ছাতার সাতকাহন

রোদ আর বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিতেই আবির্ভাব প্রয়োজনীয় এক অনুষঙ্গের। ছাতা ইংরেজিতে এটি ‘আমব্রেলা’, ‘ব্রুলি’ ও ‘গ্যাম্প’ নামে পরিচিত। তবে আমব্রেলা শব্দের সঙ্গে আমাদের পরিচিতি থাকলেও ব্রুলি ও গ্যাম্প কিন্তু নতুন। আমব্রেলা শব্দটি এসেছে লাতিন ভাষার মূল শব্দ আমব্রা থেকে, যার অর্থ ‘ছায়া’। আর ছাতা নামটি এসেছে লাতিন শব্দ ‘টগইজা’ থেকে, যার অর্থও ছায়া।

ঠিক কোথায় এবং কারা প্রথম ছাতা আবিষ্কার করেছিল, এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কেউ বলে মিসরীয়রা প্রথম ছাতা আবিষ্কার করে, আবার কেউ বলে চীনারা। তবে প্রাচীন মিসর, গ্রিস ও চীন দেশের চিত্রকর্মে ছাতার নিদর্শন পাওয়া যায়। তা প্রায় চার হাজার বছর আগেকার কথা! মিসরের প্রাচীন ভাস্কর্য ও চিত্রশিল্পে ছাতার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। এসব চিত্রের মধ্যে কয়েকটিতে দেখা যায়, রাজকন্যা রথে চড়ে ভ্রমণ করছে আর রথের কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছে রাজকন্যার জন্য বিশেষ ধরনের সুসজ্জিত ছাতা। আর দেখা যায়, বিভিন্ন অলংকার ও ফুলসজ্জিত ছাতা ব্যবহার করত রাজপুরুষেরা। সেসব ছাতার ধার ঘেঁষে হয়তো ঝুলে থাকত সিল্ক বা লিনেনের তৈরি পর্দা। এই পর্দা রাজপুরুষকে সূর্যালোক ও এর তাপ থেকে আড়াল করতে সহায়তা করত। আর অনেক চিত্রশিল্প রয়েছে, যেখানে দেখা যায়, ছাতার নিচে বসে আছে রাজা আর তার মাথার ওপর ছাতা ধরে আছে কোনো নারী ক্রীতদাস।

এশিয়া ও আফ্রিকায়ও খুব সীমিত পর্যায়ে রোদ প্রতিরোধক ছাতার ব্যবহার ছিল। গ্রিস ও রোমে ছাতা ছিল সম্মান ও আভিজাত্যের প্রতীক। সেখানকার বিশিষ্টজনদের কাঠ ও পাথরের তৈরি প্রতিমূর্তির মাথার ওপরে থাকত ছাতা। নারীরা রোদ থেকে নিজেদের আড়াল করবে ছাতার সাহায্যে, এমনই প্রথা ছিল রোমে। এসব তথ্য থেকে সহজেই অনুমেয়, সূর্যের তাপ থেকে ছায়া পাওয়ার জন্যই ছাতার ব্যবহার শুরু। রোদ নিবারণের জন্য ব্যবহার করা হতো বলে একে বলা হতো রোদনিবারক ছাতা। বৃষ্টি প্রতিরোধ করার জন্য প্রথম ছাতার ব্যবহার শুরু করে চীনারা। বৃষ্টির সময় ব্যবহারের জন্য চীনারা কাগজের তৈরি রোদনিবারক ছাতায় মোমের প্রলেপ লাগিয়ে দিত। চীনাদের মধ্যে ছাতার ব্যবহার কবে শুরু হয়, তা নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও অনেকের মতে, পশ্চিমা কিংবা মিসর থেকে তারা ছাতার ব্যবহার শেখে। স্বচ্ছ পানিরোধক কাগজ ও বাঁশ দিয়ে তারা ছাতা তৈরি করত।

