ঘটনাপ্রবাহ আর অনুভূতিপ্রবাহ দুইই জরুরি

সঙ্গীতজ্ঞ এবং কথাসাহিত্যিক উভয় পরিচয়েই শঙ্করলাল ভট্টাচার্য অনন্য। দীর্ঘ ও অতি তৎপর সাংবাদিকতা জীবনে প্রভূত অর্জন আর সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। লিখেছেন একাধিক অসামান্য গ্রন্থ। পণ্ডিত রবিশংকর আর ওস্তাদ বিলায়েত হোসেন খাঁ নিজেদের জীবনীর একান্ত অনুস্মৃতি বয়ান করেছেন তাঁর কাছে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জীবনের গল্প বাঙ্গালী জেনেছে শঙ্করলালের কলমেই। কী নিয়ে লেখেননি তিনি? মোহাম্মদ আলী থেকে দারা সিং আর মাদার তেরেসা থেকে ক্যাবারে সবই অনন্য এক রূপে প্রতিভাত হয়েছে তাঁর কলমে। বাঙ্গালীর সারস্বত চর্চার একান্ত ঐতিহ্যে নিজস্ব এক অবস্থান রয়েছে তাঁর। দীর্ঘদিন কাজ করেছেন আনন্দবাজার গোষ্ঠীতে। এমনকি অবসরের পর এখনও লিখছেন দু’হাতে। কালি ও কলম পত্রিকায় ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছেন অমৃতা শের-গিলকে নিয়ে। পটেশ্বরী নামে। আদ্যন্ত রসবশে থাকা চিরতরুণ এই অনন্য লেখকের মুখোমুখি হলো বেঙ্গল বারতা…

সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। আমাদের প্রজন্মের অনেকেই সাক্ষাৎকারের করণকৌশল শিখতে আপনার লেখা পাঠ করে। আপনি সাক্ষাৎকারের সময় আসলে কীভাবে আলোচনা শুরু করেন। যদি আপনি আজ শঙ্করলাল ভট্টাচার্যের সাক্ষাৎকার নিতেন তবে কি প্রশ্ন করতেন তাকে? কেন করতেন?

লেখালেখি নিয়ে প্রশ্ন করতাম সম্ভবত। আদপে আমি যা লিখি কিংবা যেটুকু লিখি, যেমন গল্প, উপন্যাস-ফিচার ইত্যাদি আসলে নিজেকে সবসময় যে প্রশ্নগুলো করি তারই উত্তর। একটা বয়সে এসে আমরা সবাই নাকি আত্মজীবনীই লিখি। মানে স্মৃতিচারণ আরকি!! যেমন পণ্ডিত রবিশঙ্করের সাথে কাজ করতে গিয়ে পরিচয় হয় জর্জ হ্যারিসনের সাথে। এমন অনেকবার হয়েছে। সম্ভবত আমার সাথে বেশিই হয়েছে। উনার টানা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম আমি আনন্দবাজারের পক্ষে। এছাড়াও আমি যখন ফ্রান্সে পড়ছিলাম সাংবাদিকতা নিয়ে তখন ইরানের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একটা ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম। ইরানে তখন আয়াতুল্লাহ খোমেনি ক্ষমতায়। রেজা শাহ পাহলভীর সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন উনি। আমাকে অসম্ভব সুন্দর একটা ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন। সেসময়ের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কোন রাগ- ক্ষোভ-উষ্মা নেই। অসম্ভব শিক্ষিত মানুষতো! আমি কলকাতার ছেলে জেনে রবীন্দ্রনাথের কথাও জিজ্ঞাসা করলেন। কতটুকু পড়েছি, কি লিখি- এইসব। আবার অন্যরকমও হয়। আমি বক্সার মোহাম্মদ আলীর কাছাকাছি গিয়েছিলাম। আনন্দবাজারের হয়ে একটা ইন্টারভিউও করেছিলাম। এটা লন্ডনে করা। উনি আমাকে ডেকে ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন। সে এক অনন্য অভিজ্ঞতা! মানুষটা এত বেশি জীবন্ত, এত অনন্য।
আচ্ছা জীবনকে আপনি কীভাবে দেখেন?
