহিত হয়েছিলাম। আশা ও নৈরাশ্যের এবং দৈনন্দিনতার যে সরব উপস্থিতি ছিল তা আমাদের কাব্যরুচিতে নবীন মাত্রা সঞ্চার করেছিল।
ক্লান্তি, নৈরাশ্য ও বিতৃষ্ণার যে বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাঁর কবিতায়, তা আমাদের কাছে জীবনযাত্রারই বহিঃপ্রকাশ হয়ে ওঠে। এমনকি কিছু কবিতায় কামজ প্রবণতার যে বিচ্ছুরণ স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয় তখন নারীদেহ ও নরনারীর প্রেমের চ‚ড়ান্ত পরিণতিও স্পষ্ট রূপ পরিগ্রহ করে তাঁর কবিতায়।
গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে ছোটগল্পের ক্ষেত্রে নবীন মানবিকতার যে বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছিলেন তিনি, তা হয়ে উঠেছিল এদেশের ছোটগল্পের ভুবনে নবীন মাত্রাসঞ্চারী। প্রকরণ ও গল্প বলায় সঞ্চার করেছিলেন গতানুগতিক ধারামুক্ত এক শৈলী, যে শৈলী ছিল চল্লিশের দশক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই ভিন্নতাই ছোটগল্পে তাঁকে বিশিষ্ট করেছে। আর উপন্যাসে তিনি মানবজীবনের বিস্তৃত অনুষঙ্গকে বিরাট ও ব্যাপক ক্যানভাসে রূপায়িত করেছেন।
তাঁর বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ উপন্যাস একটি জনপদের মানুষের জীবনসংগ্রামের কাহিনি। যে জনপদের মানুষ স্বপ্ন দেখে, দুঃখ-যাতনা ও কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকে; জীবনসংগ্রামের মহীয়ান এক পথ দিয়ে নিজের অস্তিত্বের স্বরূপকে চিনে নেয়।
সৈয়দ শামসুল হক পঞ্চাশের দশক থেকেই সৃজনশীল সকল শাখায় নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, ভাষা ও শৈলীর দিক থেকে নিশ্চিতই এক লক্ষ্যেও উপনীত হয়েছেন। জীবনসংগ্রাম, দুঃখ, ঘৃণা ও জীবনের জটিলতাকে পঞ্চাশের দশকের লেখকরাই এক লক্ষ্য নিয়ে উন্মোচন করেন। আমরা তাঁর কথাসাহিত্যের ভুবনে নতুন এক ভাষা নির্মাণের বৃহৎ পরিপ্রেক্ষিত প্রত্যক্ষ করি। শুধু মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্তের জীবন নয়, নিম্নমধ্যবিত্তের জীবনও তাঁর হাতে নবরূপ নিয়ে উন্মোচিত হয়। কথাসাহিত্যে এই শিল্পীর অগ্রযাত্রা বৈচিত্র্যময় ও জীবনের মানবিক প্রকাশের উজ্জ্বল এক দৃষ্টান্ত। কখনো তাঁর প্রত্যক্ষণে মানবজীবনের জটিল সম্পর্কের টানাপড়েন খুবই বিশ্বস্ততার সঙ্গে প্রতিফলিত হয়।
সৈয়দ শামসুল হকের আরেক কীর্তি শেক্সপিয়রের বাংলা অনুবাদ। বাংলায় শেক্সপিয়রের নানা নাটক বিগত একশ বছর ধরে কতভাবেই না অনূদিত হয়েছে। বাংলায় শেক্সপিয়রের চর্চা নিয়ে বিশ্লেষণমূলক একটি লেখা আছে বিগত শতাব্দীর তিরিশের দশকের অগ্রণী কবি বিষ্ণু দের। এতে যে তথ্য পাই, শেক্সপিয়র চর্চায় তা যে খুব হৃদয়গ্রাহী তা বলা যাবে না। কখনো সংক্ষিপ্তভাবে, কখনো মঞ্চ-উপযোগী করে শেক্সপিয়র অনুবাদ হয়েছে। বাংলা ভাষায় শেক্সপিয়রের এই অনুবাদ সব যে মূলানুগ হয়েছে, এমন বলা যাবে না। এ নিয়ে তর্ক হয়েছে অনেক। ভাষা ও শৈলীতে সৈয়দ শামসুল হক শুধু পারঙ্গমই নন, প্রতিটি শব্দের যথাযথ অনুবাদেও যতœশীল। অনন্য তাঁর অনুবাদ। শব্দচয়নে যথাযথ শব্দের প্রয়োগ তাঁর অনুবাদকে শুধু সমৃদ্ধই করেনি, শেক্সপিয়র অনুবাদে তিনি হয়ে উঠেছেন সর্বাধিক আলোচিত। তাঁর অনুবাদ শুধু কীর্তিমান নাট্যাভিনেতা এবং শেক্সপিয়র-বিশেষজ্ঞ উৎপল দত্তকে মুগ্ধ করেনি, তাঁকে অভিনন্দিত করেন তিনি এই দুরূহ কাজকে যথার্থভাবে সম্পন্ন করার জন্য। তাঁর অননুকরণীয় অনুবাদের ও পরিশ্রমী কর্মযজ্ঞের জন্য তিনি শুধু নাট্যজন নন, অনুবাদ-সাহিত্যেরও একজন প্রধান পুরুষ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। সৈয়দ শামসুল হকের শেক্সপিয়র-অনুবাদ বাংলা সাহিত্যে এক বৃহৎ কীর্তি ও প্রাপ্তি।
এছাড়া তিনি যে কটি মৌলিক নাটক রচনা করেছেন তার অধিকাংশই মঞ্চসাফল্য অর্জন করেছে। বিশেষত পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকটি শুধু তাৎপর্যময় মঞ্চসাফল্য অর্জনই করেনি, এ হয়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধেরও এক দর্পণ। এ ছাড়া নূরলদীনের সারা জীবন নাটকটিও বিদ্রোহ ও জীবনের মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক। তিনি ২৭ সেপ্টেম্বর পরলোকগমন করেন।