চারুকলা মেতেছে বর্ষবরণ প্রস্তুতিতে

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র, দীন ও একাকী। কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ। সে সব মানুষের সঙ্গে একাত্ম হইয়া বৃহৎ।’ এই মহত্ত্বের ডাক, এই ঐক্যের ডাকে সাড়া দিয়ে নববর্ষ নতুন প্রাণের আশ্বাস নিয়ে আসবে- এমন প্রত্যাশা নিয়েই উদ্‌যাপিত হবে নববর্ষের প্রথম দিন। নতুনের আশা নিয়ে দুয়ারে হাজির হবে ১৪২৫। বৈশাখকে স্বাগত জানাতে চারুকলায় মহাযজ্ঞ চলছে গোটা চৈত্রজুড়ে।

১৯৮৯ সাল থেকেই নিয়মিত প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন করে আসছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। নববর্ষ উদ্‌যাপনের গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ নির্মাণেও মূখ্য ভূমিকা পালন করে আসছে চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা। চিরকালীণ লোকসংস্কৃতির পাশাপাশি প্রতিবারই সমসাময়িক রাজনৈতিক সামাজিক বিষয়বস্তুকে ঘিরে বিভিন্ন অনুষঙ্গ স্থান পায় মঙ্গল শোভাযাত্রায়। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রয়াসে প্রস্তুতি চলছে মঙ্গল শোভাযাত্রার।

চারুকলা অনুষদের প্রবেশমুখেই দেখা যায় শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন শিল্পকর্ম নিয়ে কাজ করছে। জয়নুল গ্যালারির সামনের দেয়ালে স্থান পেয়েছে জল রঙের আঁকা বিভিন্ন চিত্রকর্ম। লোকজ শিল্পের ভাবনায় জীবজন্তু ও প্রকৃতির সৌন্দর্যের সম্বলিত বিভিন্ন সরাতে শিক্ষার্থীরা নিজের মনের মাধুরি মিশিয়ে রঙ করছে। কেউবা মাটির ডায়াসে তৈরী করছে নানা আকৃতির মুখোশ। মুখোশগুলো এখনো পুরোপুরি তৈরী না হলেও এর আকৃতি দেখে বোঝা যায় যে এগুলো রাজা-রানী, প্যাঁচা ও বাঘের প্রতিকৃতি। চারুকলার ছোট পুকুরের দিকে গেলে দেখা যায় বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীরা সবাই এই মহাযজ্ঞে ব্যস্ত। কেউ মাটি দিয়ে তৈরি মুখোশে কাগজ লাগাচ্ছে, কেউ কাঠামো তৈরীর জন্য বাঁশ চাঁছছে ও কাঠ কাটছে।

মঙ্গল শোভাযাত্রা উপলক্ষে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন শিল্পকর্ম তৈরি করে যার প্রধান উপজীব্য আমাদের লোকজ শিল্প-সংস্কৃতি। এসব শিল্পকর্ম সবগুলোই বিক্রির জন্য প্রদর্শিত হয়। কারণ শিক্ষার্থীদের এই নান্দনিক শিল্পকর্মগুলোর বিক্রির টাকা থেকেই আসে মঙ্গল শোভাযাত্রার খরচের সিংহভাগ। সেই প্রথম থেকেই অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথাই প্রচার করে আসছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। নানান ধর্ম ও বর্ণের মানুষের মিলন মেলা হয়ে যায় সর্বজনিন এই মঙ্গল শোভাযাত্রায়। তাই এর সার্বজনীনতা কে স্পষ্ট রাখতে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতির জন্য বিজ্ঞাপনের বা কোনো বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে হয় না। তারা নিজেদের সৃজিত শিল্পকর্ম বিক্রির মাধ্যমেই তহবিল গঠন করে থাকেন। চারুকলার প্রবেশদ্বারের পাশের দেয়ালে একটি হাতে লেখা ব্যানার তার সাক্ষী, “সুলভে শিল্পকর্ম সংগ্রহ করুন, মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজনে অংশীদার হোন।”

মঙ্গল শোভাযাত্রার সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন দিকটা হচ্ছে অনেক রঙের মিশেলে তৈরী বিভিন্ন ধরনের শিল্পকাঠামো। এই শিল্পকাঠামোগুলো হবে লোকজ মোটিফের। চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন বলেন, ‘প্রতিবারের ন্যায় এবারেও কাঠামোগুলোতে থাকবে লোকজ সংস্কৃতির ছাপ। হাতি, ঘোড়া, ময়ুর, পাখির, টেপা পুতুলের পাশাপাশি এবার থাকবে ১০টির মতো শিল্পকাঠামো।’

মঙ্গল শোভাযাত্রার অন্যতম আকর্ষণ এই লোকজ শিল্পকাঠামো। এগুলো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সবার আকর্ষণ থাকে এই কাঠামোগুলোর দিকে। প্রতিবারে এই কাঠামোগুলোর থাকে নির্দিষ্ট ভাবনা। এই ভাবনা সমসাময়িক বিষয়ের উপর ঠিক করা হয়।

এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে বাউল সম্রাট লালন সাইয়ের বাণী, “মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।”

মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতির উদ্ভোধন হয় মার্চ মাসের ১৫ তারিখে। উদ্ভোধন করেন চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী। প্রথা অনুযায়ী মঙ্গল শোভাযাত্রা ১৪২৫ এর সার্বিক ত্বত্তাবধায়নে আছে চারুকলা অনুষদের সম্মান ২০ তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা।

ঐতিহ্য অনুসারে মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্ভোধন করবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। মঙ্গল শোভাযাত্রাটি শুরু হবে পহেলা বৈশাখের দিন সকাল ৮টায়। শোভাযাত্রাটি চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হয়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে প্রদিক্ষন করে আবার চারুকলা অনুষদের সামনে এসে শেষ হবে। চারুকলা অনুষদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পাশপাশি বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে  অংশগ্রহণ করবে।

উল্লেখ্য, আজকের মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন শুরুতে এত সহজ ছিলো না। দীর্ঘ স্বৈরশাসনে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা যখন অচল, দুর্বিসহ- শ্বাসরুদ্ধকর তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের কিছু শিক্ষার্থী স্বৈরশাসনের অপশক্তির বিরদ্ধে ও দেশের মঙ্গল কামনায় পহেলা বৈশাখের দিনে বের করে এক বর্ণাঢ্য  শোভাযাত্রার। ১৯৯৬ সালে এই শোভাযাত্রার নামকরণ হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।
কবিগুরু লিখেছিলেন, ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ চারুকলার কিছুসংখ্যক তরুণ  প্রতিবাদের যে আগুন জ্বেলেছিলো তারই ধারাবাহিকতায় আমাদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পহেলা বৈশাখের দিনে প্রধান আকর্ষণ থাকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা। এই মঙ্গল শোভাযাত্রায় পরাজিত হবে অশুভ শক্তি, শুচি-শুদ্ধ ধরিত্রীর বুকে শ্বাস নেবে নতুন প্রাণ- এমনটাই সবাই আশা।