আসলে ভালো লাগাগুলোর মাধ্যমে নিজেকে বিস্তার করতে পারা। শুধু নিজেকে বিচার করাটাই জীবন নয়। আমার কখনও কখনো কিন্তু খুব বড় কোনো চাওয়া ছিলোনা। তবে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চাওয়া ছিলো। সেগুলো অর্জনের চেষ্টা করেছি। মধ্য কলকাতার যেখানে আমি জন্মেছি সেখান থেকে অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত লেখনির রসদ আমি পেয়েছি। ক্যাবারে নামে আমার একটা উপন্যাস আছে। তো ক্যাবারের অনেক কিছুই ঘটেছে আমার সামনে আবার অনেক কিছুই ঘটানো হয়েছে উপন্যাসের স্বার্থে। আমার পাঠকরাও আমাকে প্রায়ই বলে যে আপনার লেখার মধ্যে এরকম একটা সুন্দর এলাকা আমরা পাই।
জেমস জয়েসের ইউলিসিস থেকে যেমন ডাবলিন পুনর্নিমাণ করা যাবে ঠিক তেমনি আপনার লেখার থেকেও ষাটের কসমোপলিটান কলকাতার একধরণের পুনর্সংগঠন সম্ভব। পটেশ্বরীর বাইরে এখন আর কি লিখছেন বা অদূর ভবিষ্যতে লেখার পরিকল্পনা আছে?

একটা বিশেষ ইচ্ছে আমার আছে তা হলো আত্মজীবনী লেখা। সেটা এবছরই শুরু করবো। আপাতত একটা উপন্যাস লিখছি। হাতের লেখাটা শেষ হলেই ওটা শুরু করবো। সেটাতে ঘটনাপ্রবাহ আর অনুভূতিপ্রবাহ দুইই থাকবে। বার্গসঁর স্ট্রিম অফ কনশাসনেস দ্বারা আমার চেতনা অনেক অনুপ্রাণিত।
এক স্বল্পজীবী পত্রিকায় আপনি একটা লেখা লিখেছিলেন। কুস্তিগির দারা সিংকে নিয়ে। এই যে, অপ্রচলিত বিষয়, তথ্যের অপ্রতুলতা। এর মাঝেই কী দারুণ সব ফিচার লিখেছেন এবং লিখে চলছেন। ফিচারের প্রকরণ নিয়ে যদি কিছু বলতেন।
আসলে হয় কী জানো! নিজেকে প্রশ্ন করেই লেখাগুলো শুরু হয়। প্রশ্নগুলো কতটা গভীর তার ওপরে নির্ভর করে গল্পের গাঁথুনিটা কেমন হবে। আমার একটা উপন্যাস আছে একটা মেয়েকে নিয়ে। আমাদের বাসার পেছনেই ছিল ওদের বাসা। মেয়েটা অবশ্য পরে অনেক বড় আর্টিস্ট হয়েছিলো। এক্ষেত্রে লেখার সময় আমাকেই ঘটনাক্রমের পরস্পরা বজায় রাখতে নিজেকে অনেক কিছু যোগ করতে হয়েছে। ওর জীবনের সব ঘটনাক্রম তো আর জানতাম না। তবে আমার কাছে নিজের স্মৃতি মূল্যবান মনে হয় কারণ তা বারবার লেখনির খোরাক যুগিয়েছে। এখন এই লেখাগুলোর কোনোটা ফিচার আর কোনোটা উপন্যাসের আঙ্গিকে লিখেছি। আর কিছু না! লেখাটা জরুরি; আরও জরুরি দেখা এবং পড়া।
এই যে নিজের স্মৃতি, নিজের ভালোলাগাগুলোকে প্রশ্রয় দেওয়া- এটা কি লেখকের উচিত?