অনেকেই ভাবেন, লন্ডনের ইংরেজরাই প্রথম ছাতার ব্যবহার শুরু করেছিল। আসলে কিন্তু তা নয়। ছাতার ব্যবহার শুরু সপ্তদশ শতকেরও আগে। মনে করা হয়, প্রাচীন মিসরে প্রথম ছাতার ব্যবহার হয়। সমসাময়িক যুগে প্রিস্ট ও ফারাওরা আভিজাত্য ও ধর্মীয় প্রতীক হিসেবে এটি ব্যবহার করত। আসেরীয় ফলক থেকে জানা যায়, ১৩৫০ সালের আগে যখন কোনো সম্রাট তাঁর সঙ্গীকে নিয়ে বের হতেন, তখন দাস-দাসীরা তাঁদের মাথায় রোদনিবারক লম্বা হাতলওয়ালা ছাতা ধরে রাখত। ধর্মীয় ক্ষেত্রে ভারতে ছাতার আবির্ভাব ঘটে প্রাচীনকালেই। গ্রিকরা আগে ছাতাকে সন্তান উৎপাদনের প্রতীক মনে করলেও ধর্মীয় উৎসব, প্যারেড এবং রোদের হাত থেকে বাঁচার জন্য ছাতা ব্যবহার করত। রোমানরাও রোদ থেকে রক্ষা পেতে প্রাচীনকাল থেকেই ছাতা ব্যবহার শুরু করে। সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ইতালিতে প্রাচীন রোমান সভ্যতার নিদর্শন স্বরূপ ছাতা ব্যবহারের সূচনা হয়। রোদের তীব্র তাপ থেকে বাঁচার জন্য ইতালিতে অনেকে তখন পাখার মতো একটি বহনযোগ্য শেড ব্যবহার করত। ইতালীয় ভাষায় একে বলা হতো ‘আমব্রেলাসেস’। এর ভেতরে কাঠের কাঠামো লাগানো থাকত। সাধারণত এটি ব্যবহার করত ঘোড়সওয়ারীরা। একটি হাতলের সাহায্যে ‘আমব্রেলাসেস’ ঘোড়সওয়ারীদের ঊরুতে বসানো থাকত। স্পেন ও পর্তুগালেও সে সময়ে আমব্রেলাসেসের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।

পারস্য পর্যটক ও লেখক জন হ্যানওয়ে সপ্তদশ শতাব্দীতে পর্তুগাল থেকে প্রথম ইংল্যান্ডে ছাতা নিয়ে আসেন। তিনি যখনই ঘর থেকে বের হতেন, ছাতাটা তাঁর হাতে থাকতই, যেন শরীরেরই একটি অঙ্গ! ফলে এ বস্তুটি নিয়ে মানুষ কৌতূহলী হয়ে পড়ে। লন্ডনে বসবাসরত মানুষ ক্রমে ব্যবহার শেখে ছাতার। মূলত তিনিই ইংল্যান্ডে পুরুষদের মধ্যে ছাতার ব্যবহার জনপ্রিয় করে তোলেন, যে কারণে ইংরেজদের মধ্যে ছাতার আরেক নাম ‘হ্যানওয়ে’। শুধু লন্ডন নয়, যেসব এলাকায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হতো, সেখানেই ছাতার ব্যবহার দেখা যেত। ইংরেজরা যদিও ছাতা আবিষ্কার করেনি, কিন্তু সপ্তদশ শতকে তারাই পানি রোধক ছাতার আবিষ্কার ও ব্যবহার শুরু করে। এটি খুব মজবুত না হলেও একটি প্রয়োজনীয় উপকরণ হিসেবে বিভিন্ন দেশে গ্রহণযোগ্যতা পায়। ছাতা আবিষ্কারের কাহিনী অনেক পুরনো হলেও অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত ছাতার আকৃতি ছিল অনেক বড় এবং ওজনও ছিল বেশি। যেহেতু ছাতার রডগুলো ছিল কাঠের বা তিমি মাছের কাঁটা দিয়ে তৈরি এবং হাতল ছিল প্রায় দেড় মিটার লম্বা, তাই ছাতার গড় ওজন বেশি ছিল, আনুমানিক চার-পাঁচ কেজি। ইউরোপে ছাতার ব্যবহার শুরু হয় ফ্যাশন হিসেবে। অভিজাত শ্রেণীর মহিলারা প্যারিস থেকে সিল্ক ও দামি ঝালর বসানো লেসের ছাতা আনত, যার হাতলে ব্যবহৃত হতো অ্যানামেল। কিছু কিছু হাতল ছিল দেখতে ব্যানারের মতো। এমনকি সে সময় মহিলারা যে ধরনের স্কার্ট পরিধান করত, সে রকম মডেলেরও ছাতার ব্যবহার ছিল। অষ্টাদশ ও উনিশ শতকে তরুণীরা জাঁকজমকপূর্ণ ছাতা হাতে পোর্ট্রটে তৈরি করত। ছাতা তাদের অভিজাত শ্রেণীর পরিচায়ক ছিল। ডেগাস, সনেট, সোয়া ডিলাকরয়ে·, সিউরাট ও রিনয়ের পোর্ট্রেেট দেখা যেত ছাতার ব্যবহার। ব্রিটেনে যদি কোনো তরুণ তার পছন্দের মানুষকে বিয়ে করতে চাইত, তবে তার ছাতাটি বাতাসে উড়িয়ে দিত। ১৯৫৪ সালে ব্রিটিশরা প্রতি মাসে প্রায় তিন লাখ ছাতা তৈরি করে। বর্তমানে হংকং ও জাপানের ছাতা বেশ নামকরা।

