গ্রামবাংলার সাঁতার

জল-জলাভূমি, নদী-খালের বাংলাদেশে প্রাচীনতম খেলার মধ্যে অন্যতম বৈচিত্র্যপূর্ণ ‘সাঁতার’। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে জলবিহার, জলক্রীড়া বা জলকেলি নামের যে শব্দগুচ্ছের উল্লেখ রয়েছে, তাতে এর আদিত্ব বোঝা যায়। বাংলাদেশ স্রোতবহুল নদীনালা, জলাভূমির দেশ হওয়ায় সাঁতার জনজীবনের অন্যতম অভ্যাস হিসেবে প্রচলিত রয়েছে। শুধু খেলাই নয়, সড়ক অবকাঠামো সর্বত্র না গড়ে ওঠায় সাঁতার এখনো প্রাসঙ্গিক প্রয়োজনীয় হয়ে রয়েছে। এখনো প্রত্যন্ত গ্রামে তো বটেই ঢাকার অদূরে মুনশিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন গ্রামে নৌকা ছাড়া যোগাযোগ প্রায় অসম্ভব। এসব এলাকায় সাঁতার জানা অবশ্য কর্তব্য, তা না হলে ‘জীবনটা ষোলো আনাই মিছে’। পানিতে ডুবে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্য সাঁতার শেখা যেমন অত্যাবশ্যকীয়, তেমনি মনোরঞ্জনপ্রিয় ক্রীড়া হিসেবে বিনোদনকারীদের কাছে এর গুরুত্ব কম নয়।

গ্রীষ্ম এলেই শুরু হয়ে যায় সাঁতার প্রতিযোগিতার উৎসব। ভরদুপুরে জলাশয়ের দিকে তাকালেই শুধু চোখে পড়ে শিশু-কিশোরদের সাঁতারের দৃশ্য। শামসুর রাহমানের কবিতায় এই সাঁতার উঠে এসেছে স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে। সাঁতার নিয়ে ছড়াও আছে- ‘এই গাঙ্গে (নদী) কুমাইর (কুমির) নাই, হাপ্পুর-হুপ্পুর নাইয়া (গোসল) যাই’। আবার বৃদ্ধজনেরা স্মৃতি আউড়ে সাঁতার খেলা নিয়ে বিভিন্ন ছড়া কাটেন। যখন একসঙ্গে তাঁরা পুকুরে যেতেন, তখন বিভিন্ন খেলায় মেতে উঠতেন আর ছড়া কাটতেন, ‘ডুব দিয়ে যে ধরবে, তার হবে বিয়ে’। আর খিলখিল করে সবাই হাসতেন। খেলাটি যে কতটা বিনোদনমুখী এবং গ্রামগঞ্জের মানুষের কাছে কত যে প্রিয়, তা কবিতা ও ছড়া থেকে অনুমেয়।

গ্রামাঞ্চলের দস্যি ছেলেমেয়েরা মা-বাবার বকুনি উপেক্ষা করে চুপিসারে সাঁতার বিনোদনের মজা নেয় বাড়ির পাশের পুকুর বা খালে কিংবা নদীতে। এটি এখন পরিণত হয়েছে ঋতুভিত্তিক উৎসবে। গ্রীষ্ম এলে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও এলাকাভিত্তিক আয়োজন করা হয় এ প্রতিযোগিতা। বড় পুকুর, খাল বা নদীতে সাঁতার প্রতিযোগিতা দেখতে দুই পাড়ে ভিড় জমায় হাজার হাজার উৎফুল্ল দর্শক। কোনো কোনো স্থানে ঢোল বাজিয়ে উৎসাহ জোগানো হয় প্রতিযোগীদের। বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কারস্বরূপ বিতরণ করা হয় ক্রেস্ট বা নগদ অর্থ। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক ক্রীড়ানুষ্ঠানের বিভিন্ন ইভেন্টের মধ্যে সাঁতার একটি। অবশ্য গ্রামাঞ্চলে এই খেলার বিস্তার অনেকটা প্রসারিত। শহরকেন্দ্রিক আয়োজন অপ্রতুল। তবে উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সাঁতার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় প্রতিবছর। সর্বোৎকৃষ্ট ব্যায়াম সাঁতার ক্রীড়াজগতে উৎসবের একটি অংশ। নবাব ও জমিদার আমলেও সাঁতার প্রতিযোগিতার উৎসব ছিল। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট শরীরচর্চাকারীরা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন। বিজয়ীদের নবাব, জমিদাররা পুরস্কৃত করতেন। বিভিন্ন ইতিহাস এর সাক্ষ্য বহন করে।

