জন্ম তাঁর চিত্রল সরায়

সেপ্টেম্বর ১৯৪৭। রাজনীতির কাজে বগুড়ায় এসেছেন তৎকালীন কমিউনিস্ট নেতা ও তাত্ত্বিক ভবানী সেন। আলাপ-আলোচনার একপর্যায়ে তাঁর দিকে অটোগ্রাফের খাতা বাড়িয়ে দেন এক কিশোর। তাঁর শিল্পী পরিচয় আগে থেকেই জানা ছিল। তাই খাতায় লিখলেন, ‘শিল্পীর কাজ হ’ল শোষিত জনগণের ভার ও দুঃখ-দুর্দশা এমনভাবে চিত্রের ভিতর দিয়ে ফুটিয়ে তোলা যাতে সে আর্ট সমাজে নবজীবন সৃষ্টি করতে পারে।’ সেই যে শিল্পচেতনার বীজ বপন হলো মুর্তজা বশীরের হৃদয়ে। কালে কালে সতেজ জমিন পেয়ে তা আজ মহীরুহ। ছেলেবেলা থেকেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া কিশোর ম্যাট্রিক পাস করে পার্টির নির্দেশেই ভর্তি হন আর্ট ইনস্টিটিউটে (বর্তমান চারুকলা অনুষদ) এবং সেখান থেকেই শিল্পী হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। এদিকে পারিবারিক আবহে লালিত হয় তাঁর সাহিত্যপ্রয়াস। তাই একজন শিল্পী মুর্তজা বশীরের বদলে বাংলাদেশ পেয়েছে একাধারে একজন কবি, সাহিত্যিক, লেখাক, গবেষক। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এই শিল্পী সম্প্রতি মনোনীত হয়েছেন ‘হামিদুর রাহমান পুরস্কার’-এর জন্য। গত ২৭ আগস্ট ছায়ানট মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাঁকে এ পুরস্কার তুলে দেন বরেণ্য শিল্পী রফিকুন নবী, শিল্পী মাহমুদুল হক, শিল্পী হামিদুর রহমানের ভ্রাতৃবধু মিসেস পারভীন আহমদ এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের।

 

অনুষ্ঠানে বক্তব্যের পাশাপাশি শিল্পী মুর্তজা বশীরের জীবন ও কর্মকে কেন্দ্র করেমুর্তজা বশীর: শিল্প অন্বেষার ৫৫ বছর শীর্ষক স্বল্পদৈর্ঘ্যরে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন প্রযোজিত এবং সৈয়দ তানভীর আহমেদ ও পল জেমস গোমেজ পরিচালিত প্রামাণ্যচিত্রটি ২০০৫ সালে বেঙ্গল গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত মুর্তজা বশীরের গুরুত্বপূর্ণ রেট্রোস্পেকটিভকে কেন্দ্র করে নির্মাণ করা হয়।
বাংলাদেশে আধুনিক শিল্পকলার অন্যতম পথিকৃৎ মুর্তজা বশীর হামিদুর রাহমানের ছাত্রও বটে। গত শতকের মাঝামাঝি থেকে অদ্যাবধি নানা মাত্রিক সৃজনে শিল্পের আঙিনাকে আপন বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র করে তুলেছেন মুর্তজা বশীর। শক্তিশালী ড্রয়িং, রঙের সুমিত ব্যবহার এবং সমাজচেতনায় উদ্দীপিত দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর সৃজনবৈভবে প্রাণময় হয়ে ওঠে। শিল্পী মুর্তজা বশীর দীর্ঘদিনের চিত্রসাধনা ও চর্চার মাধ্যমে এ দেশের চিত্রকলা প্রয়াসকে মনীষা ও শিল্পগুণে সমৃদ্ধ করেছেন। এ ছাড়া তাঁর কবিতাচর্চা ও কথাসাহিত্যের ভুবনে বিচরণ, মুদ্রা সংগ্রহ ও পোড়ামাটির কাজ নিয়ে যে গবেষণা, তা নিশ্চিতই আমাদের ঐতিহ্যিক সাংস্কৃতিক প্রবাহে নবমাত্রা দান করেছে। মুর্তজা বশীরের জন্ম ১৯৩২ সালে, ঢাকায়। ১৯৫৪ সালে গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস থেকে পাস করে উচ্চতর পড়াশোনার জন্য ইউরোপ গমন করেন। ইতালির ফ্লোরেন্সে ‘আকাদেমিয়া দ্য বেল আর্ত’-তে অধ্যয়ন করেন ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ পর্যন্ত। স্বাধীনতার পর ফ্রান্স থেকে ফিরে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২৫ বছর চারুকলা বিভাগে শিক্ষকতা করে অবসর নেন ১৯৯৮ সালে। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদক লাভ করেন তিনি।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের কীর্তিমান শিল্পী, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের স্থাপত্য-নকশার প্রধান রূপকার ও আধুনিক শিল্প আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব হামিদুর রাহমান। তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে পরিবারের পক্ষ থেকে ‘হামিদুর রাহমান পুরস্কার’ প্রবর্তন করা হয় ২০০৭ সালে। এ পুরস্কার প্রদানের সার্বিক ব্যবস্থা ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। ২০১৩ সালে শিল্পী রফিকুন নবী, ২০১১ সালে শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর এবং ২০০৭ সালে শিল্পী মনিরুল ইসলাম এই পুরস্কারে ভূষিত হন।