অনুচিত কেন হবে? আমি গান ভালোবাসি, বই ভালোবাসি। মানুষের সঙ্গ আমার ভালো লাগে। একটা সময় সিগারেট ভালোবাসতাম। কিছু কিছু খাবার যেমন- বিরিয়ানি, ইলিশ, কৈ মাছ সাথে কিন্তু বিলেতি কিছু খাবারও ভালোবাসি। পাঠ্য বিষয় হিসেবে আমার সবচে প্রিয় হলো দর্শন। একটা লাইন আমাকে খুব তাড়িত করে। লাপ্লাসের একটা লাইন। বাংলায় সহজ করে বললে সেটা অনেকটা এমন দাঁড়ায় ‘হৃদয়েরও যুক্তি আছে কিন্তু হৃদয় সে যুক্তি বোঝে না’। আমরাতো হৃদয়ের যুক্তিতেই বেঁচে থাকি। অথচ মনের নাবিক কিন্তু দর্শন। প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত দর্শন। মানুষের উচিত তার যা ভালো লাগে তার সাথে লেগে থাকা। আমি যে পাড়ায় বড় হয়েছি সেখানে বড় বড় গানের আসর হতো। বাংলা গানের বড় বড় শিল্পীরা আসতেন। হাজার হাজার মানুষ সে গান শুনতেন। এই রাতের গানের জলসা বিষয়টা আমার চোখের সামনেই পাড়ায় পাড়ায় সংক্রামক হয়ে গেলো। আমি কিন্তু রাতের জলসা নিয়ে অনেক লিখেছি। অবশ্য তার আগে অনেক জলসায় গান শুনেছি, ঘুরেছি। পরে যখন সাংবাদিকতায় এলাম তখন বিভিন্ন সময় পণ্ডিত রবিশঙ্করের অনেক ইন্টারভিউ করেছি। তো একবার তিনিই বললেন, ছোট ছোট ইন্টারভিউ বাদ দিয়ে একটা বড় কিছু করো। তো আমি, আমার কর্তৃপক্ষকে বললাম। তারপর উনার সাথে দেশে দেশে ঘুরে ঘুরে একটা বই লেখা হলো। তার নাম রাগ-অনুরাগ। আর কোমলগান্ধার শুরুর গল্প কিন্তু আরও মজার। ওস্তাদ বিলায়েত হোসেন খাঁ নিজে আমাকে ডেকেছিলেন। এটা অনেক বড় পাওয়া। এই করতে করতে গান নিয়ে এক নিজস্ব ভালোলাগা তৈরি হলো। আমার স্ত্রীও কিন্তু গান গায়। গান থেকে সুন্দর সুন্দর আইডিয়া পাওয়া যায়।
গানের এই আইডিয়াগুলো ব্যবহার করেন কীভাবে?
একটা গান শুনতে শুনতে আসলে অনেকগুলো আইডিয়া এসে যায়। সেগুলো জুড়ে দিলেই নতুন কিছু হয়ে যায়। একটা কাজ করতে করতে আসলে আরেকটা হয়ে যায়। দুটো জিনিস আজীবন চালু রাখা উচিৎ বলে মনে করি। একটা হলো গান শোনা, আরেকটা বই পড়া। আমি কিন্তু ছেলেবেলা থেকে জীবনানন্দর ফ্যান। কিছুদিন আগে বরিশাল গেলাম। যে রাস্তা দিয়ে স্কুলে যেতেন, যেখানে পড়াতেন, ধানসিঁড়ি নদীকে যেভাবে দেখেছেন সেগুলো দেখলাম, ছবি তুললাম। এগুলো কিন্তু আমার চোখে দেখা নয়। তাঁর কবিতা-গল্প-উপন্যাসের মাধ্যমে জানা। যে রূপসী বাংলা আমরা তাঁর কবিতা থেকে দেখেছি। সেই রূপসী বাংলার স্বরূপ আবারও দেখলাম। চোখের এমন আরাম আর পাইনি আমি। লেখার সময় আমি স্মৃতি ঘেঁটে জীবনটাকে একটা প্রেক্ষাপটে লিখি। ধরা যাক, একটা গল্প আমার মাথায় এলো। কেন এলো? গল্পের বিষয়বস্তু আমার পছন্দের হলো কেন? এই গল্পের যে ঘটনাক্রম, চিন্তার ভুবন সেতো একান্ত আমারই। আমি শুনে, পড়ে, বুঝে যা পেয়েছি সেগুলোকেই একটু অন্যভাবে বলা। ঠিক আত্মজীবনী না প্রতিক্রিয়াও নয়।
একটা কথা স্বীকার করে নেওয়া ভালো। আমি আসলে এমন কোনো গল্প বা উপন্যাস লিখিনি যেটা টেবিলে লিখতে বসার আগে অনেকদিন আমার মাথার মধ্যে ছিলোনা। কিছুদিন আগে একটা ছবি করা হয়েছে আমাকে নিয়ে। একটু ভিন্ন আঙ্গিকের একটা ডকুমেন্টারি। জন্মালাম, পড়লাম, বড় হলাম, এই করলাম, সেই করলাম এই ক্রমে না। নতুন একটা ছেলে করেছে। তো ওরা আমাকে বললো, আপনার জীবনে ইন্টারেস্টিং ঘটনা কোথায় কোথায় ঘটেছে? আমি বললাম, কলেজে, কফিহাউসে আর কলেজের কাছেই একটা সিমেট্রি আছে ওখানে। কলেজের ক্লাস শেষ হলে ওখানেই সিগারেট খেতাম আর আড্ডা দিতাম। তো ওখানকার সব থেকে উঁচু যে সমাধিটা সেটা স্যার উইলিয়ামস জোনসের। আমি তাকে নিয়ে পরে একটা উপন্যাসও লিখেছিলাম, প্রথম পুরুষ। তো ওরা বললো আমরা আপনার পুরো জীবনটাই তুলে ধরবো। আপনি ঘটনাগুলো বলুন, আমরা ভিজুয়ালাইজ করবো।
এই মুহূর্তে আপনি একটা চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ করছেন। সেটা কি বায়োপিক?