১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে প্রথম অনুষ্ঠিত হয় প্রতিযোগিতামূলক সাঁতার। অলিম্পিকে ১৮৯৬ সাল থেকে পুরুষদের এবং ১৯১২ সাল থেকে মহিলাদের জন্য সাঁতার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। স্বাস্থ্য, জীবনরক্ষা, ক্রীড়া ও আনন্দের জন্য সবার সাঁতার শেখা উচিত। আনন্দদায়ক বর্তমান ক্রীড়াজগতের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে আকর্ষণীয় এ খেলাটি। সাঁতার চার প্রকার- মুক্ত সাঁতার, চিৎ সাঁতার, বুক সাঁতার ও প্রজাপতি সাঁতার। কোনো জলাশয়ে বা সুইমিংপুলে উপুড় হয়ে বুকের ওপর ভর করে সাঁতার কাটাকে বলে বুক সাঁতার, উপুড় হয়ে হাত দিয়ে পানি কেটে সামনে চলাকে বলে প্রজাপতি সাঁতার, চিৎ হয়ে পা দিয়ে ঠেলে হাত দিয়ে পানি কেটে সামনে চলাকে বলে চিৎ সাঁতার। নিজের খুশিমতো হাত-পা ছড়িয়ে সাঁতার কাটাকে বলে মুক্ত সাঁতার। এ ছাড়া রয়েছে ডুবসাঁতার, যা ব্যাঙের মতো ঝাপ দিয়ে পানির নিচে সাঁতার কাটা হয়। ডুবন্ত বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে বাঁচানোর জন্য ডুবসাঁতার খুবই প্রয়োজনীয়। পাশ সাঁতারের কথাও আমরা শুনে থাকি। শরীরের একপাশ পানির মধ্যে ডুবিয়ে রেখে ফ্রিস্টাইলের মতো সাঁতার কাটাকেই পাশ সাঁতার বলা হয়। এ ছাড়া অঞ্চলভেদে সাঁতারে রয়েছে বিভিন্ন নাম। সবার জন্য প্রযোজ্য হলেও নদীপথের যাত্রী, বিল, হাওর ও ভাটি অঞ্চলবাসীর কাছে এর গুরুত্ব ব্যাপক।

সাঁতার নিয়ে বাঙালিদের আবেগ-অনুভূতি যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বহুবিধ সাফল্য। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মায়ের কথা রাখতে গিয়ে ভরা বর্ষায় উন্মত্ত দামোদর নদী সাঁতরে পার হয়েছিলেন বলে প্রচলিত রয়েছে। ব্রজেন দাস প্রথম বাঙালি হিসেবে ইংলিশ চ্যানেল সাঁতরে বাঙালির সুনামকে উজ্জ্বল করেছেন বিশ্বদরবারে। সাঁতারে নজির হিসেবে ব্রজেন দাসের এই সাফল্য সর্বত্র তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশে, বিশেষ করে গ্রামবাংলায় সন্তানের বয়স চার বছর পেরিয়ে গেলে অথবা শিশু হাঁটতে পারলেই মা-বাবার কাঁধে দায়িত্ব এসে যায় তাঁর সন্তানকে সাঁতার শেখানোর। শহুরে সুইমিংপুলের মতো সহজভাবে বিভিন্ন পদ্ধতিতে সাঁতার শেখাতে না পারলেও নিজ উদ্যোগে নানা চেষ্টায় কাজটি সেরে ফেলেন অল্প সময়ের মধ্যে। পুকুর বা খালে শিশুটিকে দুই হাতে উপুড় করে জলের ওপর ভাসিয়ে রাখা হয়। এরপর শিশুটি পা দিয়ে জলে সাজোরে ধাক্কা দেয়। এরপর হাত দিয়ে জল কেটে সামনে এগোনোর চেষ্টা করে। মাঝেমধ্যে শিশুটির বুকের নিচ থেকে দুই হাত সরিয়ে নেয় সাহায্যকারী। তখন শিশুটির ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয় এবং পানি খেতে থাকে। তাকে উদ্ধার করে পুনরায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এভাবে এক দিন, দুই দিন, তিন দিন করে ধীরে ধীরে সাঁতার শেখানো হয় শিশুদের। এ ছাড়া পুকুরে বাঁশের মাচা ও বাঁশের রেলিং দিয়েও সাঁতার শেখানো হয়।