বিশ্বের প্রথম ছাতার দোকান ‘জেমস স্মিথ অ্যান্ড সন্স’ চালু হয় ১৮৩০ সালে এবং এই দোকান লন্ডনের ৫৩ নিউ অক্সফোর্ড স্ট্রিটে আজো চালু আছে। ১৮৫২ সালে স্যামুয়েল ফক্স স্টিলের চিকন রড দিয়ে রানী ভিক্টোরিয়ার জন্য ছাতা তৈরি করেন। ইংল্যান্ড, বিশেষ করে লন্ডনে প্রচুর বৃষ্টি হয়। এ জন্য সেখানে ব্যাপকভাবে ছাতার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। যে কারণে লন্ডন ছাতার শহর হিসেবে পরিচিত। একসময় বিশ্বের অনেক দেশ ব্রিটিশদের কলোনি ছিল। আর সে কারণে তারা বিভিন্ন দেশ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে অনেক কম খরচে ছাতা তৈরি করতে পারত। সে সময় তারা সোনা, রুপা, চামড়া, বিভিন্ন প্রাণীর শিং, বেত ও হাতির দাঁত দ্বারা ছাতার হাতল তৈরি করত। ১৭১৫ সালে মারিয়াস নামের এক পারস্যের নাগরিক পকেটছাতা আবিষ্কারের কৃতিত্ব দাবি করেন। এরপর উনিশ শতকের দিকে ছাতাকে বিভিন্ন ডিজাইনের এবং সহজে বহনযোগ্য করা হয়। ১৮৫২ সালে গেজ বা গেড নামের একজন প্যারিস নাগরিক স্বয়ংক্রিয় সুইচের সাহায্যে ছাতা খোলার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। ১৯২০ সালে জার্মানির বার্লিন শহরের হ্যানস হাপট নামের এক ব্যক্তি ছাতা তৈরিতে অভিনব পরিবর্তন আনেন। তিনি ছোট সাইজের সহজে পকেটে বহনযোগ্য ছাতা তৈরি করেন। ১৯৩৬ সালে লর্ড ও লেডি নামে এই ছাতা জার্মান জনগণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। ১৯৫০ সালের দিকে জার্মানির নিরিপ্স কোম্পানির ছাতার ডিজাইন ও আকার ভ্রমণকারীদের মধ্যে খুব সমাদৃত হয়েছিল। ১৯৬০ সালে পলিয়েস্টার কাপড়ের ছাতা পৃথিবীজুড়ে ব্যাপক হইচই ফেলে দিয়েছিল। উপহার হিসেবেও ছাতা এ সময় খুবই সমাদৃত হয়েছিল।

