চলছে চতুর্থ জাতীয় ভাস্কর্য প্রদর্শনী

যাপিত মানুষের জীবনযাপনের স্থিতি, অস্থিরতা, ক্লান্তি, আনন্দ, অবসাদ, সংকীর্ণতা সবকিছুর মিশ্রণ বা মেলবন্ধন ফুটে উঠেছে চতুর্থ জাতীয় ভাস্কর্য প্রদর্শনী ২০১৮-তে। সৌন্দর্য, স্থাপত্য, মননশীল চিন্তার প্রতীক ভাস্কর্য। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে চলছে চতুর্থ জাতীয় ভাস্কর্য প্রদর্শনী ২০১৮। এর আগে ১৯৭৬ সালে প্রথম, ১৯৮৩ সালে দ্বিতীয়বারের মতো জাতীয় ভাস্কর্য প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ৩১ বছর পর ২০১৪ সালে তৃতীয়বার এ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এরপর চার বছরের বিরতি শেষে এই বছর চতুর্থ জাতীয় ভাস্কর্য প্রদর্শনী শুরু হয়।

জাতীয় ভাস্কর্য প্রদর্শনীর চতুর্থ আসর উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসির উদ্দিন আহমেদ, শিল্পকলা একাডেমির চারুকলা বিভাগের পরিচালক আশরাফুল আলম পপলু এবং বরেণ্য ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘ভাস্কর্য শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, ইতিহাস ও সভ্যতার পরিচয়ও বহন করে। বাংলাদেশে ভাস্কর্য পার্ক নেই। আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটি ভাস্কর্য পার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। আপাতত শিল্পকলা একাডেমির চিত্রশালা প্রাঙ্গণে সেই পার্কটি স্থাপন করা হবে। পরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জায়গা বরাদ্দ পেলে সেখানে তা স্থানান্তর করা হবে। জাতীয় ভাস্কর্য প্রদর্শনী নানা কারণেই নিয়মিত আয়োজিত হয়নি। সর্বশেষ চার বছর আগে আয়োজিত হয়েছিল। আমরা আশা করছি, দুই বছর অন্তর জাতীয় প্রদর্শনী আয়োজন করতে পারব।’

ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান বলেন, ‘প্রদর্শনীর অধিকাংশ কাজই বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ। অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও নিপুণতা রয়েছে অনেক ভাস্কর্যে। সেসব দেখলে হৃদয় প্রফুল্ল হবে। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে ভাস্কর্য চর্চা কিছুটা স্থিমিত ছিল অনেকদিন। প্রতিবন্ধকতা পেরিয়েই আমাদের ভাস্কর্য শিল্প এগিয়ে যাচ্ছে, বিকাশ হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও চর্চা বেড়েছে। ভাস্কর্য শিল্পের প্রসার ও বিকাশের জন্য সরকারি পর্যায়েও সহযোগিতা রয়েছে। আমরা আশাবাদী, দেশের ভাস্কর্য শিল্প আন্তর্জাতিক মানের দিকে এগিয়ে গিয়েছে।’

নবীন ও প্রবীণ ভাস্কর্যশিল্পীদের ভাস্কর্যে গোটা প্রদর্শনী সাজানো হয়েছে। এতে সদ্যপ্রয়াত ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর কাঠের তৈরি ‘শিরোনামহীন’ ভাস্কর্য রয়েছে। ভাস্কর্যটি গাছের ডালে ডালে প্যাঁচানো প্রকৃতির রহস্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই ভাস্কর্য যেমন শিকড়ের কথা স্মরণ করায় তেমনি শিকড় উপড়ানো হলে মূল্যহীন হয়ে পড়ার আকুলতার কথা মনে পড়ে যায়। শামীম সিকদারের ‘বাউল’ ভাস্কর্যটি অসাধারণ এক অনুভূতি জাগায় মনে। একতারা সুরে অচেনা পথে হেঁটে যাওয়া বাউলের বিবাগী মন ছন্দে ছন্দে অচিন পথে নিয়ে যায় মানুষকে। বাউলের সেই গান যে শহুরের বাস্তবতায় অনুপস্থিত তা প্রতিনিয়ত মনে পড়ে এই ভাস্কর্য দেখে। ফারজানা ইসলাম মিলকির ‘অপেক্ষা’ ভাস্বর্যটি দেখলে মনে পড়ে পুরনো দিনের স্মৃতিজাগানিয়া সেইসব কথা। নারীর প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষার কথা মনে করিয়ে দেয় এই ভাস্কর্য। এছাড়াও অন্যান্য বরেণ্য শিল্পীদের কাজও রাখা হয়েছে এই প্রদর্শনীতে। তাঁদের মধ্যে নিতুন কুন্ডুর ‘বিজয়’, আবদুর রাজ্জাকের ‘কম্পোজিশন’, হামিদুজ্জামানের ‘বিশ্রাম’, আনোয়ার জাহানের ‘বালক’, শ্যামল চৌধুরীর ‘ঢুলি’, রাসার ‘গরিব মা, ধনী মা’ ভাস্কর্যের দেখা মিলে।

নবীন ভাস্কর্য শিল্পীদের মধ্যে খোকন চন্দ্র সরকারের ‘আমার বিশ্বাসের অন্তরালে-৯’ ভাস্কর্যটি রয়েছে। গরুর মাথার ভাস্কর্যে বিভিন্ন রঙের ফুলের সঙ্গে স্থান পেয়েছে রাইফেল, গ্রেনেড, কামানের মতো বিধ্বংসী অস্ত্র। এই ভাস্কর্যটি কিছুটা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ইঙ্গিত দেয়। শিমুল দত্তের ‘চাপ সামলাও-৭’ ভাস্বর্যে দেখা যায় মুখে অসংখ্য পেরেক ঢুকানো একজন মানুষকে। এই ভাস্কর্যটি সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার কথা মনে করিয়ে দেয়। অসীম হালদার সাগরের ‘মাদার অ্যান্ড চাইল্ড-৪’ ভাস্কর্যে উঠে এসেছে মমতায় জড়ানো নারীর মাতৃত্ব। আরো আছে, শুধু দুটো মাথা ও মুখমণ্ডল জোড়া লাগানো। একটি বড় আরেকটি ছোট। দেখে মনে হয়, মা তার শিশুটির দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

‘আধিপত্যের খেলা-৬’ ভাস্কর্যটি একটি কুকুরের সামনের পা ও উঁচু লেজ দেখে মনে হয় যে ক্ষিপ্রগতিতে দূরের শিকারের উপর ঝাঁপ দিবে। সামনে দুটি পাখি প্রাণ বাঁচাতে উড়ছে। বোঝা যায় আধিপত্যের বিস্তারের লড়াইয়ে সবাই কতটা মরীয়া। চন্দ্রনাথ পালের ‘মুখোশ’-এ ফুটে উঠেছে মানুষের ভেতরে পশুর অবস্থান। ক্ষিপ্র মানুষ নিজের পশুত্বকে দমন করতে না পেরে এমন সব কাজ করে যাতে তার পশুত্ব সবাই জেনে যায়। ১১ জন আমন্ত্রিত শিল্পী এবং চারজন প্রয়াত পথিকৃৎ ভাস্করের ভাস্কর্যকর্ম রয়েছে এই প্রদর্শনীতে।

৯ মে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী চলবে ৭ জুন পর্যন্ত। ৯৮ জন শিল্পীর মোট ১১৭টি ভাস্কর্যকর্ম রয়েছে এই প্রদর্শনীতে। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য খোলা থাকবে। শুক্রবার প্রদর্শনী চলবে বিকাল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।

 

ছবি: লেখক