কেওক্রাডং এর চূড়ায়

রাত সাড়ে আটটায় জুয়েল থিওটোনিয়াসকে মৌচাক থেকে নিয়ে যখন জ্যাম ঠেলে ফকিরাপুলের শ্যামলীর বাস কাউন্টারে পৌঁছলাম, ঘড়ির কাঁটায় ৯টার কিছু বেশি। ঠিক সময়ে ছাড়ল বাস। আসন্ন শীতের আমেজ পাওয়া যাচ্ছিল বাসের জানালা গলে। সেই আবেশেই ঘুম এল চোখজুড়ে।

সকাল আটটার কিছু আগে নামলাম বান্দরবান বাসস্ট্যান্ডে। ফোনে যোগাযোগ হলো রুমা বাজারে আমাদের এ যাত্রার গাইড তৌহিদের সঙ্গে। রুমা বাজার আসার ব্যাপারে চাঁদের গাড়ি নয়, তার পরামর্শ বাস। তাতে খরচের যেমন কম তেমনি সময়ও খুব বেশি হেরফের হবে না। অতএব টিকেট কেটে সাড়ে আটটার বাসে উঠে পড়া। তিন ঘণ্টার যাত্রায় হাজার ফিটের ওপর দিয়ে যাওয়া রাস্তায় জানালার বাইরে তাকালেই দেখা মেলে স্বর্গদ্বারের। শর্ত একটিই- চারপাশ থাকতে হবে মেঘমুক্ত। অসংখ্য ছোট্ট পাহাড়ি জনপদ, সবুজ উপত্যকায় ঘেরা রুমার রাস্তায় আমাদের প্রথম যাত্রা, বান্দরবানেও প্রথম। স্বভাবতই সবার মধ্যেই তুমুল উত্তেজনা। তিন ঘণ্টার মতো লাগল রুমা বাজার পৌঁছাতে। দেখা হলো তৌহিদের সঙ্গে। এ যাত্রায় তার ভূমিকা ছিল যথার্থ গাইডের মতোই। রুমা বাজারে চার দিনের রান্নার প্রয়োজনীয় মশলাপাতি ও অন্যান্য কেনাকাটা সেরে এবারের যাত্রা বগালেকের পথে। যেতে হবে ল্যান্ডক্রুজারে। এ পথে যারা যাতায়াত করেছেন তারা অন্তত জানেন এর অবস্থা সম্পর্কে। কখনও রাস্তা নেমে গেছে গভীর খাদে, কখনওবা বিপজ্জনক চড়াই। রাস্তার পাশে খাদের দিকে তাকালে ভয় ধরবে সাহসী মানুষটির মনেও। বিকেল সাড়ে তিনটায় গাড়ি থামল এমন এক জায়গায়, যার পর আর কোনো বাহন যায় না। শুরু হলো আমাদের আসল যাত্রা।

প্রায় ২৭০০ ফুট উঁচুতে বগালেক বাংলাদেশের অসামান্য ভূবৈচিত্র্যের একটি উদাহরণ। হালে অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়দের সীমানা ডিঙিয়ে সাধারণ পর্যটকদের কাছেও জনপ্রিয় এই স্থান। চড়াই ভাঙতে শুরু করতেই বুঝতে পারলাম ট্রেকিংয়ের প্রথম কয়েক ঘণ্টাকে কেন সবচেয়ে কঠিন বলা হয়। একটুখানি উঠছি আর বিশ্রাম নিচ্ছি। সামান্য পথটুকু মনে হচ্ছিল অনন্ত। পাশ দিয়ে ইয়া বড় বড় বোঝা নিয়ে তরতর করে উঠে যাচ্ছে পাহাড়ি মানুষগুলো। আর আমাদের হালকা ব্যাকপ্যাক নিয়েও এক কদম হেঁটে তিন কদম জিরোতে হচ্ছে। যাহোক, একসময় বগালেকের দর্শন পাওয়া গেল। আমাদের আজকের গন্তব্য কেওক্রাডং। রাতে এখানেই থাকব। থাকা-খাওয়ার বেশ ভালো ব্যবস্থাই আছে। আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্ট করেই দে ছুট। কেওক্রাডংয়ের পথেও বেশ চড়াই ভাঙতে হয়। তবে এখন আর তেমন সমস্যা হচ্ছে না। বুঝলাম শরীর ধীরে ধীরে মানিয়ে নিচ্ছে। এদিকে বেলা পড়ে আসছে। অনভ্যস্ত হওয়ায় দু-একজন বারবার পিছিয়ে পড়ছিল। ঠিক সময়ে পৌঁছানো নিয়ে দেখা দিল শঙ্কা। চিংড়ি ঝিরি পার হতেই দেখা গেল সূর্য বিদায় নিচ্ছে। রাতের বেলা টর্চের আলোয় ট্রেকিং! কেওক্রাডংয়ে ওঠার পথটি বেশ প্রশস্ত। ঠিক বুনো ভাবটি নেই। শুনলাম জিপ নিয়েও নাকিওঠা যায় এ চূড়ায়। যদিও রাস্তা কয়েক জায়গায় ভাঙা। এবার পুরো টিম তিন ভাগ।

আমার কাছে কোনো টর্চ না থাকায় কিছুক্ষণ পরপরই থামতে হচ্ছিল মধ্যখানে থাকা নাইম আর তোরার জন্য। পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল তখন কেওক্রাডং আলোয় ঝলমল করছে। কুয়াশা সরে গিয়ে বেরিয়ে এল কল্পরাজ্যের পাহাড় সারি। অপার্থিব এক সকাল যেন। চূড়ায় বানানো ছাউনিতে বসে মনে হলো, এ দেশে আড্ডা মারার সবচেয়ে ভালো জায়গা এটিই।

হয়ে গেল এক প্রস্থ ফটোসেশনও। চূড়ায় লাগানো ফলকে বলা আছে, কেওক্রাডং বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া। আবার বইপত্রে পড়ানো হয় তাজিংডংয়ের কথা। ইদানিং ট্রেকাররা দাবি করছে সর্বোচচ্চ চূড়া নাকি সাকাহাফং। সে যাই হোক,  কেওক্রাডং চূড়ায় আর্মি ক্যাম্প ছাড়াও আছে লালা বমের কটেজ। আমাদের রাতের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা সেখানেই। একসময় পৌঁছে গেলাম সেখানে। চূড়ার শীর্ষে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি ভাঙতে হয়। সেখানে পৌঁছে শীর্ষ ছোঁয়া নিয়েও একপ্রস্থ প্রতিযোগিতা। রাতের আঁধারে চারপাশে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তিন হাজার ফুটের উপরে রাতের হাওয়া বেশ ঠাণ্ডা। আপাতত লক্ষ হাত-পা ধুয়ে পেটে কিছু দেওয়া এবং ঘুম। রাতের খাওয়াকে ভূরিভোজ না বললে অবিচারই করা হবে। খাসির মাংস, ডাল, ভাত অমৃতসম। সারাদিনে হাড়ভাঙা ট্রেকিং শেষে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই তলিয়ে গেলাম ঘুমে।