বাংলাদেশে ছাতার প্রচলন কবে থেকে শুরু, তা নিয়েও রয়েছে বহু বিতর্ক। ছাতা হাতে না থাকলে ছাত্রছাত্রীরা পণ্ডিত মশাইকে চিনতে পারত না। ঘটক বা গরুর দালালকেও চেনা যেত ছাতা দিয়ে। বাপের বাড়ি যাওয়ার সময় বউ ঠাট্টা করে বলত, ‘ছাতা ধরো হে দেওরা!’ আভিজাত্যের প্রতীকও ছিল ছাতা। বেশি দিন নয়, এই বছর বিশেক আগেও। গ্রামের গুটিকয়েক মানুষের কাছেই তা শোভা পেত। বাংলাদেশে ছাতার ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। যদিও এই উপমহাদেশে ছাতার চল অনেক আগের। মহাভারতেও ছাতার ব্যবহার দেখা যায়। অর্জুন-কর্ণের মতো বড় বড় বীরের রথেও ছাতা ছিল ছায়া হিসেবে। তবে বাংলাদেশে ছাতার ব্যবহার শুরু হয় মাত্র ১০০ বছর আগে। উনিশ শতকের শুরু থেকে এ দেশে ছাতা তৈরি শুরু হয়। আর ছাতার পাইকারি বাজার বলতে এখনো এক নামে সবাই চকবাজারকেই চেনে। সেই কবেকার শরীফ ছাতা, আলম অ্যান্ড কোং, আলাউদ্দিন ছাতার কথা ভোলা কঠিনই বটে। এদের সঙ্গে আগের হাকিম ছাতা, সানোয়ার, নওয়াব, আফসার, এটলাস ও তাজউদ্দিন ছাতা এখনো টিকে আছে। মোগলটুলি ও মৌলভীবাজারেও রয়েছে ছাতার অনেক প্রতিষ্ঠান। চার-পাঁচ যুগের কম নয় এগুলোর বয়স। বর্তমানে চকবাজারে প্রায় ১২৫ জন ছাতা ও ছাতার সরঞ্জাম ব্যবসায়ী রয়েছেন। চকবাজার, চকমোগলটুলি ও মৌলভীবাজারজুড়ে রয়েছে এসব ছাতার দোকান। এখানকার অনেক ব্যবসায়ী নিজেরাই নিজস্ব ব্র্যান্ডের ছাতা প্রস্তুত করে থাকেন। কিছু ব্যবসায়ী বিভিন্ন ফ্যাক্টরির ছাতা বিক্রি করেন। দেশি ছাতার পাশাপাশি দেশের বাইরে থেকেও ছাতা আমদানি করেন এখানকার ব্যবসায়ীরা। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই ছাতা তৈরি করে। তাদের নিজস্ব কারখানা আছে। তবে এসব কারখানায় কিন্তু ছাতার সবকিছু তৈরি হয় না; বরং বিভিন্ন অংশ একত্র করে জোড়া দেওয়া হয়।

কাজ করছেন ছাতার মিস্ত্রি

ছাতা তৈরির প্রধান উপকরণ শিক ও কাপড়। ছাতার শিক তৈরি হয় পুরান ঢাকায়, এমন কারখানা আছে চারটি। ছাতার কাপড় সংগ্রহ করা হয় ইসলামপুর থেকে। ছাতার জন্য বিভিন্ন ধরনের কাপড় রয়েছে- টেট্রন, পলিয়েস্টার ও সুতি। তবে সুতি কাপড়ের ছাতাই উন্নত মানের। আর পলিয়েস্টার কাপড়টা দেখতে সুন্দর। ক্রেতারা এই কাপড়ের ছাতা বেশ পছন্দ করেন। তাই পলিয়েস্টারের কাছে মার খেয়েছে সুতি কাপড়ের ছাতা।

চকবাজারে অবস্থিত সবচেয়ে পুরনো ছাতার দোকানগুলোর মধ্যে একটি ‘এটলাস ছাতা’। এই দোকানের কর্মচারী মো. সামাদ বললেন, ‘ছাতা তৈরি করতে প্রয়োজন হয় অনেক কিছুই! শিক, রড, কাপড়, স্টিল, টায়ার ইত্যাদি। ব্যবসা বড় বলে আমাদের আলাদা কারখানা আছে, সেখানে এর কাঁচামালগুলো আমরা নিজেরাই বানাই। তবে ছোট ব্যবসা যাদের, তারা এগুলো বিভিন্ন কারখানা থেকে কিনে এনে ছাতা তৈরি করে। সব কাঁচামাল হাতের কাছে থাকলে একটি ছাতা তৈরি করতে খুব বেশি হলে ১৫-২০ মিনিট সময় লাগে।’ এটলাস ছাতা ও এর আশপাশে বেশ কিছু ছাতার দোকান ও কারখানা ঘুরে দেখা গেল যে হরেক রকমের ছাতা কিনতে পাওয়া যায় চকবাজারে। ছোট, বড়, কালো, রঙিন, কার্টুনের ছবিসংবলিত বাচ্চাদের ছাতা, ফোল্ডিং ছাতা, বিচ ছাতা (সমুদ্রসৈকতে যেগুলো ব্যবহৃত হয় পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য) ইত্যাদি আরও অনেক ধরনের, অনেক রঙের ছাতা।

