গুনাই বিবির কিচ্ছা

গ্রামবাংলার বিখ্যাত লোকগাথা ‘গুনাই বিবি’র নামে ইমদাদুল হক মিলনের ছোটগল্পের বই গুনাই বিবির কিচ্ছা। ঔপন্যাসিক হিসেবে মিলন অধিক জনপ্রিয়, অবশ্য ছোটগল্পেও তিনি সমান মুগ্ধকর। যখনই গল্প লিখেছেন, নতুন কিছুর সামনে পাঠককে হাজির করার চেষ্টা করেছেন। গ্রাম এবং শহর – সব পটভূমিতেই তাঁর গল্প সমান আকর্ষণীয়। তাঁর গল্প বলার স্টাইল একেবারেই নিজস্ব। ভাষা প্রয়োগেও সবসময় অন্যদের চেয়ে ব্যতিক্রম মিলন।

বইটিতে ভিন্ন স্বাদের ছয়টি গল্প স্থান পেয়েছে। ‘সোনাই বিবির চর’, ‘নেংটি ইঁদুরের জীবন’, ‘শুভদের খেলার মাঠ’, ‘গাছবন্ধু’, ‘সাহেবের ছেলে’ ও ‘গুনাই বিবির কিচ্ছা’।

প্রথম গল্প ‘সোনাই বিবির চর’ অনেকটা লোককাহিনীর আশ্রয়ে লেখা। একই গল্পে পাশাপাশি বর্ণিত হয়েছে আরো দুজন মানুষের গল্প। যারা এই গল্পের কথক ও শ্রোতা। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মামুন এবং সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক রবি। রবির মুখেই সোনাই বিবির রহস্যময় কিচ্ছা শুনছিল মামুন, আর সমান্তরালে চলছিল নিজেদের গল্প। এই গল্পের মূল চরিত্র সোনাই বিবি অদ্ভুতভাবে গায়েব হয়ে যায়। দুদিন পর তার ছেলে রতন তাকে উদ্ধার করে, তাও রহস্যজনকভাবে। মায়ের মৃত্যুতে প্রচণ্ডভাবে মুষড়ে পড়া রতনও মারা যায় এরপর। গল্প কিন্তু এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু কীভাবে চরের নাম সোনাই বিবির চর হলো সে গল্প যে তখনো বাকি। একসময় লোকমুখে চরের নাম হয়ে যায় সোনাই বিবির চর। কারণ তখনও সেখানে হঠাৎ হঠাৎ সোনাই বিবিকে দেখা যেত। তার কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়া যায়। অদ্ভুত মায়া ও বিষণ্নতায় ভরা এই গল্প আমাদের মনে দাগ কেটে যায় সহজেই।

গল্প লেখার ক্ষেত্রে সাধারণ পাঠকের মনকে মাথায় রেখে গল্প সাজান গল্পকার মিলন। তাই তাঁর গল্প সুখপাঠ্যও হয় সবসময়; যা একজন গল্পকারের শক্তিও বটে। এই বইয়ের একটি অদ্ভুত কিন্তু অসাধারণ গল্প ‘সাহেবের ছেলে’। একজন লোক দূর থেকে অফিসে যাওয়ার বিড়ম্বনা এড়াতে অফিসের কাছে বাসা নেয়। সেখানে তার দেখা শোনার জন্য একটি পরিবারকে পাঠায় তার স্ত্রী। সাহেব নামের সে নিম্নবিত্ত লোকটি তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে নিয়ে এই ফ্ল্যাটে ওঠে। এরপর একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেয় সাহেবের স্ত্রী। এতটুকু পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। কিন্তু জন্মের পর থেকে রাত ১২টার পর নিয়ম করে কাঁদতো ছেলেটি। এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে সাহেব ও তার পরিবারকে আলাদা বাসা ঠিক করে দেওয়া হয়। কিন্তু এরপর যা ঘটে তা আরো বিস্ময়কর। সাহেব ও তার পরিবার চলে যাওয়ার পর থেকে আর ঘুমাতে পারছিল না লোকটি। সে অদ্ভুতভাবে প্রতিদিন অপেক্ষা করতো ছেলেটির কান্না শোনার জন্য। যেন সেই কান্না শুনলেই ঘুম আসবে তার। অবশেষে বাধ্য হয়ে সাহেব ও তার পরিবারকে আবার ফিরিয়ে আনা হয় ফ্ল্যাটে।  সেই সাথে লোকটির ঘুমের সমস্যারও সমাধান হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত অসাধারণ একটি মানবিক অবস্থায় গিয়ে শেষ হয় গল্পটি।