জলাশয় কমে গেছে ঠিকই কিন্তু ভরা খালে-জলাশয়-নদীতে দুরন্ত শিশু-কিশোরদের দাপাদাপি কিংবা বিচিত্র ভঙ্গিতে সাঁতার এখনও দুর্লভ নয়। গ্রীষ্মের দাবদাহে প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত, তখন একটু শান্তি পেতে জলাশয়ে ছুটে আসা দুরন্তপনাদের জলকেলির মধ্যে নিহিত রয়েছে পরম শান্তি। শৈশব-কৈশোরের এই দুরন্তপনায় তুলনামূলক গ্রামের খেটে খাওয়া পরিবারের সন্তানদের দেখা যায়। অবস্থাপন্নদের কেউ কেউ সুইমিংপুলে সন্তানদের সাঁতার শেখাতে নিয়ে যান, তবে এসবই ব্যতিক্রম ঘটনা। জলাশয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে দামাল শিশুদের সাঁতার উপভোগের মধুর চিত্র এখনো বিদ্যমান। বৃষ্টিতে ভিজে সাঁতার কেটে বাড়ি ফেরা শিশুদের অকৃত্রিম আনন্দ অভ্যাস। সাঁতার তাদের কাছে এক মুক্ত স্বাধীনতা। দল বেঁধে জলে নেমে সাঁতারকাটা ও পরস্পরের গায়ে জল ছিটানো, হাসি-ঠাট্টার মজাই আলাদা। যখন ক্লান্ত হয়ে আসে, তখন শরীর এলিয়ে ভাসতে থাকে জলে। মনে হয়, পৃথিবীর সব সুখ হাতের মুঠোয়।

বাংলাদেশে সাঁতার খেলা এখনো তেমন পেশাদারিত্বে স্থান করতে না পারলেও এর আনন্দ উপভোগে মাতামাতি নিছক কম নয়। তবে যা হচ্ছে, তার অধিকাংশই মফস্বলভিত্তিক। সাঁতারের উপযোগী পরিবেশ গ্রামবাংলায় সহজলভ্য হলেও বর্তমানে শহরকেন্দ্রিক নাগরিক জীবনে হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন অভিভাবক আর তাঁর সন্তানকে সাঁতার শেখাতে পুকুরঘাটে, জলাশয়ে নিয়ে যান না। নাগরিক শিশুসন্তানের চোখ ফোটার পর তার পরিচয় ঘটে কোচিং সেন্টারের সঙ্গে। সেখানে রাত-দিন পরীক্ষা আর পড়াশোনায় হারিয়ে যায় শৈশবের আনন্দ সাঁতার। এর ফলে নগরের শিশুসন্তানের সঙ্গে পরিচয় ঘটে না জল-জলাভ‚মি, পুকুর-খাল কিংবা নদীর। তারা নদ-নদী দেখলে ভয় পায়। সাঁতারের কথা শুনলে অবাক হয়। এটি তাদের কাছে এক অচেনা বিষয়।

 

ছবি: আরিফুর রহমান