প্রথাগত বায়োপিক নিয়ে আসলে আমার একটা অনীহাই আছে। এইযে, একজনের জন্ম দেখালাম, স্কুল, চাকরি, দাম্পত্য আর মৃত্যু দেখালাম সেটুকুই শুধু মনুষ্য জীবন নয়। আমি আসলে আগ্রহী একটা মানুষের ভেতরটাকে গল্পে তুলে ধরায়। বেসিক এলিমেন্টগুলো অবশ্যই রাখি। কারণ একজনের জীবনের ঘটনা নিয়ে কাজ করছি। জেইন ক্যাম্পিয়ন এর ব্রাইট স্টার-এর মতো সিনেমা আমার খুব পছন্দের। এখন কাজ করছি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে। আশা করছি সেটা ভালো হবে। বরিশাল গিয়েছিলাম রিসার্চের জন্যই।

সদরঘাট নিয়ে তো দারুণ উত্তেজনাও তৈরি হয়েছিল। ফিল্মটা কি নতুন আগ্রহের বিষয় নাকি আগে থেকেই?
আমি তো ছোটবেলা থেকেই ফিল্মের ভক্ত। ফিল্ম নিয়ে আমার একটা বইও আছে। ছবি করার কথা এলো আমার রিটায়ার্মেন্ট এর পর। ২০০৭ সালে অফিস বললো, অবসরে যাচ্ছো তো ঠিক আছে। কিন্তু আমরা তোমাকে একেবারে ছাড়ছি না। মানে মাইনে দেবো। আমাদের যখন যা দরকার তা বাসায় বসে লিখে পাঠিয়ে দিও। আমি তখন থেকে মেইলেই লেখা পাঠিয়ে দেই। আর ওরাও আমার মাইনেটা পাঠিয়ে দেয়। এরচে ভালো সেটেলমেন্ট আসলে আর হয় না। তো এই সুযোগটা যখন পেলাম লুফে নিলাম। এর আগেও একবার ডকুমেন্টারি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তার জন্য ২ মাস অফিস থেকে ছুটি নিতে হতো। তখন আমি বাঙলা ছবির রিভিউ করি। তো একটা ছেলে এসে আমাকে বললো দাদা আপনাকে একটা ছবি করতে হবে। আমি বললাম, মানে? দাদা ফিচার ফিল্ম। যদি কোনো স্ক্রিপ্ট থাকে দিয়ে দিন। আমরা সেটা নিয়ে কাজ করবো। সেই ছবি হলো পরকীয়া। তারপরে আর হলো না। সদরঘাট নিয়ে কাজ করার কথা হলো। রাইমা সেনসহ সব অভিনেতাও চূড়ান্ত হলো। তো আমরা লোকেশন গেলাম, ঘুরলাম সব ঠিকঠাক। আপনাদের তথ্যমন্ত্রীও অনেক সাহায্য করলেন। সব ঠিকঠাক করে যখন আমরা পুরো দল নিয়ে আসব তখনই রাজনৈতিক জটিলতা শুরু হলো। আমাদের টিমকে অপেক্ষা করতে বললো। তখন জুন, আমাদের স্টোরি ছিলো শীতকালের। তাই তখন আর করা হলো না। এরপর একেবারেই করা হলোনা। অবশ্য এবারে আমি খুব আশাবাদী বিশেষত জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে কাজ। আর বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সাথে বলেও। চেয়ারম্যান আবুল খায়ের সাহেবও খুবই আগ্রহী।
বেঙ্গল বারতাকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
বেঙ্গল বারতাকেও ধন্যবাদ।