বইয়ের নামগল্প ‘গুনাই বিবির কিচ্ছা’ বইয়ের শেষ গল্পও বটে। এটিও একজনের বয়ানে সবাইকে শোনান ইমদাদুল  হক মিলন। রব মিয়া একটা প্রজেক্টের ম্যানেজার। হাসিখুশি ও প্রাণবন্ত এ মানুষটিকে সবাই পছন্দ  করে। কিন্তু প্রজেক্টে রব মিয়া সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন ইবরাহিমকে। তাকে রব মিয়াই এনেছিল এ কাজে। এই ইবরাহিমের বয়ানেই আমরা শুনি গুনাই বিবির কাহিনি। গুনাই ইবরাহিমের স্ত্রী। শ্যামলা বর্ণের গুনাইকে অসম্ভব ভালোবাসত ইবরাহিম। তবে কামাতুর গুনাইকে ফিজিক্যালি খুশি করতে পারত না সে। যে কারণে বহুগামী হয়ে পড়ে গুনাই।কিন্তু একসময় গুনাইয়ের শরীর ভেঙে পড়ে। মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে সে। সে উপলব্ধি করতে পারে ইবরাহিমের সাথে সে অন্যায় করেছে। মারা যাওয়ার আগে সে সবসময় ক্ষমা চাইত ইবরাহিমের কাছে। কিন্তু ইবরাহিম তাকে ক্ষমা করতে পারেনি। এমনকি গুনাইয়ের মৃত্যুর পর নানা নাটকীয় ঘটনা ঘটে ইবরাহিমের জীবনে। একসময় প্রতি পূর্ণিমার রাতে গুনাই আসত ক্ষমা চাইতে। কিন্তু গুনাইকে সে কখনো ক্ষমা করতে পারেনি। তবে অদ্ভুতভাবে সে যেদিন মনে মনে গুনাইকে ক্ষমা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে চরে যায়, সেদিনের পর থেকে গুনাই আর কখনো তার সামনে আসেনি। এভাবেই শেষ হয় ‘গুনাই বিবির কিচ্ছা’।

প্রায় ৫০ পৃষ্ঠার এই গল্প এক টানে পড়ে ফেলা যায়; এতটাই সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় গল্পটি লিখেছেন ইমদাদুল হক মিলন। সেই সাথে ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কোনো জটিলতার আশ্রয় নেননি তিনি। তবে এই গল্পের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ গুনাইয়ের প্রতি ইবরাহিমের প্রেম। এই গল্প পড়তে পড়তে গুনাইয়ের বোধোদয় এবং ইবরাহিমের আশ্চর্যজনক নির্লিপ্ততা আমদেরকেও আক্রান্ত করে। সেই প্রেমের বন্ধন আমরাও অনুভব করতে পারি। এছাড়া এই বইয়ের অন্য তিনটি  গল্পও বেশ মুগ্ধতা ছড়ায়। এই গল্পগুলোতেও গল্পকার কোথাও রহস্য, আবার কোথাও স্বতঃস্ফূর্ত বর্ণনাভঙ্গি দিয়ে পাঠককে আটকে রাখেন শেষ পর্যন্ত।

লেখক: ইমদাদুল হক মিলন

প্রকাশক: বেঙ্গল পাবলিকেশন্‌স

প্রকাশকাল: জানুয়ারি ২০১৫

মূল্য: ৩৩৫ টাকা