চকবাজারে সব ধরনের সব রকম ছাতাই পাওয়া যায়। ছোট-বড় ও মানের ওপর দাম ওঠানামা করে। স্বাভাবিক ছাতার আকার ২২ থেকে ২৬ ইঞ্চি। তবে ১২ থেকে ৪২ ইঞ্চি পর্যন্ত ছাতা পাবেন এখানে। বড় ছাতা বলতে গার্ডেন ছাতাও মেলে চকবাজারে। এখানে অর্ডার দিয়েও ছাতা বানানো যায়। চকবাজারের ছাতা ব্যবসায়ী নূর হোসেনের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, বর্ষা মৌসুমে চকবাজারে গড়ে প্রতিদিন দুই লাখ ছাতা বিক্রি হয়। কিন্তু বছরের অন্য সময়গুলোতে ব্যবসার বেহাল অবস্থা হয়। বর্ষাই এ দেশে ছাতা বিক্রির মৌসুম। ব্যবসা জমজমাট থাকে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। বৃষ্টি বেশি হলে বিক্রিও বেশি! গ্রীষ্মেও কিছু বিক্রি হয়। বছরের বাকি সময়টায় বিক্রি হয় না বললেই চলে। পাইকাররা সারা দেশ থেকে এসে কিনে নিয়ে যান। এমনও ক্রেতা আছেন, যারা পাইকারি কিনে নিয়ে অন্য জেলায় পাইকারি বিক্রি করেন। চকবাজারে পাইকারিই নয়, খুচরাও বিক্রি হয়। আপনি নিজের জন্য যে রকম ছাতা চান, কিনতে পারেন।

তবে বেশ কয়েক বছর ধরে ছাতা ব্যবসায়ীরা বেশ মন্দায় দিন কাটাচ্ছেন। ব্যবসা খারাপ হওয়ার মূল কারণ বিদেশি ছাতার চাহিদা। অন্য অনেক পণ্যের মতো ছাতার বাজারও আক্রান্ত বিদেশি পণ্যের আক্রমণে। ছাতার বাজারেও চলছে চীনের তৈরি ছাতার আগ্রাসন। ১০-১২ বছর আগেও দেশে বিক্রি হওয়া ছাতার প্রায় পুরোটাই ছিল এ দেশেই প্রস্তুতকৃত। স্থানীয়ভাবে একে বলা হয় বাংলা ছাতা। বর্তমানে বিক্রি হওয়া ছাতার সিংহভাগই চীনের তৈরি। গত এক যুগে চীনের ছাতার চাহিদা বেড়েছে বহু গুণে। বিশেষ করে, শহরাঞ্চলে বাংলা ছাতার ব্যবহার দেখাই যায় না। বাংলা ছাতার মূল ক্রেতা মফস্বল এলাকার মানুষ। শহরাঞ্চলে টিপ ছাতার ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বাংলা ছাতার ব্যবহার কমে গেছে বলে জানালেন ব্যবসায়ীরা। তবে এখন শহরাঞ্চল ছাড়িয়ে মফস্বলেও পৌঁছে গেছে চীনের তৈরি ছাতা। আগে যেখানে এক মৌসুমে ১০ লাখ ছাতা বিক্রি হয়েছে, সেখানে এখন এক লাখ ছাতাও বিক্রি করা কঠিন- এমনটাই বললেন ছাতা ব্যবসায়ীরা। যদি খুব শিগগির ছাতার ব্যবসা ও বাজারকে আগের লাভজনক অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া না যায়, তবে অন্যান্য অনেক দেশীয় ঐতিহ্যবাহী শিল্পের মতো এ শিল্পের মানুষও হয়তো হারিয়ে যাবে কালের গর্ভে।